বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) বলতে বুঝায় এমন এক ধরনের সংস্থা যা এক বা একাধিক স্বেচ্ছাসেবক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। তবে সংখ্যায় খুব কম হলেও গঠনের প্রকৃতিগত দিক হতে কিছুক্ষেত্রে লাভের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন এনজিও বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিলক্ষিত হয়। এনজিও গঠনের ইতিহাস প্রায় শত বছরের পুরনো হলেও জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে এনজিও প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই। তবে বিশ্বব্যাপী তা ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় বিগত শতাব্দীর সত্তরের দশকে। আমাদের দেশেও এনজিওর যাত্রা মূলত তখন থেকেই।
বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক ও সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে এসব সংস্থার যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, রিলিফ ওয়ার্কস, অসহায় ও দুস্থদের পুনর্বাসন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, কলেরা নিয়ন্ত্রণ, নারীর ক্ষমতায়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কর্মপরিধি বিস্তৃত করেছে। বর্তমানে ক্ষদ্রঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি গতিশীল রাখা ছাড়াও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, পরিবেশ রক্ষা, দক্ষতাবৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা করে আসছে। সার্বিকভাবে বলা যায় দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশেষ করে গ্রামীণ কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রসারে এ সব সংস্থা যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে আসছে। কভিড-১৯ এর ফলে সৃষ্ট আর্থিক সংকট নিরসণে আনুষ্ঠানিকভাবে এনজিওদের সম্পৃক্ত করা নিম্নোক্ত কারণে জরুরি বলে মনে করি।
১) দেশে পরিচালিত এনজিও বা বেসরকারি সংস্থাগুলোর রয়েছে বিশাল কর্মী বাহিনী। প্রায় আড়াই লাখ লোক সরাসরি এ খাতে নিয়োজিত এবং ৩ কোটি পরিবার সরাসরি এনজিও কার্যক্রমের মাধ্যমে উপকৃত (দি ফিন্যান্স টুডে, ০৬ মে, ২০২০)। দেশের সর্বত্র এসব সংস্থা তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে যেমন: হাওড়-বাঁওড়-চর, চা-বাগান, পাহাড়, উপকূলীয় ও দুর্গম এলাকা ইত্যাদি। এছাড়া, প্রায় সব এনজিওর রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার অভিজ্ঞতা, রয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করার মানসিকতা সম্পন্ন জনবল। এসব সংস্থার অভিজ্ঞতা ও রিসোর্স কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশনা ও সহযোগিতা জরুরি।
আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করেছি এবং তারা সরকারের কাজে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী। যদিও অনেক সংস্থা কভিড-১৯ এর সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর হতেই নিজস্ব উদ্যোগেই ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে যা আশাব্যঞ্জক।
২) ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে কাজ করার সুবাদে এ খাত বহির্ভূত অনেক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদরে সঙ্গেই আমার আলাপ হয়। এতে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, অনেক শিক্ষিত লোকেরও এনজিও’দের কাযক্রম সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। যারা জানেন তারা মনে করেন এনজিও বলতে শুধু ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে অধিকাংশ এনজিও একসঙ্গে নানাবিধ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে যেমন: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশিক্ষণ, এডভোকেসি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইত্যাদি। এ সব কাজের মধ্যে ক্ষুদ্রঋণ একটি অনুষঙ্গ বা উপাদান মাত্র। এনজিওগুলোর কার্যক্রম বন্ধ থাকার অর্থ হলো অন্যান্য কার্যক্রম থেকেও এর সদস্যদের বঞ্চিত হওয়া এবং প্রয়োজনে ঋণ সহায়তা না পাওয়া।
৩) গত বছরের নভেম্বর মাসে বিশ্বব্যাংকের আমন্ত্রণে তুরস্কের আঙ্কারাতে অনুষ্ঠিত অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থান বিষয়ক একটি কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করি। এতে ২৫ টি দেশের প্রায় ৬২ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন যাদের অধিকাংশই এসেছেন আফ্রিকার দেশগুলো থেকে। এদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায় যে, ওইসব দেশে সুদের হার আমাদের দেশের তুলনায় অনেক বেশি এবং জবাবদিহিতাও কম। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের এনজিওগুলোর তহবিল ব্যবহার সরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সময়ে সময়ে মনিটরিং করা হয় যেমন: ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকি করে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ), বৈদিশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পের কার্যক্রম তদারকি করে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন, রেজিস্ট্রেশন অথরিটি হিসেবে সমাজসেবা অধিদপ্তরও সময়ে সময়ে এ সব সংস্থার কর্মকাণ্ড তদারকি করে থাকে। এছাড়া, স্থানীয় প্রশাসনও এদের কর্মকাণ্ড তদারকি করে থাকে।
