আমার কাছে তিনি নমস্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ছিলেন আমার বাতিঘর। দুঃখিত ‘বাতিঘর’ শব্দটি গুণী ব্যক্তিদের অর্থে ব্যবহার করে করে বাতি নিভে যাওয়ার অবস্থা প্রায়। তবে আমার জন্য জাহাঙ্গীর ভাই একজন সত্যিই বাতিঘর ছিলেন। বাতিঘরের ঠিকানা গুলশান ১৩৮ নম্বর সড়কের লেক লাগোয়া ১৩ নম্বর শেষ বাড়ির চারতলা। বসার ঘরে ব্যালকনির দিকে পুরোটাই খোলা, কাচের দরজা খোলাই থাকে। জলের শব্দ নিয়ে লেকের বাতাস ঘরে ঢুকে ফ্যানের সঙ্গে ঝগড়া করে। আর চারদিকের দেয়ালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই, পরম শান্তিতে ঝুলছে দেশবরেণ্য শিল্পীদের জীবনের শুরুর দিককার আঁকা দুর্লভ সব পেইন্টিং। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সুলতান, আবদুর রাজ্জাক, দেবদাস চক্রবর্তী, রশীদ চৌধুরী, হাশেম খান, রফিকুন্নবি, মনিরুল ইসলাম, হামিদুজ্জামান খান, রোকেয়া সুলতানা, তাহসীনা শাহীন থেকে আরো অনেকে এমনকি আমি ওনার মুখাবয়বের একটি পেন ড্রইং তার জন্মদিনে এঁকে দিয়েছিলাম সেটিও ঝুলে আছে।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার আগেই বাঙালি দুজনের শিল্প নিয়ে লেখা পড়ে নিজের অন্তর শিল্পজগতে ঢোকার পথ খুঁজতাম। তারা দুজন সৈয়দ আলী আহসান ও বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। তবে জাহাঙ্গীর ভাইয়ের প্রতি আকর্ষণটা বেশি ছিল এ কারণে তিনি গল্প-উপন্যাসও লিখতেন বলে। আঁকার সঙ্গে গদ্য লেখার নেশাও তীব্র ছিল তখন আমার। তখনই মনে হলো তিনিই আমাকে পথের দিশা দিতে পারেন, তিনিই আমার বাতিঘর। যাকে পূর্ব দিক দিয়ে দেখি তো গল্পকার-ঔপন্যাসিক মনে হয়। পশ্চিম থেকে দেখি তো শিল্পবোদ্ধা-শিল্প সমালোচক মনে হয়। উত্তর দিক দিয়ে দেখি তো নির্ভেজাল কবি মনে হয়। দক্ষিণ দিক দিয়ে রাজনৈতিক লেখক-বিশ্লেষক মনে হয়। ওপর থেকে দেখি তো দুর্দান্ত সাহিত্য অনুবাদক মনে হয়। তার সাদামাটা পরিচয়, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক। অবাক লাগত বাইরের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনিই সর্বোচ্চ পিএইচডি করে এসেছেন। বহুমুখী সাহিত্য সাম্রাজ্য বাড়িয়ে নেয়ার সময় পান কীভাবে। মনে এমন প্রশ্ন হতেই পারে। তবে তিনি বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, তিনি পারেন এই অসাধ্য সাধন।

অনেকে মনে করেন তার ভ্রাতুষ্পুত্র মুনতাসীর মামুনের পুত্র আমার একমাত্র কন্যাকে বিয়ে করেছে বলেই আমি লতায় পাতায় আত্মীয়, তাই তিনি আমাকে স্নেহ করেন। আসলে মোটেই তা নয়। এর অনেক আগে থেকেই আমি তার স্নেহধন্য।

আগেই বলেছি তার শিল্প নিয়ে লেখা যেমন রহস্যময় তেমনি বিমূর্ত জগতে ঢোকার দিকনির্দেশনাও আমি পেতাম। আমার সদ্য যুবক হয়ে ওঠার কাল সেই চট্টগ্রাম থাকতেই ভালো লাগত তার এই রহস্যময়তায় ঢোকা। ঢাকায় এসে ঘাটে ঘাটে ঘুরি, তবে কোথাও পাত্তা পাই না। মান্নান সৈয়দ একদিন আমার গল্প পড়ে খুব পছন্দ করলেন। নিয়ে গেলেন কণ্ঠস্বর সাহিত্য ত্রৈমাসিক পত্রিকা সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কাছে। তিনিও গল্প পড়ে মুগ্ধ। পরপর দুটি গল্প কণ্ঠস্বরে ছাপলেন। প্রিয় বিপ্রদাশ বড়ুয়া আমাদের চট্টগ্রামের মানুষ। বঙ্গোপসাগরে জেলেদের সঙ্গে দিনের পর দিন আমাকে সঙ্গে নিয়ে ভেসেছেন আর শিখিয়েছেন লিখতে গেলে ডিটেইলের জন্য স্বপ্নে ভাসলে শুধু হয় না। বাস্তবেও ভাসতে হয়। তারপর বাস্তব আর পরাবাস্তব মিশিয়ে গল্প কিংবা উপন্যাস রান্না করতে হয়। শিশু একাডেমি জোবায়দা খানম নামে গোড়াপত্তন করলেও আসলে বিপ্রদাশ বড়ুয়াই লালনপালন করে গড়ে তুলেছিলেন। শিশু একাডেমির প্রথম প্রকাশের জন্য জুরি মনোনীত ২০টি বইয়ের মধ্যে আমার প্রথম বই কিশোর উপন্যাস ‘কুশল আর মৃত্যুবুড়ো’ মনোনীত হয়ে গেল। নিজের বইয়ের ছবি আঁকারও সুযোগ পেলাম। যত বড়-মাঝারি শিল্পীদের আঁকতে অন্য সব বই ভাগ করে দেয়ার পরও একটি বই রয়ে গিয়েছিল বন্ধু স্বপন গায়েনের ‘জীবের কথা জীবনের কথা’ সেইটিরও সুযোগ পেয়ে গেলাম ছবি আঁকার।

‘কুশল আর মৃত্যুবুড়ো’ যতই ছোট বই হোক না কেন তবে আমার নিজের নামে একটি বই। বেরোনোর পর পায়ের নিচে মাটি না হলেও ধুলো জমছিল যে টের পাচ্ছিলাম। তখন আমাদের সবেধন একটি মাত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল ‘বিচিত্রা’। তাতে কলামের চারটি লাইন পেলেই ভাগ্য মনে করত সবাই। সেখানে কুশল নিয়ে দুই পৃষ্ঠা আলোচনা তাও লিখলেন হায়াৎ মামুদের মতো পণ্ডিতজন। অবিশ্বাস্য তবে সত্যি ঘটছিল। এর মধ্যে কয়েকটা সাহিত্য সভায় ও পত্রিকা অফিসে সামনাসামনি দেখলাম বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরকে। কথা বলার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সাহস হয়নি। কারণ তিনি চলনে বলনে পোশাকে এবং দেখতে অন্য সব লেখক-সাহিত্যিক থেকে আলাদা মার্জিত ছিলেন। তার ব্যক্তিত্বই আলাদা ছিল। শেষ পর্যন্ত এক সাহিত্য সভায় হায়াৎ মামুদই আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন, আশির দশক আসতে তখন আর মাত্র এক বছর বাকি।

আমার হাত খুব ঘামছিল। নার্ভাস লাগছিল। যার শিল্প বিষয়ের লেখায় বিমূর্ত জগতের দিশা খুঁজি। যার গল্পের বই রেশন করে একটি করে গল্প পড়ি যাতে দ্রুত শেষ না হয়ে যায়। অথচ তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারছি না। আমার চোখে চোখ রেখে মৃদু হেসে খুবই শুদ্ধস্বরে বল্লেন, আপনার ‘কুশল আর মৃত্যুবুড়ো’ বিপ্র পাঠিয়েছিল; শিশু একাডেমির প্রথম প্রকাশনা যে ক’বই। পড়েছি, ভালো লেখা। এই অল্প বয়সে জীবন আর মৃত্যুর মাঝে যে লাইন যে বিভাজন তা রূপক প্রতীক ব্যবহার করে কিশোরদের জন্যে বেশ সহজ সরল পর্যায় লেখাটি লিখেছেন। ভালো লেগেছে আমার।

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। চেষ্টা করেও কিছু বলতে পারছিলাম না। প্রথমত, আমাকে আপনি করে বলায় থমকে পড়েছিলাম। তিনি দ্বিতীয়জন আপনি করে বললেন। এর আগে চট্টগ্রামে আবু হেনা মোস্তফা কামাল আপনি করে বলেছিলেন। তিনিও গল্প পড়ে ভালো লাগায় স্নেহ করে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। উৎসাহ দিয়ে এক প্রকার জোর করে ঢাকা পাঠিয়েছিলেন। জাহাঙ্গীর ভাইও আজীবন আমাকে আপনি করেই বলে গেলেন। আমিও তাকে কখনো বলিনি আমি ছোট আমাকে তুমি করে বলুন।

প্রথম আলাপে হাঁ হুঁ ছাড়া কোনো কথাই হলো না, অথচ তিনিই পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠলেন আমার বাতিঘর। কারণ তিনি খুব পছন্দ করতেন যারা আমার মতো নিজেই তৈরি করে পথ সে পথে হেঁটে এগিয়ে যেতে চায়। জীবনে যুদ্ধ তো থাকবেই। ঈর্ষাকাতরতা, কুটিল চক্রান্ত সাধারণ মানুষের চেয়ে শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে কিছুটা বেশি। আমি নিজে কখনো এসবে ক্লান্ত হতাশ হয়ে পড়লে তার বাসায় যেতাম। তিনি মুখোমুখি বসিয়ে চোখে চোখ রেখে বলতেন, আমি আপনার মধ্যে আলো দেখি, এ রকম অন্ধকারাছন্ন কথা বলবেন না! কাছে নয় দূরে চোখ তুলে তাকান। ভবিষ্যৎ আপনার দিকে হাত বাড়িয়ে আছে। সেইটুকু তো যেতে হব। ইকবাল, এখন শুধু ডানে-বামে না তাকিয়ে কাজ করে যান।

তার কথা আমাকে শক্তিস্নাত করত। দ্বিগুণ তেজ নিয়ে বেরিয়ে আসতাম তার বাসা থেকে।

তার টরন্টোবাসকালে পুরনো বইয়ের দোকানে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ শখ ছিল। প্রায়ই আমি বা আমার কন্যা অগ্নিলাকে তিনি পছন্দ করতেন সঙ্গে নিয়ে যেতে। অনেক গ্যালারিতে মিউজিয়ামেও সঙ্গে যেতাম আমি। ২০১৬-তে টরন্টো লাগোয়া শহর মিসিসাগায় এক নামি গ্যালারিতে আমার ১৬তম একক ছবির প্রদর্শনীর আয়োজন করল। আমি জাহাঙ্গীর ভাইকে অনেক সাধনা করে রাজি করিয়েছিলাম চিফ গেস্ট হয়ে প্রদর্শনী উদ্বোধন করার জন্য। গ্যালারির মালিক মহিলা আমাকে না জানিয়ে ইমিগ্রেশন মন্ত্রী চার্লস সোসাকে বলে বসে আছেন চিফ গেস্ট হয়ে উদ্বোধন করতে। ভেবেছেন মন্ত্রী উদ্বোধন করলে আমি বর্তে যাব। এছাড়া এসবে অনেক অংক থাকে। তবে তাতে আমার কী! তিনি আমাকে বোঝাতে বললেন আমি গ্যালারি মালিক আয়োজক আমি, আমার কথাই থাকবে। আমিও বললাম আমার ছবির প্রদর্শনী আমি যা বলেছি তা-ই হবে। আর তা না হলে প্রদর্শনীই হবে না। মহিলার দীর্ঘদিনের শিল্পীদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। আমার চোখে চোখ রেখে স্থিরভাবে দুই দণ্ড দেখে বলেলন, ওকে, আই অ্যাকসেপ্ট ইউ। তখনই ফোন করলেন মন্ত্রীর পিএসকে। কানাডার মানুষের চেয়েও মন্ত্রীরা অতি ভদ্র, রাগলেন তো না-ই, হেসে বললেন, থ্যাংক ইউ, ওকে উইথ অ্যাজ এ স্পেশাল গেস্ট। প্রধান অতিথি থেকে বিশেষ অতিথি হিসেবে তিনি প্রদর্শনীতে এলেনও, হাসলেনও। নিজের মন্ত্রণালয়ের সম্মানফলকও আমাকে উপহার দিলেন। অবশ্য এসবের কিছুই জাহাঙ্গীর ভাই জানতেন না। তবে একটা ফিলিং ছিল পরস্পরের প্রতি।

২০২০ জানুয়ারির শেষ দিকে ঢাকা আর্ট সামিট ও বইমেলার জন্য ঢাকায় এসে আটকা পড়েছিলাম। মার্চের শুরুতে করোনাকালের সবে ঢাকায় শুরু। চারদিকে সব বন্ধ হয় হয় অবস্থা। দীর্ঘ মাস হাসপাতালে থেকে বাসায় ফিরেছেন জাহাঙ্গীর ভাই। তখনো উবার চলা বন্ধ হয়নি। গেলাম সেই ছবিবোঝাই গুলশান লেকের বাতাস হুড়োহুড়ি করা বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের বাসায়। সার্বক্ষণিক নার্সরাই তার দেখভাল করছেন। সিনিয়র নার্স বললেন, বেডরুমে যান, বেডের সঙ্গে মিশে গেছেন একেবারে। কাউকে চিনতে পারন না। আমি ঢুকলাম, বেডের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। সত্যি বেডের সঙ্গে মিশে গেছেন। চোখ খুলে তাকালেন, খুব ধীরে ধীরে হাত তুললেন। পেছন থেকে নার্সের ফ্যাসফেসে গলায় শুনলাম, চিনেছে! চিনেছে!

হাত বাড়িয়ে তার শুকিয়ে কাঠি হওয়া হাত ধরলাম। অপলক আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন, জ্বলজ্বলে চোখ দুটো চিকচিক করছে। কিছু বলতে চাইছেন, কিন্তু উচ্চারণ করতে পারছেন না।

আমি কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারছি তিনি কী বলতে চাইছেন।

—যাওয়ার সময় বলে যাই। যতদিন বাঁচবেন শক্তভাবে মাথা তুলে বাঁচবেন। একদিন আলো ঠিকই আপনাকে ছুঁয়ে যাবে। বিদায় ইকবাল।

 

সৈয়দ ইকবাল: শিল্পী ও লেখক