বারবার খুবই সাধারণ দাবি নিয়ে রাস্তায় নামতে হচ্ছে পাটকল শ্রমিকদের। দাবি আর কিছু না, মজুরি নিয়মিত পরিশোধ এবং সেই সঙ্গে পাটকলগুলো যথাযথভাবে পরিচালনা করা। সর্বশেষ এবারে দাবি পূরণ না হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অভুক্ত অসুস্থ শ্রমিকরা শেষ ব্যবস্থা হিসেবে অনশন শুরু করেন। অনশনের ধকল নেয়ার মতো শারীরিক অবস্থা তাঁদের কারো নেই। এ অনশনে গিয়ে দুজন দক্ষ পাটকল শ্রমিক অকালে মৃত্যুবরণ করলেন। তাঁদের সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, মজুরির দাবি নিয়ে তাঁরা যখন মারা গেলেন তখন বহু মাসের মজুরি না পেয়ে তাঁরা ঋণগ্রস্ত ছিলেন। সবার সম্মুখে মরলেন বলে আমরা তাঁদের সম্পর্কে জানতে পারলাম। কিন্তু মাসের পর মাস মজুরি না পেয়ে অনাহারে অসুস্থতায় মানসিক চাপে কতজন মৃত, অর্ধমৃত; কত পরিবারে কেয়ামত নেমেছে সে হিসাব আমাদের কাছে নেই। এর পরও এবারের আন্দোলনের পরও তাঁরা প্রতারণা ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতির শিকার হতে যাচ্ছেন। কারণ সরকারের নীতি এ শিল্পরক্ষা বা বিকাশের বিপরীত।

গত দুই দশকে বাংলাদেশে শিল্প খাতের দ্রুত বিকাশ হয়েছে। গার্মেন্টস ছাড়াও ওষুধ, রসায়ন, প্লাস্টিক, জুতা, সিমেন্ট, সিরামিকস, ইলেকট্রনিকস, খাদ্যসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিনিয়োগ হয়েছে। তবে এসব শিল্পের বিকাশ যথাযথ নিয়ম মেনে হয়নি, কারখানা করতে গিয়ে বন উজাড় হয়েছে, জলাভূমি ভরাট হয়েছে, কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থাও যথাযথভাবে গড়ে ওঠেনি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কারখানা বর্জ্য অবাধে নদী-নালা খাল-বিল দূষণ করছে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরে অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। বুড়িগঙ্গা নর্দমায় পরিণত হয়েছে, অন্য অনেক নদীই সেই পথে। শ্রমিক মজুরি, জীবন ও কাজের নিরাপত্তা কোনো কিছুই ন্যূনতম মানে পৌঁছাতে পারেনি। ব্যক্তি মুনাফার লোভে উন্মাদ হতে পারে, কিন্তু এসব বিষয় নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের, শ্রম ও পরিবেশ অধিদপ্তরের। কিন্তু তদারকির এসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর দুর্বল রাখা হয়েছে। কারখানা পরিদর্শকের অভাব প্রকট। এর কারণে গড়ে উঠেছে অনেক অবৈধ কারখানা কিংবা বৈধ কারখানার অবৈধ তত্পরতা। আবাসিক এলাকায় মজুদ করা হচ্ছে বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্য, অবৈধভাবে চলছে প্লাস্টিক, ফ্যানসহ নানা কারখানা। গত কিছুদিনে তার ফলাফল আমরা দেখলাম নিমতলী, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর...। কারখানার শ্রমিকরা মারা যাচ্ছেন, মারা যাচ্ছেন এলাকাবাসী। এসব অকালমৃত্যুর পর সরকার থেকেই স্বীকার করা হচ্ছে এগুলো অবৈধ ছিল, কিন্তু বছরের পর বছর অবৈধ তত্পরতা যে চলল তার দায়িত্ব স্বীকার করে কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, তদারকি ব্যবস্থা ঠিক করার কোনো উদ্যোগও নেয়া হয়নি।

এসব বিষয়ে কথা বলতে গেলেই সরকার-কোম্পানি থেকে বলা হয়, উন্নয়ন করতে গেলে, শিল্পায়ন করতে গেলে পরিবেশের ক্ষতি হবেই! কথাটা ভুল। প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশকে অর্থাৎ মুনাফার ওপর মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে গুরুত্ব দিলে প্রথমত শিল্পের পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি অনেকখানি কমানো যায়, আর দ্বিতীয়ত, পরিবেশবান্ধব শিল্পকে গুরুত্ব দিলে দুই ক্ষেত্রেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। বাংলাদেশে মুনাফা উন্মাদনা, সরকারের জনস্বার্থের প্রতি চরম অবজ্ঞা এবং দুর্নীতি-কমিশননির্ভর সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া জোরদার থাকায় এ দুটির কোনোটিই হয়নি। বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব শিল্পের