টেকসই উন্নয়নে উন্নয়নশীল পরিকল্পনার প্রভাবক ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চিন্তা থেকে যেমন কাজের উত্পত্তি, বৃক্ষের পরিচয় যেমন তার ফলে তেমনি পরিকল্পনার উদ্দেশ্য বিধেয়র মধ্যে অর্থবহ উন্নয়নে সদিচ্ছার সংশ্লেষ থাকলেই বলা যাবে সে উন্নয়নে সুফল মিলবেই। সে নিরিখে এভাবে যদি আমরা ভাবি, একটি জাতির দূরদর্শী পরিকল্পনায় ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা থাকলে, উপযুক্ত উপাদনের অভাব হেতু সেখানে যদি কোনো বিচ্যুতি ঘটে তাহলে উন্নয়ন ভিন্নমুখী হয়ে যেতে পারে। এখানে আমি তদানীন্তন পাকিস্তান আমলের একটি উদ্যোগ পরিকল্পনার কথা প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতে পারি, ষাটের দশকের মাঝামাঝি পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষা আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন বেশ জোরেশোরে শুরু হলে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের উপদেষ্টারা (পাকিস্তানের সামরিক, বেসামরিক ও সামন্তবাদী রাজনৈতিক আমলারা) একদিন তাকে বললেন, ‘স্যার আমরা একটা ভালো বুদ্ধি বের করেছি।’ আইয়ুব খান জানতে চাইলেন কী বুদ্ধি? তারা বললেন, পূর্ব পাকিস্তানের লোকেরা সংখ্যাগুরু হয়ে সংখ্যালঘু আমাদের কাছে সবকিছুতে ভাগ চায়, রাষ্ট্র ভাষার দাবি তোলে, রাজধানী চায়, আরো কত কিছু। সেখানকার সমাজ ব্যবস্থায় আন্তঃআয়বৈষম্য আমাদের মতো নয়, সেখানকার মধ্যবিত্তরা সৃজনশীল, সক্রিয়, সচেতন; সেখানকার সমাজে বুদ্ধিজীবীরা মোটামুটি একাট্টা, মেধাবী ছাত্ররাই নেতৃত্বে। এটাকে মোকাবেলার জন্য আমরা একটা দূরদর্শী পরিকল্পনার কথা ভেবেছি। আইয়ুব খান বললেন সেটা কী? তারা বললেন, ‘পরিবার পরিকল্পনা’। উনি বললেন পরিকল্পনা বুঝি, কিন্তু পরিবারের আবার কী পরিকল্পনা। তখন তারা ব্যাখ্যা করলেন পূর্ব পাকিস্তানের জমি কম, লোক বেশি। সেখানে যদি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে বেশকিছু বছরের ব্যবধানে দেখা যাবে যে ওদের জনসংখ্যা কমে এসেছে। তুলনামূলক পশ্চিম পাকিস্তানে আমাদের জায়গা বেশি, লোক কম, আমরা এখানে পরিবার পরিকল্পনা যদি না নিই, তাহলে বেশকিছু দিন পরে দেখা যাবে যে সমগ্র পাকিস্তানে ওরা সংখ্যালঘু হয়ে গিয়েছে আর আমরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গিয়েছি। এর সঙ্গে আমরা আরো কিছু সম্পূরক উপকারও পাব। যেমন পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত ও সচ্ছল লোকেরা যারা তাদের শিশুদের পুষ্টিকর খাবার দিতে পারে, উপযুক্ত শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে পারে তারা কর্মসূচিটি গ্রহণ করবে। তাদের পরিবার ছোট হয়ে আসবে। পক্ষান্তরে সেখানে যারা দরিদ্র বা নিঃস্ব শ্রেণীর, যারা অপুষ্টিতে ভুগছে তারা পরিবার পরিকল্পনা ততটা আমলে নেবে না। তারা মনে করে সন্তান বেশি হলে ভালো, রোগে-শোকে দু-একজন মারা গেলেও ক্ষতি নেই। পরিবারে সংখ্যায় ভারী হলে দখলদারত্বে ক্ষমতা বাড়বে। একসময় তারাই সমাজের ভালো, শিক্ষিত জনসম্পদকে একঘরে করে ফেলবে, মন্দ টাকা ভালো টাকাকে যেভাবে বাজার থেকে বিতাড়িত করে, তেমনি এমন একসময় আসবে পূর্ব পাকিস্তানের সুশিক্ষিতরা বিদেশে পাড়ি জমাবে, সমাজ মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। সেখানকার ভালো লোকেরা রাজনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিক্ষকতা, চিকিৎসা সব খাতে টিকতে না পেরে সরে