দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনে বড় কোনো উদযাপন করার সুযোগ পায়নি
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। তবে গত শনিবার কর্ণাটকের বিধানসভার নির্বাচনী ফলাফলে সেই
উপলক্ষ্য এসে হাজির হয়েছে। রাজ্যটিতে ৪৩ শতাংশ ভোটের ব্যাপক জনসমর্থণ নিয়ে
ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) হারিয়ে রীতি মতো তাক লাগিয়ে দিয়েছে রাহুল
গান্ধির নেতৃত্বাধীন দলটি। এখন এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ক্ষমতাসীন দল
বিজেপির শক্তিশালী এ রাজ্যটি হাতছাড়া হওয়ায় অনেকে এটিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র
মোদীর পরাজয়ের সূচনা এবং কংগ্রেসের উত্থানের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখছেন।
কর্ণাটক রাজ্যে বিজেপিকে জেতাতে মরিয়া ছিলেন প্রধানমন্ত্রী
নরেন্দ্র মোদী। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অল্প সময়ের ব্যবধানে অনেক গুলো জনসভা
করেছেন। কংগ্রেসকে পরাজয়ের বার্তা শুনিয়েছিলেন তিনি। তবে তাঁর ম্যাজিকেও দক্ষিণী
রাজ্য আর রক্ষা হয়নি বিজেপির। ফলে বিজেপির এ পরাজয় খোদ নরেন্দ্র মোদীর পরাজয়
হিসেবেই অভিহিত করা হচ্ছে। এমনিতে বিজেপি কোনো নির্বাচনে জিতলে তার সব কৃতিত্ব হয়
মোদীর। তবে হারের ক্ষেত্রে দায় ওঠে রাজ্য নেতৃত্বের ঘাড়ে। কর্ণাটকের ক্ষেত্রেও তেমনটাই
হবে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। এ পরিস্থিতিতে আত্মসমীক্ষা শুরু হয়েছে দলটির
অভ্যন্তরে।
নির্বাচনের আগে বিজেপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেছিলেন, রাজ্যটিতে
কংগ্রেস জিতলে দলটির মনে এমন বিশ্বাস জাগবে যে তারা জিততে পারে। কেননা এর আগে
কংগ্রেস হিমাচল প্রদেশের ব্যতিক্রমী এক জয় ছাড়া খুব একটা সাফল্য পায়নি। এজন্য
কর্ণাটকে নতুনভাবে জেগে ওঠা স্বপ্ন এবং আত্মবিশ্বাসের অনুভূতি আগামী নির্বাচনে
একটি বড় পার্থক্য গড়ে তুলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশারদরা।
অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এ রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলের হারের পিছনে
বেশ কিছু কারণ খুঁজে বের করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। এতে মোটা দাগে
কয়েকটি বিষয় সামনে আসছে,
কর্ণাটকে কংগ্রেসের জয় কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি
কংগ্রেসের জন্য এটি অন্যান্য রাজ্যের নির্বাচনেও বিজয়ের সূচনা? একই
সঙ্গে এ জয় আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনে দলটির জোরালো অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি
না সে বিষয়টিও অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
এদিকে নির্বাচনে হেরে বিজেপি আত্মবিশ্লেষণে নেমেছে।
কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর পরাজয় স্বীকার করে পদত্যাগ
করেছেন মুখ্যমন্ত্রী বাসবরাজ বোম্মাই। বিজেপির এক সূত্র জানিয়েছে, ভোটগ্রহণের
অনেক আগেই তারা নির্বাচনে হেরে গেছে। দলটির নিজস্ব বিশ্লেষণে হারের কারণ হিসেবে
প্রাথমিকভাবে বিজেপির নেতৃত্বের জটিলতা, প্রচারণায় ভুল বার্তা, জনসম্পৃক্ততার
ঘাটতি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ওপর অত্যধিক নির্ভরতা এবং যথাযথ নেতৃত্বের
অনুপস্থিতির বিষয়গুলোকে দায়ী করা হয়েছে।
নেতৃত্বের জটিলতা
শুরুর দিকে কর্ণাটকের নির্বাচনে নতুন নেতৃত্বের অধীনে
বিজেপিকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এ জন্য ২০২১ সালের জুলাইয়ে দলের
হাইকমান্ড বিজেপির প্রবীণ নেতা এবং রাজ্যটির চারবারের মুখ্যমন্ত্রী বি এস
ইয়েদুরাপ্পাকে সরিয়ে বাসবরাজ বোম্বাইকে দায়িত্ব দেয়া হয়। অথচ ইয়েদুরাপ্পা
রাজ্যটিতে স্পষ্টতই একজন ভালো নেতা হিসাবে বিবেচিত ছিলেন। তবে অনেক চেষ্টা করেও
পরবর্তীতে বোম্মাই জনপ্রিয়তা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় বিজেপিকে ফের ইয়েদুরাপ্পার
