স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও বাংলাদেশে যে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভ করতে করতে পারল না! এমনকি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থা যে ভঙ্গুর দশা হতে টেকসই হতে পারল না, বরং সর্বশেষ আওয়ামী লীগের চরম কর্তৃত্ববাদী শাসনে একেবারে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলো; তার মূলে রয়েছে নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রহীনতা তথা এক ব্যক্তিনির্ভর স্বেচ্ছাচারিতা। কেন্দ্র হতে প্রান্ত পর্যন্ত যা সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক চেতনাহীন লাখো বেকার ও কর্মহীন সমর্থকনির্ভর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়িত চক্রের সৃষ্টি করেছে। যে চক্রের গ্যাড়াকলে স্বীকৃত গণতান্ত্রিক বিশ্বের দায়িত্বশীল, উচ্চ রাজনৈতিক বোধসম্পন্ন, শিক্ষিত রাজনৈতিক কর্মী বা দলের মর্যাদাবান ডেলিকেটের স্থলে নেতার কথায় উঠবস করা দখল ও চাঁদাবাজিনির্ভর একটি ফায়দাতন্ত্র গড়ে উঠেছে।

কোনো কিছু করে খেতে না পারা একটি বিশাল অংশের মানুষ এ দুর্বৃত্তায়িত ব্যবস্থাকেই রাজনীতি তথা নিজেদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র জ্ঞান করছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের সুশাসনহীনতা এবং কলুষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির শুরুটা এখান থেকেই। এ এমন এক সংক্রামক রোগ যাতে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল তো বটেই পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রকে রুগ্‌ণ ও দুর্বল করে তুলেছে। যার পুঞ্জীভূত অভিঘাত হিসেবে সরকার, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দলসহ সব প্রতিষ্ঠান মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো মহত্তম গণবিপ্লব সত্ত্বেও ধারাবাহিকভাবে কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ফল হিসেবে একটি ফ্যাসিস্ট ও মাফিয়া রেজিমে রূপ লাভ করেছে। তাই এ অচলায়তন হতে গণতন্ত্রকে মুক্ত করে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী জনগণের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র সংস্কারকে টেকসই ও অর্থবহ করতে চাইলে রাজনৈতিক দলগুলোয় গণতন্ত্রায়ণ জরুরি। বিশেষ করে সব দলের সব পর্যায়ের নেতৃত্ব নিয়মিত কাউন্সিলের মাধ্যমে গোপন ব্যালটে হওয়াটা বাঞ্ছনীয়।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারে গঠিত এ-সংক্রান্ত কমিশনও তাদের প্রতিবেদনে এ বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এটি একটি দারুণ ইতিবাচক সুপারিশ। কারণ এটি একেবারে সহজাত কাণ্ডজ্ঞানের কথা; যে রাজনৈতিক দল নিজেদের দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা করে না, তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির চর্চা করবে না। স্বাধীনতার পর থেকে আমরা সেই প্রবণতাই লক্ষ করেছি। সেই অর্থে কোনো রাজনৈতিক দলই অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের কমিটিগুলো গঠনের অনুশীলন করেনি। দলগুলো তাদের কর্তৃত্ববাদী গঠনতন্ত্রে ভর করে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া দলের শীর্ষ নেতার একক পছন্দের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল কমিটি গঠন করেছে। তাদের নিয়ম রক্ষার কাউন্সিলগুলোয় সব কমিটি গঠনের এখতিয়ার শীর্ষ নেতার ওপর অর্পণ করা হয়েছে। এতে দলের নেতাকর্মীরা দল ও দলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থাশীল না হয়ে একক কোনো নেতার ওপর আস্থাশীল হয়েছে, যা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকতা না দিয়ে ফায়দানির্ভর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে প্রাতিষ্ঠানিকতা দিয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে যতগুলো রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, স্বীকৃত গণতান্ত্রিকচর্চা হিসেবে কখনই সরকার ও রাজনৈতিক দলের পৃথকীকরণ ঘটেনি। বরং প্রায় সব সরকারের সময়ই রাজনৈতিক দল সরকারে বিলীন হয়ে গেছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী তথা রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রধানের পদ একই ব্যক্তি অলংকৃত করেছেন। ফলে সরকার ও দলের মধ্যে বিভাজনরেখা মুছে গিয়ে সুশাসনের একেবারে মৌলিক শর্ত "স্বার্থের দ্বন্দ্ব" এবং "সংযম ও ভারসাম্যের" নীতি লঙ্ঘিত হয়ে ব্যক্তি ও দল কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে। এর ফলে নামে বিভিন্ন সময় তথাকথিত নির্বাচিত, গণতান্ত্রিক শাসন প্রচলিত হলেও আদতে তা ছিল ভোটসর্বস্ব ব্যক্তিতান্ত্রিক এক ধরনের দুর্নীতিপরায়ণ কতিপয়তন্ত্র। আর তা বাস্তবায়নে সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বৈশ্বিক ও সভ্য ব্যাকরণের বাইরে প্রতিষ্ঠিত "বাংলাদেশ মডেলের" ভারসাম্যহীন কর্তৃত্ববাদী সাংবিধানিক ক্ষমতা কাঠামো।

