উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনখানা ঠিক সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছাতে পারলে অনায়াসেই শেষ বিকালটা আল মাহমুদের কবরে কাটিয়ে দেয়া যেত। চেয়েছিলাম তাই-ই। কিন্তু ট্রেন যখন পৌঁছাল, বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা। কবিবন্ধু মহিবুর রহিম স্টেশনেই ছিলেন, আরো দুই সঙ্গীসহ। তাদের নিয়ে এক প্রস্থ চা খেলাম স্টেশনের চায়ের দোকানে। ঠিক যেমন আল মাহমুদ খেতেন, বহুকাল আগে। গভীর রাতে, নোয়াখালী এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে নেমে, বাড়ি ফিরবার পথে। চায়ের স্টলের আড্ডা থেকে জেনে নিতেন গত এক মাসে শহরে কী ঘটল। তারপর রিকশাঅলা আফজাল তাকে বাড়ি পৌঁছে দিত। যদিও স্টেশন থেকে মৌড়াইল মোল্লাবাড়ি মাত্র ১০ মিনিটের হাঁটাপথ।
এসবই জানা যায় আল মাহমুদের ‘গন্ধবণিক’ গল্প থেকে। বলা বাহুল্য, এই গল্পের ন্যারেটরকে আমি পনেরো আনাই আল মাহমুদ হিসেবে মানবার যথেষ্ট আলামত পেলাম এখানে এসে। গল্পে যেমন, তার প্রতিবেশী একজন ব্যক্তি, যাকে তিনি ‘মন্তু নানা’ ডাকেন, তিনি মারা গেছেন। স্টেশনের চায়ের আড্ডার খবর। লাশখানি দাফনের অপেক্ষায় ঘরে চাটাই-মোড়ানো অবস্থায় পড়ে আছে। মন্তু নানার আত্মীয়স্বজন কেউ নেই। স্ত্রী গত হয়েছেন বহুবছর।
মন্তু নানা আতরের ব্যবসায়ী। গন্ধবণিক। আমরা এক্ষণে মনে করতে পারব কী প্রবল ঘ্রাণেন্দ্রিয় নিয়ে বেঁচেছিলেন কবি আল মাহমুদ। সৌরভের কাছে পরাজিত তার আরেকটি বিখ্যাত গল্প। অপরাপর বিখ্যাত গল্পগুলো তথা পানকৌড়ির রক্ত কিংবা জলবেশ্যায় আমরা অপার বিস্ময়ে আল মাহমুদের ঘ্রাণশক্তির দ্যোতনা টের পাই। কবিতায় এর ভূরি ভূরি নমুনা মিলবে।
মৌড়াইল কবরস্থানে যখন পৌঁছাই, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। শহরতলির কবরস্থান। ঢোকার মুখে পাড়ার কিছু ছেলেকে দেখা গেল, গুলতানি মারছে। নৈমিত্তিক। মহিবুর কবরটি দেখালেন। অত্যন্ত সাদামাটা একটি নতুন কবর। কোনো ফলকচিহ্ন নেই। মহিবুর বললেন, আল মাহমুদের কবিতা নিয়ে একটি ফলক বানাবেন তারা। কয়েকটি ছবি তোলা হলো। গেট থেকে একটি ছেলে গলা উঁচিয়ে বলল, আংকেল কবরস্থানে ফটো তুইল্লেন না। গুনাহ হয়।
আমরা ধীরে সুস্থে বেরিয়ে গেলাম।
মহিবুর এবার বললেন, চলেন আল মাহমুদের বাড়িতে যাই। কাছেই। মৌড়াইল মোল্লাবাড়ি। এর সামনে দিয়ে বহুবার আসা-যাওয়া করেছি। কখনো ভেতরে ঢোকা হয়নি। অত রাতে কোনো মহল্লায় যাওয়া অশোভন কিনা, ভাবছিলাম। মহিবুর সাবলীল। তাকে হয়তো বাড়ির অনেকেই চেনে।
মসজিদের পাশ দিয়ে প্রবেশপথ। ঢোকার সময়েই আমার মন্তু নানার কথা মনে পড়ে গেল। আতরের ব্যবসায়ী। মহিবুরও যেন আমার থটরিড করছিলেন। বললেন, গন্ধবণিক গল্পের প্লট থেকে ঘুরে আসি চলেন। আমার মনে পড়ল:
