দেশের অভ্যন্তরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হলো জনশক্তি রফতানি। তাই এ খাতও সরকারি প্রণোদনাসহ ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার প্রয়োজনীয় অধিকার রাখে। তবে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হচ্ছে এ খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিএমইটি কর্তৃপক্ষ শ্রম অভিবাসী প্রেরণকারী রিক্রুটিং এজেন্টগুলোকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্যে এনে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করলে এ খাতটি রেমিট্যান্স অর্জনে আরো ভূমিকা রাখতে পারে। একসময় কুয়েত ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাজার। অথচ এখন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে বাজারটি। এ ছাড়া ছোট হয়ে এসেছে সৌদি আরবের শ্রমবাজার। লিবিয়ার দুয়ারও বন্ধ। অথচ জনশক্তি রফতানির সম্ভাবনাময় এ খাত থেকে অতীতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। শেষে একমাত্র মালয়েশিয়ার বাজার ছিল চাঙ্গা। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতার নামে কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব, আরেক পক্ষের বাজার কুক্ষিগত রাখার ইচ্ছা প্রায় নষ্ট করে ফেলেছে এ শ্রমবাজার। কোনো ধরনের প্রতারণার ঘটনা না ঘটিয়ে জি টু জি প্লাস পদ্ধতিতে যখন গতি বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল, তখন জি টু জি প্লাস পদ্ধতিই বন্ধ হয়ে গেল। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রাণভোমরার ভূমিকা পালনকারী এ খাতে প্রাণসঞ্চার করতে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে অদক্ষ জনশক্তির বাজার সংকুচিত হয়ে এলেও দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। সম্ভাবনাময় এ বাজারকে সামনে রেখে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশ তাদের পরিকল্পনা সজিয়েছে। ইউরোপে নার্সের চাহিদার প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনাম সংশ্লিষ্ট খাতে দক্ষ জনসম্পদ তৈরি ও তা রফতানিতে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। এ কারণে উন্নত দেশগুলোয় তাদের নার্সের আধিক্য বেশি। এতে আয়ও বেশি। তাছাড়া প্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনবল সরবরাহের জন্য ভারত সরকার পুরো শিক্ষা কার্যক্রমই সাজিয়েছে। আইআইটি স্থাপন থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছে। এ খাতে জনশক্তি সরবরাহ করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে ভারত। বাংলাদেশেরও এমন লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। জাপানে শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ এসেছে। এটি সদ্ব্যবহারে প্রযুক্তি জ্ঞানসমৃদ্ধ দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের সম্ভাবনা রয়েছে উন্নত দেশগুলোর স্বাস্থ্য খাতে সেবা দেয়ার। সেক্ষেত্রে দক্ষ ও তাদের উপযোগী নার্স-মিডওয়াইফ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। হোটেল ব্যবস্থাপনা, শেফ, ট্যুরিস্ট গাইডের মতো পেশায় দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে। এতে আয়ও বেশি। প্রধানমন্ত্রী মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর এরই মধ্যে বহুবার জোর দিয়েছেন। বস্তুত সমস্যাটির নিষ্পত্তি হওয়া খুব জরুরি। প্রবাসে কর্মরত বাঙালির সংখ্যার অনুপাতে দক্ষ জনশক্তি বেশি নয়। অথচ প্রবাসে কর্মরতরা দক্ষ হলে রেমিট্যান্স বেড়ে যেত অনেক। দেশে এখন অনেক কারিগরি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ ব্যয় কমাতে হবে। এ দেশ শুধু জনসংখ্যাধিক্যেরই নয়, এ জনসংখ্যা সম্ভাবনাও ধারণ করে। এটা পরীক্ষিত যে বিদেশে এ দেশের শ্রমিকরা যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন। এখন দরকার শুধু অধিক সংখ্যার জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্র উদ্ভাবনী হওয়া। সুনির্দিষ্ট বাজারগুলোর দিকেই শুধু নয়; ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকার দেশগুলোতেও প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

জনশক্তি রফতানি খাতে যেমন সাফল্য রয়েছে, তেমনি এখনো অনেক ধরনের সমস্যা, অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা রয়েছে, যা এ খাতের উজ্জ্বল সম্ভাবনা ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতারকের খপ্পরে পড়া, উচ্চ খরচ, কারিগরি ও ভাষাগত অদক্ষতা, প্রবাসী কর্মজীবীদের সামাজিক সুরক্ষার অভাব ইত্যাদি চ্যালেঞ্জ উল্লেখ্য। প্রক্রিয়াটা দালালনির্ভর হয়ে যাওয়া, অসদুপায় অবলম্বনের মাধ্যমে কর্মীর বয়স বাড়ানো বা কমানো, ধর্মীয় পরিচয় গোপন রাখা, বিদেশে প্রেরণের আগে কাজের সঠিক বর্ণনা না দেয়া, ভাষাগত অদক্ষতা, অপর্যাপ্ত ট্রেনিং, কিছু কিছু ক্ষেত্রে মোটেই ট্রেনিং না করে সার্টিফিকেট নেয়া ইত্যাদিও কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে আনতে নানা পদক্ষেপের কথা শোনা গেলেও সুফল তেমন দৃশ্যমান হয়নি। একটা সুষ্ঠু ও নিরাপদ অভিবাসী প্রক্রিয়ার লক্ষ্যে সার্বিকভাবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উইং—বিএমইটি, বোয়েসেল, ওয়েজ আর্নার কল্যাণ বোর্ড, দূতাবাসের শ্রম উইং ও বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সমন্বয় করে কাজ করা উচিত। তাই মন্ত্রণালয় ও রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে আলাপ-আলোচনা, সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নিরাপদভাবে জনশক্তি রফতানিতে আরো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।

বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে আসার অন্যতম কারণ দক্ষ জনশক্তির অভাব। আর এ অভাব পূরণের জন্য সম্প্রতি বিদেশগামীদের প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলছে সরকার ও বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, আগামী পাঁচ বছরে সাড়ে তিন লাখ বিদেশী দক্ষ কর্মী নেবে জাপান। যা বাংলাদেশের জন্য একটা বড় সুযোগ বলে মনে করা হচ্ছে। এ সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য শ্রমিকদের দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হলেও তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আসলে বৈদেশিক শ্রমবাজারে এখন অদক্ষ ও আধা দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা তেমন নেই। সংগত কারণেই দেশ থেকে শ্রমিক পাঠানোর গ্রাফটা নিম্নমুখী।

বিদেশের শ্রমবাজার ধরে রাখতে চাইলে বিদেশের চাহিদামাফিক শ্রমিক রফতানির দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব বলেছেন, বিদেশে যেতে আগ্রহী ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব কেন্দ্রে স্বল্পমেয়াদে যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, তা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদামাফিক জনশক্তি তৈরির ক্ষেত্রে কতটুকু ভূমিকা পালন করবে, তাও ভেবে দেখতে হবে। এটা পরিষ্কার যে আমাদের শিক্ষা বিদেশে চাহিদা আছে, এমন দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারছে না। বিশ্বায়নের যুগে দরজা বন্ধ করে রাখা যাবে না। ফলে এমন জনশক্তি তৈরি করতে হবে, যাতে দেশের ভেতরে কিংবা বাইরে তারা বিদেশীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে। আমাদের জনশক্তিকে যদি বিশেষায়িত শিক্ষায় দক্ষ করে তুলতে পারি, তাহলে জনশক্তি রফতানি কমলেও প্রবাসী আয় কমবে না।