‘FDR and the End of Empire: The Origins of American Power in the Middle East’ বইয়ে Christopher D. O’sullivan ২০১২ সালে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে লেখেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, এই অঞ্চলের অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে, যুদ্ধ শেষ হলে বিজয়ী মিত্ররা শুধুমাত্র একটি ‘শর্তযুক্ত শান্তি’ আরোপ করবে, আত্মসংকল্প অস্বীকার করবে এবং আরো ম্যান্ডেট আরোপ করবে, সম্ভবত ‘ট্রাস্টিশিপের’ ছদ্মবেশে। 

তার মতামতের খুব বেশি হেরফের দেখা যায় না। তুরস্ক ও ইরানের অবস্থান ছাড়া বাকি রাষ্ট্রগুলোর প্রত্যক্ষভাবে নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের পর থেকে এই অঞ্চলের ভূ- রাজনৈতিক নীতিগুলোর জন্য বিশ্ব মূলত নির্ভর করে মার্কিনীদের উপর। নেতৃত্বে পরিবর্তন আসলেও এই অঞ্চল ঘিরে নীতিতে আমূল পরিবর্তন কখনই খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। এবারেও হয়ত তেমনটাই হবার কথা ছিল কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু নীতি জো বাইডেন যে মোটামুটি পুরোপুরি পরিবর্তন করতে যাচ্ছেন এ বিষয়টি স্পষ্ট। 

ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে, গত চার বছর ইজরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে গিয়েছে। যদিও মার্কিন প্রশাসন সবসময়ই ইজরায়েলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষক। দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান রেখার বিষয়টি খেয়াল করাই যথেষ্ট আগের বাক্যের সমর্থনের জন্য, এমনকি যখন ইজরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে বসতি নির্মাণ করতে থাকে তখনও তাদের আপাত নিষ্ক্রিয় আচরণ অনেক কিছু পরিষ্কার করে।  তিনি অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে মার্কিন সাহায্য বন্ধ করে দেন, আনুষ্ঠানিকভাবে জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে দেন। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে ট্রাম্প বসতি নির্মাণ এবং সম্প্রসারণকে অবৈধ বলে নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি পর্যন্ত জানান যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তিনি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তহবিল প্রত্যাহার করে নেন, যার উপর লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনির শিক্ষা, খাদ্য এবং জীবিকা নির্ভরশীল। ট্রাম্প তিনটি আরব দেশের সাথে ‘স্বাভাবিকীকরণ’ চুক্তি করেছেন যারা বিনিময়ে ফিলিস্তিনের স্বার্থের দাবি ছাড়াই ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। 

ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক নিন্দার সাথে সাধারণীকরণ চুক্তি পূরণ করা হয়েছিল, আনাদলু এজেন্সির মতে তারা বলেছিলেন যে এই চুক্তি ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কাজ না করে বরং তাদের অধিকারকে অগ্রাহ্য করে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বলেছে যে ইস্রায়েলের সাথে যে কোনও চুক্তি নীতিগত ভিত্তিতে ২০০২ আরব শান্তি উদ্যোগের ভিত্তিতে হওয়া উচিত যা ছিল শান্তির জন্য ভূমি, ইস্রায়েলের দাবি অনুসারে 'শান্তির জন্য শান্তি' এই নীতির ভিত্তিতে নয়।

১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাসে নবনির্বাচিত ডেলাওয়্যার সিনেটর জো বাইডেন তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফরে ইজরায়েল সফর করেন এবং ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের সাথে সাক্ষাৎ করেন। বাইডেন এই ঘটনার পুনরুল্লেখ অসংখ্যবার করেছেন এবং এই ঘটনাকে "আমার জীবনের সবচেয়ে ফলপ্রসূ মিটিং" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এটি ইজরায়েলের প্রতি তার অদম্য সমর্থন এবং ইজরায়েলী নেতৃত্বের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চিহ্নিত করে।

১৩ বছর পর যখন বাইডেন মার্কিন সিনেটে একটি আবেগপূর্ণ ভাষণ দেন, এটা পরিষ্কার করে যে আমেরিকার স্বার্থ ইজরায়েলের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ। ১৯৮৬ সালের জুন মাসে তিনি আইন প্রণেতাদের উদ্দেশে বলেন, "এখন সময় হয়েছে ইজরায়েলের প্রতি আমাদের সমর্থনের জন্য ক্ষমা চাওয়া বন্ধ করার। "এটা আমাদের সেরা ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ। যদি ইজরায়েল না থাকত, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই অঞ্চলে তার স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি ইজরায়েল আবিষ্কার করতে হত”। পরের বছর ইজরায়েল যুক্তরাষ্ট্র থেকে বার্ষিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সামরিক সাহায্য গ্রহণ করে। বাইডেন, আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী একজন স্বঘোষিত জায়নবাদী, অনেক ইজরায়েল পন্থী লবি গ্রুপ মিটিং, যেমন আমেরিকান ইজরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপিএসি) এবং জে স্ট্রিট উপস্থিত থাকেন।

