যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হয়নি, বরং তা কয়েক মাস পিছিয়ে গেছে বলে মনে করছে মার্কিন গোয়েন্দারা। দেশটির একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রাথমিক প্রতিবেদনে এমনটাই উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিআইএ) এ মূল্যায়নের সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো  নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছে, শনিবার চালানো বিমান হামলায় ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ধ্বংস হয়নি। তবে এ মূল্যায়নকে ‘একজন নিম্নপদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তার ফাঁসকৃত ভুল তথ্য’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে হোয়াইট হাউজ।

সেই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস’ হয়েছে। ডিআইএর এ প্রতিবেদনকে ‘একটি অত্যন্ত সফল সামরিক অভিযানের মর্যাদাহানির প্রচেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি। গত শনিবার ইরানের তিন পারমাণবিক স্থাপনায়—ফোর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান—‘বাংকার-বাস্টার’ বোমা নিক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্র। যেগুলো ১৮ মিটার কংক্রিট বা ৬১ মিটার মাটি ভেদ করে বিস্ফোরিত হতে সক্ষম।

তবে ডিআইএর মূল্যায়নের সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো জানায়, ইরানের সেন্ট্রিফিউজের বড় একটি অংশ এখনো অক্ষত রয়েছে। হামলায় ফোর্দো ও নাতাঞ্জের স্থাপনাগুলোর প্রবেশপথ দুটি বন্ধ হয়ে গেছে এবং কিছু অবকাঠামো ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে যেসব স্থাপনা ভূগর্ভে অবস্থিত, সেগুলো মূলত রক্ষা পেয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, এ হামলার ফলে ইরানকে তার পারমাণবিক কার্যক্রম পুনরায় সচল করতে সময় লাগবে, তবে সেটা ‘সর্বোচ্চ কয়েক মাস’ হতে পারে। এ সময়সীমা নির্ভর করবে, তারা কত দ্রুত ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে মেরামত করতে পারে তার ওপর। মার্কিন হামলার আগেই ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কিছু অংশ স্থানান্তর করেছিল বলেও জানিয়েছে ডিআই।

যুক্তরাষ্ট্রের ইরান হামলা নিয়ে ফাঁস হওয়া গোয়েন্দা তথ্যকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ আখ্যা দিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা। মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, এ তথ্য ফাঁস ‘অবিশ্বাস্য রকমের অপরাধ’, এর জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা উচিত। ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে উইটকফ বলেন, ‘এটা রাষ্ট্রদ্রোহ। এর তদন্ত হওয়া উচিত। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের জবাবদিহি করতে হবে।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও উইটকফের বক্তব্যের একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেছেন। তিনি উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ‘ফোর্দোতে ১২টি বাংকার-বাস্টার ফেলা হয়েছে। ছাদ ভেদ করে ভেতরে ঢুকেছে এবং পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। কেউ যদি বলে, আমরা সফল হইনি, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়েছে। যারা বলছে এ বোমা ধ্বংসাত্মক ছিল না, তারা কেবল প্রেসিডেন্ট ও তার সফল মিশনের মর্যাদাহানি করার চেষ্টা করছে।’

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এ দাবি নিয়ে সন্দেহ অনেকেরই। মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি ও পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সদস্য ডেমোক্র্যাট ব্র্যাড শারম্যান বিবিসিকে বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন জয়ের ঘোষণা দিতে খুব অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করছে—এখনো পরিষ্কার নয় এ হামলায় আসলে কী অর্জিত হয়েছে।’

তার মতে, প্রশাসন বলছে পারমাণবিক কর্মসূচি ‘ধ্বংস’ হয়েছে, তারা স্পষ্ট করে বলছে না সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস হয়েছে নাকি ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম তৈরি করার সক্ষমতা ধ্বংস হয়েছে। ইরানের মজুদকৃত ইউরেনিয়াম কোথায় গেল তারও কোনো হদিস দিতে পারছে না প্রশাসন। ব্র্যাড শারম্যান আরো জানান, ইরানের মজুদ দিয়ে অন্তত নয়টি পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব।