(গতকালের পর)

সেলিম জাহান: সাংস্কৃতিক সংসদ বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন জমজমাট ছিল। তাদের পক্ষ থেকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে খুব বড় করে আমাদের নবীনবরণ অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। আমার যদি স্মৃতি প্রতারণা না করে তাহলে তখন সাংস্কৃতিক সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মাহফুজ আনাম। সেখানে নবীনদের পক্ষ থেকে আমি ও রসায়ন বিভাগ থেকে জারীন হুদা অংশগ্রহণ করেছিলাম। নবীনবরণ উৎসবের কিছুদিন পরে আমাদের বিভাগীয় অর্থনীতি সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দুজন প্রার্থী ছিলেন। একজন ইকবাল আহমেদ। তিনি রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন, এখনো গান। আইএলওতে কাজ করেছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। আরেকজন কিংবদন্তি ছাত্র ড. রিজওয়ানুল ইসলাম। যিনি জীবনে কখনো দ্বিতীয় হননি। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সম্পর্কেও এটা সত্য। ইকবাল ভাই গান গেয়েই মোটামুটিভাবে সহসভাপতি হওয়াটা পাকাপোক্ত করে নিলেন। ইকবালের গান কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ করে মেয়েদের মন জয় করে নিয়েছিল।

শামীম আজাদ: বাংলা বিভাগের অনুষ্ঠানের সুনাম ছিল। আমি যখন বাংলা বিভাগে পড়তে চাইলাম তখন আমার বাবা কিন্তু তাতে রাজি ছিলেন না। বাবার ইচ্ছা আমি ইংরেজিতে পড়ি। কিন্তু আমি বাংলায় পড়ব। ভর্তির সময় শেষ হয়ে এসেছে, আমি কান্নাকাটি করছি, বাবাও অনঢ়। এমন সময় আম্মা এসে বললেন, এটার তো সমাধান হওয়া উচিত। তোমরা বাবা-মেয়ে কথা বলো। বাবা আমার কাছে সিলেটি ভাষায় জানতে চাইলেন, বাংলায় কিতা অত মদু? এর মানে বাংলায় কি এমন মধু আছে? আমি অগ্রসর বাংলা বিষয়ে আমাদের কুমুদিনী কলেজ থেকে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছিলাম। তাই মনে করতাম আমি বাংলায় ভালো করব। অন্য বিষয়টা হচ্ছে, বাংলা বিভাগের অনুষ্ঠানগুলোয় স্বয়ং শিক্ষকরা যোগ দিতেন। স্যাররা তখন টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করতেন। আমি আব্বাকে বললাম, যাদের বই পড়ে পড়ে আমি এত নম্বর পেয়েছি, ওই লোকগুলো সামনে এসে পড়াবে। আমি এজন্য পড়তে চাই। তখন বাবা বললেন, আমি ওনাদের অনুষ্ঠান দেখি, ওনারা অনেক গুণী মানুষ। ঠিক আছে মা, তুমি বাংলায় ভর্তি হও। তবে একটা শর্ত। ইংরেজি সাবসিডিয়ারি হিসেবে রাখতে হবে।

নীলিমা ইব্রাহিম আপা, মুনীর চৌধুরী স্যার কবিতা পড়তেন এবং আমাদের সঙ্গে নিয়ে বসতেন। এমন একটা আবহ তৈরি হয়েছিল যে শুধু অনুষ্ঠান নয়, নীতিগতভাবে আমাদের হাতে ধরে মঞ্চে তুলে নিতেন। শুধু তো পরিবেশনা নয়, এর সঙ্গে পঠন-পাঠন, উচ্চারণ, নীতি-নিয়মগুলো শিখিয়ে দিতেন। কোন গানটি ডিএল রায়ের, তাকে কেন আমরা রবীন্দ্রসংগীত বলে ভুল করছি। কোনটি কায়কোবাদের চরণ হবে, সেখানে কেন আমরা শীতালং শাহ নিয়ে আসছি। আবদুল হাই স্মৃতি পাঠকক্ষে মহড়া হতো। আমি কোরাসের শিল্পী ছিলাম। যখন অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলো, তখন জাহিদুর রহিম স্যার, শেখ লুত্ফুর রহমান স্যার, লতিফ স্যার আমাদের কিছু গান শিখিয়ে দিয়েছিলেন। আমরা ট্রাকের ওপর উঠে গানগুলো করতাম। গান করতে গিয়ে আমরা তাদের কাছ থেকে শিখেছি যে শুধু সংগীত বা বাণী নয়, এর উদ্দেশ্য আছে এবং এই উদ্দেশ্য কী, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিয়েই আমরা মঞ্চে উঠতাম।

সেলিম জাহান: এ পর্যায়ে আমি রোকেয়া হল সম্পর্কে বলব। আমি রোকেয়া হল বিশেষজ্ঞ নই, তবে তিনটা কথা। এক. রোকেয়া হলের চামেলি ভবনটি একজন আমেরিকান স্থপতির করা। দুই. রোকেয়া হলের সামনে একটা গতি নিরোধক বাঁধ আছে। এখন ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় আছে। তবে ওটি হচ্ছে ঢাকা শহরের প্রথম গতি নিরোধক বাঁধ। এটার একটা ইতিহাস আছে। ১৯৬১ সাল। মাহবুব আরা নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী তার দুই বন্ধুকে নিয়ে ছবি দেখতে যাবেন। তারা রাস্তা পার হচ্ছেন। তার অন্য দুই বন্ধু রাস্তা পার হয়ে গেলেও তিনি যখন রাস্তা পার হচ্ছিলেন তখন নীলক্ষেতের দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের নিচে তিনি পিষ্ট হন এবং মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনার পর গতি নিরোধক বাঁধটি দেয়া হয়। এর আবার আরেকটা দুঃখজনক দিক আছে। আমাদের সমসাময়িক আহসান হাবীব বলে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক আশির দশকে টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করতেন। আমিও তখন টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করতাম। আহসান হাবীব এবং আমার অনুষ্ঠান পরপর থাকত। তিনি সম্ভবত সূর্য সেন হল বা মহসিন হলের গৃহশিক্ষক ছিলেন। একদিন তিনি অনেক রাতে অনুষ্ঠান শেষ করে ফিরছিলেন। খুব জোরে বাইক চালিয়ে আসার সময় ওই গতি নিরোধক বাঁধে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে তার মৃত্যু হয়, যা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। তিন. এ ঘটনা কিন্তু হাসির। রোকেয়া হলের সামনে দারোয়ান থাকত। সেই বিখ্যাত কবিতা ‘অন্তরে তার মমতাজ নারী বাহিরেতে শা-জাহান’—এটাকে আমাদের অনেকে অন্যভাবে বলত যে—‘রোকেয়া হলের ভেতর দেখেছ, দেখ নাই তার প্রাণ, ভেতরে তার শত শত নারী, বাহিরেতে দারোয়ান।’

শামীম আজাদ: আমাদের সময়ের পরে রোকেয়া হলে হামিদুজ্জামান খানের করা বেগম রোকেয়ার একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। যে বেগম রোকেয়া অবরোধবাসিনী নিয়ে লিখলেন, সুলতানার স্বপ্ন নিয়ে লিখলেন, তার ভাস্কর্যকে হলের ভেতরে আবদ্ধ করে রাখার কিন্তু প্রয়োজন ছিল না। যদি নতুন গেট হলো তাহলে বেগম রোকেয়ার ভাস্কর্য সামনে রাখা উচিত ছিল। এটা আমার মনে লেগেছে। কারণ নভেরার ভাস্কর্য, ছেলেদের হলের ভাস্কর্যগুলো তো সব বাইরে আছে, মেয়েদের হলে কেন এটা বাইরে থাকবে না।

সেলিম জাহান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরনের ভাস্কর্য রয়েছে। আমাদের সময় যেটা পাবলিক লাইব্রেরি ছিল, তার সামনে একটা মঞ্চও ছিল। ১৯৬২ সালে মুনীর চৌধুরীর নির্দেশনায় সেখানে কিস্তু রক্তকরবী মঞ্চস্থ হয়েছে। এখানে নভেরার ভাস্কর্যও ছিল। আমাদের যে বন্ধুরা কবিতা লিখতেন, তারা কিন্তু তাদের কবিতায় নভেরার ভাস্কর্যের কথা উল্লেখ করেছেন, কবি নির্মলেন্দু গুণসহ।

