শুভ্র পাঞ্জাবি-পাজামা পরা আজন্ম লড়াকু মানুষটি এ বাংলার আমজনতার মজ্জায় ঠিক যেন মিলেমিশে একাকার। ভেতর আর বাইরে তিনি সমুজ্জ্বল। ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে শারীরিকভাবে দৃশ্যান্তরে যাওয়াটা অনেকটাই প্রতিদিনের। হা-হা স্বরের মধ্যে পুনর্জাগরণ। তার কর্মযোগ এই বদ্বীপের জল-হাওয়ায় উল্লাসে বিষাদে আরো প্রবলভাবে চিরভাস্বর হয়ে রইলেন। একই সঙ্গে একটি মানুষ মায়ামমতার দরিয়া, আবার বজ্রকঠিন শপথে অনড়। আর একজন কামাল লোহানী আবার কী হাল ধরবে তার অসমাপ্ত সাধু প্রয়াসের চিহ্নপথে! মুসা লোহানীর পুত্র কামাল লোহানী। সবার ভালোবাসার সম্বোধন দুলাল। খাস কাউলিয়ার সুবিস্তৃত পিতৃপুরুষের বসতভিটে যমুনার করাল গর্ভে রাতারাতি বিলীন হয়ে যায়। নতুন ভিটেমাটি গড়ে ওঠে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার খান সনতলা নামের শ্যামল গ্রামে। এই ছায়াছন্ন গ্রামে তার জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন। কলকাতার শিশু বিদ্যালয়ে তার বর্ণমালার সঙ্গে পরিচয়। দেশভাগের পর পাবনায় ফিরে আসেন। পাবনা জিলা স্কুলে ভর্তি হন। এরপর পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে পড়াশোনা, ১৯৫২ সাল। মেধাবী ছাত্র ছিলেন বটে, তবে ছকে বাঁধা পাঠ্যক্রমে দারুণ অনীহা। তরুণ বয়স থেকেই তার চেতনায় দেশ-দশের জন্য ঘনীভূত হচ্ছিল মর্মভেদী বেদনা। লালিত এ অব্যক্ত হূত্কম্প, দুরারোগ্য বেদনার উপশম হবে বুঝি স্বদেশভূমির অবহেলিত জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের আলোকিত উন্মোচনে। হলকুমে জমে উঠছিল সব অসংগতির বিরুদ্ধে সাহসী উচ্চারণ। এ সময় তিনি বাম রাজনৈতিক চেতনায় মুক্তির দিশায় দৃঢ়চেতা। ১৯৫৩ সালে ছাত্র সংসদের নির্বাচন করেন এবং ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সম্মেলনে যোগ দেন। তরুণ লোহানী এ উল্লেখ্য সময়ে চাচা শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক তাসাদ্দুক লোহানীর আপাত কড়া অভিভাবকত্বের আওতায় ছিলেন। চাচা সোজা পথের মানুষ। রাজনীতি ভাইপোর পড়াশোনায় বিস্তর বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। চাচা শঙ্কিত। কামাল লোহানী এরই মধ্যে জেলহাজতবাসের তিক্ত অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় করেছেন। তথাকথিত নিয়ম শৃঙ্খলে তাকে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়। চাচা মাত্র ১৫ টাকা দিলেন। সেই পুঁজি নিয়ে কামাল লোহানী ঢাকায় আসেন। চাচাতো ভাই ফজলে লোহানীর সহযোগিতায় ৮০ টাকা বেতনে মিল্লাতে সাব এডিটর হিসেবে যুক্ত হন। শুরু হলো নতুন অধ্যায়, নতুন লড়াই। দৈনিক আজাদ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক বার্তা অনেক পত্রিকায় নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাংবাদিকতা করেছেন।
