২৫ জুন, ১৯৫০; দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর আচমকা আক্রমণ করে বসে উত্তর কোরিয়া। কোরিয়া উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে পুঁজিবাদীদের ওপর সমাজতন্ত্রীদের সেই আক্রমণই ইতিহাসে কোরিয়া যুদ্ধ নামে পরিচিত। ৩ বছরস্থায়ী এ যুদ্ধে মারা যায় কয়েক লাখ মানুষ, স্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া।

১৯৫৩ সালের অস্ত্রবিরতি চুক্তির মাধ্যমে কোরিয়া উপদ্বীপ সামরিকভাবে বিভক্ত হয়। উপদ্বীপের বিভাজনে আপত্তি জানিয়ে যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি দক্ষিণ কোরিয়া। আর তাই রণক্ষেত্রে লড়াই থামলেও বলতে গেলে, ৭৫ বছর আগের সেই কোরিয়া যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। যার ফলে পুরো অঞ্চলটি বহু দশক ধরে অস্থিরতা আর উত্তেজনার ছায়ায় রয়েছে।

এক প্রতিবেদনে এই যুদ্ধ থেকে পাওয়া তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার কথা উল্লেখ করেছে সংবাদমাধ্যম চায়না ডেইলি। যা আজকের বিশ্ব রাজনীতিতে আগের চেয়েও প্রাসঙ্গিক।

প্রথমত, প্রক্সি যুদ্ধের ফাঁদ: কোরিয়ার যুদ্ধ শুধুমাত্র একটি আঞ্চলিক সংঘাত ছিল না। বরং এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে একটি পরোক্ষ লড়াই। সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর কোরিয়াকে সমর্থন জানায় পর্দার আড়াল থেকে, আর চীন তার সীমান্তরক্ষা ও নিরাপত্তার অজুহাতে সরাসরি ‘চীনা পিপলস ভলান্টিয়ার্স’ পাঠিয়ে যুদ্ধের ময়দানে নামে। এ ধারা আজও বহাল—ইউক্রেন, সিরিয়া কিংবা ইয়েমেনের মতো দেশে ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় শক্তির দ্বন্দ্বে বলির পাঁঠা হয়ে উঠছে।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা দোটানার ফাঁদ: যুক্তরাষ্ট্র যখন ৩৮তম সমান্তরাল রেখা অতিক্রম করে চীনা সীমান্তের ইয়ালু নদীর দিকে এগিয়ে যায়, তখন চীন তা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। ফলে তারা ‘মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও কোরিয়াকে সহায়তা’ করার সিদ্ধান্ত নেয়। যুক্তরাষ্ট্র এ প্রতিক্রিয়াকে কৌশলগত ছলচাতুরি হিসেবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে, যার ফলে সংঘাত আরো তীব্র হয়। এ ভুল বোঝাবুঝি এখন দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালীতে আবারো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক জোট’কে চীন দেখছে একটি ঘেরাও কৌশল হিসেবে।

তৃতীয়ত, বহুপাক্ষিক কাঠামোর ব্যর্থতা: কোরীয় যুদ্ধের সময় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে সামরিক অভিযানের বৈধতা দিতে ব্যবহার করেছিল। যা প্রমাণ করে কীভাবে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। আজও জাতিসংঘের কার্যকারিতা ভেটো ক্ষমতার কারণে জটিল হয়ে উঠেছে। যার কারণে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া অচল হয়ে পড়েছে। এর ফলে আস্থা কমছে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ওপর।

বিশ্লেষকরা এ যুদ্ধকে ‘থুসিডিডিস ফাঁদ’-এর একটি প্রতীক মনে করেন—যেখানে একটি উদীয়মান শক্তিকে একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তি হুমকি হিসেবে দেখে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের উত্থানকে কমিউনিস্ট সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচনা করে, আর চীন দেখে মার্কিন আগ্রাসনের ধারাবাহিকতা। এমন আদর্শিক সংঘাত নিরাপত্তা দোটানাকে চরমে পৌঁছে দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ ‘ফাঁদ’ কোনো অনিবার্যতা নয়—বরং কৌশলগত ভুল চিন্তার ফলাফল। চীনের একাধিক বার্তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ৩৮তম রেখা অতিক্রম করেছিল, যা ছিল এক গুরুতর কৌশলগত ভুল। আজও এশিয়া-প্যাসিফিকে চীনকে ঘিরে একই ধরনের ভুল বিশ্লেষণ সংঘাতের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

বিশ্ব এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি যুদ্ধকে আরো ধ্বংসাত্মক করে তুলেছে, বিশ্বায়ন মানুষকে অবধারিতভাবে সংযুক্ত করে ফেলেছে, আর বহুমুখী বিশ্বকাঠামো নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য দাবি করছে।

আজও কোরিয়া উপদ্বীপে স্থায়ী শান্তিচুক্তি হয়নি। বর্তমানে কোরিয়া উপদ্বীপের জটিলতা আরো বেড়েছে। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা কৌশলগত ভারসাম্য বিঘ্নিত করছে, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার উচিত অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় জোরদার করে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা কমানো।