ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, জাতিসংঘের অগোচরে দীর্ঘদিন ধরে তিনটি স্থানে গোপনে পরমাণু কার্যক্রম পরিচালনা করেছে ইরান।
আইএইএর ৩৫ সদস্য দেশের সমন্বয়ে তৈরি প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইরান ‘লাভিজান-শিয়ান’, ‘ভারামিন’ ও ‘তুরকুজাবাদ’ নামের তিনটি কেন্দ্রে পরমাণু গবেষণা চালিয়েছে। অথচ এসব কেন্দ্রের অস্তিত্বই এতদিন অস্বীকার করে এসেছে তেহরান। লাভিজান-শিয়ানে ২০০৩ সালে নিউট্রন তৈরির চেষ্টা চালিয়েছে দেশটি। আর তুরকুজাবাদে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সংরক্ষিত ছিল পরমাণু পদার্থ ও তীব্রভাবে দূষিত যন্ত্রপাতি। পাশাপাশি, দুইটি কেন্দ্রে ইউরেনিয়ামের চিহ্ন মিললেও ইরান এখনো তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। কেন্দ্র তিনটি পরিদর্শনের অনুমতিও দিচ্ছে না ইরান।
প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, ইরান বর্তমানে ৬০ শতাংশ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে—যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রয়োজনীয়র খুব কাছাকাছি। এখন দেশটির কাছে প্রায় ৪০৮ দশমিক ৬ কেজি উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম আছে যা অস্ত্রমান পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হলে অন্তত নয়টি পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী এসব কর্মকান্ড সংগঠিত ও অঘোষিত পারমাণবিক কর্মসূচির অংশ, যা ইরান বহু বছর ধরে গোপনে পরিচালনা করেছে। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইরানকে অভিযুক্ত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে পশ্চিমা দেশগুলো। এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি একটি খসড়া প্রস্তাবও তৈরি করেছে, যা পাশ হলে ইরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির লঙ্ঘনকারী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হবে।
তেহরান অবশ্য এই প্রতিবেদনকে সরাসরি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে আখ্যা দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পরমাণু সংস্থা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, আইএইএ যদি ইরানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে তারা ‘উপযুক্ত জবাব’ দেবে। তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি একান্তই শান্তিপূর্ণ।
এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। ওমানের মধ্যস্থতায় ইরানের কাছে পারমাণবিক চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র। জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের অধিকারের ভিত্তিতে এ প্রস্তাবের জবাব দেয়া হবে বলে জানিয়েছে তেহরান।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার ইঙ্গিত থাকলেও, এখনো নির্ধারিত হয়নি তারিখ বা ভেন্যু। তবে আইইএর এই নতুন প্রতিবেদন ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর কূটনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে ইরানের পরমাণু ভবিষ্যৎ আবারো এক অনিশ্চয়তার মুখে। যা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই নাড়িয়ে দিতে পারে।









