গ্যাস সংকট নিরসন নাকি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির লক্ষ্যে যেকোনো মূল্যে এলএনজি আমদানি অপরিহার্য? এ প্রশ্নের জবাব পাঠক দেবেন।

স্পট মার্কেট থেকে অতিচড়া দামে এলএনজি আমদানির অজুহাতে পেট্রোবাংলা ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের মূল্যহার ১১৭ শতাংশ এবং লাইসেন্সিরা উৎপাদনে গড়ে ৬০ শতাংশের অধিক, সঞ্চালনে ১২৯ এবং বিতরণে ১২০-৪০০ শতাংশ চার্জ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন। বিইআরসির কারিগরি কমিটি (টিসি) ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের মূল্যহার ২০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করে। গণশুনানিতে পেট্রোবাংলাসহ কোনো লাইসেন্সিই তাদের কোনো প্রস্তাব ন্যায্য ও যৌক্তিক প্রমাণ করতে পারেননি। কারিগরি কমিটিও তাদের প্রস্তাব ন্যায্য ও যৌক্তিক প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি। গণশুনানিতে দেখানো হয়, ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে নির্ধারিত চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি সরবরাহ না হওয়ায় উভয় বছরে যথাক্রমে ৭ হাজার ২৮৪ দশমিক ৩ ও ৭ হাজার ৬৪৮ দশমিক ৮ কোটি টাকা রাজস্ব উদ্বৃত্ত থাকে। সেসব উদ্বৃত্ত রাজস্ব লাইসেন্সিদের প্রস্তাবে সমন্বয় হয়নি। টিসিও তার প্রস্তাবে সমন্বয় করেনি। টিসির প্রস্তাবে বিদ্যমান সরকারি ভর্তুকি অর্ধেকেরও বেশি কমানো হয়েছে। বিতরণ লাইসেন্সিদের প্রায় সবার ক্ষেত্রেই আয় অপেক্ষা ব্যয় অনেক কম। তাদের বিতরণ চার্জ মঞ্জুর করা ন্যায্য ও যৌক্তিক না হলেও শূন্য দশমিক ২৫ টাকা বহাল রাখা হয়েছে এবং বিদ্যমান সঞ্চালন চার্জ শূন্য দশমিক ৪২৩৫ টাকা থেকে শূন্য দশমিক ৪৮৯০ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্যাবের হিসাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে জিটিসিএলের ৪৫ কোটি টাকা রাজস্ব উদ্বৃত্ত থাকে। অথচ টিসি সঞ্চালন চার্জ শূন্য দশমিক শূন্য ৬৫৫ টাকা (১৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ) বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। এসব বিবেচনায় ক্যাব স্পট মার্কেট থেকে অতি উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি না করার এবং নিম্নে বর্ণিত পর্যালোচনা মতে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধির পরিবর্তে ভারিত গড়ে ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করেছে। তবে ক্যাবের পক্ষ থেকে সব শ্রেণীর গ্রাহকের বিদ্যমান মূল্যহার বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু গ্যাস তসরুপ প্রতিরোধে মাসিক ৭৭ ঘনমিটারের পরিবর্তে ৪০ ঘনমিটার ব্যবহার ধরে মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকদের চুলাপ্রতি গ্যাসের মূল্যহার কমানোর এবং কস্ট প্লাসের পরিবর্তে আগামী শুনানি না হওয়া পর্যন্ত জিটিসিএলের সঞ্চালন চার্জ ও তিতাসের বিতরণ চার্জ কস্ট বেসিসে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২০-২১ অর্থবছরে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি ও মোট গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৬ হাজার ১১৯ দশমিক ১৪ ও ৩১ হাজার ১৭৯ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন ঘনমিটার। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রাক্কলিত রাজস্ব চাহিদায় মোট গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ কমেছে, অথচ স্পট মার্কেট থেকে ৮৩ দশমিক ৪৭ টাকা মূল্যহারে এলএনজি আমদানির পরিমাণ বেড়েছে। ফলে আর্থিক ঘাটতি চরমে পৌঁছেছে এবং গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির চরম চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু শুনানিতে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি ও আর্থিক ঘাটতি কোনোটিই ন্যায্য ও যৌক্তিক বলে প্রমাণিত হয়নি।