শামীম আজাদ: নির্মলদাকে কিন্তু ওখানেই আমরা দেখতাম। আমাদের পাবলিক লাইব্রেরির সামনে।

সেলিম জাহান: শামীম আমি একটু ঠিক করে দিচ্ছি। নির্মলদাকে সেখানে কে না দেখেছে! কারণ ওই পথ দিয়ে আমাদের সব বন্ধু-সহপাঠী ক্লাস করে আসতেন। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে দীর্ঘদেহী পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত বাউলের মতো নির্মলদাকে না দেখার কোনো সুযোগ ছিল না।

শামীম আজাদ: আমাদের স্মৃতিচারণে আরো কবি বন্ধু আসবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা নয়, তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু এক এবং অনন্য। এখানে যারা পড়িয়েছেন, যারা পড়েছেন, তারা আজকে বিভিন্ন জায়গায় স্থান করে নিয়েছেন। শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং খেলাধুলা সবকিছুতেই কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রণী ছিল। খেলাধুলা প্রসঙ্গে আমার খুকির (সুলতানা কামাল, পরে শেখ কামালের স্ত্রী) কথা মনে হচ্ছে। আমাদের বিভাগে পড়ত সালমা। আমি আর বাবলি খেলাধুলায় খুব পারদর্শী ছিলাম না, তবে জিমনেশিয়ামে হাজিরা দিতে যেতাম। কারণ নিয়ম ছিল ৪০ দিন হাজিরা দিতে হবে। আমরা যেতাম আসলে যখন খুকি আর সালমার খেলা থাকত। আমরা খুব ভালো চিয়ার লিডার ছিলাম। টিএসসির মাঠে ওদের খেলা থাকলে আগের দিনই খবর পেয়ে যেতাম। রিলে-রেসে খুকির সঙ্গে সালমা ও আরো দুজন মেয়ে থাকত। যখন আমাদের জিমনেশিয়ামে হাজিরা দিতে হতো, যখন বলা হতো যেকোনো কসরত করলেই হবে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় নিয়ে। আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম যে রোলার স্কেট রয়েছে। বলাকা সিনেমা হলে ইংরেজি ছবিতে এগুলো দেখেছিলাম আগেই। মনে হলো, এটা বোধহয় খুবই সোজা। পা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেই হলো। আমি পায়ের মধ্যে চাকাগুলো লাগিয়ে নিলাম। টের পেলাম আমি নই, রোলার স্কেটই আমাকে নিয়ে চলছে। সাঁই করে আমি গিয়ে ধাক্কা খেলাম কিছু দূরে রাখা একটা টেবিলের সঙ্গে। ভাগ্যিস কোনো ছেলে ছিল না সেখানে। খুকি এসে আমাকে টেনে তুলে দাঁড় করাল।

সেলিম জাহান: তোমার কথা শুনে আমার লিও তলস্তয়ের একটা গল্প মনে পড়েছে। তিনি ঠিক এমনিভাবে একটা জিমনেশিয়ামের মধ্যে সাইকেল চালানো শিখছেন। দূরে একটা মেয়েকে দেখে তার অসম্ভব ভালো লেগে যায়। তিনি ঠিক করলেন যে কসরত করবেন কিন্তু অসম্ভব সাবধানতার সঙ্গে, যাতে কোনো মতেই মেয়েটির গায়ের ওপর গিয়ে না পড়েন। তিনি খুব ধীরস্থিরভাবে সাইকেল চালাতে শুরু করলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই মেয়েটির ঘাড়ের ওপর গিয়েই পড়লেন।

শামীম আজাদ: সেলিম শুধু বলো যে ক্যান্টিনের কোন খাবারটা তুমি প্রথম খেয়েছিলে এবং কোন খাবারটা বেশি ভালো লাগত।

সেলিম জাহান: এটা মনে নেই, তবে পরিষ্কার মনে আছে যে কোন খাবারটা একদমই পছন্দ করতাম না। একটা হচ্ছে হালিম এবং অন্যটা শাহি টুকরা।