কাছে ফিরতে বাধ্য হয়। এজন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে এ নির্বাচনের
প্রচারে ফিরে আসেন ইয়েদুরাপ্পা। এখানেই মূল জটিলতা তৈরি হয়। কেননা বিজেপি
নির্বাচনে জিতলে বোম্মাইকে ধরে রাখবে কি না, নাকি তার জায়গায় অন্য মুখ
নিয়ে সরকার চালাবে,
সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। এ অনিশ্চয়তা দলীয় কর্মীদের
মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে।
স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব
নির্বাচনে বিজেপি উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে তাদের প্রচারণার
রোডম্যাপ প্রস্তুত করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের প্রচারণার বার্তা আর সেরকমটা
থাকেনি। বেকারত্ব ও খাদ্য দ্রব্যের মূলস্ফীতির উদ্বেগ মোকাবিলায় বিজেপির কোন
বিশ্বাসযোগ্য কণ্ঠস্বর ছিল না। শুরুর দিকে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণায়
হিন্দুত্ববাদকে অন্তর্ভুক্ত না করার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ দিকে এটি স্পষ্ট হয়ে
উঠে।
যুক্তি-তর্কের ব্যর্থতা
কংগ্রেস যদিও নির্বাচনের অনেক আগেই বক্তব্য দিতে সক্ষম
হয়েছিল যে বিজেপি সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত। শাসক দল কার্যকরভাবে এটি প্রতিহত করতে
ব্যর্থ হয়েছে। দলীয় নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ বিজেপির পরাজয়ের কারণকে সঠিক সময়ে
কার্যকর প্রতিক্রিয়া জানাতে ব্যর্থতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। এছাড়া, কংগ্রেস
তাদের দুই শীর্ষ রাজ্য নেতা সিদ্দারামায়া এবং ডি কে শিবকুমারের মধ্যে মতভেদ
সত্ত্বেও একটি ঐক্যবদ্ধ ইউনিট গড়তে সক্ষম হয়েছিল।
মোদীর ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা
হিমাচল প্রদেশসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যের সাম্প্রতিক ফলাফল
দেখিয়েছে, রাজ্য ইউনিটের মধ্যে একতা ও দৃঢ়তা না থাকলে নির্বাচনে জয় লাভ সম্ভব না। প্রধানমন্ত্রী
নরেন্দ্র মোদী সব কাজ করে দিতে পারবেন না। নির্বাচনের আগে রাজ্যের বিজেপি নেতারা
নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করার জন্য নরেন্দ্র মোদীর আগমনের অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু
গত বছরের নভেম্বরের হিমাচল নির্বাচনের মতো কর্ণাটকের নির্বাচনও প্রমাণ করেছে, ‘মোদি
ম্যাজিক’ কেবল তখনই কার্যকর হবে যখন রাজ্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে।
দলটি নির্বাচনী অডিও ভিজ্যুয়াল ক্যাম্পেইনে রাজ্য নেতাদের
সফলতা তুলে ধরার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের প্রচার করেছে।
এসব প্রচারণায় মোদীর জনপ্রিয়তাই তুলে ধরা হয়েছে। দলটি ভোটারদের কাছে সঠিক বার্তা
পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। কেননা কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নির্বাচনের মধ্যে পার্থক্যের
বিষয়টি বিজেপির প্রচারণায় বিবেচনা করা হয়নি।
তৃণমূল নেতাদের অনুপস্থিতি
বিশ্বাসযোগ্য তৃণমূল পর্যায়ের রাজ্য নেতৃত্বের অনুপস্থিতি
কর্ণাটকে বিজেপির জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে কমিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
ইয়েদুরাপ্পা ছাড়া দলের অন্য কোনো নেতা প্রচারণায় ছিল না। তবে, যেহেতু
ইয়েদুরাপ্পা নিজে এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি, তাই প্রচারণায় ভোটারদের
বা কর্মীদের আস্থা যোগানো সম্ভব হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এরকম বহু
চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে বিজেপি। ২০১৪ সাল থেকে উত্তরপ্রদেশ এবং আসাম ছাড়া
অন্য রাজ্যে শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারছে না দলটি। এমনকি রাজ্যের দলীয়
নির্বাচনী প্রচারণা ও কৌশলসমূহেও থাকতে হয় নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতি। প্রচারণাগুলোও
হয় ক্ষমতাসীন এ নেতার বিভিন্ন উদ্যোগকে কেন্দ্র করেই।