এলএনজি আমদানি

২০১৯ সালে বিইআরসি গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধির আদেশে ৮৫০ এমএমসিএফডি এলএনজি সরবরাহ ধরে গ্যাস সরবরাহে রাজস্ব চাহিদা নির্ধারণ করে।

২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত গড়ে কম-বেশি ৫০০ এমএমসিএফডি এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। কিন্তু ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩১ মার্চ পর্যন্ত গড়ে আমদানি হয়েছে ৬২৯ দশমিক ৭৭ এমএমসিএফডি। তাতে দেখা যায়, স্পট মর্কেটে একদিকে এলএনজির দাম বেড়েছে, অন্যদিকে আমদানীকৃত এলএনজিতে ওই এলএনজির অনুপাতও বেড়েছে। চড়া মূল্যে এলএনজি আমদানির এ ধারাবাহিকতায় বর্তমান অর্থবছরে ৩০ জুন পর্যন্ত পেট্রোবাংলা ও টিসি উভয়ই গ্যসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। কিন্তু এরই মধ্যে দেশী গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি করেছে আইওসি প্রায় ৫৫ ও বিজিএফসিএল ১৫ এমএমসিএফডি। প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে জুন পর্যন্ত দেশীয় গ্যাস সরবরাহ আরো বাড়বে। বিষয়টি ২০২১-২২ অর্থবছরের গ্যাসের চাহিদা নির্ধারণে বিবেচনায় নেয়া হলে এলএনজি আমদানি কম-বেশি ৫০০ এমএমসিএফডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে গ্যাস সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। মূল্যহার ও/বা ভর্তুকি বৃদ্ধির দরকার হতো না। অথচ এমন বিবেচনা পেট্রোবাংলা ও টিসি উভয়ের প্রস্তাবে অনুপস্থিত ছিল।

২০২১-২২ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি বিবেচনা করা হয়েছে পেট্রোবাংলার প্রস্তাবে ৮ হাজার ৭৮৫ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ঘনমিটার (Mm3) (৮৫০ এমএমসিএফডি), তার মধ্যে চুক্তিতে ৭ হাজার ৮৩১ Mm3 (৭৫৭.৬৮ এমএমসিএফডি) এবং স্পট মার্কেট থেকে ৯৫৪ দশমিক শূন্য ৮ Mm3 (৯২.৩১ এমএমসিএফডি)। টিসির প্রস্তাবে ৭ হাজার ৭৮ দশমিক ২৯ Mm3 (৬৮৪.৮৫ এমএমসিএফডি), তার মধ্যে চুক্তিতে ৬ হাজার ৪১ দশমিক ৮৫ Mm3 (৫৮৫.৫৭ এমএমসিএফডি) এবং স্পট মার্কেট থেকে ১ হাজার ৩৬ দশমিক ৪৪ Mm3 (১০০.২৮ এমএমসিএফডি)। ক্যাবের প্রস্তাবে ৬ হাজার ৯৯৫ দশমিক ৯৩ Mm3 (৬৭৬.৮৮ এমএমসিএফডি), তার মধ্যে চুক্তিতে ৬ হাজার ৪১ দশমিক ৮৫ Mm3 (৫৮৫.৫৭ এমএমসিএফডি) এবং স্পট মার্কেট থেকে ৯৫৪ দশমিক শূন্য ৮ Mm3 (৯২.৩১ এমএমসিএফডি)। উভয় প্রস্তাবের মধ্যে যেটি কম সেটি ক্যাবের প্রস্তাবে গৃহীত হয়েছে।

ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে চুক্তিভিত্তিক প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানি ব্যয় ছিল ভারিত গড়ে ২০ দশমিক ৫০ টাকা। স্পট মার্কেট এলএনজির ক্ষেত্রে সে ব্যয় ছিল ২৬ দশমিক ১৭ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে উভয় ধরনের এলএনজির ক্ষেত্রে সে ব্যয় ছিল যথাক্রমে ৩১ দশমিক ৫৪ ও ৮৩ দশমিক ৪৭ টাকা। আমদানি বাজারে এলএনজির মূল্য যখন স্বাভাবিক ছিল তখন পেট্রোবাংলা চুক্তিভিত্তিক এলএনজি আমদানি করেছে ২৮ দশমিক ৮৪ টাকা দরে। অথচ ভারত তখন ক্রয় করে বাংলাদেশী মুদ্রা মানে ১৮ দশমিক শূন্য ১ টাকা দরে। উভয় দেশের ক্রয়মূল্যে এত বেশি তারতম্য ন্যায্য ও যৌক্তিক ছিল না। বিষয়টি গণশুনানিতে উল্লেখ করে বলা হয়েছিল, তুলনামূলক কম মূল্যে স্পট মার্কেটে এলএনজি পাওয়া সম্ভব এবং সে মূল্য কখন কম বা বেশি হয় তাও প্রক্ষেপণ করা অসম্ভব নয়। এ বিবেচনায় বিইআরসির আদেশে চুক্তিভিত্তিক আমদানির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি গুরুত্ব পায়। অথচ চুক্তিতে আনা এলএনজির মূল্য অপেক্ষা কম মূল্যে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কখনই আমদানি করা হয়নি। পেট্রোবাংলা ২০২১-২২ অর্থবছরে গড়ে ৮৩ দশমিক ৪৭ টাকা দরে দিনপ্রতি ৯২ দশমিক শূন্য ৭ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি অব্যাহত রেখেছে এবং বিইআরসির কারিগরি কমিটি ওই একই মূল্যহারে দিনপ্রতি ১০০ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানির সুপারিশ করেছে, যা বিইআরসি আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। গ্রীষ্মকালে সাধারণত আবহাওয়া ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ থাকে। সাইক্লোন-জলোচ্ছ্বাস লেগেই থাকে। সুপারিশে তা বিবেচনায় আসেনি। ভোক্তাস্বার্থ ও অধিকারবিরোধী এমন অস্বাভাবিক অধিক মূল্যে এলএনজি আমদানি কার স্বার্থে ও কার সিদ্ধান্তে করা হচ্ছে, ভোক্তাপক্ষ থেকে গণশুনানিতে এমন সব প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। শুনানিতে টিসির ওই সুপারিশ বিভ্রান্তিকর অভিহিত করে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং এত বেশি দামে এমন এলএনজি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দাবি করা হয়েছে।

এলএনজি সরবরাহ ব্যয়

১ নং ছকে এলএনজি সরবরাহ ব্যয় বিশ্লেষণ দেখানো হলো।



ক্যাবের প্রস্তাবে এলএনজি আমদানির পরিমাণ ধরা হয়েছে টিসির প্রস্তাবিত চুক্তিভিত্তিক এলএনজি আমদানির পরিমাণ এবং পেট্রোবাংলার প্রস্তাবিত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির পরিমাণের সমষ্টি। প্রস্তাবে এলএনজি ক্রয়ে বিদ্যমান ভর্তুকি অনুদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকে প্রদত্ত ভতুর্কিকে ভোক্তাদের পক্ষের অনুদান হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্ধারিত চাহিদা অপেক্ষা এলএনজি কম সরবরাহ হওয়ায় উদ্বৃত্ত রাজস্ব ২০২১-২২ অর্থবছরে ক্যাবের প্রাক্কলিত এলএনজি সরবরাহে রাজস্ব চাহিদায় ভোক্তাপক্ষের অনুদান হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব অনুদান এলএনজি আমদানি পর্যায়ে সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

টিসি রি-গ্যাসিফিকেশন চার্জ ও পেট্রোবাংলার চার্জ ২০২০-২১-এর তুলনায় ২০২১-২২-এ প্রায় দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করেছে, যা ন্যায্য ও যৌক্তিক বলে প্রমাণিত নয়। লাইসেন্সিদের কাছ থেকে বিইআরসি কর্তৃক গৃহীত ফিগুলোও ন্যায্য ও যৌক্তিক বলে প্রমাণিত নয়। ক্যাবের মতে, গণশুনানি ব্যতীত এমন সব চার্জ নির্ধারণ বিইআরসি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিইআরসি আইনের ৩৪(২)(খ) উপধারা মতে, গ্যাস সরবরাহ ব্যয়ের সঙ্গে মূল্যহার বা চার্জহার নির্ধারণ সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

