১.
পুরো পৃথিবী চালিত হচ্ছে অর্থের জোরে। অর্থহীন জীবন আসলেই অর্থহীন। দ্বন্দ্ব লাগছে? দ্বন্দ্বের কোনো অবকাশ নেই। অর্থ না থাকলে সবকিছু বিস্বাদ ঠেকছে। তাই বলাবাহুল্য অর্থহীন জীবন, আসলেই অর্থহীন। করোনাকালীন সময়ে জীবন আর জীবিকার সংঘাতে টিকে থাকছে জীবিকা। রূঢ় অর্থনীতির কাছে মানবিক জীবন শুধু সংখ্যা মাত্র। সেই সংখ্যা এখন শঙ্কায় রূপ নিয়েছে, দেখাচ্ছে ভয়। ভীত সবাই। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে অনেক ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও আদতে অর্থনীতি পড়েছে চাপে। একদিকে দেশীয় অর্থনীতিবিদরা অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার বুদ্ধি-পরামর্শ দিচ্ছেন, আরেকদিকে অর্থের জন্য পাগলপ্রায় মানুষ অর্থ লুটের পরিকল্পনা করছে।
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মুড়িয়াউক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মলাইকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার অপরাধ কঠোর। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ৫০ লাখ নিম্ন আয়ের পরিবার অর্থসহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। সেই তালিকায় রফিকুল ইসলাম ৪টি মোবাইল নম্বরের বিপরীতে ৩০৬টি নাম জমা দেয়। (৪/৬/২০২০, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম) রফিকুল ইসলামের কাজটি কি ধরনের তা নিয়ে পরে বিশ্লেষণ করা যাবে কিন্তু কাজটি করেছে অর্থের জন্য। এইটা নিশ্চিত। একজন চেয়ারম্যানের কি অর্থের অভাব? নিশ্চয়ই নয়। রফিকুল ইসলাম অর্থলোভী এবং তার স্বভাব নষ্ট, তাই এই কাজটি করেছে। এইটা ভয়ানক শাস্তিযোগ্য অপরাধ নিঃসন্দেহে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এক দম্পতি আড়াই মাসের কন্যা সন্তানকে বিক্রি করে দেয়। কারণ লকডাউনের কারণে সদ্যজাত শিশুটির বাবা আর মা দুজনেই কাজ হারিয়েছেন, তাদের রোজগার বন্ধ। তাই বাধ্য হয়ে কন্যা সন্তান লালন-পালন করতে ব্যর্থ দেখে সন্তানটি বিক্রি করে দেন। (৪/৬/২০২০, বিবিসি)
দুটি আলাদা দেশের ঘটনা। দুটি ঘটনার পেছনে অর্থ জড়িত। একটি স্বভাবের কারণে আরেকটি অভাবের কারণে। একটি অনৈতিক, আরেকটি বেঁচে থাকার তাগিদে। দুটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, অর্থ মানুষের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি। এই জরুরি কথাটা জানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ও। একদিকে দেশে অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে অপরদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় ব্যস্ত তাদের অর্থের ভাগ ঠিক করতে। দুর্ভাগ্য, সেই ভাগের খবর জানাজানি হয়ে যায়।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় অস্বাভাবিক খরচের প্রস্তাব করেছে স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে। প্রস্তাবে প্রতিটি সেফটি গগলসের দাম ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা। অথচ বর্তমান বাজারে প্রতিটি সেফটি গগলস বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকায়। প্রতিটি পিপিইর দাম ধরা হয়েছে চার হাজার ৭০০ টাকা। অথচ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি ভালো মানের পিপিই বিক্রি হচ্ছে এক থেকে দুই হাজার টাকায়। পাঁচটি কম্পিউটার সফটওয়্যারের দাম ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। মাত্র চারটি ওয়েবসাইট উন্নয়ন করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর খরচ ধরেছে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পাঁচটি ডাটাবেইস তৈরিতে খরচ ধরেছে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এইরকম আরো অনেক। সবচেয়ে অবাক করার মতো খরচ দেখানো হয়েছে ভ্রমণ খাতে, তাতে ব্যয় ধরা হয়েছে এক কোটি ২০ লাখ টাকা। (৪/৬/২০২০, কালের কণ্ঠ) অথচ করোনাকালীন সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থরিব হয়ে আছে! এটি নমুনা মাত্র। এই তালিকা বেশ সুদীর্ঘ। কি পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হলে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় ভয়ানক সংকটেও এইধরনের উচ্চাভিলাষী খরচ দেখাতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
২.
