ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সিএনএনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের সক্ষমতার কথা জানান তিনি।

বর্তমানে ২০২৪ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রচারণা চালাচ্ছেন এ রিপাবলিকান নেতা। গত মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের মনোভাব ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহানুভূতিশীল। এজন্য এমন মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের মাঝে বিভিন্ন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

২০১৮ সালে ফিনল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার শীর্ষ সম্মেলন। এর পর থেকেই পুতিনের বিরুদ্ধে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের বিভিন্ন অভিযোগ উপেক্ষা করতে থাকেন ট্রাম্প। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে রুশ প্রেসিডেন্টের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন নির্দ্বিধায়। ওই সময়ে এফবিআইয়ের বিপক্ষে গিয়ে পুতিনের ওপর আস্থা দেখিয়েছেন ট্রাম্প।

এখন ট্রাম্প যদি হোয়াইট হাউজে ফিরে আসেন, তবে ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করবে বলে অনুমান বিশ্লেষকদের। ট্রাম্পের পুনরুত্থানের মধ্য দিয়ে রাশিয়ার প্রতি পুরনো ইতিবাচক মনোভাব মার্কিন নীতির চালিকা শক্তি হিসেবে ফিরে আসতে পারে।

সিএনএনের আয়োজিত ইভেন্টে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যে পুতিনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে। সাবেক এ প্রেসিডেন্ট ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন বলেছেন, কিন্তু কীভাবে করবেন সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। এছাড়া যুদ্ধে ইউক্রেনকে জয়ী করতে চান কি না সে বিষয়েও কোনো মন্তব্য করেননি। তবে এ যুদ্ধে সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের খরচ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের নিজেদের জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্রভাণ্ডার নেই। অনেক কিছুই এ যুদ্ধে দিয়ে দিচ্ছি।’ ইউরোপীয় দেশগুলোর যথেষ্ট অবদান না রাখার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন কংগ্রেস যদিও ইউক্রেনের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সহায়তার অনুমোদন দিয়েছে। যা দীর্ঘ সময় ধরে সরবরাহ করা হবে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরলে কার্যনির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে সেই সহায়তা কমিয়ে দিতে পারেন। এমনকি বন্ধও করতে পারেন। বিশ্লেষকরদের এমন আশংকা কিছুটা বাস্তবিক। কেননা কংগ্রেসে অনুমোদিত সামরিক সহায়তা বাতিলের নজির এর আগেও তিনি দেখিয়েছেন।

ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় রিপাবলিকান কয়েকজন নেতা অবশ্য তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তবে তার মন্তব্যের মধ্যে অনেকেই বাস্তবতা খুঁজে পেয়েছেন। সমালোচকরা বলছেন, যদি ট্রাম্প নির্বাচিত হন, তবে যুদ্ধ প্রচেষ্টায় মার্কিন সহযোগিতার সম্পূর্ণ অবসানও ঘটতে পারে। কমপক্ষে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের ইউক্রেনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের ঐক্যবদ্ধ জোট সম্ভবত ব্যাপকভাবে কমে যাবে।

এদিকে যুক্তরাজ্য ইউক্রেনকে সহযোগিতার ক্ষেত্রে সম্প্রতি দীর্ঘ পরিসরের ক্ষেপণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত করেছে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়ার আলোচনা সেখানে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়ঙ্গার বিবিসিকে বলেন, “ট্রাম্প যদি অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেন, তবে রাশিয়ার শর্তানুযায়ী যুদ্ধ শেষ হবে। পশ্চিমাদের জন্য যা হবে অত্যন্ত দুঃস্বপ্নময়। পুতিনের ইউক্রেন অভিযানের সময় কোনো ‘প্ল্যান বি’ ছিল না। কিন্তু ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি হচ্ছে তার জন্য ‘প্ল্যান বি’-এর অপেক্ষা।”

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, যুদ্ধের শুরু থেকেই ইউক্রেনে আমেরিকান সাহায্যের প্রতি জনসাধারণের সমর্থন কমতে শুরু করেছে। সম্প্রতি পিউ রিসার্চ জরিপে দেখা গেছে, এমন আমেরিকানদের সংখ্যা বেড়েছে যাদের বিশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রের এখন অভ্যন্তরীণ সমস্যার প্রতি বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত।

নিউ হেভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল সিকিউরিটি বিভাগের অধ্যাপক জেফরি ট্রিয়েস্টম্যান বলেন, ‘মার্কিন সহযোগিতা প্রত্যাহারের ফলে রাতারাতি যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাবে কি না সেটি স্পষ্ট নয়। ইউক্রেনীয়রা কৃতিত্বের সঙ্গে রুশদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। অপ্রতুল সহায়তা নিয়েই রুশ আগ্রাসন প্রতিহত করার অবিশ্বাস্য মনোবল দেখিয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি সাহায্য বন্ধ করে দেয় তবুও ইউক্রেন যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে এবং এটি দীর্ঘস্থায়ী হবে।’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পরদিনই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বিবিসিকে জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচন নিয়ে তার কোনো ভয় নেই। যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেনের সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনাও উপেক্ষা করেন তিনি। ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘মার্কিন নির্বাচন এখনো এক বছর বাকি। কে জানে আমরা তখন কোন পরিস্থিতিতে থাকব। আমি বিশ্বাস করি, ততদিনে আমরা বিজয়ী হব। সুতরাং, এর পরে যা হয় দেখা যাবে।’