ওয়াশিংটনের দাবি, দক্ষিণ ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ও হরমুজ প্রণালিতে মাইন পেতে যাওয়ার চেষ্টা করা নৌযানকে লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টকম জানিয়েছে, হামলাগুলো ছিল ‘আত্মরক্ষামূলক’। এ অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের সুরক্ষার জন্য অভিযান পরিচালিত হয়েছে। তবে তেহরান একে যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে পাল্টা জবাব দেয়ার অধিকার রয়েছে বলে সতর্ক করেছে। নতুন এ হামলার ফলে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এবং সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে আবারো অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি বাজারে আবারো অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

সোমবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর মঙ্গলবার সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, হরমোজগান প্রদেশ ও বন্দর আব্বাস এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পরে সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেন, ইরানি বাহিনীর ‘হুমকি’ মোকাবেলায় মার্কিন বাহিনী দক্ষিণ ইরানে হামলা চালিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানি নৌযানগুলো হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপনের চেষ্টা করছিল এবং কাছাকাছি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র সংযম দেখাচ্ছে, তবে নিজেদের সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

বন্দর আব্বাস ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে অবস্থিত। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ এ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। জ্বালানি ছাড়াও খাদ্য, সার ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে শুরু করে।

সাম্প্রতিক হামলার পর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি যুদ্ধবিমান ও আরেকটি ড্রোন লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। যদিও কখন এ ঘটনা ঘটেছে তা স্পষ্ট করা হয়নি। একই সঙ্গে আইআরজিসি বলেছে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের যেকোনো ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার ‘বৈধ ও নিশ্চিত অধিকার’ ইরানের রয়েছে।

এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি হজ উপলক্ষে দেয়া এক বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কয়েক মাস আগে ইসরায়েলি হামলায় নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তিনি প্রকাশ্যে খুব কমই দেখা দিয়েছেন। গতকাল দেয়া বার্তায় তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য আর কখনো মার্কিন ঘাঁটির নিরাপদ ঢাল হয়ে থাকবে না। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিনই তার আগের প্রভাব ও অবস্থান হারাচ্ছে।

যদিও যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তেজনা বাড়ছে, তবুও কূটনৈতিক আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, সমঝোতা এখনো সম্ভব এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনায় অগ্রগতি হতে পারে। ভারত সফরকালে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আলোচনায় বিভিন্ন ধারা ও ভাষা নিয়ে টানাপড়েন চলছে এবং সমাধানে কয়েকদিন সময় লাগতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি ‘ভালো চুক্তি’ করতে চান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

একই সঙ্গে রুবিও কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি যেকোনো পরিস্থিতিতেই খোলা রাখতে হবে। তার ভাষায়, ‘একভাবে বা অন্যভাবে প্রণালি খোলা থাকবে’ তিনি ইরানের পদক্ষেপকে বেআইনি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অগ্রহণযোগ্য বলে বর্ণনা করেন।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অবশ্য জানিয়েছেন, আলোচনায় বেশকিছু বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু চুক্তি সই একেবারে আসন্ন—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। আলোচনায় যে সমঝোতা স্মারক নিয়ে কথা হচ্ছে, তাতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি এখনো গোপন স্থানে অবস্থান করছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার সঙ্গে দূতদের যোগাযোগ জটিল হয়ে পড়ায় আলোচনার গতি ধীর হয়ে গেছে। ধারণা করা হয়, তিন মাস আগে যুদ্ধের প্রথম দিনে চালানো ইসরায়েলি হামলায় তিনি আহত হয়েছিলেন।

আলোচনার সবচেয়ে জটিল অংশগুলোর একটি হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল। অস্ত্রমানের ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণের জন্য এটি খুবই ছোট ধাপ দূরে রয়েছে। ফলে পশ্চিমা দেশগুলো আশঙ্কা করছে, তেহরান চাইলে দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্থানীয় সময় সোমবার রাতে বলেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হয় দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে হবে অথবা ইরানের সহযোগিতায় সেগুলো সেখানেই ধ্বংস করতে হবে। তবে ইরান এখনো প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

যুদ্ধ ও কূটনীতির এ দ্বৈত বাস্তবতার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলার ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত আবারো ছড়িয়ে পড়লে জ্বালানি তেলের দাম ফের ১০০ ডলার অতিক্রম করতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজার এখনো বিশ্বাস করছে যে শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া হবে। তবে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। শেয়ারবাজারেও তার প্রভাব দেখা গেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার বেশির ভাগ শেয়ারবাজারে সূচক কমেছে, ডলারের মান কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে।

গত ৮ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে উভয় পক্ষই সামরিক উপস্থিতি ও চাপ বজায় রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ জোরদার করেছে, অন্যদিকে ইরান উপসাগরীয় জলপথে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। ফলে সামান্য উসকানিও যে আবার পূর্ণমাত্রার সংঘাতে রূপ নিতে পারে, সেই আশঙ্কা এখনো কাটেনি।