খুব অন্ধকারের মধ্যে আমি বাড়ির মসজিদের দরজায় এসে দাঁড়ালাম। এখানে সবসময় একটা বাতি অর্থাৎ বৈদ্যুতিক বালব জ্বলে। মসজিদের পশ্চিম দিকের একটা থামের গায়ে বাতিটা থাকে। আজ বাতিটা অন্ধকার। সম্ভবত বালবটা ফিউজ হয়ে গেছে। একটা অশুভ অন্ধকার পরিবেশটাকে থমথমে করে রেখেছে। এখানে এলেই আমার কেমন যেন গা টা ছমছম করে। মসজিদের উত্তর-দক্ষিণের দু’পাশে কবরের সারি। আমার পূর্বপুরুষদের কবর। আমি সাধারণত রাতের গাড়িতে ফিরলে এখানে রিক্সা থেকে নেমেই ভাড়া মিটিয়ে দ্রুত চত্বরটা পেরিয়ে আমাদের পুকুরের ঘাটলায় এসে দাঁড়াই। [গন্ধবণিক, আল মাহমুদ]
মসজিদের দেয়ালে লাগোয়া একটি বিজলিবাতি। আশ্চর্য! এখনো এমনটাই আছে! রাতের ট্রেনে যখন আল মাহমুদ বাড়ি ফিরতেন, এই দেয়াল-লাগোয়া বিজলিবাতিই তাকে পথ দেখাত। মোল্লাবাড়ির ভেতরে ছোট একটা কবরস্থানের বর্ণনা আছে গল্পে। আমি অবশ্য বাস্তবে খেয়াল করিনি। ছিল হয়তো। চারপাশে নানাবিধ বহুতল স্থাপনায় ম্লান হয়ে যাওয়া শহরতলির কোনো পারিবারিক কবরস্থান। একটু এগোলেই দোতলা একটা ভবন। তার পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে সেই পুকুর, শানবাঁধানো ঘাটলা।
এই সেই পুকুর, মহিবুর রহিম বলল।
কোন পুকুর? আমি ধন্দে পড়ে যাই। আল মাহমুদের বাড়ির পুকুর? আবার দেজাভ্যুমত হয়:
আমি ঘাটলায় এসে শানের ওপর একটু বসলাম। চাঁদটা যেন মেঘপুঞ্জের অনেক ওপরে উঠে এসেছে। জোছনায় ঝলমলিয়ে উঠেছে আমাদের পুকুরটা। ছোট ছোট ঢেউ চাঁদের প্রতিবিম্বকে ঘাটলায় শেষ সিঁড়িতে এনে টুকরো টুকরো করে ভাঙছে। ঘাটলার পাশে নিমগাছটা থেকে রাতের অশুভ কোনো পাখি ডানা ঝাপটিয়ে পুকুরের ওপর দিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেল। ... বরং কিসের যেন একটা মিষ্টি গন্ধ আসছে ঝিঁঝির শব্দের মতো তীক্ষ। উদ্ভিদ বা ফুলটার নাম আমি কিছুতেই স্মরণ করতে না পেরে হাতড়ে হাতড়ে কৈশোরের ঘাটপাড়ে এসে দাঁড়ালাম। [গন্ধবণিক]
মফস্বলের শীত এখনো বিদায় হয়নি এখানে। আমি ঘাটলার সিঁড়িতে এসে দাঁড়াই। নিমগাছটি এতদিনে বেশ বড় হয়ে চাঁদটাকে আড়াল করে দিতে সমর্থ হয়ে উঠেছে। গন্ধবণিক গল্পের মন্তু নানার বাড়ির ঘাটলা। যেখানে তিনি গোসল করে উঠে যাবার পর আড়ালবর্তিনীরা তড়িঘড়ি পুকুরে নামত। গন্ধের আশায়।
পুকুরের প্রায় গা-ঘেঁষে দোতলা বাড়ি। মহিবুর জানালেন, এটা ফরহাদ ভাইয়ের বাড়ি। ফরহাদ আল মাহমুদের সহোদর ভাই। গত হয়েছেন বেশ আগে।
এটা আদিতে ছিল আল মাহমুদের মামাদের বাড়ি, মহিবুর যেভাবে বলছিলেন। মামাবাড়িতেই তারা থাকতেন। অর্থকষ্টে পড়ে একবার মামারা বাড়ি বেচে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। আল মাহমুদ তখন ইত্তেফাকে চাকরি করেন। আল মাহমুদের মা তাকে বললেন, বাবা, বাড়ি বেচে দিলে আমাদের কী হবে? যাব কোথায়?