শামীম আজাদ: আমি কিন্তু সর্বভূক। আমার সবই ভালো লাগত। সবচেয়ে ভালো লাগত ছোট ছোট শিঙ্গাড়া আর ছোট কাপে ভীষণ চিনি দেয়া চা। আচ্ছা, তোমরা তোমাদের চিঠি পেতে কোথায়? মেয়েদের হলে একটা পিজন হোল ছিল। সেখানে চিঠি জমা হতো। আমি আর শ্রাবণী গিয়ে সেগুলো চেক করতাম।

সেলিম জাহান: আমরা যার যার চিঠি রুমে পেতাম। যাই হোক, এবার ভাস্কর্য প্রসঙ্গে আসি। কার্জন হল থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় বহু ভাস্কর্য আছে। অনেকেই মনে করেন যে টিএসসির ভাস্কর্যটা বুঝি আমেরিকান কোনো স্থপতি করেছিলেন, যা সঠিক নয়। এটি একজন গ্রিক স্থপতি করেছিলেন বলেই আর্মেনিয়ার একটা স্মৃতিস্তম্ভ নষ্ট করা হয়নি সেখানে। এটিকে অনেকেই গ্রিক ভাস্কর্য বলে মনে করি, কিন্তু এটা আর্মেনিয়ান। তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর মারা যাওয়ার পর তাদের দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটাকে ভাস্কর্যের আদলে শামসুন্নাহার হলের সামনে রাখা হয়েছে। এছাড়া অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্যটা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু একটা ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একশ বছরে পা দেয়া উপলক্ষে আমরা বোধহয় বিষয়টিকে মনে করতে পারি। বঙ্গভঙ্গ হলে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, পরবর্তীতে সে আন্দোলনের ফলে বঙ্গভঙ্গ রদও করা হয় ১৯১১ সালে। তখন দুটো জিনিস ঘটেছিল। ব্রিটিশ সরকার চাইছিল যে পূর্ববঙ্গকে কোনো না কোনোভাবে খুশি করে দেয়া, আর এ অঞ্চলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি উঠেছিল।

শামীম আজাদ: স্মরণাতীতকালের বড় দুর্যোগ পৃথিবীময়। অনেকে নিজের আপনজনের কাছে নেই। অনেকে আপনজন হারিয়েছেন। আমরাও হারিয়েছি। সেলিম ও আমি নিজেদের মধ্যে স্মৃতিচারণ করছিলাম। স্মৃতিচারণের মাধ্যমে আমরা কিছু বিষয়ের মূল্য দিতে শিখি। বুঝি যে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল সে সময়টা; কত-না ভালোবেসেছি, কত-না আনন্দ করেছি, কত যে প্রাণের মানুষের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে, কত-না পেয়েছি এই পৃথিবী থেকে। এই প্রকৃতি আমাদের কত কিছু দিয়েছে। আমরা এসব ভুলে মাঝে মাঝে প্রকৃতির সঙ্গে বৈরী ব্যবহার করি। শুধু প্রকৃতির সঙ্গে নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যবহারও এমন একটা জায়গায় নেমে এসেছে, যা ভাবলে মন খুব খারাপ হয়ে যায়। দৌড়ানোর সময় দেখা যায় না যে আমরা কী পার হয়ে যাই, যখন থামি তখন বুঝি যে কতটা ফেলে এলাম। করোনাকাল আমাদের থামিয়ে দিয়েছে। আবার জীবন শুরু হবে। আবার সবকিছু মঙ্গলালোকে ভরে উঠবে—এটা আমরা বিশ্বাস করি। কিন্তু স্মৃতি কেন? স্মৃতির কতগুলো সুপ্রভাব আছে। স্মৃতি আমাদের একতাবদ্ধ করে, একত্র করে। আমাদের সুফল পাওয়ার মুহূর্তগুলোকে মনে করিয়ে দেয় এবং আমরা কৃতজ্ঞ হই যে আমরা বেঁচে আছি। সেলিম এবং আমি গল্প করছিলাম। তখন মনে হলো, আমরা যদি সবাইকে শামিল করি তাহলে যূথবদ্ধভাবে আমাদের দেশটাকে একটা অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করব। কারণ স্মৃতি কখনো হারায় না। যখন মনে করা হয়, সব ফিরে ফিরে আসে। এই বন্দি সময়ে আপনারাও ঘরে বসে আপনাদের ভালো স্মৃতিগুলো টেনে আনুন। সেলিম, আমাদের স্মৃতিকথায় আমরা একদিন একাত্তরের কথাও বলব।