পড়বে। সমাজ পেশিশক্তি, সিন্ডিকেট ও দুর্বৃত্তায়নের অভয়ারণ্য হয়ে উঠবে। আজ ভাবি ও দেখি ষাটের দশকের পাকিস্তান থেকে বর্তমানের বাংলাদেশ, প্রায় ছয় দশকের ব্যবধানে সামাজিক সংহতি কিংবা যদি মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিস্থিতির দিকে তাকাই, ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ অভ্যন্তরে সমঝোতা সম্মান সম্ভ্রম বোধের উত্থান-পতনের বিষয়টা যদি শুমার করি তাহলে কী দেখি? আজ (পশ্চিম) পাকিস্তানের জনসংখ্যা এই ডিসেম্বরে (২০২২) মাসে ২৩ কোটি ১৪ লাখ ২৬ হাজার আর পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে ১৬ কোটি ৮৭ লাখ ১৭ হাজার। তাদের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক সক্ষমতা অর্জন-পরিকল্পনার ফলে পাকিস্তানে আজ আমরা সংখ্যালঘু হয়ে যেতাম আর পাকিস্তানিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বিবেচিত হতো। তারা পরিকল্পনা এঁটেছিল পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির প্রভাবে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে একটা সামাজিক বৈষম্য পরিস্থিতির, আয়বৈষম্য আর মূল্যবোধের অবক্ষয়-আবহ তৈরি হবে। সেটা কীভাবে? সেটা হচ্ছে শিক্ষিত লোকের পরিবারের সদস্য সংখ্যা কমবে। একজন বা দুজন হবে। তারা তাদের সন্তানকে শিক্ষা-দীক্ষা সবকিছু দেবে, কিন্তু সমাজের অন্য বিশাল শ্রেণী যারা পরিবার পরিকল্পনা নেয়নি, সেখানে আর্থসামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করবে। সমাজে এটাও নিয়ম যারা সংখ্যায় বেশি, পেশিশক্তিতে বলবান তারাই সবকিছুতে ভোগদখল বা ভাগ বসাতে আসে। তারা এমন ভাবনাও ভেবেছিলেন যে এমন একটা সময় আসবে তখন দেখা যাবে যে পূর্ব পাকিস্তানের যারা মেধাবী, যারা বুদ্ধিজীবী তারা সংখ্যায় সীমিত হয়ে আসবে। অন্যদিকে যারা অসচ্ছল তারা সংখ্যায় বেড়ে যাবে, বেড়ে গিয়ে সমাজে একটা ভারসাম্যহীন পরিবেশ তৈরি হবে। যেটা কিন্তু আমরা এখন লক্ষ করছি। সচ্ছল-সক্ষমরা ছেলেমেয়েদের মাঠে খেলতে যেতে দিতে ভয় পায়, স্কুলে যেতে গেলে আরেকজনকে দিয়ে পাঠাতে হচ্ছে, নিরাপত্তা নেই পথে-ঘাটে। এমনকি একটা পর্যায়ে গিয়ে সচ্ছলরা তাদের ছেলেমেয়েকে বিদেশে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে, মেধা পাচার হচ্ছে। দেশে মেধাবীরা থাকছে না, থাকতে পারছে না। না তারা ব্যবসায়, না রাজনীতিতে, না শিক্ষা-সংস্কৃতিতে, চাকরিবাকরি কোনো কিছুতে, ফলে একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা সৃষ্টি হয়েই রয়েছে। যদিও তত্কালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে পরিবার পরিকল্পনা ভালো উদ্যোগ ছিল কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে বাস্তবতা উপেক্ষিত হওয়ায় সেটি সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির হেতুতে পরিণত হয়েছে। 

যেমন ’৪৫ সালে ব্রিটিশ ভারতে উইনস্টন চার্চিল সাহেব ভারত বিভাগ প্রসঙ্গে ভেদবুদ্ধিজাত এমন ফন্দি আঁটলেন, ভারতকে যদি স্বাধীনতা দিয়েই আসতে হয়, তা এমন পরিকল্পিতভাবে ভাগ করা হবে বা হলো, যা এখনো উপমহাদেশের দেশগুলোয় আন্তঃবিভাজন বিদ্যমান, যা স্বাধীনতার অর্জনকে চ্যালেঞ্জের মুখে রেখে দিয়েছে। ব্রিটিশরাজ শনাক্ত করল ভারতের যেসব অঞ্চল সবচেয়ে ক্রিয়াশীল, সবচেয়ে বেশি মেধা, সেনাবাহিনী যেখানে রয়েছে, যেখানে সুযোগ-সুবিধার সহজলভ্যতার পাশাপাশি সংগ্রাম, বিদ্রোহ করার প্রবণতা যে অঞ্চলগুলোয় বেশি