ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই তীব্র শ্রমিক সংকটে পড়েছে রাশিয়া। সংকট মোকাবেলায় উত্তর কোরিয়ার হাজার হাজার নাগরিককে দাসপ্রথার মতো শর্তে রাশিয়ায় কাজ করতে পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ক্ষেপণাস্ত্র, গোলাবারুদ ও সৈন্য ব্যবহার করে মস্কো বহুবার পিয়ংইয়ংয়ের সাহায্য নিয়েছে। বর্তমানে রাশিয়ার বহু পুরুষ নিহত বা যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় দেশটির নির্মাণ, আইটি ও পোশাক খাত উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করছে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়া থেকে পালানো ছয়জন উত্তর কোরিয়ান শ্রমিক, সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক ও শ্রমিকদের উদ্ধারে সহায়তাকারীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বিবিসি জানিয়েছে, মস্কোতে ‘দুর্বিষহ’ পরিবেশে কাজ করছেন উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকরা। কর্মস্থল থেকে পালানো ঠেকাতে তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে উত্তর কোরিয়ার প্রশাসন।

শ্রমিকদের একজন বলেন, রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যে নেমেই এক উত্তর কোরিয়ান নিরাপত্তা কর্মকর্তা তাকে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি নির্মাণস্থলে নিয়ে যান। কর্মস্থল সম্পর্কে কাউকে কিছু না বলতে বা কিছু না দেখতে নির্দেশনা দেয়া হয়। এরপর থেকে উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক নির্মাণে ১৮ ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করতেন তিনি। বিবিসি যে ছয়জনের সঙ্গে কথা বলেছে তারা প্রত্যেকেই একই রকম শাস্তিমূলক কর্মদিবস বর্ণনা করেছেন। ভোর ৬টায় উঠে পরদিন রাত ২টা পর্যন্ত কাজ করতেন তারা। বছরে ছুটি মাত্র দুইদিন।

ক্লান্তিতে শ্রমিকদের অনেকে কাজ ছেড়ে পালিয়ে যেত বা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ত, কিন্তু সুপারভাইজাররা ধরে তাদের পেটাত। তাদের জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ।

পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করে দক্ষিণ কোরিয়ার দোং-আ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাং দং-ওয়ান বলেন, ‘পরিস্থিতি ভয়াবহ’। একাধিকবার রাশিয়ায় গিয়ে উত্তর কোরিয়ান শ্রমিকদের সাক্ষাৎকার নেয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘শ্রমিকরা ভীষণ বিপজ্জনক অবস্থায় কাজ করেন। রাতে আলো নিভিয়ে দেয়া হয়, তারা অন্ধকারে অল্প কিছু সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে কাজ করে।’

পালিয়ে আসা শ্রমিকরা জানান, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের এজেন্টদের নজরদারিতে দিন-রাত নির্মাণস্থলে আটকে থাকতে হয়। পোকায় ভর্তি নোংরা শিপিং কনটেইনারে গাদাগাদি করে ঘুমোতে হয়। প্রচণ্ড ঠান্ডায় শীত নিবারণে ব্যবহার করা হয় ত্রিপল।

২০১৯ সালে উত্তর কোরিয়ার শ্রমিক বিদেশে পাঠানোয় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জাতিসংঘ। অভিযোগ আছে, শ্রম খাতের এই বৈদেশিক আয় দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে কিম জং উনের সরকার।

বিবিসিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণ কোরিয়ান এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত বছরই ১০ হাজারের বেশি শ্রমিক রাশিয়ায় পাঠিয়েছে উত্তর কোরিয়া। এব বছর আরো বেশি শ্রমিক পাঠানো হবে, সংখ্যায় যা হতে পারে ৫০ হাজারেরও বেশি।

রাশিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ১৩ হাজারের বেশি উত্তর কোরিয়ান দেশটিতে প্রবেশ করেছে। যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১২ গুণ বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৮,০০০ জন শিক্ষার্থী ভিসায় প্রবেশ করেছে। কিন্তু গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর একটি কৌশল।

উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের শিগগিরই রাশিয়ান অধিকৃত ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড পুনর্নির্মাণ প্রকল্পেও পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা। এর সত্যতা পাওয়া গেছে রাশিয়ার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সের্গেই শোইগু-য়ের বক্তব্যে। গত জুনে তিনি জানিয়েছেন, পাঁচ হাজার উত্তর কোরিয়ানকে কুর্স্ক পুনর্নির্মাণে পাঠানো হবে।

সিউলের কুকমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও উত্তর কোরিয়া-রাশিয়া সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই লানকভ জানিয়েছেন, রাশিয়ায় এখন তীব্র শ্রমিক সংকট, আর উত্তর কোরিয়ানরা সেরা সমাধান—তারা সস্তা, কঠোর পরিশ্রমী ও সমস্যা সৃষ্টি করে না। উন্নত জীবনের প্রলোভন ও দমননীতি প্রয়োগ করে সবচেয়ে বিশ্বস্ত পুরুষদের কঠোর যাচাই-বাছাই শেষে রাশিয়ায় পাঠানো হয়।

কিন্তু শ্রমিকদের আয়ের বড় অংশই ‘নিষ্ঠা ফি’ হিসেবে সরাসরি উত্তর কোরিয়ান রাষ্ট্রের কাছে চলে যায়। অবশিষ্ট সামান্য অংশ—সাধারণত মাসে ১০০-২০০ ডলার একটি খাতায় নথিভুক্ত হয়। দেশে ফেরার আগে সেই পারিশ্রমিকও হাতে পান না শ্রমিকরা।

অবস্থা ও কম আয়ের কথা জানার পর অনেক শ্রমিক মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় আশ্রয় নেয় অনেকে।

তবে পালানো ঠেকাতে উত্তর কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি শ্রমিকদের সীমিত স্বাধীনতার ওপর আরো দমননীতি আরোপ করেছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। কিম জং উনের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করতে শ্রমিকদের নিয়মিত বাধ্যতামূলক কর্মশালায় অংশ নিতে হয়। আগে মাসে একবার দলবেঁধে ছুটি কাটাতে যেতে পারতেন শ্রমিকরা। পালানো ঠেকাতে বর্তমানে সেই সুযোগও সীমিত করা হয়েছে।