বিইআরসি নির্ধারিত ৮৫০ এমএমসিএফডি অপেক্ষা এলএনজি আমদানি কম হওয়ায় নির্ধারিত ভর্তুকি ১০ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা অপেক্ষা কম লাগে। ফলে প্রতি বছর সরকারি ভর্তুকির প্রয়োজন হয় গড়ে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। স্পট মার্কেট এলএনজি আমদানি বেশি ধরে এবং কোনো ভর্তুকি বিবেচনা না করে ২০২১-২২ অর্থবছরে পেট্রোবাংলা গ্যাস সরবরাহে প্রাক্কলিত রাজস্ব চাহিদামাফিক গ্যাসের মূল্যহার ১১৭ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করে। ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহে রাজস্ব চাহিদায় বিদ্যমান ভর্তুকি কমিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকে ৪ হাজার এবং সরকারি ভর্তুকি ৩ হাজার কোটি টাকা সমন্বয় করে টিসি গ্যাসের মূল্যহার ২০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করে। কিন্তু ক্যাব মূলত বিদ্যমান ভর্তুকি ১০ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা ও উদ্বৃত্ত রাজস্ব ২ হাজার ৫৩৭ দশমিক ৯১ কোটি টাকা এলএলজি আমদানি পর্যায়ে সমন্বয় করে, ডব্লিউপিএফ ও করপোরেট কর লাইসেন্সিদের রাজস্ব চাহিদায় সমন্বয় না করে এলএনজি আমদানি পর্যায়ে প্রদত্ত ভ্যাট ভোক্তা পর্যায়ে প্রদত্ত ভ্যাটে সমন্বয় করে এবং সঞ্চালন ও বিতরণ পর্যায়ে উদ্বৃত্ত রাজস্ব সমন্বয় না করে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের মূল্যহার ভারিত গড়ে শূন্য দশমিক ১৬ টাকা (১.৬৫ শতাংশ) কমানোর প্রস্তাব করে। ভারিত গড়ে বিদ্যমান মূল্যহার ৯ দশমিক ৬৯ টাকা। তবে অন্যান্য ভোক্তা শ্রেণীর গ্যাসের বিদ্যমান মূল্যহার বহাল রেখে গ্যাস তসরুপ কমানোর লক্ষ্যে মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাসের ব্যবহার ৭৭ ঘনমিটারের পরিবর্তে ৪০ ঘনমিটার ধরে চুলাপ্রতি গ্যাসের মূল্যহার কমানোর প্রস্তাব করেছে ক্যাব।

দেশীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যয়

২০২০-২১ অর্থবছরে এলএনজি ক্রয়ে প্রকৃত রাজস্ব চাহিদা ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৩৮ দশমিক ৩৪ টাকা। ক্যাবের প্রস্তাবে তা ধরা হয় ৩৭ দশমিক ৩৪ টাকা। উদ্বৃত্ত রাজস্ব ও বিদ্যমান ভর্তুকি সমন্বয়ে তা হয় ১৮ দশমিক ১৮ টাকা। আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাটসহ অন্যান্য ব্যয় ও এলএনজি-সংক্রান্ত আয় সমন্বয়ে তা হয় ২৭ টাকা। পেট্রোবাংলার এলএনজি অপারেশনাল চার্জ সমন্বয়ে তা হবে ২৭ দশমিক শূন্য ৩ টাকা।

