দেশে নারী ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এর মধ্যে গৃহিণীর সংখ্যা অর্ধেকের কাছাকাছি। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিআরএইচ) তথ্য উদ্ধৃত করে শনিবার বণিক বার্তায় এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত এক দশকে দেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে অন্যান্য পেশাজীবীর তুলনায় গৃহিণীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত ১০ বছরে ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যুতে পুরুষের তুলনায় এগিয়ে রয়েছেন নারীরা। দেশের গৃহিণীরা স্তন, জরায়ুমুখ, গাল বা মুখগহ্বর, ফুসফুস, যকৃৎসহ অন্যান্য ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এক্ষেত্রে নারী-পুরুষের পেশার বিভাজন থাকার পরও গৃহিণীদের ক্যান্সার বৃদ্ধি পাওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। এটি প্রতিরোধে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি ও উপজেলা পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্ত করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে অন্যান্য পেশাজীবী নারীর থেকে গৃহিণীদের মধ্যে ক্যান্সারের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে জিনগত কারণ ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনাচরণকে দায়ী করা হচ্ছে।
আগের থেকে বেশিসংখ্যক নারী রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার কারণে এ রোগ শনাক্ত হার বাড়ছে। আধুনিক নগর জীবনে গৃহিণীদের শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, কায়িক শ্রম কমে যাওয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে তাদের মধ্যে স্থূলতা বৃদ্ধি, উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও বেড়েছে আর এসব রোগের সঙ্গে ক্যান্সারের সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া পারিবারিকভাবে জিনগত কারণে ক্যান্সারের শঙ্কা রয়েছে। এদিকে বাংলাদেশে ক্যান্সারের চিকিৎসা এখনো সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাইরে। দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল, দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল। রোগীর তুলনায় ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংখ্যা অনেক কম। মূলত চিকিৎসকরা যখন কারো দেহে ক্যান্সার শনাক্ত করেন আর তা প্রাথমিক পর্যায়ে (স্টেজ) ধরা পড়লে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা প্রদানের সুযোগ থাকে, যাদের সামর্থ্য আছে তাদের অনেকেই চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যান। পরিস্থিতি অনুযায়ী অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অপারেশন করে আক্রান্ত অঙ্গ বা তার পাশের অংশ ফেলে দেয়া যায়। অনেকের ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন হয় না, ওষুধের মাধ্যমেই সুস্থ করা যায়। এছাড়া কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির মাধ্যমেও ক্যান্সারের চিকিৎসা করা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি
ও বেসরকারি
হাসপাতালে এ ধরনের চিকিৎসা
দেয়া হয়, তবে তার মান নিয়ে
সাধারণ মানুষের
মাঝে যথেষ্ট
প্রশ্ন রয়েছে।
আমাদের দেশে
জাতীয় পর্যায়ে
এখন পর্যন্ত
কোনো ক্যান্সার
রোগীদের তথ্যভাণ্ডার নেই। প্রতি বছর কী পরিমাণ
মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে, কী পরিমাণ মৃত্যুবরণ
করছে এবং তাদের আর্থসামাজিক অবস্থান কী, সেটি
জানার ক্ষেত্রে
জাতীয় পর্যায়ে
ক্যান্সার নিবন্ধন
না করায়
প্রকৃত সরকারি
হিসাব পাওয়া
যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, আনুমানিক দেশে
প্রায় তিন থেকে চার লাখ মানুষ
প্রতি বছর ক্যান্সারে আক্রান্ত
হচ্ছে, তার মধ্যে মারা
যাচ্ছে প্রায়
আড়াই লাখ মানুষ। এদিকে
বাস্তবতা এই যে অনুমিত
সংখ্যার কয়েক
গুণ বেশি
রোগী আমাদের
দেশে শনাক্তের
বাইরে থেকে
যাচ্ছে। বিপুলসংখ্যক রোগীর সঠিক তথ্যভাণ্ডার বা ডাটাবেজ না থাকার কারণে
দেশের ক্যান্সার
চিকিৎসা ব্যবস্থা
নিয়ে জনগণের
আস্থা নেই বললে চলে।
আমাদের ক্যান্সার
চিকিৎসা ব্যবস্থা
প্রয়োজনের তুলনায়
অপ্রতুল। আমরা
এখন পর্যন্ত
ক্যান্সার চিকিৎসা
ব্যবস্থাকে ঢেলে
সাজাতে পারিনি।
এক্ষেত্রে জনসংখ্যা
নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের মতো মানুষের বাড়িতে
বাড়িতে গিয়ে
গৃহিণীদের সচেতনতা
বাড়ানোর পদক্ষেপ
সরকার নিতে
পারে। একই সঙ্গে জেলা
পর্যায়ে ক্যান্সারের ডাক্তার নিয়োগ এবং সেখানে তাদের
অবস্থান নিশ্চিত
করতে হবে।
পাশাপাশি উপজেলা
পর্যায়ে ক্যান্সার
শনাক্তের সুবিধাও
সম্প্রসারণ করতে
হবে।
ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা যেন সচেতন হন সেজন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে প্রাথমিক ধাপেই যেন ক্যান্সার চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায় সেদিকে আমাদের মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ উন্নত দেশগুলোর মতো চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া উচিত। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা যেন মানসিকভাবে ভেঙে না পড়েন সেজন্য তাদের মনোবল ধরে রাখতে হবে। সঠিক চিকিৎসায় ক্যান্সার নির্মূল হয় এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে, তাই ক্যান্সার রোগীদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা দরকার। আর পুরুষের ক্যান্সার চিকিৎসা যেভাবে গুরুত্ব পেয়ে থাকে, এক্ষেত্রে নারীর চিকিৎসার দিকটি এখনো সে তুলনায় সঠিক গুরুত্ব পায় না। যে কারণে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা সংকোচবশত তাদের রোগের কথা বলতে পারেন না। নারীদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সার এবং জরায়ুমুখের ক্যান্সারের সংখ্যা বেশি শনাক্ত হচ্ছে। এক্ষেত্রে অনেক নারীই তাদের শারীরিক অসুবিধার দিকটি লুকিয়ে রাখায় প্রাথমিক স্তরে ক্যান্সার শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। যখন শনাক্ত হয়, তখন দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে মৃত্যুকেই বরণ করে নিতে হয়। অথচ ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার উপায় হতে পারে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ। দীর্ঘদিন লড়াই করে ক্যান্সার থেকে মুক্ত হওয়ার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। তাই ক্যান্সার হলেই বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা, আত্মবিশ্বাস এবং চিকিৎসাসেবার সহজলভ্যতাই ক্যান্সার আক্রান্তদের আশার আলো দেখাতে পারে। এজন্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ক্যান্সার চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির জন্য সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ক্যান্সার চিকিৎসা অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল বলে মানুষ ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না। এক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা আরো বাড়াতে হবে।










