সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে বিদ্রোহী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের দেশ ত্যাগের খবরের মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় শেষ হচ্ছে তার দীর্ঘ সময়ের শাসন। বিদ্রোহীরা মাত্র দুই সপ্তাহের অভিযানের মধ্য দিয়ে এই সাফল্য অর্জন করেছে। বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে রয়েছে হায়াত তাহরির আল-শাম নামে সশস্ত্র ইসলামি গোষ্ঠী।
তারা প্রথমে সিরিয়ার উত্তরের শহর আলেপ্পো দখল করে। পরে হোমস ও হামা অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়। দক্ষিণ সিরিয়ার দেরা অঞ্চলেও বিদ্রোহীরা বড় ধরনের সফলতা অর্জন করেছে। বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে, সিরিয়ার সামরিক বাহিনী তাদের দখলে থাকা দুর্গগুলো ত্যাগ করে বা বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে।
হায়াত তাহরির আল-শাম কারা?
বিদ্রোহী আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছে হায়াত তাহরির আল-শাম বা এইচটিএস নামের একটি ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী। এইচটিএস জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত।
এইচটিএস-এর শুরু হয় ২০১১ সালে জাবহাত আল-নুসরা নামে। যা সরাসরি আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই গোষ্ঠীর গঠনে ইসলামিক স্টেট বা আইএস-এর নেতা আবু বকর আল-বাগদাদিও ভূমিকা রেখেছিলেন। এটি আসাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা সবচেয়ে শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল।
২০১৬ সালে এইচটিএস-এর নেতা আবু মোহাম্মদ আল-জওলানি আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। পরে তিনি জাবহাত আল-নুসরা ভেঙে একটি নতুন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। যা এইচটিএস নামে পরিচিত হয়।
সংগঠনটি সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইদলিব প্রদেশে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তারা সেখানে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকাও পালন করছে। যদিও তাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
সিরিয়ায় যুদ্ধের পটভূমি
২০১১ সালের মার্চ মাসে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর দেরায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর গণআন্দোলনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এই বিক্ষোভ গণতন্ত্রের দাবিতে গড়ে ওঠে। আসাদ সরকার এই বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক হামলা ও প্রাণঘাতী অস্ত্রও ব্যবহার করে। প্রেসিডেন্ট আসাদ এই আন্দোলনকে বিদেশী মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদ বলে উল্লেখ করেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে শত শত বিদ্রোহী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এর সঙ্গে যোগ দেয় ইসলামিক স্টেট। পরে এটি পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক আক্রমণ
সিরিয়ার যুদ্ধ বিগত চার বছর ধরে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। বড় শহরগুলোতে আসাদ সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবে কিছু অংশে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল, বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমে ইদলিব এবং দক্ষিণে দেরা অঞ্চলে।
সম্প্রতি এইচটিএস আলেপ্পো শহর দখল করে। এই শহরটি আসাদ সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর একটি। এরপর বিদ্রোহীরা দ্রুত দক্ষিণের হামা এবং হোমস অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। যা শেষ পর্যন্ত আসাদের পতন ত্বরান্বিত করে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি আসাদের সেনারা। প্রেসিডেন্ট আসাদ দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া এবং ইরানের সমর্থন পেয়ে আসছেন। সম্প্রতি ইউক্রেন নিয়ে বেশি ব্যস্ত রাশিয়া। মস্কো থেকে সাহায্য বলতে গেলে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। অন্যদিকে ইরানি সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের সহায়তায় আসাদ তার শাসন টিকিয়ে রেখেছিলেন। এই মিলিশিয়াদের মধ্যে অন্যতম হলো হিজবুল্লাহ। সম্প্রতি ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় তাদের কাছ থেকেও সহায়তা পাচ্ছিলেন না আসাদ। এছাড়া ইসরায়েল সিরিয়ায় ইরানি মিলিশিয়া এবং হিজবুল্লাহর ওপর আক্রমণ জোরদার করেছে। এসব আক্রমণে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সরবরাহ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে আসাদ বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ায় বিদ্রোহীরা বড় ধরনের সুযোগ পায়। যা শেষ পর্যন্ত পতন ঘটিয়েছে বাশার আল আসাদের দীর্ঘ দুই যুগের শাসনের।