পোশাক খাত নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তাদের আয়, সংগঠন, শ্রমিক সবকিছুই বেশি এবং শক্ত। করোনাকালীন সময়ে পোশাক মালিকরা যেন অর্থনৈতিকভাবে আরো সাবলম্বী হতে পারে সেই জন্য সবকিছু বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ২০২০ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে ধাপে ধাপে পোশাক কারখানাগুলো খুলে দেয়া হয়। তারও আগে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্য ৫০০০ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়। কারণ মালিকরা অর্থনৈতিকভাবে সর্বশান্ত হয়ে পড়ছে বলে রব তুলেছিল। এখন তাদের অর্থের অভাব কি মিটেছে? অভাব তো মিটেইনি। বরং বেরিয়ে এসেছে স্বভাবের চমৎকারী।
রুবানা হক জানিয়ে দেয়, জুন থেকে পোশাক শ্রমিক ছাঁটাই হবে। (৪/৬/২০২০, প্রথম আলো) পোশাক খাতের ৪০ লাখ শ্রমিকের মধ্যে ২০ শতাংশ বা আট লাখ শ্রমিক ছাঁটাই হয়ে যেতে পারেন। (৫/৬/২০২০, বণিক বার্তা)
শ্রমিক যে শুধু জুন থেকে ছাঁটাই হবে তার আগে হয়নি তা কিন্তু নয়। করোনা যখন থেকে বাংলাদেশে হানা দিয়েছে তখন থেকে শ্রমিক ছাঁটাই চলছে। এখন ঢাকঢোল পিটিয়ে তা সবাইকে জানিয়ে দেয় বিজিএমইএ সভাপতি। প্রশ্ন হলো, যে খাতকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার জন্য সরকারের এতো ইচ্ছা সেই খাতই অর্থনৈতিক মন্দার ঘোষণা দিয়ে কর্মী ছাঁটাই করতে চাইছে।
পোশাক মালিকদের যেমন অর্থের প্রয়োজন, তেমনি দোকান মালিকদেরও অর্থের প্রয়োজন। দোকান মালিকরা যাতে অর্থ আয় করতে পারে তার জন্য ভয়ংকর করোনাকালীন সময়ে ২০২০ সালের ১০ মে থেকে শপিং মল, দোকান খুলে দেয়া হয়।
২০১৯ সালে রমজানের ঈদে দোকানগুলোতে বেচাকেনা হয়েছিল অন্তত ৬০ হাজার কোটি টাকা। ২০২০ সালের রমজানের ঈদে বেচাকেনা হয়েছে আনুমানিক ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ গতবারের তুলনায় লেনদেন ৫৬ হাজার কোটি টাকা কম হয়েছে। (২৬/৫/২০২০, বাংলা ট্রিবিউন)
দেশের অর্থনীতিকে হৃষ্টপুষ্ট করার জন্য সরকার একের পর এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিল সেই অর্থনীতি আদতে সাবলম্বী হয়নি। বরং পোশাক কারখানা এবং শপিং মল খুলে দেওয়ার জন্য করোনা আক্রান্ত অনেকগুণে বেড়ে গিয়েছে যার প্রমাণ প্রতিদিন মিলছে।
৩.
একটি দেশের অর্থনীতি দেশের চালিকাশক্তি। অর্থনীতিকে সচল রাখতে সরকার সবসময় সর্বোতভাবে সচেষ্ট থাকেন। যে দুই খাত থেকে সরকার সবচেয়ে বেশি আয় করে তার একটি হলো পোশাক খাত যার প্রতি সরকারের নজর সবচেয়ে বেশি। আরেকটি হলো, প্রবাসী আয়। যেটিতে সরকারের নজর সবচেয়ে কম।
‘বিদেশফেরত অভিবাসী কর্মীদের জীবন ও জীবিকার ওপর কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব’ শীর্ষক এক জরিপ পরিচালনা করে ব্র্যাক। ২২ মে ২০২০ এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের তথ্যানুযায়ী, দেশে ফিরে সরকারি বা বেসরকারি কোনো সাহায্য পাননি ৯১ শতাংশ প্রবাসী।
অথচ মে মাসে প্রবাসীরা বাংলাদেশে অর্থ পাঠায় ১৫০ কোটি ৩০ লাখ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ ১২ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। করোনাকালীন সময়ে একমাত্র স্বস্তি প্রবাসী আয়।
করোনাকালীন সময়ে অর্থনীতি বাঁচানোর এই প্রক্রিয়া দেখে আমার সত্যজিৎ রায়’র ‘হীরক রাজার দেশে’ চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় সংলাপটি মনে পড়ে গেল।
‘যায় যদি যাক প্রাণ,
হীরকের রাজা ভগবান।।’
এখন আমাদের রক্ষাকর্তা ভগবান কে, তা দেখার অপেক্ষায়।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
benoydutta.writer@gmail.com