২০১৫ সালের আগে বা পরে পেট্রোবাংলা এসওসি (বাপেক্স, বিজিএফসি, এসজিএফএল) ও আইওসির গ্যাস ক্রয় করত যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৮৮, শূন্য দশমিক ২২৫০, শূন্য দশমিক ২২৫০ ও ৬ দশমিক শূন্য ৪৫ টাকা মূল্যহারে। এসওসির গ্যাস উৎপাদন ব্যয় বা ক্রয় মূল্যহার নির্ধারণের এখতিয়ার বিইআরসির নয়, সরকারের। প্রস্তাবে পেট্রোবাংলা যে যে ক্রয় মূল্যহার সমন্বয় দেখায়, গ্যাসের মূল্যহারে তাই তাই সমন্বয় হয়ে বিইআরসির আদেশ হয়। বরাবরই ভোক্তাদের তাতে আপত্তি থাকে। সব ব্যয় বা চার্জ ন্যায্য ও যৌক্তিক নিশ্চিত না হলে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যহার ন্যায্য ও যৌক্তিক নিশ্চিত হয় না। ২০২১-২২ অর্থবছরে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাবে রাজস্ব চাহিদায় স্ব-স্ব এসওসির গ্যাস উৎপাদন ব্যয় বা ক্রয় মূল্যহারগুলো যথাক্রমে ৪ দশমিক ৫৪৭৩, শূন্য দশমিক ৮৭৯৮ ও শূন্য দশমিক ৩৩৮৩ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। এবারের শুনানিতে লাইসেন্সি তথা পেট্রোবাংলার কাছে এসওসির গ্যাস উৎপাদন ব্যয় তথা ক্রয়মূল্য বৃদ্ধির ব্যাপারে আইনি ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। পেট্রোবাংলা ব্যাখ্যা দেয়নি। টিসির প্রস্তাবে বিদ্যমান ক্রয় মূল্যহার বহাল রাখা হয়। ক্যাবের প্রস্তাবে ওই ক্রয় মূল্যহারগুলো গৃহীত হয়।

২০১৫ সালের তুলনায় বাপেক্স, বিজিএফসিএল ও এসজিএফএলের গ্যাস ক্রয় মূল্যহারগুলো ২০১৯ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ২৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ২১৫ দশমিক ৪২ ও —৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। গ্যাস উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে যথাক্রমে ১ দশমিক ২৭, ২৫ দশমিক ৬৩ ও ৪২ দশমিক ৭৬ শতাংশ।  অবশ্য পেট্রোবাংলার তথ্যে বাপেক্সের গ্যাস উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ২৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। অন্যদিকে আইওসির গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ক্রয় মূল্যহারও হ্রাস পেয়েছে। তাতে প্রতীয়মান হয়, এসওসি বিশেষ করে বাপেক্স ও বিজিএফসিএলের গ্যাস উৎপাদনের পরিমাণ ও ক্রয় মূল্যহারের সঙ্গে আইওসির গ্যাস উৎপাদনের পরিমাণ ও ক্রয় মূল্যহারের পরিবর্তন অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং যৌক্তিক নয়। তদুপরি গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগ উভয়েরই অদক্ষতা ও ব্যর্থতা প্রতিভাত হয়।

গ্যাস উন্নয়ন তহবিল গঠনের মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল গ্যাস সরবরাহে এসওসির গ্যাসের অনুপাত বৃদ্ধি করে আইওসির গ্যাসের অনুপাত কমিয়ে গ্যাসের ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে এসওসির দক্ষতা ও সক্ষমতা উন্নয়ন। এ লক্ষ্যে পাঁচ বছরের কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে অনুমোদনের প্রয়োজনে বিইআরসিতে পেশ করা জন্য বিইআরসি পেট্রোবাংলাকে আদেশ দেয়। সে আদেশ পেট্রোবাংলা প্রতিপালন করেনি। ভোক্তাদের অর্থে গঠিত গ্যাস উন্নয়ন তহবিলকে সরকারি তহবিল বিবেচনা করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ওই তহবিল পরিচালনার নীতিমালা তৈরি করে। সেই নীতিমালার আওতায় গ্যাস উন্নয়ন তহবিল ব্যবহার করে। ভোক্তাদের মতে তা এখতিয়ারবহির্ভূত। যার পরিণতিতে তহবিল গঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সফল হয়নি। পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এর দায় কার? শুনানিতে এ প্রশ্ন উত্থাপন করে বিইআরসির আদেশ প্রতিপালন না করার দায়ে পেট্রোবাংলার বিরুদ্ধে ভোক্তাপক্ষ বিইআরসি আইনের ৪৩ ধারা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব করেছে। সেই সঙ্গে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে বিইআরসির নিয়ন্ত্রণে এনে পক্ষগুলো প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি দ্বারা গ্যাস উন্নয়ন তহবিল পরিচালনার প্রস্তাব করেছে। তাছাড়া ওই তহবিল থেকে বিইআরসির কর্তৃত্বে এসওসির গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন প্রকল্পগুলোয় সরাসরি অর্থ বরাদ্দ ও বণ্টনেরও প্রস্তাব করা হয়েছে। [চলবে]

 

ড. এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