দুই নেতা এমন এক বিশ্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন, যাকে তারা ‘জঙ্গলের আইন’-এ ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার সর্বশেষ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরের পরপরই পুতিনকে ঘিরে এ ধরনের রাজনৈতিক বার্তা মূলত ওয়াশিংটনের প্রতি বেইজিং ও মস্কোর সমন্বিত অবস্থানের প্রকাশ।
পুতিনের ২৫তম এ চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে ২০টি চুক্তি সই হয়েছে। যদিও সফর শুরুর আগে ধারণা করা হয়েছিল, ৪০টি চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। গতকাল ক্রেমলিন জানিয়েছে, প্রথম ধাপে ২০টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাকি চুক্তিগুলো পরবর্তী সময়ে পৃথকভাবে ঘোষণা করা হবে। স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, উদ্ভাবন, গণমাধ্যম সহযোগিতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সুরক্ষাবিষয়ক সমঝোতা। দুই দেশের মধ্যে বিশেষ করে জ্বালানি ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
গতকাল বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলন ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। লালগালিচা বিছিয়ে এবং চীন ও রাশিয়ার জাতীয় সংগীত পরিবেশনকারী সামরিক ব্যান্ডের সঙ্গে পুতিনকে স্বাগত জানানো হয়। এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র এক সপ্তাহ আগে শি জিনপিং কর্তৃক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আতিথেয়তা দেয়ার পর পরই, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতির দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
দুই নেতার যৌথ বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১৭৫ বিলিয়ন ডলারের ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পরিকল্পনার সরাসরি বিরোধিতা করা হয়েছে। এ পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে একটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষেত্র নির্মাণের কথা রয়েছে। এর পাশাপাশি দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে শেষ অবশিষ্ট অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনার সমালোচনা করেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প মস্কোর চুক্তি এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাবে সাড়া না দেয়ায় চুক্তিটি কার্যত ভেস্তে গেছে।
বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে চীন ও রাশিয়া অভিযোগ করেছে, কিছু রাষ্ট্র আবারো একতরফা বৈশ্বিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে এবং নিজেদের স্বার্থ পুরো বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ঔপনিবেশিক যুগের মানসিকতা নিয়ে অন্য দেশের সার্বভৌম উন্নয়ন সীমিত করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। যদিও কোনো দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবে বক্তব্যের মূল লক্ষ্য যে যুক্তরাষ্ট্র তা স্পষ্ট।
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শি জিনপিং বলেন, ‘বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে যুদ্ধ ও সংঘাত বাড়ানো সমাধান নয়।’ বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি এখন সবচেয়ে জরুরি। নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া আরো বিপজ্জনক হবে।’
বৈঠকের শুরুতে পুতিন বলেন, ‘আন্তর্জাতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও রাশিয়া-চীন সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা শক্তিশালী গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।’ শি জিনপিংও দুই দেশের সম্পর্ককে অটুট বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, বিশ্ব যত বেশি বিশৃঙ্খল হচ্ছে, ততই বেইজিং ও মস্কোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এবারের বৈঠকে জ্বালানি সহযোগিতা ছিল অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। পুতিন জ্বালানি খাতকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ‘চালিকাশক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ গ্যাস পাইপলাইন নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। যদিও কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি, তবে ক্রেমলিন জানিয়েছে পাইপলাইনের রুট ও কাঠামো নিয়ে একটি মৌলিক সমঝোতা তৈরি হয়েছে। চীনের পক্ষ থেকেও এ প্রকল্প নিয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। শি জিনপিং শুধু বলেছেন, জ্বালানি ও সম্পদ সংযোগ দুই দেশের সম্পর্কের স্থিতিশীলতার ভিত্তি হওয়া উচিত।
পুতিন বৈঠকে বলেন, ‘রাশিয়া ও চীন একসঙ্গে স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখবে।’ অন্যদিকে শি জিনপিং আবারো বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, একক আধিপত্যের যুগ শেষ হওয়া উচিত এবং বিশ্ব রাজনীতিতে আরো ভারসাম্য প্রয়োজন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফর ও পুতিনের সফরের মধ্যে পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প সফরে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা পেলেও কোনো চুক্তি বা কৌশলগত অগ্রগতি হয়নি। বিপরীতে পুতিনের সফর ছিল অনেক বেশি রাজনৈতিক ও প্রতীকী।










