মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং এর প্রভাবে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর ফলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বে ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা- ইউনিসেফ। সংস্থাটির নতুন এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ সংকট বহু বছরের অর্জিত অগ্রগতিকে ম্লান করে দিতে পারে। পাশাপাশি লাখ লাখ শিশুকে আরো গভীর দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দিতে এবং বৈষম্য বাড়াতে পারে।
আজ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রকাশিত ইউনিসেফের 'দ্য ইম্প্যাক্ট অব দ্য ওয়ার ইন দ্য মিডল ইস্ট অন চিলড্রেন ইন মনিটারিলি পুওর হাউজহোল্ডস' শীর্ষক বিশ্লেষণে বিশ্বের ১৬৭টির বেশি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন, বৃহত্তর অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবারগুলোর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সামর্থ্য কমে যাচ্ছে। এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথেরিন রাসেল বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মূল্য শুধু ওই অঞ্চলের নয়, বহু দূরের অন্য অঞ্চলের শিশুরাও দিচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, এর প্রভাব তত ভয়াবহ হবে। নিত্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় অনেক পরিবারের জন্য খাবার কেনা ও শিক্ষা অব্যাহত রাখা সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। আগে থেকেই দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা শিশুদের জন্য এ সংকট বঞ্চনাকে আরো গভীর করছে এবং এর প্রভাব তাদের জীবনে থেকে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। বিরূপ পরিস্থিতিতে মাঝারি মাত্রার অর্থনৈতিক অভিঘাতের কারণে অতিরিক্ত ১ কোটি ৮৩ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে। আর যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তীব্র পরিস্থিতি তৈরি হয়ে দীর্ঘমেয়াদে পণ্য পরিবহন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হবে, যার ফলে অতিরিক্ত ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যেতে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষতির সঙ্গে শিশুদের অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র হওয়ার জোরালো সম্পর্ক রয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকা এবং অনেক দেশের সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে পরিবারগুলোর জন্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছে।
ইউনিসেফের বিশ্লেষণ বলছে, অর্থনৈতিক দারিদ্র্য সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে এশিয়া ও আফ্রিকায়। বিশ্বে মোট যে সংখ্যায় অর্থনৈতিক দারিদ্র্য বাড়তে পারে, তার প্রায় ৮০ শতাংশই হবে এই দুই অঞ্চলে। আগে থেকেই এ দুই মহাদেশে দারিদ্র্যের হার বেশি এবং বিশ্বের অন্য অঞ্চলে যে কোনো বিরূপ পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে এখানেই।
প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। সোমালিয়ায় সংঘাত শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই মোগাদিশুতে জ্বালানির দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এর ফলে খাদ্য, পানি, পরিবহন ও মানবিক সহায়তার ব্যয় বেড়ে দেশটি আরো তীব্র অপুষ্টিজনিত সংকটের মধ্যে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় ইথিওপিয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে। ডিজেলের দাম ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে ব্যবহৃত জ্বালানির খরচ বেড়েছে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ। ফলে দুর্গম এলাকায় সহায়তা পৌঁছে দেয়া আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।
নাইজেরিয়ায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ খাদ্য ও যাতায়াতে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও তাদের ক্রয়ক্ষমতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশেও চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি, মাছ ও মুরগির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। এর ফলে দেশে অতিরিক্ত প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বহু বছরের অর্জিত অগ্রগতি পিছিয়ে পড়ছে। সময়োচিত ও লক্ষ্যভিত্তিক নীতিগত পদক্ষেপ নেয়া না হলে এ সংকট লাখ লাখ শিশুকে আরো পিছিয়ে দেবে। এর ফলে দারিদ্র্য আরও বাড়বে এবং পরিবারগুলোর জন্য ঘুরে দাঁড়ানো আরো কঠিন হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে শিশুদের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা সেবা পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে ইউনিসেফ বিভিন্ন দেশের সরকার, দাতা দেশগুলোর সরকার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি কয়েকটি অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও শিশু সুরক্ষাসহ শিশুদের নির্ভরশীল সেবা ও সরবরাহব্যবস্থার জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা; শিশুবান্ধব নগদ সহায়তাসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ ও টেকসই করা; মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিশু ও পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে নিশ্চিত করতে ন্যূনতম সরকারি ব্যয় বজায় রাখা; স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় দেশীয় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজন হলে ঋণ পরিশোধ স্থগিত বা পুনর্গঠনের ব্যবস্থা গ্রহণ; পাশাপাশি শিশুদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলায় প্রস্তুতি ব্যবস্থা গড়ে তোলা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।
ক্যাথেরিন রাসেল বলেন, এই সংকট শিশুদের জীবন ও ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিশ্ব যদি দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সংঘাত, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও মূল্যবৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাব লাখ লাখ শিশুকে গভীর দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দেবে। এতে বহু বছরের কষ্টার্জিত উন্নয়ন অর্জনও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।