সেটাও নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে পারেনি, সময়ে সময়ে সামরিক শাসন থেকে শুরু করে নানা অসাংবিধানিক উপায়ে তার ছন্দপতন ঘটানো হয়েছে। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী সামরিক-বেসামরিক কায়েমি গোষ্ঠী এ ব্যবস্থাকে আরো কলুষিত করে তাদের অবৈধ ক্ষমতালিপ্সার উপলক্ষে পরিণত করেছে। বিশেষ করে এরশাদের প্রায় এক দশকের সামরিক শাসনে আমাদের রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিদ্যমান সব অসুখের সূচনা ঘটেছে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন-সংগ্রামের মুখে ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থা পরিবর্তনের আশা জাগ্রত হলেও তা তাদেরই অনৈক্য, ক্ষমতালিপ্সা ও জাতির প্রতি ওয়াদা ভঙ্গের কারণে ব্যর্থ হয়েছে। আর এ ব্যর্থতার পেছনেও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্বেচ্ছাচারিতা ও যৌথ নেতৃত্বের অভাব কাজ করেছে।

বিশেষ করে ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ঘিরে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট এবং তৎপরবর্তী ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়াকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত সাংবিধানিক সংকটের সময় ক্ষমতাসীন দলে গণতান্ত্রিক চর্চার আবহ ও যৌথ নেতৃত্ব কার্যকর থাকলে রাজনৈতিক অস্থিরতা এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও এক-এগারোর মতো সেনা সমর্থিত অসাংবিধানিক হস্তক্ষেপ এড়ানো যেত। তবে দলে গণতন্ত্র ও যৌথ নেতৃত্ব না থাকলে যেকোনো দেশ বা জাতি কী ভয়ংকর সংকটে পতিত হয় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সদ্যসমাপ্ত ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান ও আওয়ামী লীগের লজ্জাজনক পতন। এর বীজ রোপিত হয়েছিল ২০১১ সালে; একতরফাভাবে বলতে গেলে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিলের মাধ্যমে।

এর ফলে পরপর তিনটি জঘন্য বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক চরম কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র কাঠামোর সূচনা ঘটে। রাশিয়ার জার ও মোগল সম্রাটের চেয়ে বেশি ক্ষমতা নিয়ে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠে সেই ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যমণি। সুতরাং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে পূর্বের মতো ব্যর্থ হতে দিতে না চাইলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হিসেবে রাজনৈতিক দলে যৌথ নেতৃত্ব, গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র ও দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের কার্যকর চর্চার ওপর জোর দিতে হবে। তা না হলে রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক রূপান্তর তো ঘটবেই না, বরং আরেকটি স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে নতুন গণ-অভ্যুত্থানের অপেক্ষা করতে হবে। আর আমরা তো গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে পটু না হলেও গণ-অভ্যুত্থান ঘটাতে দারুণ পারঙ্গম।

মনজুর এরশাদ খান: শিক্ষক, লেখক ও সমাজকর্মী