বাইডেন সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং সুদানের সাথে ইজরায়েল সাম্প্রতিক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। টাউন হলে বাইডেন এই চুক্তি মধ্যস্থতা করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি ইঙ্গিত দেন যে তিনি ইজরায়েলকে আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে আরো স্বীকৃতি পেতে সাহায্য করার জন্য মার্কিন নীতি অব্যাহত রাখতে পারেন।

এই তথ্য গুলো থেকে এতটুকু নিশ্চিত করে বলা যায় আসন্ন দিন গুলোতে ইজরায়েল, মার্কিন ও ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক সম্পর্কে একেবারে নতুন কিছু দেখতে পাবার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ এমনকি নেই বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। আমেরিকার রাজনীতিবিদদের এই বিষয়ে এত স্তিতিশিল থাকার আসল কারণ হচ্ছে ইজরায়েল লবির রাজনৈতিক ক্ষমতা। এই লবি হচ্ছে ব্যক্তি এবং সংগঠনের একটি আলগা জোট যারা ইজরায়েল পন্থী দিকে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করে। এমনটাই উল্লেখ করেন John J. Mearsheimer ও Stephen M. Walt তাদের ২০০৭ সালে প্রকাশিত বই “The Israel Lobby and U.S. Foreign Policy” -এ।  

প্রচারণার শেষ সপ্তাহে বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির অগ্রাধিকার কি হতে পারে তার কিঞ্ছিত ধারণা পাওয়া যায়। 

অক্টোবর মাসে এক প্রচারাভিযান বিবৃতিতে বাইডেন আজারবাইযানের প্রতি তুরস্কের সমর্থনের সমালোচনা করেন এবং ইরানকে আঞ্চলিক সংঘাত থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান। বাইডেন সেপ্টেম্বরে যুদ্ধে তুরস্কের ভূমিকার সমালোচনা করেন।

বাইডেন প্রচারণার শেষের দিকে ইরানের কথা উল্লেখ করে ইঙ্গিত দেন যে তিনি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতি নরম দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে থাকবেন।  F. Gregory Gause তার ২০১০ সালে রচিত “The International Relations of the Persian Gulf” বইয়ে উল্লেখ করেন যে ইরানের আঞ্চলিক হেজেমন হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে- এই প্রসঙ্গ টেনে আনার কারণ হিসেবে বাইডেনের সম্ভাব্য ইরান নীতিকে উল্লেখ করা যায়, যদিও এই নীতিতে আরও নানা দিক বিবেচনায় থাকবে এটাই স্বাভাবিক। অক্টোবরে টাউন হলে বাইডেন বলেন, ট্রাম্পের পুলিশ ইরানকে বোমা বানানোর জন্য যথেষ্ট পারমাণবিক উপাদান থাকার কাছাকাছি নিয়ে গেছে।  ২০১৮ সালে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যাচ্ছে। বাইডেন শর্তসাপেক্ষে এই চুক্তিতে পুনরায় ফিরে যেতে চান, যা পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার বিনিময়ে তেহরানের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়ার ব্যাপারে বেশ উৎসাহব্যাঞ্জক অগ্রগতি আনতে পারে। বাইডেনের প্রচারণা ওয়েবসাইট অনুসারে ইরানের সম্মতি নিয়ে চুক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেরত যাবার ব্যাপারে উল্লেখ রয়েছে। 

সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং এর ফলে কুর্দিদের সাথে জোট খর্ব করার জন্য ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে কঠোরভাবে আক্রমণ করে থাকে। তবে সামগ্রিকভাবে ডেমোক্র্যাট নেতারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতি হ্রাসের পক্ষপাতী এবং মার্কিন বৈশ্বিক নীতির সাথে এই অঞ্চলের ক্রমহ্রাসমান প্রাসঙ্গিকতার বিষয়টি নিয়ে বেশ ওয়াকিবহাল। ডেমোক্র্যাট বারাক ওবামাই ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করে নেন; বাইডেন, সম্ভবত একই পথে চলতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর পরিপূর্ণ নির্ভরশীল নয় সাথে সাথে চীনকে তার সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এবং আইএসআইএস-এর পরাজয় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কৌশলগত সন্ত্রাসী হুমকির মাত্রা কমিয়ে দিয়েছে। 