১৯৬২ সালে কামাল লোহানীর নামে হুলিয়া জারি হয়। ১৩ ফেব্রুয়ারিতে গভীর রাতে দৈনিক আজাদ অফিস থেকে ঘরে ফেরার পথে গ্রেফতার হন। সামরিক শাসকের ষড়যন্ত্রে দেশ তখন ভারাক্রান্ত। ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের ২৬ নং সেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, রণেশ দাশগুপ্ত, হায়দার আকবর খান রনো, অধ্যাপক রফিকুল ইসলামসহ আরো অনেকেই একসঙ্গে বন্দি ছিলেন। সাড়ে তিন মাস পর তিনি মুক্তিলাভ করেন। ১৯৭১-এর এপ্রিলের শেষে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে কলকাতা পৌঁছেন। আমিনুল ইসলাম বাদশার সঙ্গে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে উপস্থিত হন। সেখানে তখন চলছিল ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে’র ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভ ট্রান্সমিটার উদ্বোধনের আয়োজন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ বিদ্রোহী’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন। দীর্ঘ প্রায় নয় মাস এ বেতার কেন্দ্রে কামাল লোহানী সমস্ত ভালোবাসা, শ্রম ঢেলে কাজ করে গেছেন। তিনি যদিও সংবাদ বিভাগের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন, কিন্তু সংবাদ পাঠ, কথিকা লেখা ও প্রচার, বিবিধ ঘোষণা, স্লোগান দেয়া ইত্যাদিতেও স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নিয়েছেন। অনেকটা জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ। সে সময় প্রায় সবাই প্রয়োজনে সব ধরনের কাজে এগিয়ে এসেছেন। মাতৃভূমির জন্য নিঃশেষিত হতে তারা কেউ যেন পিছপা ছিলেন না। ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ঢাকা আগমনের ধারা বিবরণী তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়। ২৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ দায়িত্ব নিলেন ঢাকা বেতার কেন্দ্রের। কিন্তু নানা কারণে পুনরায় সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন। যোগ দেন ‘দৈনিক জনপদ’ নামের একটি নতুন পত্রিকায়। জীবনের লড়াই, জীবিকার লড়াই চলছিল। চলছিল লাগাতার অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জেগে ওঠার জন্য লড়াই। অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। সমাজে বিদ্যমান সব নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে লড়াই। আজন্ম লড়াকু মানুষটি নিজের আখের গোছানোর বিষয়টি স্বপ্নেও ভাবেননি বোধ করি। যা হোক সন্তজনের আকাশের চাঁদোয়াই মাথার ওপর ছাদ। এরপর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। ‘বঙ্গবার্তা’, ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকায় কাজ করেন। ১৯৭৮ সালে ‘দৈনিক বার্তা’র সম্পাদক নিযুক্ত হন। এ সময় জাম্বিয়ার লুসাকায় কমনওয়েলথ রাষ্ট্রপ্রধান সম্নেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ পান। কিন্তু তিনি উপেক্ষা করেন। কারণ শর্ত ছিল স্যুট কোট পরতে হবে। কিন্তু কামাল লোহানী তার চিরন্তন পরিধেয় পরিত্যাগ করেননি। ফলে লুসাকা যাত্রা বাতিল। পরবর্তী সময়ে ডেপথনিউজে বাংলাদেশের সম্পাদক নিযুক্ত হন। কিছুদিন পরই পিআইবির অ্যাসোসিয়েট এডিটর পদে নিযুক্ত হন। কামাল লোহানী ১৯৯১ সালে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন বাগ্মী, যার উচ্চারণে ছিল জাদু। পঞ্চাশের দশকে বাচিক শিল্পী হিসেবে সমধিক পরিচিতি লাভ করেন। শিল্পকলার নির্যাসের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার তার অবিচল প্রতিবাদের ভাষা। নির্লোভ নিরহংকার এ নেতা জন্মেছিলেন সবটুকু শক্তি দিয়ে মাতৃভূমির কল্যাণসাধনের নিমিত্তে। নৃত্যগুরু জিএ মান্নানের কাছে নৃত্যে