সেলিম জাহান: নিশ্চয়ই। আমরা তো আসলে ’৬৯ ও ’৭১-এর সন্তান। সুতরাং এ সময়ের কথা বলব। আসলে স্মৃতিরা কখনো হারায় না। তারা শুধু লুকিয়ে থাকে। বিভিন্ন সময়ে তারা বেরিয়ে আসে। এই দুর্যোগের সময় এ স্মৃতিকথাগুলো পরস্পরকে বলা, জানানোর মধ্য দিয়ে এক ধরনের সুখ বা প্রশান্তিও মানুষের জীবনে আসে।

শামীম আজাদ: একটা শক্তিও আসে। তুমি বলবে এবার তোমার ভর্তি পরীক্ষাটা নিয়ে?

সেলিম জাহান: আমাদের সময়ে কিন্তু লিখিত পরীক্ষা বলে কোনো ভর্তি পরীক্ষা ছিল না। নম্বরের ভিত্তিতে ভর্তি করা হতো। যেটা হতো তা হচ্ছে মৌখিক পরীক্ষা। আমার বাবা আমাকে নিয়ে এলেন। তিনি নিজেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন মির্জা নুরুল হুদা। বাবা তার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তিনি একদিন আমাকে তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে পরিচয় করিয়ে দেবেন বলে নিয়ে এলেন। আমাদের সঙ্গী হলেন বাবার বন্ধু ইসলামের ইতিহাসের অধ্যাপক রেজাউল করিম। আমাদের ভেতরে ঢোকালেন কানুদা (সবাই তাকে চিনবেন। কারণ তিনিই তো সবকিছুর হর্তাকর্তা ছিলেন)। বাবা যখন ছাত্র ছিলেন তখন কানুদা ছিলেন। শুনেছি জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী যখন ছাত্র ছিলেন তখনো নাকি কানুদা ছিলেন। কানুদা বাবার সঙ্গে কথাবার্তা বললেন এবং আমাকে কোনো ধরনের পাত্তাই দিলেন না। রুমে বড় একটা টেবিল। ড. হুদা তার উল্টো দিকে বসা। তার সামনে দু-তিনটে চেয়ার। আর একটু দূরে কাঠের এবং বেতের চেয়ার। ঢোকার পর বাবা এবং অধ্যাপক রেজাউল করিম তার সামনে বসলেন। আর আমি খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারা অনবরত গল্প করতে শুরু করলেন। ড. হুদা তার সামনে রাখা কলিংবেলটা চাপলেন, সঙ্গে সঙ্গে রুমে হাজির হলেন আবদুর রহমান ভাই। তাকে তিনি কিছু একটা বলার পর কিছুক্ষণ পরে এসে ড. হুদার হাতে একটি কাগজ দিলেন। এই প্রথম ড. হুদা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ভালোমতো পড়াশোনা করবে তো?’ আমি উত্তরে বললাম, ‘জি।’ তিনি বললেন, ‘বাবার মতো হওয়া চাই’—বলে খসখস করে কী যেন লিখে দিলেন, আমি ভর্তি হয়ে গেলাম।

শামীম আজাদ: আমারটা কিন্তু এত সহজ ছিল না। তবে তুমি যেমন এসেছ বরিশাল থেকে, আমি এসেছি টাঙ্গাইল থেকে। একটা সময় কিন্তু সমতার ভিত্তিতে সবাই সুযোগ পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসত। কোনো একটা শ্রেণীর হাতে ছিল না। আমার ভাইভার দিন পরিপাটি হয়ে সুতির শাড়ি পরে গেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে দাঁড়িয়েছি। যখন ভেতরে ডাকা হলো, দেখলাম ড. কাজী দীন মোহাম্মাদ ও মুনীর চৌধুরী স্যার বসে আছেন। এক্সটারনাল হিসেবে এসেছেন সৈয়দ আলী আহসান। আছেন রফিকুল ইসলাম স্যার। আমি ঢোকার পরে প্রথম কথাই হলো, আমার পৈতৃক নিবাস কোথায়? আমি বললাম সিলেট। এবার আমাকে বললেন, ‘তাহলে তোমাকে তো বলতে হবে সিলেটে কোন মহাপুরুষের জন্ম হয়েছে?’ আমি খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমার চিন্তায় পড়া দেখে তারা বুঝে গেছেন যে আমি পারব না। তখন রফিক স্যার আমাকে বললেন, মেয়ে তুমি একটু চিন্তা করো, তোমাদের এই মহাপুরুষের নামে কিন্তু অনেক গান হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে পড়ল শ্রী চৈতন্যদেবের কথা। আমি তখন বললাম, স্যার তার ডাক নাম নিমাই। আমি এটা পারার পরে তারা এত খুশি হয়ে গেলেন, বললেন যে ‘এবার বলো তো দেখি সিলেটে কী কী পিঠা তৈরি হয়?’ আমি ভর্তি হয়ে গেলাম।