ওয়াশিংটন আঙ্কারার কোন বন্ধুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিকট অতীতে দেখা যায়নি ওবামা এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগানের মধ্যে খানিক বন্ধুত্ব ছাড়া, যদিও সেটাও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন যে তুরস্কের একটি রাশিয়ান ফাইটার জেট কে ভুপতিত করায় রাশিয়ার সাথে আমেরিকার অবাঞ্ছিত উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। এরদোগান পুতিনের সাথে সম্পর্ক নবায়ন করেন রাশিয়ান এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এস-৪০০ কেনার মাধ্যমে যা ন্যাটো ও ওয়াশিংটনের জন্য বিরক্তির কারণে পরিণত হয়। পূর্বসূরিকে অনুসরণ করে বাইডেনের তুরস্কের বিপরীত শক্তির সাথে সখ্যতা রক্ষা করার বিষয়টি সাম্প্রতিক মার্কিন কর্মকাণ্ডে বেশ স্পষ্ট।

সৌদি আরবের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে কিছু নতুন মোড় দেখা দিতে পারে বলে মনে করা হছে। Kenneth Pollack এর ২০০৪ সালের মন্তব্য এখানে প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে “উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলি এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে যে তাদের লক্ষ্য কেবলমাত্র একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা বা প্রতিরোধ তৈরিই নয়, বরং তা এমনভাবে করা যা প্রক্রিয়াধীন তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস না করে”- এই মন্তব্য তিনি তার  The Persian Puzzle: The Conflict between Iran and America বইয়ে উল্লেখ করেন। 

একজন ঐতিহ্যবাদী হিসেবে পরিচিত বাইডেন এই নির্বাচনের মৌসুমে সৌদি আরবের কঠোর তিরস্কারের মাধ্যমে প্রচলিত জোটকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা দেখিয়েছেন। যদিও ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ ২০১৫ সালে ওবামা-বাইডেন প্রশাসনের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে শুরু হয়, বাইডেন রাজ্যের 'বিপর্যয়কর' সংঘাতের জন্য মার্কিন সাহায্য বন্ধ করার অঙ্গীকার করেছেন।

যেখানে- ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন যে বাইডেনের বিজয়ের পর পরবর্তী মার্কিন প্রশাসন তার আগের ভুলের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।  রুহানি তার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এক বিবৃতিতে বলেন, 'এখন ভবিষ্যৎ আমেরিকান প্রশাসনের জন্য একটি সুযোগ রয়েছে তার আগের ভুলগুলোর ক্ষতিপূরণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি মেনে চলার পথে ফিরে আসার।  ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেছেন যে তিনি আশা করেছিলেন যে বাইডেনের প্রশাসন 'ধ্বংসাত্মক মার্কিন নীতির অবসান ঘটাবে', সেখানে বাইডেন গত আগস্টে বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কাউন্সিলকে বলেছিলেন 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি আরবকে একটি বিপজ্জনক ফাঁকা চেক দিয়েছেন,' 'সৌদি আরব ইয়েমেনে একটি যুদ্ধের প্রসারের জন্য এটি ব্যবহার করেছে যা বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ মানবিক সংকটের সৃষ্টি করেছে, বেপরোয়া পররাষ্ট্র নীতির লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং নিজেদের জনগণকে দমন করছে।'  নভেম্বর মাসে এক বিতর্কে তিনি সৌদি ভিন্নমতাবলম্বী জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ডের জন্য রিয়াদকে দায়ী করার অঙ্গীকার করেন। ‘আমি পরিষ্কার করে বলব যে, আমরা আসলে তাদের কাছে আরও অস্ত্র বিক্রি করতে যাচ্ছি না, বাইডেন বলেন। আমরা আসলে ওদের কে মূল্য দিতে যাচ্ছিলাম, আর ওদের কে ওরা যে পরিবারটা বানিয়েছিল তা-ই বানাব।’

সৌদি আরব ছিল একমাত্র উপসাগরীয় দেশ যারা বিজয়ের জন্য বাইডেনকে তাৎক্ষনিক অভিনন্দন জানায়নি বরং এর পরিবর্তে ক্যাম্বোডিয়ার রাজাকে দেশের স্বাধীনতা বার্ষিকীতে এবং তানজানিয়ার প্রেসিডেন্টকে তার পুনঃনির্বাচনের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছে।

তুরস্কের রাজনৈতিক মহল ট্রাম্পের জয়ের আশা করছিল যদিও বিদায়ী প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদে দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক- অস্থিরতা এবং সংকটমুক্ত ছিল না।  আঙ্কারা রিপাবলিকানদের জয়ের পক্ষে থাকার দুটি প্রধান কারণ ছিল: প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান এবং ট্রাম্পের মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যক্তিগত আলোচনা এবং বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্টের রাশিয়া থেকে এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিগ্রহণের উপর তুরস্কের উপর নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সিদ্ধান্ত। সাথে ইরানের নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর চেষ্টার অভিযোগে ট্রাম্প তুরস্কের হাল্ক ব্যাংককে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পক্ষপাতীও ছিলেন না।

যদিও ট্রাম্প এরদোগানের প্রতি তার শ্রদ্ধা গোপন করেননি, বাইডেন প্রকাশ্যে তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে স্বৈরশাসক বলে অভিহিত করেন, যা তুরস্কের রাজধানীতে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ট্রাম্পের থেকে ভিন্ন, বাইডেনের পররাষ্ট্র নীতি অবশ্যই তুরস্কের মানবাধিকার পরিস্থিতি অন্তর্ভুক্ত করবে, কারণ তিনি ওবামা প্রশাসনের অধীনে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার এক সফরে তুরস্কে বেশ কয়েকজন ভিন্নমতাবলম্বীর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।  আগামী সময়ে ওয়াইপিজির সাথে ওয়াশিংটনের অংশীদারিত্ব আরো তীব্রতার সাথে সহ্য করবে যদিও এই ক্ষেত্রের পরিস্থিতিতে তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজন হবে। তাদেরকে সিরিয়ার উপর একটি নতুন ভারসাম্যের ব্যাপারে আপস করতে হবে। 

বাইডেন প্রশাসনের এজেন্ডার একটি তাৎক্ষণিক বিষয় হতে পারে ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাধ্যমে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা। এই দুই সংস্থার সাথে তুরস্কের বিচ্ছিন্ন সম্পর্ক তাই তুরস্কের স্বার্থের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে বৃহত্তর আঞ্চলিক স্বার্থে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয়, সিরিয়া, ককেশাস ইত্যাদি ক্ষেত্রে।  কোন সন্দেহ নেই, তুরস্কের এস-৪০০ ক্রয় এবং তাদের পরীক্ষা আগামী সপ্তাহগুলোতে আঙ্কারা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক দখল করবে এই উদ্বেগের সাথে যে কংগ্রেসের নিষেধাজ্ঞা সক্রিয় করা হতে পারে।

“Zones of Conflict: US Foreign Policy in the Balkans and the Greater Middle East” বইয়ে Vassilis K. Fouskas 'তুর্কি প্রশ্ন' নামে পশ্চিমাদের এক ধারণার সমন্বয় করেন। তার মতে 'তুর্কি প্রশ্ন' বেশ কিছু আন্তঃসম্পর্কিত বিষয় নিয়ে গঠিত, যার মধ্যে রয়েছে ১। তুরস্কের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক, জাতিগত এবং ধর্মীয় সমস্যা; ২। একটি দুর্বল মানবাধিকার রেকর্ড; ৩। তুরস্কের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয়তা; ৪। তুরস্কের প্রায় যে কোন প্রতিবেশীর সাথে তার অতিরিক্ত বা গোপন বিবাদ; ৫। সাইপ্রাস এবং ইইউ সদস্য গ্রীসের সাথে এজিয়ান নিয়ে বিবাদ। 

২০০৩ সালে দাড় করানো এই বিষয়গুলো এখনো তুরস্কের সাথে পশ্চিমের সম্পর্ক নির্ধারণে প্রবল ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। নতুন হিসেবে সামনে এসেছে অবশ্য তুরস্কের বর্তমান উন্নত সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। 

মধ্যপ্রাচ্য ও তুরস্কের বিষয়ে নতুন কি থাকবে জো বাইডেনের নীতিতে তা দেখতেই মুখিয়ে বিশ্ববাসী। তবে সৌদি আরবের অবস্থান, সাথে ইরান আর তুরস্কের প্রতি মার্কিনীদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি আমার আকর্ষণ সব থেকে বেশি। সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে নতুন কোন পরিকল্পনা কি থাকতে পারে কিনা বাইডেন প্রশাসনের এ ব্যপারেও যথেষ্ট প্রশ্ন থেকে যায়। তবে শুরুতেই আগ্রাসী কোন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের দিকে তারা যাবে না কেননা করোনা মোকাবেলা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি পুনরুদ্ধার তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হবে বলে ধারণা করা যায়। 

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
raiyanamir@gmail.com