প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৫৯ সালে ‘নকশিকাঁথার মাঠ’ নৃত্যনাট্য পরিবেশন করে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ সফর করেন। ১৯৬১ সালে সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য সফর করেন। সামরিক শাসক রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধ করার পাঁয়তারা করছিল। এ দুঃসময়ে ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ হয়। লোহানী বজ্র সেনের ভূমিকায় অভিনয় করে ভূয়সী প্রশংসা পান। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এ মেহের আলীর ভূমিকায় অভিনয় করে প্রশংসিত হন। এরপর আবার কারাবাস। মুক্তি পেলে তিনি ছায়ানট সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। সাড়ে চার বছর পর মার্ক্সবাদের চেতনায় ‘ক্রান্তি’ গড়ে তোলেন। উদ্বোধন হয় পল্টন ময়দানে; ‘ধানের গুচ্ছে রক্ত জমেছে’ অনুষ্ঠান, নাটক ‘আলোর পথের যাত্রী’ এবং নৃত্যনাট্য ‘জ্বলছে আগুন ক্ষেতে ও খামারে’ মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে। পল্টন থেকে কুলাউড়া কৃষক সম্মেলনে, নওগাঁর ঈদগাহ ময়দানে, চট্টগ্রামের জাম্বুরী মাঠে, টঙ্গী শ্রমিকদের মিলব্যারাকের ময়দানে—লাগাতার ক্রান্তির জয়যাত্রা। এ বাংলার নানা প্রান্তে। বেতারে ১৯৭২-এ ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ এবং সফোক্লিসের ‘ইডিপাস’ নাটকে অংশগ্রহণ করেন। আর মঞ্চে করেন নাটক ‘উজান পবন’। ১৯৮৩ সালে গড়ে তোলেন গণশিল্পী সংস্থা। এছাড়া উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর উপদেষ্টা। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা ছিলেন। কামাল লোহানী ছিলেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা ও সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা বেশ কয়েকটি। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে রাজনৈতিক সামাজিক প্রক্ষাপটে লিখেছেন নিরন্তর।
‘সময়ের সাহস’ গ্রন্থে খ্যাতিমান ওয়াহিদুল হক লিখেছেন, ‘প্রথমেই মনে পড়ে ছায়ানটের ভিক্ষা মিছিলের কথা। প্রাণোচ্ছলতার অনন্ত উৎস লোহানীর ঝাঁপিয়ে পড়ে সব কাজ করবার স্পৃহা, প্রবৃত্তি আর ক্ষমতা না থাকলে তা সম্ভব হতো না। সিধু ভাইয়ের বাড়িতে গান হলো ‘ভিক্ষা দাও গো, পুরবাসী ‘নবরূপে।...ছায়ানট তিন পূর্ণ দিবসের মিছিলে সংগ্রহ করল ৫০ হাজার টাকা। সব পাঁচ পয়সা, দশ পয়সার মুদ্রা দিয়েছিল রিকশাওয়ালা আর পথের ভিখারি।...শ্যামা নৃত্যনাট্যে সুন্দরী শ্রেষ্ঠা মন্দিরা নন্দী তো লোহানীকে অর্থাৎ বজ সেনকে উদ্দেশ করেই গেয়ে উঠেছিল, আহা মহেন্দ্রনিন্দিত কান্তি, উন্নতদর্শন। তা দেবতাদের ঘি খাওয়া শরীরে চর্বি তো একটু থাকেই, লোহানীর তা ছিল না।...সমস্ত গা গরম করা গণসংগীত ওর ঠোঁটস্থ ছিল। ‘ইসবার লড়াই লানেওয়ালা বাঁচকে না যায়ে পায়েলা’— বলে কী হুংকারটাই না দিত। স্ত্রী শিক্ষিকা দীপ্তি লোহানী ছিলেন তার নেপথ্য প্রেরণা। তিনি কণ্টকাকীর্ণ চলার পথে নিদানের সম্বল। এরই মধ্যে মায়ামমতার আশ্রয় ছিল তাদের আবাসস্থল। কামাল লোহানী রেখে গেছেন তিন সুযোগ্য সন্তান। শোকাভিভূত বাংলার বহুজন তাকে শক্তির প্রতিভূরূপে, আদর্শের আলোয় বারবার চিহ্নিত করবে। তার লড়াকু আত্মা চিরশান্তিতে থাকুক।
দিলারা মেসবাহ: কামাল লোহানীর বোন