সে দুই অঞ্চল হচ্ছে পাঞ্জাব ও বেঙ্গল। বেঙ্গলের শক্তি অনেক বেশি ছিল, তখন বলা হতো হোয়াট বেঙ্গল থিংকস টুডে, ইন্ডিয়া থিংকস টুমরো। পাঞ্জাবেও আর্মিসহ সবকিছু খুব শক্তিশালী ছিল। চার্চিল সাহেব মনে করলেন যে এ দুটিকে যদি আমি দ্বিখণ্ডিত করে দিতে পারি, এক টুকরো ইন্ডিয়াকে দেব আরেক টুকরো পাকিস্তান পাবে। এখন ওদের নিজেরা মারামারি করে ওদের সামরিক শক্তি ক্ষয় করবে, ওদের ব্রেনের শক্তি ক্ষয় হবে। ওদের বুদ্ধিবৃত্তি দুই ভাগ হয়ে যাবে, সবকিছু বিভক্ত হয়ে যাবে তাতে ব্রিটিশেরই সুবিধা হবে। কারণ তারা যদি একসঙ্গে থাকে তাহলে একদিন উপনিবেশ ভারতবর্ষের সঙ্গে তারাই পারবে না। এই যে ভেদবুদ্ধিসম্পন্ন পরিকল্পনার ভেতরে যদি মনুষ্য সৃষ্ট ইচ্ছা-অনিচ্ছার কারণ থাকলে যথেষ্ট ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। 

বাংলাদেশের অর্থনীতির দিকে আসি। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এটি কৃষিনির্ভর দেশ, ফল-ফসলের দেশ। এ দেশের আমজনতা শান্ত-সুজন এবং যখন প্রয়োজন তখন তারা সংগ্রাম করে না হলে তারা সবসময় শান্তিপ্রিয়, সেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ’৭২ সালে বঙ্গবন্ধু এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যারা করেছিলেন তারা বিষয়টাকে বুঝেছিলেন, বুঝেছিলেন বলেই তারা প্রথমেই সংবিধান প্রণয়নে মন দেন। কারণ তারা অবগত ছিলেন ২৪ বছরে পাকিস্তানে শাসনতন্ত্র তৈরি করার বিতর্ক নিয়েই শেষ পর্যন্ত তাদের সংসার টেকেনি। 

সুতরাং প্রথমেই শাসনতন্ত্রে মৌলিক অধিকারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব সহকারে সন্নিবেশ করা হলো। যদি ওই বৈশিষ্ট্যের মধ্যে থেকে পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় পরিচালনা, পরিকল্পনাগুলো সেভাবে চলত তাহলে বাংলাদেশ আরো অগ্রসর হতে পারত। বঙ্গবন্ধু সে সময় সবুজ বিপ্লবের কথা বলেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ সে পথে হাঁটেনি। কারণ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম যে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নেয়া হলো, তার যে উদ্দেশ্য-বিধেয় সেখানে খুব স্পষ্ট ছিল যে এদেশ এবং অর্থনীতি কোন দিকে যাবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কমিশনে যারা ছিলেন তারা কিন্তু বিষয়টিকে ভিন্ন দিকে নিয়ে গেছেন। কারণ তারা সবাই ছিলেন রাশিয়া বা সেখান থেকে পড়াশোনা করা লোক, তারা ধীরে ধীরে দেশকে সমাজতন্ত্র বা এ রকম একটা পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে চাইলেন, সেটা অন্যদিকে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে প্রধান যে সমস্যাটা দৃশ্যমান হয়েছে একটি নদীমাতৃক দেশ, কৃষিপ্রধান দেশ তার থাকবে নদী, সে অববাহিকায় গড়ে উঠবে বন্দর, নগর, শহর, স্রোতশীল নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, নদীর মাছ খেয়ে তার পুষ্টির জোগাড় হবে, সে নদীর পানি দিয়েই দুই ধারে ফসল উৎপাদন করবে, কিন্তু আশির দশকে যে সরকার এল তার মাথায় ’অবৈধ সরকার’-এর বদনাম ঘোচাবার বুদ্ধি। তত্কালীন সময়ের নীতিনির্ধারকরা বললেন, আপনি বরং বিদেশ থেকে সাহায্য নেয়া শুরু করেন। দেশের সম্পদ দেশে রেখে এর মাধ্যমে অবকাঠামো গড়ে তুলে আপনি পারবেন না। এতে আপনার অবৈধতার বদনাম যাবে না এবং আপনি উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারবেন না। তখন তিনি বৈদেশিক সাহায্যের