মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে বৈধতা পেতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। এজন্য লবিস্ট নিয়োগ করেছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের ডিসিআই গ্রুপকে বছরে ৩০ লাখ ডলারে লবিস্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে যুদ্ধাপরাধ, দমন-পীড়ন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের অভিযোগে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত জান্তা সরকার। এর মাধ্যমে তারা মার্কিন নীতি প্রভাবিত করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের ভাবমূর্তি পাল্টাতে চায়।
এ অর্থ ব্যয় করা হবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য, মানবিক সহায়তা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ-সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণ নিজেদের পক্ষে আনার লক্ষ্যে। এর মাধ্যমে জান্তা চায় নিজেদের শাসন ব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা হিসেবে উপস্থাপন করতে, যদিও তাদের শাসনের বিরুদ্ধে প্রমাণিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ড আন্তর্জাতিক মহলে স্পষ্ট।
এ ধরনের কৌশল মিয়ানমারের ইতিহাসে নতুন নয়। সামরিক শাসকরা দীর্ঘদিন ধরেই এক সুপার পাওয়ারকে অন্যটির বিপরীতে দাঁড় করিয়ে টিকে থাকার পথ তৈরি করেছে। এবারো চিত্র প্রায় একই। চীন এরই মধ্যে মেকং উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জান্তাকে ৩০ লাখ ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছে। দুই শক্তিধর রাজধানী ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয়ের কাছেই দরজা খোলা রেখে তারা যেন একে অপরকে পাল্টা ভারসাম্যে বাধ্য করছে। নিজেদের ‘চীনের প্রভাব ঠেকাতে সক্ষম যুক্তরাষ্ট্রের বাফার’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, এটি ক্ষমতার চেয়ারে আঁকড়ে থাকার পুরনো নকশার পুনরাবৃত্তি।
ট্রাম্প প্রশাসন যেসব প্রস্তাব নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা করেছে তার একটি হলো সরাসরি জান্তার সঙ্গে আলোচনা করে কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মির (কেআইএ) সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। এছাড়া জান্তা সরকারকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি কেআইএর সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। যদিও এ সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে মিয়ানমারের বিরল খনিজের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার লক্ষ্যেই মূলত এ উদ্যোগ নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এ অবস্থায় জান্তা সরকার আশা করছে ব্যয়বহুল লবিং প্রতিষ্ঠান ভাড়া করে অন্তত কিছুটা হলেও নিজেদের ভাবমূর্তি পাল্টানো সম্ভব হবে। যদিও মার্কিন মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে নিছক প্রতারণা বলেই মনে করছে। তারা বলছে, জান্তার সহিংসতা, গ্রাম ধ্বংস, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল পুড়িয়ে দেয়া এবং নারী-শিশুসহ হাজারো বেসামরিক মানুষ হত্যার রেকর্ড কোনোভাবেই মুছে ফেলা যাবে না।
সমালোচকদের মতে, অতীতে জান্তা আন্তর্জাতিক সহায়তা আত্মসাৎ করেছে, খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ আটকে রেখেছে। যে কারণে তাদের নিয়ন্ত্রণে পৌঁছানো যেকোনো সহায়তা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধযন্ত্রকেই শক্তিশালী করবে, জনগণের দুর্ভোগ কমাবে না। এ ধরনের শাসনের হাতে অর্থ ও সম্পদ তুলে দেয়া মানে যুদ্ধক্ষেত্রে আরো গোলাবারুদ সরবরাহ করা।
মিয়ানমারের তেল, গ্যাস, খনিজ এবং বনজ সম্পদ বহু দশক ধরে সামরিক ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য মুনাফার খনি। বর্তমানে এসব খাতে চীনের আধিপত্য সর্বাধিক। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই এ খাতগুলোয় বিনিয়োগে আগ্রহী হয়, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন তাদের প্রথমে স্থানীয় জাতিগত প্রতিরোধ গোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। যারা বাস্তবে এসব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং চীনের প্রভাব প্রতিহত করার একমাত্র কার্যকর শক্তি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত উপকূলে, যা দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পয়েন্টে পরিণত করেছে। এ অবস্থানকে কাজে লাগিয়েই জান্তা ওয়াশিংটনে লবিংয়ের চেষ্টা করছে।
মার্কিন বিশ্লেষকরা বলছেন, এ প্রচেষ্টা যত অর্থবহই হোক না কেন, এটি জান্তার অবৈধ ক্ষমতা দখল এবং নির্মম শাসনের বাস্তবতা আড়াল করতে পারবে না। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি), সিভিল সোসাইটি এবং বিভিন্ন জাতিগত প্রতিরোধ গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা। এ পথে না গিয়ে লবিং চুক্তির প্রলোভনে পা দেয়া মানে হবে জান্তার আয়ুষ্কাল আরো দীর্ঘ করা এবং মিয়ানমারের ভেতরে গণতন্ত্রের আলো আরো বহু বছর অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখা।










