সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সম্মেলন শাংগ্রি-লা ডায়ালগে এ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তার এ বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ নিয়ে হোয়াইট হাউজে শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে বৈঠক শেষে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সমঝোতার ঘোষণা আসেনি।

গতকাল সিঙ্গাপুরে বক্তব্য দিতে গিয়ে হেগসেথ বলেন, ‘প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারো হামলা চালাতে সক্ষম। এজন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রভাণ্ডার ও সামরিক সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মোতায়েনকৃত বাহিনীর জন্যও আমাদের অস্ত্র মজুদ যথেষ্ট।’

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার দুই পক্ষ একটি সমঝোতা কাঠামো বা মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছিল। ওই প্রস্তাবে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরো ৬০ দিন বাড়ানো এবং এ সময়ের মধ্যে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার জন্য ট্রাম্প এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অনুমোদন প্রয়োজন।

হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেবল এমন কোনো চুক্তিই গ্রহণ করবেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং তার ঘোষিত ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করবে না। তার ভাষায়, ‘ইরান কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না।’

তবে তেহরান এসব শর্তকে অতিরিক্ত এবং অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আবারো কূটনীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। অবরোধ বজায় রেখে এবং অতিরিক্ত দাবি তুলে তিনি প্রমাণ করেছেন যে তার লক্ষ্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধান নয়।’

ইরানের আধাসরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ট্রাম্পের বক্তব্যে আংশিক সত্য থাকলেও অনেক দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিশেষ করে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংসের বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে আলোচিত সমঝোতা কাঠামোর অংশ ছিল না বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, তাদের প্রধান লক্ষ্য যুদ্ধের অবসান। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা চলছে না।

এ অবস্থায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত শুক্রবার বলেন, ‘আলোচনায় এখন মূলত কয়েকটি ভাষাগত ও কারিগরি বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রশ্নে এখনো সমাধান হয়নি।’ তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘দুই পক্ষ চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।’

তবে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সতর্ক করে জানান, তেহরান কোনো প্রতিশ্রুতি বা আশ্বাসে বিশ্বাস করে না। তার ভাষায়, ‘অন্য পক্ষ পদক্ষেপ না নেয়া পর্যন্ত আমরাও কোনো পদক্ষেপ নেব না। যে পক্ষ যুদ্ধের পরের দিনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রস্তুত থাকবে, শেষ পর্যন্ত তারাই লাভবান হবে।’

ফলে যুদ্ধবিরতি আরো ৬০ দিন বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অবিশ্বাস এখনো কাটেনি। কূটনৈতিক টেবিলে আলোচনা চললেও মধ্যপ্রাচ্যে আবারো সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি। পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নির্ভর করছে হোয়াইট হাউজ ও তেহরানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। যদি সমঝোতা ব্যর্থ হয়, তাহলে নতুন করে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে দুই দেশ, যার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্ব অর্থনীতিতেই পড়বে।