বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ। আল মাহমুদ নামেই বাংলা সাহিত্যে তার লেখালেখি ও পরিচিতি। কবির সঙ্গে শিল্প-সাহিত্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে দুই দফা কথা হয়। দ্বিতীয়বার ২০১৪ সালের ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় তার মগবাজার বাসায়। কথা হয় পরিবার, সাহিত্য, রাজনীতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে জব্বার আল নাঈমের সঙ্গে।

প্রশ্ন: মাহমুদ ভাই, গত বছর ঘোষণা দিয়ে মহাকাব্য লেখা শুরু করেছিলেন এবং লিখে কিছু অংশ প্রকাশও করেছেন। মহাকাব্যের বাকি অংশের কী অবস্থা?

আল মাহমুদ: হ্যাঁ। লিখতে শুরু করেছিলাম। কতটুকু শেষ করতে পারি, তা তো বলা যাচ্ছে না আর। (পাশে বসা শামিল আরাফাতের কাছে জানতে চায় মহাকাব্যের লাইন সংখ্যা কত? শামিল আরাফাত জানায়, মোট লেখা হয়েছে ৯২৭ লাইন) আল মাহমুদ আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে, শুনলে তো। তবে কতটুকু টেনে নিয়ে যেতে পরি, তা বলতে পারছি না। এই বয়সে মহাকাব্য লেখা খুব টাফ কাজ। আমি সেটা করছি।

প্রশ্ন: কত লাইনের মধ্যে রাখার ইচ্ছে বা কতটুকু হেঁটে দাঁড়াতে চান?

আল মাহমুদ: এটা অ্যাকচুয়ালি বলা কঠিন। তবে আমার চেষ্টার ঘাটতি থাকবে না। আমি একটা ফরম শেষ করতে চাই। শেষে মিলন দিয়েই শেষ করতে চাই। আমি চেষ্টা করব। তবে কতটুকু পারি বা কোথায় গিয়ে পারব, তা বলতে পারছি না।

প্রশ্ন: আমরা আপনার পুরো মহাকাব্যের জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে আছি। আপনার আগের বইগুলো সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো। আবার আরব্য রজনীর রাজহাঁস, কাবিলের বোন কিংবা উপমহাদেশের মতো গ্রন্থ রয়েছে—তারপর এ মহাকাব্য?

আল মাহমুদ: প্রথমে বলি তৃপ্তি বা অতৃপ্তির কথা। আসলে প্রতিভাবানদের আত্মতৃপ্ত হতে নেই। প্রতিনিয়ত তারা ক্ষুধার্ত থাকা ভালো। এখন তো ভালো করে লিখতে পারছি না। যদি ভালো করে লিখতে পারতাম। চোখে দেখতে পেতাম। আমার আরো কিছু লেখার ইচ্ছে আছে। কিন্তু পারছি না। ইচ্ছা থাকলেই সবসময় সবকিছু লিখতে পারা যায় না, তা এখন বুঝতে পারছি। কত সময় কেটে গেল অবহেলায়! (কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর) আমার ইচ্ছা আছে কাব্য-নাট্য লেখার। কিন্তু সেটা আমি আর পারব বলে মনে হয় না। অনেক সময় মনে হয়, এটা করতে পারলে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি কাজ করত মনে। তার পরও ইচ্ছে আছে।

প্রশ্ন: কোনো অপূর্ণতা থেকে কি মহাকাব্য লেখা শুরু করেছেন?

আল মাহমুদ: অপূর্ণতা তো কত প্রকারের হয়। অপূর্ণতা থাকবেই। যেহেতু প্রত্যেকটি সৃজনের বিষয় আলাদা। অতএব একটার সাথে আরেকটার অর্থগত মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। উচ্চারণগত কিংবা অন্য কিছু হয়তো কাছাকাছি থাকলেও থাকতে পারে। পূর্ণতা নয়।

প্রশ্ন: একটু আগে কাব্য-নাট্য করার ইচ্ছা পোষণ করছিলেন। বাংলাদেশের কার কাব্য-নাট্য আপনার ভালো লেগেছে?

আল মাহমুদ: বয়সের কারণে অনেক কিছু মনে করতে পারি না। (স্মরণ করার চেষ্টা করার পর) সরি ফর মেমোরি। এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। তবে আমি বেশ কয়েকটা ইংরেজি কাব্য-নাট্য পড়েছি। সেগুলোও অনেক আগে। তখন চোখে অসুখ ছিল না। চোখে অসুখ হওয়ার পর তেমন কোনো সাহিত্য আর পড়া হয় না। নিজে দেখে পড়ায় আলাদা একটা আনন্দ আছে। আমি তা থেকে বঞ্চিত।

প্রশ্ন: আপনি কিছুক্ষণ আগে বলেছেন নিজের হাতে লিখতে না পারার বেদনার কথা। নিজের হাতে লিখতে পারলে কী লিখতেন?

আল মাহমুদ: নিজের হাত দিয়ে কাজ করলে আপনি যত সুন্দর ফিনিশিং টানবেন, আরেকজনের হাতে তা নাও হতে পারে। এভাবেই সৃষ্টিশীলরা অতৃপ্তিতে ভোগেন। তৃপ্ত হতে নেই। সেখানে আমি না দেখি চোখে, না লিখতে পারি হাতে। আবার কানেও কম শুনি।

প্রশ্ন: তাহলে সৃষ্টিশীল জগতে কেউই সন্তুষ্ট নন?

আল মাহমুদ: এটা জটিল প্রশ্ন। আমার কাছে তা-ই মনে হয়। রবীন্দ্রনাথের এত বেশি সৃজন। তিনি কী হয়েছেন? আমার তো মনে হয়, তিনিও তৃপ্ত ছিলেন না। শত বছর পর তার সাহিত্য স্মরণের আবেদন করতেন না। সবসময় আমার ভেতরে একটা হাহাকার ছিল। হয়তো সব লেখকের ভেতরে ভেতরে আছেও। পরিতৃপ্ত নন। তবে ভালো কিছু লিখলে বা কলমের মাথায় এলে মনে অটোমেটিক একটা হাসি আসে। যে হাসিটা বড় কিছু অর্জনের। জীবনে অনেক দিন এমন হাসতে পেরেছি আমি।

প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গ যেহেতু চলে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে বড় মাপের একজন কবি। কিন্তু দেখা যায়, কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথকে দিয়েই বাংলা সাহিত্য শুরু করে। সেখানে মাইকেলরা উপেক্ষিত থেকে যান। এটাকে আপনি কীভাবে বলবেন?

আল মাহমুদ: এর একটা কারণ আছে, যেটা আমার মনে হয়। (কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর) আচ্ছা, মধুসূদন নিজে কখনো মাইকেল বলতেন না। অথচ তোমরা তাকে মাইকেল বলো, এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার! আমরা অতি উৎসাহে মাইকেল বলি। কিন্তু তিনি কি কখনো কোথাও বলেছেন? নেভার। বলেন না। তিনি বলতেন—&dquote;&dquote;

পিতা রাজ নারায়ণ

জননী জাহ্নবী

দত্তকুল কবি

আমি শ্রী মধুসূদন।

কখনো তিনি নিজ থেকে বলতেন না যে আমি মাইকেল।

আর বাংলা সাহিত্যে তো অনেকেরই নাম আলোচনায় আসে না। কালিদাস পণ্ডিতের নাম আসে না। অসাধারণ গদ্যশিল্পী মীর মশাররফ হোসেন, তিনি বিষাদ সিন্ধুর লেখক। তিনি বিশ্বমানের কাতারে পৌঁছে গেছেন। অথচ এত কম আলোচিত। তাতে কী? গদ্য পুস্তক লেখক তিনি। যাকে বারবার সালাম করতে ইচ্ছে হয়। মুনীর চৌধুরী সম্ভবত ‘নীল মানুষ’ নামে একটা বইয়ে তাকে নিয়ে খুব আলোচনা করেছেন। অসাধারণ সেই আলোচনা। বিভিন্ন সময়ে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখক অসম্ভব ভালো কিছু লিখে গেছেন। তারা আজ নেই। কারো আলোচনা হচ্ছে আবার কারো আলোচনা হচ্ছে না। আলোচনায় থাকতে পছন্দ রাজনীতিবিদদের। আলোচনাকে পুঁজি ভাবেন তারা। চলচ্চিত্র অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও আলোচনায় থাকলে বাজার ভালো হয়। সময়ের হিট অভিনেতা হয়। কিন্তু লেখালেখির জগৎ একেবারে ভিন্ন। নীরবে চিন্তার কাজ করতে হবে। লেখকরা আলোচনায় চলে আসলেই সুবিধার চেয়ে অসুবিধা বেশি। হয়তো লেখক সেই সময়ে এটা বুঝতে পারবেন না।

প্রশ্ন: মাহমুদ ভাই, তার পরও এটা সত্য, সব লেখকই তো আলোচনায় আসতে চান, মিডিয়া ফোকাস পেতে চান।

আল মাহমুদ: ওই যে আমি বললাম, লেখকের কাজ পর্দার অন্তরালে থেকে প্রচলিত চিন্তাকে নতুন চিন্তা দিয়ে আঘাত করা।

প্রশ্ন: মাহমুদ ভাই, পর্দার অন্তরালে থাকলে তো পেট চলে না। জীবিকার জন্যই বাইরে বেরিয়ে আসতে হয়। দু-চার বাক্য কথাও বলতে হয়। নয়তো হতাশা আসার শঙ্কা আছে।

আল মাহমুদ: আমি কখনই হতাশ ছিলাম না। মাসের পর মাস কাজ পাই না। কেউ চাকরি দেয় না। বেকার ছিলাম। তার পরও আমি আশাবাদী মানুষ। হতাশ হওয়ার কোনো কারণ তো নেই। সাহিত্য কোনো দিন কোনো মানুষকে খালি হাতে ফেরায় না। সাহিত্য কিছু না কিছু দেয়। আর যারা হতাশবাদী কথা বলেটলে, আমার মনে হয় এরা সাহিত্যিক না।

প্রশ্ন: হতাশবাদীরা সাহিত্যচর্চা করতে পারে না?

আল মাহমুদ: যুদ্ধের ময়দানে একজন সেনাপ্রধান থাকে। সে যদি হতাশ হয় কিংবা ভয় পায়, যুদ্ধে হেরে যাবে নিশ্চয়ই। একজন লেখক একটি সমাজের সেনাপ্রধান। তাকে হতাশ হলে চলবে কীভাবে? প্রকৃত লেখকরা হতাশ নয়।

প্রশ্ন: এ রকম সত্য সাহিত্যের বাইরে যারা আছেন তাদের বেলায়ও সত্য, তাই না? একনাগাড়ে একটা কাজে মনোযোগী হয়ে কাজ করলে সে সফল হতে বাধ্য।

আল মাহমুদ: আমি যেহেতু সাহিত্যের মানুষ, তাই আমি সাহিত্যের কথাই বললাম। তবে এটা নিশ্চিত, সাহিত্য মানুষকে কিছু না কিছু দেয়। যে যেই কাজই করুক, লেগে থাকতে হবে। দিন শেষে ফল আসবে। না হয় মানুষ প্রতিনিয়তই পেশা বদলে ফেলত।

