গত মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) ই-মেইল সার্ভিসে সমস্যা দেখা দেয়। টেলিকম সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ইতিসালাত এজন্য সমুদ্র তলদেশের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে দায় দেয়। আন্তর্জাতিক ফোনকল, মেসেজসহ তথ্য আদান-প্রদানের ৯৯ শতাংশই সম্পন্ন হয় আন্তঃমহাদেশীয় সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে। সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডের কাছাকাছি সমুদ্র উপকূলে রাশিয়ার সামরিক মহড়া সেখানকার সাবমেরিন কেবলকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।

আটলান্টিক কাউন্সিলের সাইবার স্টেটক্রাফট ইনিশিয়েটিভের অনাবাসিক ফেলো জাস্টিন শেরম্যানের মতে, ইউক্রেনে বিশ্বের মনোযোগ থাকলেও মস্কো যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তাহলে সাবমেরিন কেবল কেমন ঝুঁকিতে পড়তে পারে, সে বিষয়টি তেমন পাত্তা পায় না। রাশিয়ার সম্ভাব্য সাইবার হামলার বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকার পাশাপাশি সমুদ্র তলদেশীয় কেবল যে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে, সে ব্যাপারে ইউক্রেন ও তার মিত্র দেশগুলোকে সতর্ক থাকার কথা বলেন।

বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে ইউরোপীয় কমিশন বলছে, সাবমেরিন কেবলনির্ভরতা যথেষ্ট হয়েছে। এবার বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে। বিদেশী কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ও ডাটা সুরক্ষা নিশ্চিতে স্যাটেলাইটনির্ভর ইন্টারনেট ব্যবস্থার জন্য ৬৮০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ইউরোপীয় কমিশন। 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শিল্প বিভাগের প্রধান থিয়েরি ব্রেটন এক বিবৃতিতে বলেন, আমাদের নতুন কানেক্টিভিটি অবকাঠামো দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা দেবে। এটি বর্তমান সাবমেরিন কেবলনির্ভর ইন্টারনেট অবকাঠামোর বিকল্প হিসেবে দাঁড়াবে। পুরো ইউরোপ ও আফ্রিকায় নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ ও নিরাপদ তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিতে কাজ করবে।

আশা করা হচ্ছে, আগামী বছরেই এ মহাপ্রকল্পের কাজ শুরু হবে। মেগা প্রকল্পটির অর্থায়ন করবে ইইউ, ইইউভুক্ত দেশ, ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি। এছাড়া তহবিলে থাকবে বেসরকারি বিনিয়োগও। ইলোন মাস্কের স্টারলিংক নেতৃত্বাধীন উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবাদানকারী লো আর্থ অরবিট (এলইও) স্যাটেলাইটের জোয়ারের মধ্যে এ পরিকল্পনা নেয়া হলো।

জাতিসংঘের আউটার স্পেস অবজেক্ট ইনডেক্স অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ এলইওতে প্রায় সাড়ে সাত হাজার স্যাটেলাইট স্থাপন করা হয়েছে। সাবমেরিন কেবল নিখুঁত ব্যবস্থা নয়। ধীরে ধীরে বিকল্প হিসেবে দাঁড়াচ্ছে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে স্থাপিত সাবমেরিন কেবলের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ লাখ কিলোমিটার, যা দিয়ে চাঁদকে তিনবার মুড়ে ফেলা যাবে। সমুদ্র তলদেশের নেটওয়ার্কটির মালিকানায় রয়েছে বেশ কয়েকটি বৈশ্বিক কোম্পানি, যারা বিশ্বজুড়ে দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা দেবে। আবুধাবির টেকনোলজি ইনোভেশন ইনস্টিটিউটের গবেষক ডক্টর চাউকি কাসমি দ্য ন্যাশনালকে জানান, এসব ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তারের সময় ব্যাকআপ হিসেবে একাধিক কেবল রাখে, যাতে একটি বিকল হলে অন্যটির মাধ্যমে সংযোগ চালু থাকে। কিন্তু ইন্টারনেট সংযোগ সমস্যা বর্তমানে রুটিনে পরিণত হয়েছে। তার হিসাবে, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় শতাধিক কেবল বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে টোঙ্গার আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট টাইফুন দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা। এর আগের মাসে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ৮০ কিলোমিটার কেবল ছিন্ন হয়ে যায়। এছাড়া সাবমেরিন কেবল বিভ্রাটের দুই-তৃতীয়াংশ ঘটে মাছ ধরার নৌযান ও বড় জাহাজ নোঙর করার কারণে। এসব কেবল বিভ্রাটের কারণে বড় অংকের আর্থিক ক্ষতি গুনতে হয় সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে। ইন্টারন্যাশনাল কেবল প্রটেকশন কমিটির এক প্রাক্কলনে বলা হয়, ইন্টারনেট যোগাযোগ বিভ্রাটে প্রতি ঘণ্টার আর্থিক মাশুল গুনতে হয় ১৫ লাখ ডলার।