সেলিম জাহান: এখন যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেন, তারা চিন্তা করতে পারবেন এটা! এখনকার দিনে শিক্ষার্থীদের যে প্রাণান্তকারী চেষ্টা, শিক্ষার্থীদের আটকানোর নানা ধরনের পদ্ধতি এবং তীব্র প্রতিযোগিতা। যে প্রতিযোগিতার ফলে দুঃখজনকভাবে অনেক ছেলেমেয়ে আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নিচ্ছে। এসব কিন্তু তখন ছিল না। যেকোনো কারণে হোক, সে কারণের মধ্যে আমি যাচ্ছি না। তবে তখন এমন একটা পরিবেশ ছিল যে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যেত। এখন অবশ্য ছাত্র সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। উচ্চশিক্ষার চাহিদা বেড়ে গেছে ইত্যাদি বিষয় রয়েছে। তবে ভর্তির মৌখিক পরীক্ষার পরেও আমাদের কিন্তু আরো দুটো মৌখিক পরীক্ষা দিতে হয়েছে। সম্মান ও এমএ শেষ করতে একটা করে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।

শামীম আজাদ: তবে প্রথমটার মতো বাকিগুলো এতটা ভয়ের ছিল না।

সেলিম জাহান: তাই।

শামীম আজাদ: বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করার পর দেখা গেল যে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম কর্মকাণ্ড হচ্ছে। যেমন গান, নাচ, আবৃত্তি, খেলা। তবে সব জায়গায় পরীক্ষা দিয়ে ঢুকতে হয়। ছাত্র ইউনিয়ন থেকে উৎসব হবে। রোকেয়া হল থেকে কারা নাচ, গান বা কবিতা আবৃত্তিতে অংশ নেবে, তাদের বাছাই হবে। আমি আগে থেকেই নাচ করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে যেখানেই যখন যা আমি দেখছি, সবই চেষ্টা করছি। নাচের অডিশন দিতে গেলাম। অডিশন নিলেন লায়লা হাসান এবং শারমিন হোসেন। এরা দুজন তখনকার দিনে বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী। আমরা অডিশনের পর দেখলাম যে তারা দুজনের মধ্যে আলোচনা করছেন যে একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিলে একে দিয়ে হবে। আমি আশান্বিত হলাম। কিন্তু আবৃত্তির ওখানে গিয়ে নাচের চেয়ে একটু ভালো করে ফেললাম, আবার বক্তৃতায় আরো ভালো করলাম। এরপর আবৃত্তি শেষে মঞ্চ থেকে উঠে গেলে সজ্জা নষ্ট হতো বলে আমাকে কোরাসের শিল্পী হয়ে যাওয়ার জন্য বলা হলো। ইফফাত আরা দেওয়ান, শাহীন সামাদ, মিলিয়া আলী, লতা চৌধুরী—তারা আজ অনেক বড় সংগীতশিল্পী, তাদের সঙ্গে কিন্তু আমিও গেয়েছি। [শেষ]

 

শামীম আজাদ: একজন কবি, লেখক ও গল্পকথক। তিনি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখেন। সত্তরের দশকে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রায়’ শামীম তরফদার নামে প্রবর্তন করেন বাংলাদেশে ফ্যাশন সাংবাদিকতার। যুক্তরাজ্যে বাংলা ভাষায় তার প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি।

সেলিম জাহান: একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দুয়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মুখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন দুই দশক ধরে। ইংরেজি ও বাংলায় তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা এক ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক।

 

শ্রুতলিখন: রুহিনা ফেরদৌস