কিন্তু অত টাকা কোখায় পাবেন কবি, ইত্তেফাকের ছাপোষা সাব-এডিটর?
একদিন তার বিমর্ষ মুখ ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার নজরে পড়ল। কথায় কথায় আল মাহমুদ জানালেন তার দুর্দশার কথা। বাড়ি কিনতে কত টাকা লাগবে, মানিক মিয়া জানতে চাইলেন। ৭ হাজার, আল মাহমুদ বললেন। মানিক মিয়া সাথে সাথেই বললেন, আমি বলে দিচ্ছি, অ্যাকাউন্টস থেকে নিয়ে যাও। মাসে মাসে বেতন থেকে কেটে নেবে।
সেই টাকা আল মাহমুদ তুলে দিলেন মা’র হাতে। বাড়ি কেনা হলো মা’র নামে। পরে, মা যখন গত হলেন, আল মাহমুদের ভাই ফরহাদ জায়গাটুকুর বেশির ভাগের ওপর একখানা দোতলা ভবন উঠিয়ে দিলেন। সেই ক্ষোভে আল মাহমুদ বহুদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসতেন না। বা আসলেও বাড়িতে পা দিতেন না।
আমার মনে পড়ল প্রত্যাবর্তনের লজ্জা কবিতার ফরহাদের কথা: গাড়ি আসার আধা ঘণ্টা আগেই স্টেশনে পৌঁছে যায় ফরহাদ! যথারীতি লেইট আল মাহমুদের ভাগের জায়গাটুকু খালি পড়ে আছে। ভেতরে সেই দীনহীন, ভাঙা কফিন বাক্সটা, যাতে চড়ে তিনি বাংলাদেশের সেরা কবি তার জন্মভূমিতে প্রত্যাবর্তন করলেন দিনকয় আগে। বাউন্ডারি দেয়া শূন্য ভূমিতে আর কিছুই নেই। শুধু কিসের যেন একটা ঘ্রাণ ম্লান হয়ে ঘুরছে ফিরছে নাকের আশেপাশে। ছাতিমের মতো তীক্ষ নয়। কিন্তু কেমন যেন মাথায় গিয়ে লাগে। লোবানের?
২.
একদা আমি যাদের কাছে নত হওয়া শিখেছিলাম
রপ্ত করেছিলাম অভিবাদনের কায়দা-কানুন
তারাই আজ আমার ঝুঁটি দেখে চিন্তিত
তাদের দাঁত ঘষটানির শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছি
তাদের বন্দুকের নল এখন আমার মাথার দিকেই তাক করা
[আমার মাথা]
এরপর » পৃষ্ঠা ১৪
আল মাহমুদ যেদিন মারা গেলেন, আকাশ সামান্য মেঘলা ছিল। বাংলা একাডেমিতে তার মরদেহ আনা হবে শুনেছিলাম, কিন্তু পৌঁছাতে পৌঁছাতে লাশ সেখান থেকে প্রেস ক্লাবে রওনা দিয়ে দিয়েছে। পেছন পেছন সেখানেই গেলাম। ছোটখাটো একটা জানাজা হলো। অধিকাংশই অচেনা মানুষ। চেনা একজন কবিকে দেখা গেল গাড়িসহ ঢুকতে। কিন্তু কী কারণে যেন তিনি গাড়ি ঘুরিয়ে ফেরত চলে যান। প্রেস ক্লাব পর্ব শেষ করে আল মাহমুদের লাশ যখন বায়তুল মোকাররমের দিকে ধাবমান, আমরা কয়েকজন প্রেস ক্লাবের আশপাশেই চা খাচ্ছিলাম। তখন চেনা একজন বুদ্ধিজীবী কলামিস্টকেও দেখা গেল। প্রেস ক্লাব থেকে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যাচ্ছেন। বোঝাই যাচ্ছিল, আল মাহমুদের মরদেহ তাকে প্রেস ক্লাব অভ্যন্তরে বেশ খানিকটা সময় আটকে রেখেছিল!