উল্লেখ্য, সবচেয়ে বেশি মনিটরিংয়ের আওতায় থাকে পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থাগুলো। পিকেএসেএফ ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের পাশাপাশি সহযোগী সংস্থার সব কর্মকাণ্ড তদারকি ও পর্যবেক্ষণ করে থাকে। পিকেএসএফ শুধু তদারকি ও পর্যবেক্ষেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং এসব সংস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এছাড়া, অন্যান্য দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থাও তাদের স্ব স্ব প্রকল্প ও কর্মসূচি তদারকি করে থাকে। কাজেই এনজিওদের কার্যক্রম তথা তহবিল ব্যবহার নিয়ে যারা সংশয় প্রকাশ করে থাকেন তারা অন্তত বিদ্যমান তদারকি ব্যবস্থার ওপর কিছুটা নির্ভর করতে পারেন।
৪) বিগত সময়ে আমরা (২০০৭ সালে সিডর, ২০০৯ সালে আইলা) দেখেছি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরকারের সহযোগী হিসেবে বেসরকারি সংস্থাগুলো দারুণভাবে সহায়তা করেছে যা তৎকালীন সময় প্রশংসনীয় হয়েছে। এছাড়া, মঙ্গা নিরসণে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকাও প্রণিধানযোগ্য। অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা বিস্তার ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ব্র্যাকসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের সামর্থ্য ও অভিজ্ঞতা প্রশংসনীয়। সাম্প্রতিক সংকট মোকাবেলায় এ সব প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত ও কার্যকর করা হলে তা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য যথেষ্ট সুফল বয়ে নিয়ে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
৫) সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, এনজিওগুলো ঘূর্ণায়মান তহবিল হিসেবে প্রতি বছর প্রায় ১ দশমিক ৫০ লাখ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করে থাকে যা দেশের জিডিপির প্রায় ১২ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (দি ফিন্যান্স টুডে, ০৬ মে ২০২০)। ঋণ বিতরণের পরিমাণ মোটেও অগ্রাহ্য করার মতো নই। যে দরিদ্র কৃষক কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কোনদিন ব্যাংকে যাননি কিংবা গেলেও ঋণ পাওয়া তার জন্য স্বপ্নের মতো, আর পেলেও তা দিয়ে চাহিদার কিয়দংশই পূরণ হতো বা হবে। এনজিওদের অর্থায়ন এ সব দরিদ্র পরিবারকে মহাজনি ব্যবস্থা হতে রক্ষা করেছে এবং সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করছে। এরা ঋণ প্রদান করেই বসে থাকে না, পাশাপাশি ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য তদারকি, উদ্যোগ পরিচালনার প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ইত্যাদি প্রদান করে থাকে। বিগত মার্চ হতে ঋণের কিস্তি আদায় ও বিতরণ বন্ধ রয়েছে যা পযালোচনা সাপেক্ষে চালু করা প্রয়োজন। অন্যাথায়, গ্রামীণ কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো অর্থ প্রবাহের অভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে বাধাগ্রস্ত হবে কৃষির উৎপাদন, বেকার হয়ে যাবে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা।
৬) কভিড-১৯ এর কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয় মোকাবেলা করার জন্য সরকার এরই মধ্যে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে যার কিছু কিছু অংশ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ঘোষিত প্রণোদনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে নিজস্ব তহবিল হতে ৫১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগকে সুখকর বলে উল্লেখ করেছেন সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। এ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের জন্য গঠিত ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের পুরোটাই বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন তহবিল হিসেবে দিতে পারে। তিনি উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ প্রদানের জন্য এ অর্থ এনজিওদের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান পিকেএসএফ বা এসএমই ফাউন্ডেশনকে লিড এজেন্সি হিসেবে নিয়োগের পরামর্শ প্রদান করেন (দৈনিক বণিক বার্তা, ০৬ মে ২০২০)।
এছাড়া, অর্থনীতি বিশ্লেষক জনাব মামুন রশীদ মনে করেন, এ সংকট মোকাবেলায় পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থাদের সম্পৃক্ত করা হলে অন্যান্য সময়ের মতো এবারও সুফল পাওয়া যাবে (দৈনিক বণিকবার্তা, ০৭ মে ২০২০)। উল্লেখ্য, এনজিওদের অর্থায়ন ও তদারকির সক্ষমতা, গ্রামীণ কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের বিকাশে পিকেএসএফ-এর অভিজ্ঞতা সরকারের কাজে লাগানো উচিৎ বলে এ খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন ।
দেশব্যাপী এনজিওদের ২ দশমিক ৫ লাখ জনবলের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, প্রায় ৩ কোটি দরিদ্র পরিবারের নিকট সহযোগিতা পৌঁছানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করতে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে দ্রুত কভিড-১৯ জনিত সংকট নিরসনে সস্পৃক্ত করা প্রয়োজন। এতে সরকারের ওপর চাপ কমবে বলেই আশা করা যায়। নীতি নির্ধারকরা যতো দ্রুত বিষয়টি অনুধাবন করবেন ততোই তা মঙ্গলজনক হবে।
লেখক: উন্নয়ন বিশ্লেষক ও সমাজকর্মী, ডেপুটি ম্যানেজার, পিকেএসএফ
Email: ggilane@gmail.com