প্রশ্ন: মাহমুদ ভাই, মানুষের হারানোর কিছু নেই। মানুষ এক জীবনে সব অর্জন করে, তাই না?&dquote;&dquote;

আল মাহমুদ: জীবন নিয়ে এত হতাশ হওয়ার কিছু নেই। মানুষ কখনই হারায় না। মানুষ অর্জনের ভেতরে বড় হতে থাকে। তবে প্রশ্নটা জটিলও আরেক অর্থে, মানুষ হারায় না। মানুষ কি সব অর্জন করে? আমার জীবনে জেল-জুলুম হয়েছে। চাকরিচুত্য হয়েছি। অযথা আমাকে কষ্ট করতে হয়েছে। তার পরও আমি আমার কাজ করে গিয়েছি। এ বৃদ্ধ বয়সেও আমি বসে থাকিনি। যখন যেটা পেরেছি করেছি। এখনো করছি। কবিতা, গল্প, উপন্যাস লিখে যাচ্ছি। হয়তো ভালোভাবে সম্পূর্ণ করতে পারি না। তার পরও অলস বসে থাকি না।

প্রশ্ন: পৃথিবীর অনেক বড় বড় কবি-সাহিত্যিক জেলে গিয়েছেন।

আল মাহমুদ: হ্যাঁ, এ নিয়ে আমার দুঃখ নেই। প্রকৃত লেখকরা ভিন্ন কিছু ভাবে। ভাবনার ভেতর ডুবে থাকে। তাদের ভাবনা প্রথম প্রথম সমাজ গ্রহণ করে না। ফলে গোটা সমাজ তার বিপক্ষে চলে যায়। মামলা-মোকদ্দমা হয়, জেল-জুলুম হয়। অনেকের ফাঁসিও হয়েছে। কেউ আবার রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা হয়েছে। আমি রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা হয়েছি। এখনো হয়ে যাচ্ছি।

প্রশ্ন: রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা হয়েছেন, সমর্থনও পেয়েছেন নিশ্চয়ই? রাজনীতির নীতিই এ রকম, এক পক্ষ আঘাত করলে আরেক পক্ষ টেনে নেবে।

আল মাহমুদ: আমি সেই সময় ধরতে পারিনি। আমি শুধু মত পাল্টেছি। মত পাল্টানো বা মত প্রকাশের অধিকারের জন্যই তো একাত্তর সালে যুদ্ধ করেছি। আমার যুদ্ধের কোনো গুরুত্ব নেই? হয়তো আছে। সেটা দিতে চায় না। কেড়ে নিতে চায়। এখন কাড়াকাড়ি বেড়ে গেছে। এই কাড়াকাড়ি যত বাড়বে, ততই আমরা পেছনের দিকে যেতে থাকব।

প্রশ্ন: আপনার কি মনে হয়, আমরা পেছনের দিকে যাচ্ছি? গেলে কেন?

আল মাহমুদ: কখনো কখনো মনে হয়। যোগ্য মানুষরা যখন অবিবেচিত হয়, তখনই এমন ভাবনা মাথায় কাজ করে। যোগ্যরা তো মূল্যায়ন বা সম্মান পাওয়ার দাবি রাখে। যোগ্যরা নতুন পথে হাঁটতে চায় বলে কেউ কেউ তাকে দমিয়ে রাখে।

 

প্রশ্ন: এ রকম প্রায়ই মনে হয়? নাকি এই সময়ে ঘরে বসে থাকার কারণে এমন ভাবছেন?

আল মাহমুদ: ঘরে যেহেতু থাকি, এখানেই ভাবি। এমন ভাবনার জন্য পণ্ডিত হতে হয় না, যে কেউই ভাবতে পারে।

প্রশ্ন: মাহমুদ ভাই, আমি বোঝাতে চেয়েছি, এ রকম আরো আগেই, মানে ২০১৪ সালের আগেই মনে হতো কিনা?

আল মাহমুদ: বেশ কয়েক বছর ধরেই ভাবছি।

প্রশ্ন: মাহমুদ ভাই, ২০০৮-০৯ সালের দিকে কি কখনো মনে হয়েছিল যে শেষ বয়সে অবমূল্যায়িত হবেন?

আল মাহমুদ: আমি অবমূল্যায়িত, সেটা কে বলে (কিছুটা উচ্চকণ্ঠে)! আমাকে তো মূল্যায়ন করার দরকার নেই। আমি যে কাজ করেছি, সেটার প্রাপ্য মূল্যায়ন হলেই আমি খুশি। সৃজনের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া দরকার। না হয় মানুষ এতে আগ্রহ হারাবে। মানুষের সৃজনশীলতা মরে যাবে। সৃজনশীলতা না থাকলে মানুষের চিন্তার গভীরতা কমবে। একজন আরেকজনের কথাকে মূল্যায়ন করবে না। আমার সাহিত্যই থাকবে, আমি থাকব না।

প্রশ্ন: আপনার সাহিত্য থাকবে, এটি আপনি বিশ্বাস করেন?

আল মাহমুদ: বড় লেখকরা জীবদ্দশায় কিছুটা বুঝতে পারে, তার সৃজন থাকবে কিনা।

প্রশ্ন: আপনার কি মনে হয় আজ থেকে ১০০ বছর পর আপনার সাহিত্য টিকে থাকবে?