না। শহীদ মিনারে নেয়া হয়নি বাংলা ভাষার সর্বকালের সেরা এই কবির মরদেহ। শহীদ মিনারের ম্যুরাল গেটকিপারদের গ্রিন সিগনাল পাওয়া যায়নি। শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানেও সমাহিত হননি মুক্তিযোদ্ধা এই কবি। কী কসুর ছিল তার? স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের স্তাবক ছিলেন! বেশ। আরো যারা যারা ও-রকম ছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে তো এমন নিষেধাজ্ঞা হয়নি! বাড়ি পেয়েছেন এরশাদের কাছ থেকে! আরো যারা যারা পেয়েছেন, তাদের তো আমরা ‘দালাল’ বলে ডাকি না। শুধু আল মাহমুদের ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম কেন ঘটল?
একসময় আল মাহমুদ জামায়াতের বগলদাবা হয়েছিলেন। এটা নিশ্চয়ই গুরুতর ঘটনা। তার সমসাময়িক সুবিধা-সারথিরা জামায়াত অব্দি যাননি। আল মাহমুদ গেছেন। বা তাকে সেদিকেই যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। ঢাকার এলিট কবিবলয়ে গ্রাম থেকে আসা গরিব কবি আল মাহমুদ কীভাবে বছরের পর বছর নাস্তানাবুদ হয়েছেন, এ গল্প আজ আর কারো অজানা নয়। তখন কিন্তু তিনি ‘জামায়াত’ ছিলেন না, এমনকি ‘এরশাদ’ও ছিলেন না। খালি গরিব ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু তাকে শিল্পকলা একাডেমির চাকরিটুকু দিয়েছিলেন। তিনি পরে জিয়া ও এরশাদ সরকারেরও ঘনিষ্ঠ ছিলেন। অনুগ্রহ নিয়েছেন। সরকারি আনুকূল্য ছাড়া শুধু কবিতা লিখে একজন ছাপোষা কেরানির পক্ষে একটা সংসার চালানো এ দেশে নিতান্ত অসম্ভব। এ থেকে বোঝা যায়, আল মাহমুদের রাজনীতি। রাজনীতি বিষয়ে এর বাইরে গুরুতর ভাবনাচিন্তা আল মাহমুদের ছিল, এ রকম সাক্ষ্যপ্রমাণ শুধু একবারই পাওয়া গেছিল। যখন তিনি জাসদের ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। এবং জেল খাটেন। তার জামায়াত-ঘনিষ্ঠতা যতটা না রাজনীতি, তারচে বেশি হয়তো বিকল্প সমাজবেষ্টনী। প্রত্যাখ্যাত একজন মানুষের। কিন্তু আয়রনি হলো, সেখানেও যতটা না তিনি আনুকূল্য পেয়েছেন, তারচে বেশি ব্যবহূত হয়েছেন। প্রত্যাখ্যাতও হয়েছেন পরে, এমন শুনতে পাই। কোনো খোপেই আটকে থাকার জন্য তিনি যে জন্মাননি!
৩.
