ময়না (আমিরুল ইসলাম চৌধুরী) আমার অন্তরঙ্গ বাল্যবন্ধুদের একজন। আমরা দুজনেই অশীতিপর—আমি ছিয়াশি ময়না পঁচাশি।
আমাদের পরিচয় ১৯৫৩ সালে যখন আমরা দুজনেই পুরান ঢাকার নওয়াবপুর সরকারি হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। আমি অবশ্য সেখানে ১৯৫১ সাল থেকে। ময়না ময়মনসিংহ থেকে এসে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। আমার মতোই ছোটখাটো বালক, তবে সুবেশী ও স্মার্ট। এর সঙ্গে সে বছর আমাদের ক্লাসে আরো যুক্ত হয়েছিল ময়নার পুরনো সহপাঠী পিন্টু, পরবর্তীকালের প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার কেএস নবী। এরা দুই বন্ধু প্রথম থেকেই ক্লাসে পাশাপাশি বসত এবং অনবরত গল্প করত, একদিন ইংরেজির শিক্ষক পলিকাপ ডরেস স্যার ধমকের সুরে বললেন, ‘তোমরা সামনের দিন থেকে আলাদা জায়গায় বসবে।’ নবীর চকিত উত্তর ‘কি যে বলেন স্যার, আমরা আগের স্কুলেও পাশাপাশি বসতাম, আমরা এক সঙ্গেই বসব।’ ওই বয়সের ছেলের এমন উত্তর শুনে স্যার রীতিমতো অপ্রস্তুত, কথা বাড়ালেন না। নবীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুই ছিল। আমারও বন্ধু ছিল নবী, যেমন ছিল হিরু (ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন)। ময়না জজ সাহেবের ছেলে, যুক্তিতর্কে সেও নবীর মতো ভীষণ স্মার্ট। অনেক বছর পর, আমরা তখন দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র (১৯৫৯), ময়না ছাত্রশক্তির নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, তাদের শিল্প ও সংস্কৃতি পরিষদের একটি স্মরণিকা প্রকাশের দায়িত্বে ছিল, সে প্রেসে কাজ দেখছিল, আমিও ছিলাম তার সঙ্গে, কী নিয়ে বিতর্কে প্রেস ম্যানেজার ময়নাকে আইনের ভয় দেখাচ্ছিল, ময়নার শাণিত উত্তর, ‘আমাকে আইন দেখাবেন না, আমি জজের ছেলে।’ ভদ্রলোক তাকে আর ঘাঁটালেন না। ময়না আগাগোড়াই স্পষ্টবাদী ও সাহসী। পরবর্তীকালে তার সাহসিকতার এক বড় দৃষ্টান্ত, ১৯৯৬ সালে ময়নাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল শেয়ার মার্কেটের অনিয়ম তদন্ত করার কাজে নেতৃত্বের জন্য। আমিরুল ইসলাম চৌধুরী ও তার কমিটি যথার্থ দোষীদের শনাক্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছিল। তৎকালীন রাঘববোয়ালেরা চিহ্নিত হয়েছিল। ময়নার ওপর হুমকিধামকিও এসেছিল। তাতে তার কোনো বিকার ছিল না।
আমি ও ময়না স্কুল (১৯৫৩-৫৬), ঢাকা কলেজ (১৯৫৬-৫৮) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৮-৬২), তিন পর্বেই সতীর্থ বন্ধু ছিলাম। হরিহর আত্মা বলতে যা বোঝায়, সে রকমই ছিল সম্পর্ক। আমাদের আরেক বন্ধু শাহাবুদ্দিন মাহমুদ (মনু) একই ধারার বন্ধু। মনু অকালে বিদায় নিয়েছে। আমরা তিনজন ঢাকা কলেজে খুবই ঘনিষ্ঠ সময় কাটিয়েছি, তিনজনই ছিলাম ‘জিওগ্রাফি’ ধারায়। আমি ও মনু বিজ্ঞানে, ময়না কলা শাখায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ছিল ভূগোলে অনার্স, সাবসিডিয়ারি অর্থনীতি ও ইতিহাস, ময়নার অর্থনীতিতে অনার্স ও ভূগোল ও ইতিহাসে (বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে) সাবসিডিয়ারি। শাহাবুদ্দিন ছিল বিএসসি পাস কোর্সে, ভূগোলসহ। অর্থাৎ ‘ভূগোল’ আমাদের কমন বিষয়। পরবর্তী পেশাগত জীবনে ভূগোল বিশেষ করে নগর ভূগোল, নগর অর্থনীতি ও নগর পরিকল্পনা ও গবেষণা আমাদের তিনজনের প্রিয় বিচরণ এলাকা।