আল মাহমুদ: এ কথা আমি আপনাকে বলব না, মানুষ মূল্যায়ন করবে। গত ৭০ বছরের বাংলা সাহিত্যের একটা হিসাব করলে আগামী ১০ বছরের একটা হিসাব দাঁড় করানো যাবে। খুবই নিখুঁত হিসাব। সেই হিসাবটা আমি বুঝি।

প্রশ্ন: আপনি যখন থাকবেন না, তখন বিস্মৃত হওয়ার আশঙ্কা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

আল মাহমুদ: কেউ কেউ জীবিত থাকাবস্থায়ও অমরত্ব লাভ করে। এ সমাজ এটাও জানে। যদিও আমি ওসব নিয়ে ভাবিনি। ভাবি জীবন খুবই সুন্দর।

প্রশ্ন: আপনার মূল পরিচয় আপনি কবি। আপনি গদ্যও সমান তালে লিখেছেন।

আল মাহমুদ: মানুষ আমাকে কবিই বলে। ইচ্ছে করলে অন্য কিছুও বলতে পারে। কিন্তু কবিতে একটা অহংকার আছে। আমার কাছে কবি শুনতে বেশি ভালো লাগে।

সব লেখকই প্রথম জীবনে কবি হতে চায়। কবি হতে না পেরে অন্য কিছু করে।

প্রশ্ন: আপনি জীবনের প্রথম থেকেই কবি হতে চেয়েছিলেন?

আল মাহমুদ: হ্যাঁ। কারণ আমি আগেই বুঝে গিয়েছি, আমি আর কিছু পারি না।

প্রশ্ন: কবিতায় এমন কী জাদু আছে? যার জন্য আপনি কবিই হতে চেয়েছিলেন? আপনার কাছে কবিতা কী?

আল মাহমুদ: কবিতার সংজ্ঞা? এটা বলা তো ভারি মুশকিলের কাজ। কঠিন। কী বলব? (কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর) কবিতা হলো প্রথমে কবির দর্শন ও উপলব্ধির বাস্তবতা এবং জীবনের বাস্তবতা এবং স্বপ্ন যার মধ্যে পা ফেলে অবিরাম হেঁটে চলে। আবার সেই অভিজ্ঞতাই শৈল্পিক ভঙ্গিতে কলমের মাথায় তুলে আনা।

প্রশ্ন: কেউ কেউ তো ভিন্নভাবেও ব্যাখ্যা করেছেন।

আল মাহমুদ: কবিতার যেহেতু সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই, তাই করতেই পারে।

তবে কবিতা হলো মানুষের হূদয়ের রসায়ন। যেখান থেকে রসবৃত্তি ভেসে এলে তাকে ভাষায় রূপ দিয়ে কবিতা করা হয়। অনেক কিছুরই সামষ্টিক একটি রূপ হলো কবিতা। কবিতাকে হালকা বা সহজভাবে দেখার অবকাশ নেই। শিল্পের সবচেয়ে ওপরের স্তর হলো কবিতা। কবিতার সংজ্ঞা একেকজন একেকভাবে দিয়েছেন।

তাই কবিতার প্রমাণ করার কিছু নেই। এটা বিজ্ঞান নয় যে এটাকে প্রমাণ করতে হবে। উপপাদ্য বা সম্পাদ্য বানাতে হবে। কবিতা হলো নিজ থেকে অনুভবে বোঝা আর লেখা। কবিতা লেখার পর তোমার মুখে এক ধরনের উজ্জ্বলতা কাজ করবে, যা তুমি নিজেই বুঝে ফেলবে। বুঝবে একটা কিছু হয়েছে। এটা কবিতা হওয়ার ইঙ্গিত। তুমি তখন ঘরময় পায়চারি করতে থাকবে। কবিতাটি বারবার পড়তে থাকবে। তখন বুঝবে কাজ হয়ে গেছে। দশ মাস মা তার সন্তান পেটে রাখার পর যখন প্রসব করে, সেই মা-ই বোঝে তার মনের আনন্দের অবস্থান।

তাই কবিতা কলাও না আবার কবিতা বিজ্ঞানও না। কবিতা হলো কবিতা। আবার কখনো কখনো কলা ও বিজ্ঞানের চেয়ে বেশি। সর্বশেষ কবিতা কবিতাই থাকে। কবিতাকে কবিতা হিসেবেই বুকে টানতে হবে। কবিতাকে কবিতার কাছে রাখাই ভালো। গবেষণা করে কবিতা নষ্ট করার দরকার নেই। গবেষকরা মূলত গবেষণা করে কবিতার সৌন্দর্য নষ্ট করে ফেলছে।

কবিতা একটা দারুণ ইমাজিনেশন। অনেক কিছুর সংমিশ্রণেই কবিতা। তবে কবিতায় কী থাকবে আর কী থাকবে না, তা নির্ভর করে সময়ের ওপর। আমি যখন লিখি, তখন আমি আমার লেখাটা লিখি। যা আমি ভাবি। আমি চিত্রকল্প তৈরি করি। আমি স্বপ্ন তৈরি করি। আমি লিখি। আমি একটা জিনিস তৈরি করি। এই যে তৈরি করাটাকে বলে সৃজন বা ক্রিয়েশন। এই ক্রিয়েশন শুধু একজনই করতে পারে, সে হলো কবি। সৃষ্টির একটা কম্পন আছে। এই কম্পন শরীর থেকে ছেড়ে দেয়। এবং তিনি তখন বুঝতে পারেন যে তিনি কোথাও না কোথাও পৌঁছে গেছেন।

কবি শব্দটা অনেক দামি শব্দ। অহংকার করার মতো শব্দ। কমিট হতে ‘কবি’ শব্দের আগমন ঘটেছে। কবি কিছু বলেন আর অন্যরা সেসব শুনে মুগ্ধ হবেন। এটাই স্বাভাবিক সত্য। ‘কবি’ শব্দটা খুব নরমাল নয়। আরো পাঁচ হাজার বছর পরও শব্দটা নরমাল হবে না। ‘কবি’ শব্দের ওজন অনেক। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সরকারের বড় বড় আমলা-কামলাকেও কবি হওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করতে দেখেছি। তারা সময়ের টানে হারিয়ে যান। আবার কেউ যদি কবি হনও, তারা তাদের ওই পদবিটা লুকিয়ে নামের আগে ‘কবি’ শব্দটা সুন্দরভাবে বসিয়ে দেন। রবীন্দ্রনাথ ও মধুসূদন দত্ত তো জমিদার ছিলেন। তারা নামের আগে ‘জমিদার’ শব্দটি কখনই বসাতেন না। শিল্প-সাহিত্যের সবচেয়ে এলিট ক্লাব হলো কবিতা। শৈশবে কবি হওয়ার চেষ্টা কমবেশি সবাই করেছে। কবি সবাই হতে পারে না। কবি হওয়া পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার বটে।

প্রশ্ন: আপনি আলোচনার শুরুতে বলেছেন, বড় মানের লেখক হওয়ার পরও কালিদাসকে মানুষ স্মরণ করে না। তার ধাঁধা কিন্তু এখনো চর্চিত হয়।

আল মাহমুদ: ধাঁধা মূলত কবিতাই। আর কালিদাস অনেক বড় মানের কবি। কারণ তিনি মেঘদূত রচনা করেন। তার মেঘদূত যেসব দেশের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, সেসব দেশের বর্ণনা দিচ্ছেন তিনি। এত অ্যাকিউরেট বর্ণনা! কোন দেশের মেঘের চুল কেমন, সেসবের বর্ণনা। গায়ের বর্ণনা। এটা কি খুব সহজ! এটা গভীর জ্ঞান ছাড়া অসম্ভব।

কালিদাস তার সময়ে সবচেয়ে বড় পণ্ডিত ছিলেন। তিনি প্রায় সব বিষয়ে জ্ঞান রাখতেন। এছাড়া ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান যেভাবে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন, ভাবলে এখনো অবাক হই! আসলে খুব সহজ কথা নয়। কালিদাস একজন কবি। জেনুইন কবি। কবিতা একজন কবির স্বপ্ন। এখানে সবকিছুই এসে যায়, যা গল্পে বা উপন্যাসে আসে অন্যভাবে।

প্রশ্ন: গল্প-উপন্যাসের কথা চলে এল। কবি ও কথাসাহিত্যিকের মধ্যে কীভাবে তফাত করবেন?&dquote;&dquote;

আল মাহমুদ: গল্পকার যখন সৃজন করেন, তখন তিনি একজন কবিই। কারণ সৃজনের কম্পন কবির মতোই। কিন্তু তার জ্ঞান, বুদ্ধি, পড়াশোনা তাকে গদ্য প্রস্তুতে প্ররোচনা দিচ্ছে। আবার কবিতাও সে লেখে। কখনো কখনো কবিতাও লেখে। কথা হলো, রচনার মুহূর্তে তার মধ্যে যে সৃজন কম্পন হয়, শরীর শিরশির করতে থাকে এবং শুধু লিখতে বা বলতে ইচ্ছে করে। এটাই তো একজন কবির কাজ।

আমি তো শুধু কবিই নই। একজন গদ্যকারও বটে। আমার গল্পের জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিও আছে। আমার গল্পের ওপর গবেষণা আছে। চলচ্চিত্র হয়েছে দেশের বাইরে। জলবেশ্যা গল্প অবলম্বনে ‘টার্ন’ চলচ্চিত্র হয়েছে। আমার গল্পগুলো আমার অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি। আমি জানি না, এমন বিষয়গুলো আমি কখনই লিখি না।

প্রশ্ন: দশক হিসেবে কবিতার বাঁক বদল ঘটে। এই বাঁকবদলে নেতৃত্ব দিয়েছেন মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, জসীমউ্দদীন থেকে শুরু করে আল মাহমুদ সর্বশেষ সংযোজন।

আল মাহমুদ: পরিবর্তনটা সব কবিই চায়। সমসাময়িক কালের যে গণ্ডি আছে, এটা সবাই ভেঙে বের হয়ে যেতে চায়। পঞ্চাশের পরের জেনারেশনও ভাঙতে চেয়েছে। আমার একটা ছড়া আছে—

সবাই বলে ভাঙব ভাঙব

কেউ কি কিছু ভাঙ্গে?

ষাটের দশক বগল বাজায়

বউ কেড়ে নেয় লাঙ্গে।

হা-হা-হা...(হাসি)

কথাটা কিন্তু ঠাট্টা নয়। আবার ঠাট্টা হলেও বাস্তবতা আছে। ষাটের দশকের কিছু কবির বউ ঘরে ছিল না। তবে এটা কাউকে আহত করার জন্য বলা না।

আসল কথা হলো, সমসাময়িক কালটাকে ধরে ভেঙে বের হতে হবে। আমাদের দেশে যেহেতু কাব্যে আমরা একটু বেশি এগিয়ে আছি, আমাদের কাব্য নিয়েই বেশি কথা হবে। আর হলেই ভালো। কবিতা হলো আধুনিক একটা প্যাটার্ন।

প্রশ্ন: কাব্য নিয়ে বেশি কথা হওয়ার আরেকটা কারণ বোধহয় গল্পকারের তুলনায় দেশে কবির সংখ্যা বেশি।

আল মাহমুদ: ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যাবে, এ অঞ্চলের মানুষের কবিতা প্রেম সত্যিকারার্থে বেশি। কিন্তু সব জায়গায় এমনটা নয়। ফরাসি বা ইংরেজি সাহিত্যে কবিতার চেয়ে গল্পের দিকেই ঝোঁক বেশি। সেটা এখনো আছে। কিন্তু কবিকে অবমূল্যায়ন করে না তারা। কবিকে অনেক সম্মান দেয়। তারা এটা ভালোভাবে বোঝে, একজন কবির কবজির অনেক শক্তি।

প্রশ্ন: কবির শক্তি অনেক বেশি বলতে অনেকে বোঝে কবিতার দুর্বোধ্যতা...কঠিন টেক্সট বুঝতে না পারাকে।

আল মাহমুদ: কে বলে কবিতার টেক্সট কঠিন?

কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান

আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি

পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ছোট ভাই-বোন

আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি—রাবেয়া রাবেয়া—

প্রশ্ন: কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী

কুয়াশায়—ঢাকা—পথ, ভোরের আজান কিম্বা নাড়ান দহন

পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ

মাছের আঁশটে গন্ধ, উঠোনে ছড়ানো জাল আর

বাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর!...

আল মাহমুদ: ভাই, কবিতা এ রকম। তবে এমনই যে হতে হবে, এমনও না। এগুলো তো আমি বলেছি। স্রেফ আমার কল্পনামাত্র। আমার মনে হয়েছে। তবে এটাই যে সার্থক সংজ্ঞা, এমনটা বলতে পারব না।

প্রশ্ন: ‘সোনালি কাবিন’ কাব্যগ্রন্থে আপনি লিখেছেন, ‘ছলনা জানি না বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি।’ আসলেই কি তাই? কোনো ব্যবসা শেখেননি?

আল মাহমুদ: হ্যাঁ। আসলেই তাই। আগেও বললাম। আমি কিছুই করতে পারতাম না। পারলে তো অনেক কিছু করতাম। আরেক লাইন আছে, ‘দেহ দিলে দেহ পাবে দেহের অধিক মূলধন।’ যা-ই হোক, এখানে একজন কবির বক্তব্য খুব ওপেন বলেছি। আমি বলতে পেরেছি, প্রেমের সংজ্ঞা তো সবাই দেয়। কথাটা আশা রাখি বুঝতে পেরেছ।

প্রশ্ন: আরেক জায়গায় বলেছেন, ‘পরাজিত নয় নারী; পরাজিত হয় না কবিরা।’

আল মাহমুদ: কবিরা পরাজিত নয়। কোনো কবি কোনো কালে পরাজয় বরণ করে না। কবিরা পরাজয় মানতে চায় না। এই হলো কবির স্বভাব। কোনো কবিই পরাজয় মানতে চায় না। সেই কালিদাস থেকে শুরু করে আজ অবধি কোনো কবি পরাজয় মানে না। কবি আরবের ইমরুল কায়েসের দিকে লক্ষ করলে দেখবে, শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে, কিন্তু পরাজয় মানেনি। আর একজন কবি পরাজয় মানবেই বা কার কাছে। একজন প্রকৃত কবির হারানোর কিছু নেই। হারানোর ভয় শিক্ষক ও অধ্যাপকদের। একজন প্রকৃত কবি আরো জানে সামনের দিকে তাকাতে এবং একজন প্রকৃত কবির উচিত সবসময় সামনের দিকে তাকানো।

প্রশ্ন: আপনার কবিতায় অনেক চিত্রকল্প থাকে। এ চিত্রকল্পের ব্যবহারকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আল মাহমুদ: আমি অন্য কোনো কবির সাথে নিজেকে তুলনা করতে চাই না। এখনো না। আগামী দিনও না। আমি নিজের সাথে নিজেকে তুলনা করে চলি। আমি আমার অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। যা দেখেছি, যা বুঝেছি, তা-ই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। তাছাড়া আমি আমার ছোট দেশটাকে ভালো করে জানি ও চিনি। আমি আমার দেশের অলিগলি দাবড়ে বেড়িয়েছি, এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত। কথায় আছে না, এমন নদী কই, যে নদীতে আমি সাঁতার কাটি না? আমার অভিজ্ঞতাই আমার সম্বল। আমার শব্দরাজি খুলে দেখো, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ব্যবহূত হয়নি, এমন অনেক শব্দ আমি আমার লেখায় ব্যবহার করেছি। বাংলা ভাষার আঞ্চলিক ডিকশনারি বের করেছি, সেখানে আমি দেখেছি আমার অনেক শব্দ। আমি মনে করি, এটা আমার পাওয়া।

প্রশ্ন: ডিকশনারি বা অভিধানের কথা যেহেতু বললেন, আরেকটা প্রশ্ন করে ফেলি। কবি ও ডিকশনারি কে কার ওপর নির্ভরশীল?

আল মাহমুদ: আগে বলো, অভিধান দেখে কি কেউ কবিতা লেখে? আমার তো এমনটা মনে হয় না। অভিধান কবির পেছন পেছন যায়। ধরো, অক্সফোর্ড ডিকশনারিটায় ‘খই’ শব্দ কোথায় আছে? দেখাও তো। ইংরেজরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য অনেক কিছু করলেও ‘খই’ শব্দটি ইংরেজি অভিধানে বসাতে পারে না। আমি উল্টেপাল্টে পেলাম না। বলো, এই যে ‘খই’ শব্দের উদ্বোধক কারা? নিশ্চয়ই কবি। বুঝতে হবে, কে কার পেছনে ঘোরে?