দর্শকের অপরাধ কী? দর্শকের অপরাধ হলো, তুমি যখন তোমার সবচে গুরুত্বপূর্ণ খেলাটা দেখাচ্ছ, সে তখন ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলছে! - জাঁ জেনে
আল মাহমুদের ইসলামী প্যারাডাইম তার জামায়াত-সংশ্লিষ্টতার ফল নয়। ওরিয়েন্টালিজম লিখবার জন্য এডওয়ার্ড সাঈদকে ফিলিস্তিনি গেরিলা বাহিনীতে নাম লেখাতে হয়নি। তবু তাকে ফিলিস্তিনি ‘সন্ত্রাসী’ বলে ডাকা হতো পশ্চিমে। মনে রাখতে হবে মিশেল ফুকোর মতো দার্শনিকও ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সমর্থনে বই লিখেছেন। আশ্চর্যজনকভাবে এ সবকিছুই ঘটেছে একই সময়ে, যখন আল মাহমুদ তার সোনালী কাবিন-এর ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না কিংবা মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো লিখছেন। কিন্তু আমরা যারা সে সময় আল মাহমুদ পড়তে শুরু করেছিলাম, আমরা আদতে ছিলাম মতাদর্শের সন্তান। আমাদের পাঠ্যসীমা ছিল সোনালী কাবিন পর্যন্ত। আমাদের বলা হয়েছিল, আল মাহমুদ দারুণ কবি, কিন্তু এখন ‘বিপথগামী’ হয়ে গেছেন। তাই সোনালী কাবিন-এর বেশি তাকে পড়বার দরকার নেই। তাই ততটুকুই পড়তাম। অবশ্য সোনালী কাবিন-এর ইউটোপিয়া আমাকে বেশি টানে নাই। কেন টানে নাই, এ নিয়ে অন্যত্র লিখেছি।
পরে যখন আকস্মিকভাবে মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো কিংবা প্রহরান্তের পাশ ফেরা বইগুলো পড়তে শুরু করি, অবাক বিস্ময়ে এক নতুন আল মাহমুদকে আবিষ্কার করি সেখানে। আমাদের মতাদর্শের সরল ব্যাখ্যার সাপেক্ষে কবি ‘বিপথগামী’ সত্য, কিন্তু কবিতা তো একেবারে জ্বলজ্বল করছে! আত্মায় গিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে! তখনো পৃথিবী থেকে সমাজতন্ত্র নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নাই, মতাদর্শ-উত্তর দুনিয়ায় আমরা পা রাখি নাই। কিন্তু আমাদের বামপন্থী গুরুরাই বিড় বিড় করে শ্বশুরকুল-সম্পর্কিত একটা গালি দিয়ে বলতেন, পচে গেলেও ব্যাটা এখনো কী ভয়ংকর সুন্দর লেখে!
স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তীকালে আবার আল মাহমুদ পড়তে শুরু করি। এবার বেশ নির্ভার মনে, রেজিমেন্টেড বামপন্থার চোখরাঙানি নেই, নৈতিক খবরদারিও নেই, শুধু কবির জামায়াত-কানেকশনজনিত খচখচানিটুকু আছে। স্থির করলাম, এই ঐতিহাসিকতাটুকুকে খানিক উপেক্ষা করে আরো একবার আল মাহমুদ পড়ে দেখব।
এবার দেখলাম, আইকনিক সোনালী কাবিন সনেটগুচ্ছ থেকে প্রায় কোনো রসই সঞ্চারিত হয় না। বরং এর সনেটীয় গড়ন নানা জায়গায় বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে। বরং প্রথম দুটি বই, লোক-লোকান্তর ও কালের কলস বেশি তাজা, আনন্দঘন আর সারল্যভরা। কিন্তু সবচে বিস্ময়ের কারণ হলো তার ‘বিপথগামী’ পর্বের কবিতাগুলো। যাদের কোনো কোনোটাকে আমি অনায়াসে এডওয়ার্ড সাঈদ কিংবা মিশেল ফুকোর তাত্ত্বিক পজিশনের সাথে অদলবদল করে পড়তে পারছি। কী আশ্চর্য! আল মাহমুদ যখন প্রহরান্তের পাশ ফেরা লিখছেন, হাবারমাস তখনো পোস্ট-সেক্যুলারিজমের তত্ত্বায়ন করেন নাই। এমনকি আশীষ নন্দীও তার অ্যান্টি-সেক্যুলার মেনিফেস্টো লেখা ধরেন নাই। অথচ কী অবলীলায় আল মাহমুদ লিখলেন:
কারণ আমি জানি
শতাব্দীর এই শেষ পাদে
প্রেম শব্দটিকে বে-আব্রু করতে যারা টেবিল চাপড়াচ্ছে
তাদের আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে দাঁড়াতে পারে এমন
দল বা প্রতিরোধ বাহিনী নেই। নেই
সে যৌবন যে লুণ্ঠন ও লোভের বশবর্তী নয়। নেই সেই
শিক্ষক, যিনি সৌন্দর্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে
অন্তত একবার বিদ্রূপে বিদ্ধ হবেন।
[প্রহরান্তের পাশ ফেরা]
কবিকে হতে হয় দ্রষ্টা। মতাদর্শের স্তাবক নয়, এমনকি কখনো কখনো ধারক ও বাহক নয়। বরং হয় স্রষ্টা, নয় সংহারক। ব্যক্তি আল মাহমুদ কখনো তা পেরেছেন, কখনো তা পারেননি। কিন্তু কবিতার আল মাহমুদ কবি হিসেবে এ দায় শোধ করে গেছেন তার প্রজন্মের একমাত্র প্রতিনিধি হয়ে। তিনি যখন কবিতায় বুদ্ধদেব বসুর সাক্ষাৎসারের বর্ণনাটুকু দিচ্ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের, পূর্ব বাংলা থেকে পালিয়ে আসা এক শরণার্থী হিসেবে, আমি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম কবির ওপর (বুদ্ধদেব বসুর সাক্ষাৎসার, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো)। মনে হয়েছিল, বানানো। রাজনৈতিক। যেহেতু ওটা ছিল মায়াবী পর্দা যুগের কবিতা। এখন যখন মমতা-মোদি আমলে এই কবিতা আবার পড়ি, বিমূঢ় হয়ে যাই। বুদ্ধদেব বসু চরিত্রের রাজনৈতিক প্রতীকী মূল্য বুঝে উঠতে পারি এই কবিতায়। তিরিশ বছর পর এই কবিতা কী সাংঘাতিক অর্থের বিচ্ছুরণ ঘটাতে শুরু করল!
৪.
আল মাহমুদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে ‘ফররূখের কবরে কালো শিয়াল’ মনে পড়ছিল। কবিতাটির প্রতীকী মূল্য বুঝতে চাইছিলাম। কী ভয়ংকর কবিতা! অতখানি সাহস আর দিব্যদৃষ্টি কেবল কোনো কবির পক্ষেই থাকা সম্ভব। কবিতাতেই তা সম্ভব। অবশ্য ফররূখে যা হয়েছিল, মাহমুদে তা হবে না। ইতিহাসে নায়কের পুনরাবৃত্তি হয় বটে। কিন্তু ভূমিকার বদল হয়। মার্ক্স যেমন বলেন, ফার্স অ্যাজ ট্রাজেডি, দ্যান অ্যাজ ফার্স। এখানে কিন্তু কারিগরদের কথা বলা হয়েছে। মৃত ফররূখ মাহমুদ ইতিহাসের চরিত্র এখানে, কারিগর নন।
তিতাসপাড়ের এই কবি তার নিজভূমিতে ফিরেছেন। তিনি জীবনের জলাধারে তুমুল রোহিত হতে গিয়েছিলেন ঢাকায় ১৯৫৪ সালে। খ্যাতি পেয়েছেন, ভালোবাসা পেয়েছেন, ঘৃণা পেয়েছেন, অবজ্ঞা পেয়েছেন—ব্যক্তি হিসেবে। কিন্তু কবি হিসেবে তাকে উপেক্ষা করার সামর্থ্য বাংলা কবিতা পাঠকের কোনোদিনও হবার নয়। তিনি মরে গিয়ে নিশ্চয়ই ব্যক্তি আল মাহমুদ বিষয়ে আমাদের দোনোমনা কমিয়ে দিতে পেরেছেন। মৃত আল মাহমুদ ক্রমশ কবি হিসেবে আরো আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন, বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের কবিতা যতবারই বাঁক পরিবর্তন করবে, ততবারই আল মাহমুদের কাছ থেকে পানিপড়া নিয়ে আসতে হবে। এই প্রত্যাবর্তনে লজ্জা নাই। কেবলি প্রাপ্তিযোগ আছে।