দিকে হাত বাড়ালেন এবং হাত এমনভাবে বাড়ালেন যে তখনকার সময়ে সে এক দশকে বাংলাদেশের এডিপির ১০২ শতাংশ বিদেশী সাহায্য দ্বারা বাস্তবায়িত হতো। ফলে সে সময় অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে, এনবিআর আর কর বিভাগকে মানুষের উপার্জনের উৎসের কাছে নিয়ে গিয়ে তাদের কাছ থেকে কর আহরণ করতে হবে এদিকে মোটেই যাওয়া হলো না। এদিকে বিদেশী সাহায্য দেয়ার-নেয়ার নাম করে বিদেশী সাহায্যদাতাদের প্রধান দেশগুলো থেকে বলা হলো ঠিক আছে লোন এমনকি গ্রান্টও দেয়া হবে, তবে তা দিয়ে রাস্তা তৈরি হবে, সেতু নির্মিত হবে, এসব অবকাঠামো তৈরিতে কৃষিজমি ব্যবহূত হবে, খালবিল ভরাট হবে। প্রচুর রাস্তা তৈরি হলো। রাস্তা তৈরি করার মানে হচ্ছে ওই নদীর পানিপ্রবাহ, খালবিলের পানিপ্রবাহ এগুলো বাধাপ্রাপ্ত হলো। এর ফলে দেখা গেল নদীগুলো ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে যাচ্ছে এবং নদীগুলো সংস্কার হচ্ছে না। ফলে হঠাৎ বৃষ্টি এসে বন্যা হচ্ছে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে জলবায়ুর তারতম্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে বেশি বেশি সড়ক বানানোর জন্য। সবাই ওই সড়কের দিকেই ধাবিত হলো, মানুষ আর নৌপথে চলাচল করতে চায় না। ফলে নদীর প্রতি আগ্রহ, আকর্ষণ ও নদীর নাব্যতা রক্ষার দায়িত্বে গাফিলতি চলে এল। সড়কপথ তৈরিতে বিদেশীরা যে সাহায্য দিয়েছিল, তারা চেয়েছিল যে এমন একটা সড়কপ্রধান দেশ হোক যেখানে প্রচুর গাড়ি ব্যবহার হবে। গাড়ির রফতানিকারক ডোনাররা চান মানুষ গাড়ি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকবে, কিন্তু গাড়িতে চড়ার অর্থনীতিতে তার যে নিজস্ব শক্তি সেটা অর্জনে তার মন-মাথা ঘুরে গেল। মানে প্রচুর রাস্তা তৈরি হলো এবং কৃষিজমি নষ্ট হলো। নদী, খাল-বিলের পানিপ্রবাহ নষ্ট হলো এবং গ্রামের মানুষ খুব সহজে শহরে আসার দিকে ধাবিত হলো। কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হয়েছে এবং গ্রামের উন্নতির দিকে মন দেয়ার দরকার নেই। অফিসারদের ফ্যামিলি মহানগরে থাকে, মফস্বলের শহরে তাদের ছেলেমেয়েরা পড়ে না, চিকিৎসা নেয় না। পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা প্রণয়নে যে বিভ্রাট ভর করল নীতিনির্ধারকের মাথায় তা হলো নদীমাতৃক দেশে, কৃষিমাত্রিক দেশে নদীর প্রতি খেয়াল রাখার ঔচিত্যবোধ উবে গেল। নদীমাতৃক যাতায়াত, যোগাযোগ ব্যবস্থায় শান্ত-সুনিবিড়ে স্বাস্থ্যসম্মত সবকিছু করা সম্ভব ছিল। এখন সড়কে দামি জ্বালানি ব্যয় হয় এবং অহরহ দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ে বেশুমার। গাড়ির একচেটিয়া এক ব্যবসায়ী যখন নিষ্ফল উপদেশ বিলান ‘একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’ তখন নদীর কান্না কি কেউ শুনতে পায়? শত শত সেতু যখন উদ্বোধন হয় তখন ছোট-বড় নদীর কপাল পুড়ে, নদী শুকিয়ে যায় নাব্যতা হারায়। নদীগুলোর নব্যতা রাখতে সেতু না বানিয়ে আধুনিক ও অধিক সংখ্যায় ফেরি দিলে পরিবেশ বাঁচে, জ্বালানি তেলের সাশ্রয় হয়। পরিকল্পনা প্রণয়নকারী নীতিনির্ধারকরা হিসাব কষে দেখতে পারেন, সড়ক-সেতুপথের চেয়ে নদীপথ ব্যবহারের ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন অবশ্যই বেশি। 

বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিক ফাপড়ে পড়ে যায় আন্তর্জাতিক নদী গঙ্গার পানি উজানে সরানোর মতলবে ফারাক্কায় আটকানো পানির হিস্যা চাওয়া-পাওয়ার বেলায়। পুরো পাকিস্তান আমলে বিশ্বব্যাংকের লোন নিয়ে ভারত যে ফারাক্কা বাঁধটা বেঁধেছিল, সে ফারাক্কা বাঁধ কিন্তু তারা পাকিস্তান আমলে কার্যকর করতে পারেনি। কারণ কৌশলগতভাবে পাকিস্তান তাদের সিন্ধু নদে বাঁধ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এ ধরনের কথা বলায় এর ভেতর দিয়ে পাকিস্তান কিন্তু ভারতের গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার ব্যাপারটি আটকে রেখেছিল। এটা কিন্তু এ রকম ছিল না যে ভারত ফারাক্কায় পানি আটকে দিলে বেচারা পূর্ব পাকিস্তান শুকিয়ে যাবে, কষ্ট হবে এ কথা ভাবার চেয়ে পাকিস্তান ভেবেছিল ভারতকে যেভাবে হোক একটু আটকালে তাদের উন্নয়ন ব্যাহত হবে এবং ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে নেগোশিয়েট করতে সুবিধা হবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর গঙ্গার পানিবণ্টন প্রশ্নে বেশ নাজুক অবস্থায় উপনীত হয়। ১৯৭২ সালে ‘এক সপ্তাহের জন্য ভারত পরীক্ষামূলক ফারাক্কা বাঁধ চালু করলেও’ সে চালু আর বন্ধ হয়নি, পানি ভাগাভাগির কূলকিনারা হয়নি। ১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানী ফারাক্কা অভিমুখী লংমার্চ করেন। এটিই ছিল বাংলাদেশ থেকে প্রথম এবং শেষ রাজনৈতিক প্রতিবাদ। 

ভারতের ফারাক্কায় এবং তিস্তা পানি উজানে আটকানোর ফলে ভাটিতে নদীমাতৃক কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ মরুভূমির মতো পরিবেশ-পরিস্থিতিতে নিপতিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক নদী গঙ্গার উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের প্রমত্তা পদ্মা শুকনা মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় নাব্যতা হারিয়ে যায়, যাতায়াত যোগাযোগ ব্যবস্থা নষ্ট হয় এবং এমনকি পদ্মা ও তিস্তার শাখা নদীগুলো (যা বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৬৫ শতাংশ অঞ্চলের অববাহিকা) পানিশূন্য হয়ে ভরাট হয়ে বর্ষা মৌসুমে অস্বাভাবিক পানিপ্রবাহের কারণে এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি ও অমানবিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। জিকে ও তিস্তা ইরিগেশন প্রজেক্টের আওতায় পানি ব্যবস্থাপনার যে ব্যবস্থা ছিল, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি করেও এবং তিস্তা চুক্তি ঝুলে থাকায় শুষ্ক মৌসুমে হিসাবের পানিও মেলে না আর ভরা বর্ষায় অস্বাভাবিক পানিপ্রবাহে ভেসে যায় বিস্তীর্ণ অঞ্চল। গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের কথা মাঝেমধ্যে শোনা যায় কিন্তু এগুলো আসলে কার্যকর করা যায় না। ফলে বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ক্রমে দেউলিয়া হতে চলেছে। মধুমতী বা অন্যান্য নদীর মিষ্টি পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের লোনা পানি আরো উপরে এসে পুরো সুন্দরবনসহ দক্ষিণ-পশিচমাঞ্চল ভয়ংকর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে। ভারতের সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার অনুমতি না মিললেও বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকায় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হচ্ছে। (চলবে)


ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ: সরকারের সাবেক সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান এবং প্ল্যানিং কমিশনের সাবেক সদস্য