তবে জীবন অভিজ্ঞতার জন্য সহায়তাকারী অনেক বই পড়তে হবে। তুমি যে লিখতে এসেছ, তার জন্য নিশ্চয়ই মালমসলার প্রয়োজন? ওই মালমসলা হলো বই। প্রত্যেক কবির একটা দীর্ঘ প্রস্তুতি থাকে। থাকে আয়োজন। কী পরিমাণ অর্থ জানেন। থাকে ইমাজিনেশন। আর এগুলো তখন মস্তিষ্কে খেলা করতে থাকে। কোনটার সাথে কোনটার মিল হবে, অন্ত্যমিল কীভাবে দেয়া হবে। উপমা কী, উেপ্রক্ষা জানতে হবে। কবি যখন কবিতা ভাবনায় বসেন, তখন ইমাজিনেশন, শব্দ, ছন্দ, উপমা, উেপ্রক্ষা সব একসাথে কাজ করতে থাকে। সবগুলোকে সমানভাবে কন্ট্রোল করতে হয়। কবিতা কি এতই সোজা কথা! যে কেউ ইচ্ছে করলেই কবিতা লিখতে পারে না। আবার লিখলেই হয় বলা যায় না। প্রকৃত কবিরা ভেতরের সত্তাটাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন মাত্র।

জালালউদ্দিন রুমীর কথা ধরো, কত বড় মানের আধ্যাত্মিক মানুষ তিনি। কত বড় মাপের কবি। সেই রুমীর একটি দল ছিল, মৌলানা দল। তারা কেবল নাচত। ড্যান্সিং দরবিশ দল। যে অবস্থায় পড়লে অনেকেই ঘোরগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন তার কাছে মনে হবে আমিই সব। তার ধ্যান এতটাই উচ্চপর্যায়ে, যা সাধারণের চিন্তারও বাইরে। তখন সমানভাবে তার শরীরের সব অংশ কাজ করতে থাকে। কবিতা লিখতে গেলেও একজন কবির কবিতাবিষয়ক সব মেকানিজম কাজ করে। এজন্য বলা হয়, সবাই কবিতা লিখতে পারে না। এ কাজটা যে আবার সবসময় হয় তাও না। সব দিক সবসময় কাজ করবে না। তার জন্য একাগ্রতা থাকা চাই।

প্রশ্ন: বলা হয়, বর্তমান কবিতা আধুনিকতা অতিক্রম করে উত্তরাধুনিকতায় পৌঁছেছে।

আল মাহমুদ: উত্তরাধুনিক বিষয়ে আমি কিছু জানি না। যারা আধুনিক আর উত্তরাধুনিক বলে লাফালাফি করে, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, তার আগে বলুন, আধুনিকতার বয়স কত? আধুনিকতার বয়স ধরা যায় বড় জোড় ১০০ বছর। উত্তরাধুনিকতার প্রশ্ন এলে আবার আধুনিকতার সীমা নির্ধারণ করা আছে। এরপর উত্তরাধুনিকের কথা আসবে। এরপর আসবে কবিতার উত্তরাধুনিকতাবাদ বা উত্তরাধুনিকতাবাদ চর্চা। মানুষ কবিতা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! তাহলে একটা সময় কবিতা হবে সব সমস্যার সমাধান!

প্রশ্ন: কবিতা কি সব সমস্যার সমাধান?

আল মাহমুদ: এটা কথা প্রসঙ্গে বলা। এটা অন্য প্রসঙ্গ। আর কবিতার কাছে তুমি এত সমস্যার সমাধান চাও কেন? কবিতা কোনো সমাধান দিতে পারে না। অতএব কবিতার কাছে তোমার কোনো সমাধান চাওয়া উচিত হবে না। কবিতার কাছে প্রেম, কাম ও ভালোবাসা চাইতে পারো। এর অধিক নয়। কবিতা কাউকে নিশ্চয়ই বিল্ডিং বানিয়ে দিতে পারবে না। কেউ যখন কারো টাকা চুরি করবে, তখন সে তার সেই সমাধান কবিতার কাছে চাইবে না নিশ্চয়ই। (হা-হা-হা) কবিতা মানুষের মনে সাময়িক আনন্দ দেয়। কবিতা মানুষের মুখের ভাষাকে সমৃদ্ধতা জোগান দেয় শুধু।

প্রশ্ন: মাহমুদ ভাই, একবার আপনি বলেছিলেন, কবিতায় আধুনিকতার সূত্রপাত মূলত দেশভাগের মাধ্যমে। এটা কতটুকু প্রাসঙ্গিক?

আল মাহমুদ: আমি এমনটা বলেছিলাম?

প্রশ্ন: বলেছিলেন।

আল মাহমুদ: বললেও মনে নেই বা স্মরণে নেই। কবিতা মূলত চর্যাপদ থেকে শুরু হয়েছে। শোনো, চর্যাপদে কী ছিল তা দেখতে হবে। বাংলা ভাষার শব্দ, বাক্য এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষ করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। আর আমরা উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছি। এতে আগের ও পরের আমাদের এবং তোমাদের অনেক কিছু জানাও হচ্ছে। এই জানাটা কী? আধুনিক না উত্তরাধুনিক?

তবে দেশভাগের মাধ্যেমে যে বাংলা কবিতার সূত্রপাত হয়েছে, এটা অযৌক্তিক। দেশভাগের মাধ্যমে মূলত তিনটা দেশ তিনটা ভূ-খণ্ড হয়েছে। পরবর্তীকালে এসে আমরা বাংলা ভাষা ও স্বাধীনতা পেয়েছি। স্বর ও সুর পেয়েছি। অধিকার পেয়েছি। আমরা আমাদের মতো করে লিখতে পারছি। আমাদের জীবনযাপনই আমাদের শিল্প-সাহিত্যিকরা লিখে যাচ্ছে এবং পড়তে পারছে। এই যে পারাটা, পারাটা কিন্তু আমাদের অধিকার। আমরা যুদ্ধ করছি নতুনভাবে বাঁচার জন্য। বেঁচে থাকাটা শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে। এই যে নতুনভাবে শুরু করাটা আধুনিক।

