সফট পাওয়ার হিসেবে প্রযুক্তি ব্যবহার সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন নীতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। আগে সাধারণত সেনা অভিযান ও অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে কোনো ভূরাজনৈতিক বিরোধে অংশ নিত ওয়াশিংটন। সম্প্রতি তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি ও মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে ব্যবহার। খবর ওয়াশিংটন পোস্ট।

প্রযুক্তিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পেছনে পরোক্ষভাবে ওই দেশের জনগণকে তাদের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা থাকে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সাধারণ রুশ নাগরিক আইফোন ব্যবহার করতে পারছেন না কিন্তু জেনারেলরা ইউক্রেনে বিনা বাধায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছেন। প্রযুক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারে মার্কিন অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রভাব কমে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন অনেক বিশ্লেষক। এতে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানির বৈশ্বিক আধিপত্য সংকুচিত হয়ে যাবে বলে মনে করেন কেউ কেউ।

চীন ও রাশিয়ার মতো সুপার পাওয়ার দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা প্রযুক্তির বিকল্প নিয়ে আসছে। মার্কিননির্ভরতা কমাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীন ও রাশিয়া শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। নিয়মিত সোস্যাল সাইট ও প্রযুক্তি প্লাটফর্মের কার্যক্রম সীমিত করে দেয়ার কৌশল নিলে আরো অধিকসংখ্যক মানুষ বিকল্প প্লাটফর্মে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। রাশিয়ায় গুগলের বিকল্প প্লাটফর্ম চালু, চীনা ফেসবুক কিংবা ইরানিয়ান ইউটিউব শুধু তাত্ত্বিক জায়গায় সীমিত নয়, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট পরিষেবা সহজলভ্য রাখার পক্ষপাতী মানবাধিকার সংস্থা অ্যাকসেস নাউয়ের মুখপাত্র পিটার মিসেক জানান, মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সেবা বিচ্ছিন্ন করা হলে মানুষ বিকল্প খুঁজে নেবে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের সুবিধা ও বিপত্তি নিয়ে নির্ঘুম দিন কাটছে মার্কিন সরকারি কর্মকর্তা ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্তাদের। রাশিয়ায় ইন্টারনেট ও সোস্যাল মিডিয়ার কার্যক্রম ব্লক করা কিংবা সীমিত করতে ইউক্রেনীয় কর্তাব্যক্তিদের আহ্বানের বিরোধিতা জানিয়ে আসছে বিভিন্ন কোম্পানি এবং ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করছে এমন সংস্থাগুলো। তাদের যুক্তি রাশিয়ার মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেয়ার গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক ছিল টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম। এগুলো ব্লক বা সীমিত করে দেয়ার মাধ্যমে সাধারণ রাশিয়ানদের কাছে সঠিক তথ্যপ্রবাহ আটকে দেয়া হচ্ছে। এটা অনেকটা পুতিন সরকারের উপকারে আসছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ফেসবুক, টুইটার ও গুগল ব্লক বা সীমিত করার মাধ্যমে বিনা বাধায় নিজেদের কার্যক্রম চালাতে পারছে ক্রেমলিন।

মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য আরো আশঙ্কার বিষয় হলো, এমন ব্লক ও নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়ানরা চীনা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়বে। মার্কিন কোম্পানিগুলোর এ নীতিতে শক্তিশালী হবে অন্য পরাশক্তি, যাদের সঙ্গে কয়েক বছর ধরে প্রযুক্তি ও বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে।

কয়েক বছর ধরেই চীনের মতো প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার চেষ্টা করছে রাশিয়া। ইয়ানডেক্স রাশিয়ার জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে দাঁড়িয়েছে। চলতি সপ্তাহে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুসতিন জানান, পশ্চিমা পণ্য ও সেবার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম কিংবা ইন্টেলের বিকল্প পণ্য ও সেবা রয়েছে রাশিয়ার। রাশিয়ায় মার্কিন ও অন্যান্য প্রযুক্তি কোম্পানিকে স্থানীয় অনেক সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে আগ্রাসী নিষেধাজ্ঞায়ও খারকিভে পুতিন প্রশাসনের বোমা হামলা বন্ধ করবে না বা কিয়েভ অভিমুখে অভিযান থামাবে না। চীন ও ইরানের ক্ষেত্রে এর সফল উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। চিপ নির্মাণ ও ফাইভজি প্রযুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞায় চীন স্বনির্ভরতার ওপর জোর দিচ্ছে। সেমিকন্ডাক্টর খাতে তারা শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। ২০১৯ সালে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় নিজস্ব ‘হালাল ইন্টারনেট’ চালু করে তেহরান। এছাড়া স্থানীয় বিভিন্ন অ্যাপ ও সফটওয়্যারও জনপ্রিয়তা পায়। রাশিয়ার ওপর মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা রুশ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেই কি শক্তিশালী করবে? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে অনেক বিশ্লেষক ও শীর্ষ নির্বাহীর মনে।