কভিড-১৯ মহামারী আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নাজুকতা আরো পরিষ্কার করে দৃশ্যমান করেছে। সংক্রমণের বিস্তার রোধে ব্যর্থতায় দিন দিন শনাক্তের সংখ্যার সঙ্গে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। কভিড রোগীদের ভিড় বাড়ছে হাসপাতালগুলোয়। ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। স্বভাবতই বেড়ে চলা রোগীদের চাপ সামলাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও কভিড চিকিৎসায় যুক্ত করছে। এ পর্যন্ত করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য সাতটি বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সরকার চুক্তি করেছে। এর মধ্যে ঢাকা শহরে রয়েছে চারটি, নারায়ণগঞ্জে একটি ও চট্টগ্রামে চারটি। তবে দিন যত যাচ্ছে, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জালিয়াতিও সামনে আসছে। সম্প্রতি কভিড চিকিৎসায় নিয়োজিত রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে পরীক্ষা না করে কভিড সনদ প্রদান, রোগীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ নেয়া এবং সরকারের কাছে বিপুল অর্থের ভুয়া বিল পাঠানোর প্রমাণ মিলেছে। তদন্তে আরো বেরিয়ে এসেছে যে আলোচ্য হাসপাতালের নিবন্ধনই নবায়ন করা হয়নি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, শুধু রিজেন্ট হাসপাতালই নয়; একটি বাদে চুক্তিবদ্ধ সাতটি বেসরকারি হাসপাতালেরই নিবন্ধন নবায়ন করা হয়নি। নিবন্ধন না করেই করোনা মহামারীর সুযোগ নিয়ে এসব হাসপাতাল চিকিৎসা বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে। তারা একদিকে যেমন সরকারের থেকে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছে, তেমনি রোগীদের থেকেও আদায় করছে অতিরিক্ত অর্থ। বলতে গেলে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নাকের ডগায় এসব অপর্কম চলমান রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যেহেতু হাসপাতালগুলোর সঙ্গে চুক্তি করেছে, নিশ্চয়ই প্রয়োজনে যাচাই-বাছাই করেছে; সবকিছু জেনেশুনেই সেগুলোকে কভিড হাসপাতালে রূপ দিয়েছে। সুতরাং এসব জালিয়াতির দায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তথা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও এড়াতে পারে না।
নিবন্ধন নবায়ন না হওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নবায়ন পদ্ধতির ত্রুটি এবং অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের গাফিলাতির কথা উঠে এসেছে হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষের ভাষ্যে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের ভাষ্য হলো, যেসব শর্তে নিবন্ধন নবায়ন করতে হয়, চিকিৎসাসেবার সব শর্ত পূরণ করতে পারে না বলেই হাসপাতাল মালিকরা নবায়ন এড়িয়ে যান। নিবন্ধন নবায়ন করতে হলে নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, ক্লিনার, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ পরিবেশগত ছাড়পত্র, সিটি করপোরেশনের নিষ্পত্তিপত্রসহ বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও কাগজপত্র পেশ করতে হয়। অনেকে সেগুলো পরিপূরণ করতে পারেন না। ফলে তারা নিবন্ধন নবায়নে গড়িমসি করেন। প্রশ্ন হলো, নিবন্ধন নবায়ন না করে কীভাবে হাসপাতালগুলো দিনের পর দিন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে? স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করার কথা। কোথাও অনুমোদনহীন হাসপাতাল কার্যক্রম চালাচ্ছে কিনা, স্বাস্থ্যসেবার নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে কিনা, তা দেখার দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। তার মানে সংস্থাটি তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে না। তাদের শিথিলতার সুযোগে বেসরকারি অনেক হাসপাতালই মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যবসা করছে। জনজীবন হুমকিতে ফেলছে। এর দায়ভার সরকারি প্রতিষ্ঠানটিকেও নিতে হবে। যেহেতু চিকিৎসাজনিত অনিয়মগুলো নতুন করে সামনে এসেছে, সেহেতু প্রতিষ্ঠানটির সক্রিয়তা বাড়াতে হবে লক্ষণীয় মাত্রায়।
শুধু কভিডভুক্ত হাসপাতাল নয়, এর বাইরে অনেক বেসরকারি হাসপাতালেরই নিবন্ধন নেই কিংবা সেটি হালনাগাদ করা হয়নি। এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, প্রায় অর্ধেক বেসরকারি হাসপাতালেরই নিবন্ধন মেয়াদোত্তীর্ণ। এভাবে চলতে দেয়া যায় না। জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালগুলোকে নিবন্ধন নবায়নের তাগাদা দিতে হবে। সাবধান করে দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করতে হবে অথবা সেগুলোর নিবন্ধন বাতিল করতে হবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে। কেননা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারো নেই। এ ধরনের অপরাধ গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যে-ই হোক, দুষ্কৃতকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা সত্য, কভিড মহামারীতে মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তি নিয়ে ব্যাপকতর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। জনসাধারণ চিকিসা পেতে প্রচণ্ডভাবে আঁকুপাঁকু করছে। সেক্ষেত্রে চুক্তিবদ্ধ বেসরকারি কভিড হাসপাতালগুলো এখনই বন্ধ করে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। ওইসব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্যে নবায়ন প্রক্রিয়াধীন আছে বলে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয়তায় শর্ত পূরণসাপেক্ষে তাদের নবায়ন প্রক্রিয়া কীভাবে বেগবান করা যায়, সেটি দেখতে হবে। আর নির্ধারিত হাসপাতালগুলোয় ঠিকভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম হচ্ছে কিনা, তা নিয়মিতভাবে তদারক করতে হবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে। মালিকদের আন্তরিকতা ও সততা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের তত্ত্বাবধানে বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা পাবে, এটিই প্রত্যাশা।