প্রশ্ন: সাতচল্লিশের দেশভাগের পর আমরা একঝাঁক সাহিত্যিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পেয়েছি। দেখা গেল, সত্তরের আগে অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের আগেই আমরা একঝাঁক নিবেদিত সাহিত্যিক পেয়েছি। কিন্তু তার পরবর্তী সময়ে আমরা সেখানে কিছুটা হতাশ হয়েছি বলে মনে করি।

আল মাহমুদ: সবাই যে খারাপ লিখছে তেমন নয়। ভালো অনেক সাহিত্য আমাদের আছে। তবে এর মধ্যেও অনেক লেখক আছেন, যাদের লেখা আমার খুব ভালো লেগেছে। আর আমি অনেকদিন ধরে চোখে কম দেখি। কানে কম শুনি বলে এখন আর পড়া সম্ভব হয় না। আবার তেমনভাবে সবার নাম বলাও সম্ভব নয়। যেহেতু স্মৃতিশক্তির লোপ হয়েছে। আরো অনেক নাম আছে, যারা ভালো লিখে চলছে। তাদের সবার নাম বলা হয়তো সম্ভব না। কিংবা বললে দেখা যাবে, আমার ভালো লাগা নামটিই বাদ দিয়ে গিয়েছি। এগুলো বলতে গেলেও একটা প্রিপারেশন দরকার। আবার এখন এসব বলা মানে বাড়াবাড়ি হবে। অনেকেই ভালো লেখেন। আসল কথা হলো, ভালো কিছু কেউ যদি না লেখে, তাহলে ওই সেক্টরে কেউ টিকে থাকবে না। সম্ভব নয়। এত ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও বাংলা সাহিত্য যেহেতু টিকে আছে, তাহলে বুঝতে হবে, বাংলা সাহিত্যে কিছু না কিছু হচ্ছে।

প্রশ্ন: কবি ও কবিতা প্রায় একে অন্যের পরিপূরক। কিন্তু যখন কোনো কবি কোনো সম্প্রদায় বা কোনো দলের হয়ে যায়, সেটাকে কীভাবে দেখবেন?

আল মাহমুদ: বুঝেছি। এটারও জবাব আছে। জবাব থাকবে না কেন? কোনো কবিই কোনো কালে কোনো দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন না। হয়ে যান না। কবি যেকোনো অবস্থায়ই কবি থাকে। সাময়িক অবস্থায়ই একজন কবি একটি দলের আশ্রয় নিল। আসলেই কি আশ্রয় নেয়। প্রকৃত কবি যখন কোনো কবিতা লেখে, তখন সেটা কোনো দলের না হয়ে সেটা হয়ে ওঠে সর্বজনীনের। কবিরা আজীবনই নিঃসঙ্গ। রাজনীতির ঊর্ধ্বে তার অবস্থান। কবি যে চিন্তা করেন, রাজনৈতিক ব্যক্তিরা তা করলে দেশের উন্নতি হওয়াটা সময়ের ব্যাপার।

প্রশ্ন: শিল্প-সাহিত্যে এ রকম একটা আলোচনা থাকে যে দেশের প্রধান কবি একটি দলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকেন...

আল মাহমুদ: কিছু প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত। আবার কিছু প্রশ্নের উত্তর সময় দিয়ে দেয়। কবি আল মাহমুদ কোনো দলের লোক কখনই ছিল না। এটা কেউ বলতে পারে না। আমি সবার জন্য কবি। একজন কবির কাছে দেশের যে কেউ আসতে পারে। বিভিন্ন ব্যাপারে পরামর্শ গ্রহণ করতে পারে। সেটা গ্রহণ করা না করার দায়িত্ব কবির। কবি আল মাহমুদ কোনো দলের সাপোর্ট করে কবিতা লেখে না। যারা লেখে তাদের বেলায় সেটা প্রযোজ্য। কবি সবসময় কবি। আমি এখন যেমন কবি, আজ থেকে ৫০ বা ১০০ বছর পরও কবি থাকব। কেউ আমাকে রাজনৈতিক দলের নেতা বলবে না। যেমন কোনো নেতাকে কবি বলবে না। (হি-হি-হি)

প্রশ্ন: অনেকেই আপনাকে মৌলবাদী কবি বলে থাকেন।

আল মাহমুদ: সময় অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়। যারা আমাকে এসব কথা বলে, আমি কি তার প্রতিবাদ করতে যাই? আমি চোখে দেখি না। কানে কম শুনি। হাঁটতেও পারি না ঠিকমতো। এ অবস্থায় আমার শোনা ছাড়া আর কিছু করার আছে?

প্রশ্ন: এটা আপনি সবচেয়ে ভালো জানবেন।

আল মাহমুদ: প্রতিবাদ করতে যাই না। যখনই সময় আসে, তখনই দেখা যায়, তাদের অনেকেই আমার আশপাশে ঘুরঘুর করে। আমি তখন তাদের গ্রহণ করি। আমি বিশ্বাসী মানুষ। দলছুট হবে। আবার আসবে। আমি আমার বিশ্বাস নিয়ে কাজ করি এবং প্রার্থনা করি। এটাই আমার বৈশিষ্ট্য। যারা আমার নিন্দা করে, আমি তাদের প্রতিবাদ করি না। হয়তো তারাও একদিন বুঝবে। পৃথিবীতে অনেক বড় বড় কবি জন্মেছেন। তারা কিন্তু বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন। তাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ একজন। তিনি কিন্তু বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন। তার বেলায় যে এমন কথা ওঠে না। আমি এ ব্যাপারে আর কথা বাড়াতে চাই না। আশা রাখি, এখানে এই প্রশ্ন শেষ।

প্রশ্ন: মাহমুদ ভাই, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। অনেক কথা হলো।

আল মাহমুদ: তোমাকেও ধন্যবাদ।