চলমান করোনা সংক্রমণজনিত স্বাস্থ্য সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাব সর্বব্যাপ্ত। এতে পর্যুদস্ত হয়েছে প্রায় প্রতিটি খাতই। বাদ নেই মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পও। দীর্ঘদিন ধরেই এ শিল্প আমাদের এসএমই খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। এ শিল্পে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়োজিত। তাদের জীবন-জীবিকা একান্তভাবে এর ওপরই নির্ভরশীল। খাতটিতে টার্নওভারের পরিমাণও কম নয়। এ খাতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার টার্নওভার হয় প্রতি বছর। আগে থেকেই কিছুটা সংকটে ছিল দেশীয় এ শিল্প। হঠাৎ করে করোনা মহামারীতে বড় রকমের হোঁচট খেয়েছে খাতটি। এরই মধ্যে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর মিলছে দেশীয় মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পের। এ অবস্থায় করোনা-পরবর্তী সময়ে শিল্পটি সুরক্ষার স্বার্থে সরকারের পক্ষ থেকে এ খাতে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিতের দাবি সংশ্লিষ্টদের। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত সাম্প্রতিক এক ওয়েবিনারে আমন্ত্রিত বক্তাদের ভাষ্যেও এর অনুরণন ঘটেছে। অবশ্য মহামারী সংকট শুরু হওয়ার পর পরই সরকার তা মোকাবেলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তথা এসএমইর জন্য ২০ হাজার টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর আওতায় মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পও নিশ্চয়ই পড়ে। তবে ঘোষিত এ প্যাকেজ থেকে এ খাতের উদ্যোক্তারা খুব একটা ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ মিলছে। মূলত ঋণ ফেরত অনিশ্চয়তা ও তহবিল ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে ব্যাংকগুলো তাদের ব্যাপারে অনাগ্রহী। এ অবস্থায় তাদের ঋণ সুবিধা নিশ্চিতে কেন্দ্রীয় ব্যাাংকের তদারকি বাড়াতে হবে, একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকেও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। নইলে খাতটির ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে বৈকি।

দেশীয় মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পে এক বড় নীতিগত বিষয় অসম শুল্ক কাঠামো। দেশীয় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ শুল্ক ও কর পরিশোধ করে মুদ্রণের প্রধান উপকরণ কাগজ, কালি, প্লেট, রাসায়নিক ইত্যাদি সংগ্রহ করে মুদ্রণকাজ করতে হয়। অথচ তৈরি পোশাক খাত বড় মাত্রায় মুনাফা অর্জনকারী শিল্প হলেও তাদের করপোরেট ট্যাক্স দিতে হয় মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে। এর বাইরেও তারা নানা রকম প্রণোদনা পেয়ে থাকে। পণ্যের উপকরণ আমদানিতেও তারা শুল্ক ছাড় পায়। অন্যদিকে এসএমই শিল্প হলেও মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পে উচ্চহারে শুল্ক-ভ্যাট দিতে হয়। এটি কেবল অযৌক্তিক নয়, চরম বৈষম্যমূলকও। সেদিক থেকে অসম শুল্ক কাঠামোর সংস্কারের দাবিটি বেশ ন্যায্য। বিশেষত করোনা সংকটে এটি আরো বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, যেহেতু এ শিল্পে আয় চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে, তাই বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকারের জরুরি সক্রিয়তা কাম্য।

লক্ষণীয়, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সবসময় এগিয়ে। প্রকাশনা শিল্পেও একই অবস্থা। এর কারণ এই নয় যে তাদের সক্ষমতা বেশি। বরং দেখা গেছে, ভারত সরকার মুদ্রণ শিল্পের জন্য ব্যবহূত কাগজে উচ্চ শুল্ক নির্ধারণ করেনি। এমনকি সৃজনশীল লেখা, সাহিত্য, শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যবহূত কাগজের ওপর ভারতে মূল্যছাড় দেয়া হয়। তাতে পাঠ্যপুস্তক ও বই প্রকাশে প্রকাশকরা এগিয়ে গেছেন। কিন্তু আমাদের দেশে তেমন ছাড় না থাকায় এর ভুক্তভোগী এক দিক থেকে পাঠকশ্রেণী, তেমনি অন্য দিক থেকে শ্রমিকশ্রেণী। এসব ক্ষেত্রে ভারতের উদাহরণ বরং আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। শিল্পটিকে এগিয়ে নিতে দেশটির সরকার অব্যাহতভাবে পৃষ্ঠপোষকতা জুগিয়ে চলেছে। ফলে সেখানে আজ বিশ্বমানের মুদ্রণ শিল্প গড়ে উঠেছে। আমাদের দেশেও সেটি সম্ভব। তবে তার জন্য চাই রাষ্ট্রীয় পরিপূরক সহযোগিতা। 

প্রায় চার মাস ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। স্বাভাবিক কারণেই শিক্ষার্থী ও গবেষকরা তেমন একটা বইপুস্তক কিনছেন না। ফলে চাহিদায় অবনমনের কারণে আলোচ্য শিল্পে আর্থিক ক্ষতি দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ অবস্থা উত্তরণে সরকারের পক্ষ থেকে আশু আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখা জরুরি।