ময়না ও আমি দীর্ঘ সময় যুক্ত রয়েছি আমার প্রতিষ্ঠিত নগর গবেষণা কেন্দ্র বা Centre for Urban Studies (CUS)-এর সঙ্গে। কেন্দ্রের সব কার্যক্রমে ময়না ছিল আমার একান্ত সহযাত্রী। এর গবেষণা, সেমিনার ও সম্মেলন আয়োজন, প্রকাশনা ইত্যাদি সবকিছুতেই ময়নার সাহায্য ও সমর্থন ছিল (বা এখনো আছে) আমার শক্তি।
সিইউএসের গুরুত্বপূর্ণ বড় মাপের গবেষণা প্রকল্প The Urban Poor in Bangladesh, Urban Governance অথবা Urban Land Management in Bangladesh ইত্যাদি সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না ময়না পাশে না থাকলে। মনে পড়ছে, ‘আরবান পুওর ইন বাংলাদেশ’ গবেষণা প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন লেখার সমাপ্তি পর্বে আমরা দুজন এনেক্স ভবনে আমার অফিস কক্ষে বসে সারা রাত কাজ করেছি, শেষ করে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি আলো ঝলমল সকাল। সালটি ছিল ১৯৯০, অর্থাৎ আজ থেকে ৩৫ বছর আগে। আমাদের কাজে তখন যেসব মেধাবী তরুণ সহায়তা করেছিল তাদের একজন বর্তমানে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহ-উপাচার্য (ড. মো. আবদুর রব খান)।
ময়না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ সম্পন্ন করে ১৯৬৩ সালে (নির্ধারিত সময়ের এক বছর পর; শ্রেয়তর ফলাফলের স্বার্থে এক বছর ড্রপ দিয়েছিল)। পরে Ph.D করে ওয়েলসের Aberys twyth University থেকে মিউনিসিপ্যাল ফাইন্যান্সের ওপর। বেশ কয়েক বছর পর ভারতের নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটিতে এক বছর ‘পোস্টডক্টরাল রিসার্চ’ করেছিল ভারত ও বাংলাদেশের পৌর অর্থ ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণে।
ময়নার গবেষণার মান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে যে বিষয়টির দিকে তার অনাগ্রহ তা হলো গবেষণানির্ভর প্রকাশনা। আমি আনন্দিত যে আমার ও আমিরুল ইসলাম চৌধুরীর যুগ্ম সম্পাদনায় একটি উল্লেখযোগ্য সংকলন Urban Land Management in Bangladesh প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯২ সালে।
ময়না লিখেছে কম কিন্তু তার প্রতিটি প্রবন্ধই গুণমানে উচ্চ, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে তার লেখা। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় ময়না অত্যন্ত সাবলীল। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করতে হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আমিরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্ব ছিল দৃষ্টান্তমূলক।
আমিরুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বন্ধু ময়না ও আমি দুজনে একসঙ্গে নানা ক্ষেত্রে বিচরণ করেছি। পরিণত বয়সে আমরা উভয়ে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে খুব একাগ্রভাবে জড়িত ছিলাম। বন্ধু ইতিহাসবিদ ড. সিরাজুল ইসলামের সভাপতির দায়িত্ব পালন শেষে আমি সভাপতি ছিলাম ২০১২-১৩ কার্যকালে, ময়না ছিল পরবর্তী সভাপতি, পরপর দুই কার্যকালের জন্য ২০১৪-১৭ পর্যন্ত।
কয়েক দশক ধরেই ময়না ও আমি রাজধানীর প্রায় একই অংশে (নীলক্ষেত-এলিফ্যান্ট রোড-ধানমন্ডি) কাছাকাছি বসবাস করি। ময়না থাকে নিউ এলিফ্যান্ট রোডে তাদের পারিবারিক ১০ তলা মিনিতা ভবনের সর্বোচ্চ তলায়। আমি ধানমন্ডির ২৭ নম্বর রোডের ছয়তলা ভবনের ওপরের তলায়, যার বারান্দা থেকে নারকেল গাছের পাতা ছোঁয়া যায়। দুজনের বসবাসই ঢাকার ব্যস্ত দুই বাণিজ্যিক সড়কের পাশে। আমাদের আবাসনে একটি কমন বিষয়, চারদিকে দেয়ালজুড়ে বই আর বই, আর বেশকিছু ভালো পেইন্টিং। ইদানীং আমাদের শারীরিক অসুবিধায় দেখাশোনা কিছুটা কমে গেছে, তবে প্রায়ই ফোনে যোগাযোগ হয়। বেশি কথা হয় না, তবু যেটুকু হয়, তাতে পরম তৃপ্তি ও আনন্দ অনুভব করি। আমাদের দুজনের মধ্যে এত স্মৃতি, এত কথা জমা আছে, তা আর এ বয়সে সাজিয়ে লিখতে পারছি না। তবে শেষ করার আগে অসংখ্য সুখস্মৃতির একটির কথা লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে।
১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরে আমি ব্যাংককের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (AIT) শিক্ষকতার কাজে যোগ দিয়েছি, সঙ্গে স্ত্রী ও কন্যা (তখন শুধু বড় মেয়ে সিমি, কান্তির জন্ম পরে, ব্যাংককে)। এক বেডরুমের খুব ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে আমাদের সাময়িক বসবাসের ব্যবস্থা। এমন সময় প্রায় হঠাৎ ময়না তার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহকর্মীকে (প্রয়াত ড. কবীর) নিয়ে মালয়েশিয়ার পথে আমাদের আস্তানায় হাজির, রাতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো, পরদিন ওরা শহরে গেল, সন্ধ্যায় যখন ফিরল ময়নার হাতে আমার স্ত্রী রওশনের জন্য খুব ছোট্ট একটি বৈদ্যুতিক পাখা, উপহার। ময়না দেখেছে সন্তানসম্ভবা রওশন রান্নার জায়গায় (কক্ষ নয়) গরমের মধ্যে কী রকম কষ্ট করে কাজ করছিল। ৩০০ বাথের সেই পাখাটি রওশনের নিত্যসঙ্গী, এখনো তার (বর্তমানের) সুপরিসর রান্নাঘরে সেবা দিচ্ছে। ময়নার সুখ্যাতি রয়েছে বন্ধুবৎসল মানুষ হিসেবে ও স্নেহশীল শিক্ষক হিসেবে। নিজের সন্তানদ্বয়ের দায়িত্ববান অভিভাবক তো বটেই। সঙ্গে থাকা নাতনি অন্নপূর্ণা তার চোখের মণি। পুত্রবধূ লরনার ওপর আস্থাশীল ময়না। প্রগতিশীল উদার অসাম্প্রদায়িক মানুষ বলতে যা বোঝায় আমিরুল ইসলাম চৌধুরী (আমাদের ময়না) একেবারেই সে রকম একজন মানুষ ৷
ময়নার মঙ্গল কামনা করি। বন্ধুপত্নী বেনুর অভাব অনুভব করি। তার আত্মার শান্তি কামনা করি। পরিবারের সবার কল্যাণ হোক।
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: শিক্ষাবিদ, নগরবিদ। ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়










