মাঝআকাশে থাকা উড়োজাহাজে হঠাৎই বিস্ফোরণের বিকট শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে কেবিনের বাতাসের চাপ কমে যায়, মুখের সামনে নেমে আসে অক্সিজেন মাস্ক। রীতিমত আপদকালীন পরিস্থিতি। যাত্রীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখতে পান, এক সহযাত্রী জানালা দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছেন। তবে পাশে থাকা স্ত্রী আর সহযাত্রীদের সহায়তায় প্রাণ বেঁচে গেলেন তিনি। তবে ততক্ষণে দ্রুত গতিতে উচ্চতা হারানো উড়োজাহাজটি অনেকটা নিচে নেমে গেছে।

সম্প্রতি ভয়াবহ এ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইটের যাত্রীরা। স্থানীয় সময় শুক্রবার সকালে গ্রিসের থেসালোনিকি থেকে জার্মানির মেমিংগেনের উদ্দেশে উড্ডয়নের প্রায় ১০ মিনিট পরই উড়োজাহাজটিতে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় সেটি মূহুর্তেই প্রায় ৯ হাজার ফুট নিচে নেমে আসে।

আইরিশ বিমান সংস্থাটি জানিয়েছে, ফ্লাইটটি উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই ফিরে আসে। মাঝ আকাশে যাত্রীদের আসনের পাশের একটি জানালা স্থানচ্যুত বা আলগা হয়ে যাওয়ায় এ জরুরি অবতরণ করতে হয়।

তারা আরো জানায়, উড়োজাহাজটি স্বাভাবিকভাবেই অবতরণ করেছে এবং যাত্রীদের টার্মিনালে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। একজন যাত্রী থেসালোনিকি বিমানবন্দরেই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। পরবর্তীতে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য কয়েক ঘণ্টা পর একটি বিকল্প উড়োজাহাজের ব্যবস্থা করা হয়।

গ্রিসের একটি হাসপাতালের কর্মকর্তা মাইকেলিস জিয়ানাকোস জানান, আহত যাত্রী একজন ৬১ বছর বয়সী সার্বিয়ান নাগরিক। মাঝআকাশে বাতাসের তীব্র চাপের কারণে তিনি জানালার বাইরে ছিটকে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে তার পা চেপে ধরে রাখেন। পরবর্তীতে অন্য যাত্রীদের সহায়তায় তাকে ভেতরে টেনে আনা সম্ভব হয়। বর্তমানে ঘর্ষণজনিত ক্ষতের (ফ্রিকশন বার্ন) কারণে হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে।

উড়োজাহাজটিতে থাকা ক্রিস্টিনা নামের যাত্রী স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, হঠাৎ জানালার কাচ ভেঙে যাওয়ায় আমরা বুঝতে পারি, কেবিনের ভেতরের বায়ুচাপ তীব্রভাবে কমে গেছে (ডিকম্প্রেশন)। চারদিকে চিৎকার শুরু হয়ে যায়। অক্সিজেনের মাস্কগুলো নিজে থেকেই নেমে আসে এবং একটি তীব্র গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। আহত ওই যাত্রীর মাথা ও কাঁধ জানালার বাইরে চলে গিয়েছিল। সৌভাগ্যবশত তিনি সিট বেল্ট বাঁধা অবস্থায় ছিলেন।

সোফিয়া নামের আরেক যাত্রী জানান, ডিকম্প্রেশনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে আমাদের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আহত ব্যক্তিটি রক্তাক্ত অবস্থায় ছিলেন এবং শক ও অক্সিজেনের অভাবে বার বার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন।

যাত্রীদের অভিযোগ, উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের কোনো একটি অংশ ছিটকে এসে জানালাটি ভেঙে ফেলেছে। যদিও রায়নাআয়ার কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। জানা গেছে, ১৮ বছরের পুরনো এ উড়োজাহাজ পরিচালনা করছিল রায়নাআয়ারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘মাল্টা এয়ার’।

থেসালোনিকি বিমানবন্দর পরিচালনাকারী সংস্থা ফ্রাপোর্ট গ্রিস জানিয়েছে, ঘটনাটি বর্তমানে হেলেনিক এয়ার অ্যান্ড রেল সেফটি ইনভেস্টিগেশন অথরিটি তদন্ত করছে। পাশাপাশি আইরিশ এভিয়েশন অথরিটিও (আইএএ) তদন্তকারীদের সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত এয়ারলাইন পাইলট ক্রিস ব্র্যাডি বলেন, ওই যাত্রীর সিট বেল্ট বাঁধা না থাকলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারত। এ কারণেই আমরা পাইলটরা সবসময় সিট বেল্ট সাইন বন্ধ থাকার পরও যাত্রীদের সিট বেল্ট বেঁধে রাখার পরামর্শ দিই।

এর আগে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ইঞ্জিনের ধ্বংসাবশেষ ছিটকে এসে জানালা ভেঙে যাওয়ার পর এক নারী যাত্রী বাইরে ছিটকে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন।