বাংলার প্রকৃতি স্বাস্থ্যোজ্জ্বল, সবসময়ই উচ্ছল; যৌবনের জয়গান তার সহজাত। শত অপমান, অবমাননা, বিপর্যয়েও সতেজ, সহজ। প্রকৃতিকে দুমড়ে মুচড়ে দিলেও অন্তর্লীন শক্তিতে নিজেই আবার মাথা টানটান। উর্বর এ মাটি, বাংলার মানুষের মন। প্রেমের কামের বাসনা আকাশছোঁয়া, স্বপ্নধোয়া, দ্বিধাহীন। আল মাহমুদের গল্প সৃজনের সময়কালে রাষ্ট্রের নাগরিকের ক্রমাগত পরিবেশ বিনাশ বিনষ্ট করেনি ঋতুবিন্যাস, বর্তমানের মতন একের ভেতরে অন্যে বাঁধেনি বাসা। প্রতি ঋতু আলাদাভাবেই অনুভূত হতো সংবেদনশীল মানুষের সব ইন্দ্রিয়তে। আমরা যদি ধারাবাহিকভাবে তার গল্পমালা পড়ি, দেখব পরিবেশের ও মানুষের প্রকৃতির প্রেম এবং এই দুইয়ের বিপর্যয় কেমন করে ঘটানো মানুষের পক্ষেই সম্ভব! গল্পগুলো যার কিনা দালিলিক উদাহরণ। পানকৌড়ির রক্ত, কালো নৌকা, জলবেশ্যা, রোকনের স্বপ্নদোলা এবং বুনো বৃষ্টির প্ররোচনা—গল্পসমগ্রের প্রথম পাঁচ গল্প নিয়ে আমাদের আলাপ এগিয়ে নেয়া যাক।
****
নতুন জামাইয়ের পাখি শিকার ও স্ত্রীসংসর্গের গল্প ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রায় চিত্রকলার সৌন্দর্যে চিত্রায়িত। এ যেন গল্প নয়, একখানা চিত্রশালার প্রদর্শনীমালা। পাখির ও নারীর রক্ত এখানে একাকার।
‘বিল শুকিয়ে গিয়ে কাদাটা হয়েছে বনশুয়োরের চামড়ার মতো ভারী আর নরম’, শীতের মাঝামাঝিতে এমন এক বিলে পাখি শিকাররত গল্পের উত্তম পুরুষ। এখানে পাখি গুলির আঘাতে ‘তাসের ঘরের মতো পানির ওপর শাদা দুটি বড় পাখা খুলে বিছিয়ে’ দেয়। দ্বিতীয় পাখিটি কালো, তার চঞ্চলতায় ‘জীবিকাজয়ী প্রাণীর দর্প’ ফুটে বের করে। স্ত্রীর গায়ের রঙ বিষয়ে উত্তম পুরুষের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য: ‘ময়লা বললে যেমন একটা মায়া-মমতাময় কালো রঙকে বোঝায়, আমার স্ত্রীর গাত্রবর্ণও তেমনি।’ পাখি শিকারিকে দেখে ‘দ্রুত অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে’ ‘ঢেউয়ের দিকে গলা লম্বা করে কাঁথার ওপর সুঁচ গাঁথার মতো শরীরটাকে পানির ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে ডুবে গেল’। হবু স্ত্রীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে স্ত্রীর ‘বেণীর ফণায় দুটি শাদা গোলাপ গোঁজা’ এই অভাবিত বাক্য, বেণীকে ফণা হিসেবে কল্পনা একজন খাঁটি প্রেমিক কবির পক্ষেই তো সম্ভব। আমাদের কারো কারো মনে পড়বে সেই অমর গান, অকারণে, ‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন... ’। দুই শ্যালিকা প্রথম পাখিটিকে বিছিয়ে দেয়ার পর তার ‘গাঢ় সবুজ পা বর্ষাধানের ঝরাধানের লকলকে ডাঁটার মতো পেছন দিকে বিছিয়ে থাকল।’ দ্বিতীয় পাখিকে গুলি করার পর ‘পাখিটার লাল রক্ত, সবুজ জল ও তার গাঢ় কালো পালকের আলোড়নে যন্ত্রণাদায়ক এক বর্ণের সমারোহ সৃষ্টি করে আমাকে স্তম্ভিত করে দিল।’ উত্তম পুরুষ প্রবল মাথাব্যথা নিয়ে ঘরে ফেরে। স্ত্রী জানান দেয়, ‘আজ হবে। ব্যাপারটা বন্ধ হয়েছে।’ গল্পের শেষ দিক অজস্র রঙে চোখ ঝলসে দেয়। দেখুন পাঠক: ‘আদিনা বিছানায় উঠে এলে আমি তাকে বুকের কাছে টেনে আনলাম। আমার ব্যথার কোনো উপশম নেই। আদিনা তার বুক দিয়ে আমার মুখমণ্ডল ঢেকে দিলে আমি পানকৌড়ির পালকের মতো গাঢ় কালো রঙের মধ্যে আমার জোড়া ভ্রমরের মতো জ্বালাধরা চোখ দুটিকে ডুবিয়ে দিয়ে স্বস্তি পেতে চাইলাম। আস্তে আস্তে কালো পালকের মতো অন্ধকার ফিকে হতে লাগল। লিকার-ভরা চায়ের কাপে ফোঁটা ফোঁটা দুধ মেশালে যেমন হয়, অনেকটা তেমনি। কিম্বা পাঙাশ মাছের পেটের মতো এক ধরনের ভোর-ভোর অবস্থা এসে আমার চোখের অন্ধকারকে হালকা করে দিল।’ আল মাহমুদ প্রথম গল্পেই নারী ও প্রকৃতি, শিকার ও রতিবিভঙ্গ জলরঙের কুশলতায় আঁকেন। বনফুলের ‘ভুবন সোম’ পড়েছিলেন কিনা লেখক জানতে ইচ্ছা করে মাঝে মাঝে।
****
‘কালো নৌকা’ সমুদ্রগামী জেলেদের গল্প, যেখানে পরিবার-পরিজন প্রায় নিখোঁজ হয়ে যায়। মানুষ একটি নিরাপদ সংসার পেতে চেয়ে পায় না। নিয়তি পরিশ্রমী মানুষের জীবনকেও তছনছ করে দেয়। রাসু জলদাস, এ গল্পের নায়ক; নিজের ছেলের সমুদ্রে নিখোঁজ হওয়ার বেদনা এবং স্ত্রীর মৃত্যুবেদনা সহ্য করে। পুত্রবধূ উন্মাদ ঘুরে বেড়ায় নগ্ন দেহে, এই দৃশ্যও সয়ে যেতে হয়। একদিন মদ খেয়ে নিজের ধীরস্থির সংযত স্নায়ুকে বিপদের প্রান্তসীমায় ঠেলে দিতে হলো তাকে। পুত্র দামোদর আর স্ত্রী সতীর অনুপস্থিতি তার নিজস্ব যুক্তিজাল ভেঙেচুরে দেয়। পুত্রবধূর সঙ্গেই শরীরের ভেতর দিয়ে কোনো একটা সম্পর্কে সম্পর্কিত হতে চায়, মেয়েটির উন্মাদদশার সুযোগে। কিন্তু নিয়তি! শেষ তিন লাইনে নিয়তি সব ছিন্ন করে দেয়: ‘জোয়ার তখন নৌকাটাকে ঢেউয়ের ওপর ভাসিয়ে দিয়েছে। বঙ্গোপসাগরের নোনা বাতাসের গতি মধ্যরাত্রে ডুবন্ত বেলাভূমির ওপর দিয়ে হু-হু করে বইতে লাগল। আর বাতাসের সাথে ঘুরপাক খেতে খেতে একটা চালকহীন কালো নৌকা অন্যায় ঢেউয়ের ওপর দুলতে দুলতে নিরুদ্দেশের দিকে ভেসে গেল।’
‘রোকনের স্বপনদোলা’ খুব সাদামাটা এক গল্প। স্ত্রীকে নিয়ে রেলভ্রমণের সময় সামনে বসা নারীটিকে দেখে চেনা লাগল। অনেক ভেবে টের পায় প্রাকবিবাহকালে যে কয়েকজন নারীকে বিবাহেচ্ছায় দেখে বেড়িয়েছিল, ইনি তারই একজন কিন্তু তখন মুখোমুখি এতটাই জড়সড় হয়ে বসেছিলেন, তার সৌন্দর্য এই গল্পের সময়কালে, সামনে বসে থাকা পূর্ণ রাতের মতো দৃশ্যমান হয়নি। রোকনের স্মৃতিতে নারীদের মিছিল যেভাবে আবির্ভূত হয়, আমার মনে পড়ে গিয়েছিল ভুবনজয়ী পরিচালক ফ্রাসোয়া ত্রুফোর ‘দ্য ম্যান হু লাভড উইম্যান’ চলচ্চিত্রখানি; যে সিনেমায় মানুষটির শেষকৃত্যে রাশি রাশি মেয়ে আসে, মিছিল সমারোহে। গল্পটির ঘটনা ঘটে রোকনের স্বপ্নের ভেতর। পুরুষ হূদয়ের একটি নিয়মহীন জান্তব যৌনবৈশিষ্ট্য এই গল্পের কাহিনীভাগ মাংসল করেছে। এমনকি ঘুম ভেঙে গেলে সীতাকুণ্ড স্টেশনে এসে রেল থামলে—‘বাইরে, পূর্বদিকে চন্দ্রনাথ পাহাড়কে ধরিত্রীর বিশাল পাথুরে স্তনের মতো মনে হলো। তার ফাঁক দিয়ে সূর্যের অর্ধাংশকে মনে হলো এক অভাবিত উজ্জ্বল ধাতুর লকেট।’
‘জলবেশ্যা’ গল্পের জায়গা-জমিন লালপুর হাট ও সন্নিহিত মেঘনা নদী, নদীর ভাসমান নারী, যারা শরীর বিক্রি করে উপার্জন করে। প্রকৃতির চেহারাটা লেখকের কলমেই দেখে নেয়া যাক: ‘ওপারের গ্রামগুলোকে একটা ক্ষীণ কালো রেখার মতো দেখা যাচ্ছে। রেখার মধ্যে দু-একটা আলোর ফোঁটা, দুধের ফোঁটার মতো স্পষ্ট হয়ে আছে। বেদেদের ঝাঁকবাঁধা নাওগুলোর আলো নদীর ছোট ছোট ঢেউয়ে প্রতিবিম্ব তুলে একটা অখণ্ড আলোর মালার মতো ভাসমান মনে হচ্ছে। কিম্বা মনে হচ্ছে, নদীর ভেতরে নুয়ে পড়া কয়েকটা হিজল গাছকে যেন এক ঝাঁক অতিকায় জোনাকি ঘিরে ধরেছে।’ আবিদ বেপারী এক মাতৃহারা ছেলে, বাপে খেদানো, হাটে দালালি করে খায়। মায়ের কবরস্থানের দিকে চিৎসার করে যখন বলে: ‘মায়ো, বাজান আবার এক বেডিরে বিয়া কইরা আমারে খেদাইয়া দিছে। জমিজিরাত কিছু দেয় নাই। আমি বাজারে ব্যবসা করি, দালালি করি। ভালাই আছি। তুই হুনছ মায়ো, আমার কতা? হুনছ?’ আকাশ ব্যাপ্ত করে তারার ভেতর তখন ‘সাপের ডিমের মতো শাদা চাঁদ’ দেখা দিয়েছে। এই গল্প প্রতারণার। এই গল্প জলে ভেসে বেড়ানো বেশ্যার যাবতীয় পুরুষের ওপর প্রতিশোধ নেয়ারও এক গল্প। একটি অনন্য সঙ্গমসম্ভাবনা বেদেনীর পরিকল্পিত পায়ের আঘাতে ঝুপড়িখোলা সাপের ছোবলে কেমন করে ছিঁড়েখুঁড়ে যায়, তা না পাঠ করলে পাঠককে ধরিয়ে দেয়া অসম্ভব। এবং এ কারণেই আল মাহমুদের যে তিন গল্প প্রজন্ম অন্তরজুড়ে, ধ্যানী পাঠক মাত্রেরই পরিচিত তার একটি ‘জলবেশ্যা’।
‘বুনো বৃষ্টির প্ররোচনা’ ইটের ভাটার ব্যবসায়ীর মনোদৈহিক জটিলতার গল্প। সমান্তরালে তার প্রকাশ্যে নারীবান্ধব স্ত্রীর একান্তে গৃহকর্মীর ওপর খড়্গহস্ত হওয়ার গল্প। এই গল্পে গল্পকার পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলাফল সম্পর্কে ভাবেন। ভাবেন হিমালয়ের যে চূড়োয় বাতাস ধাক্কা লেগে ফেরে, তা না থাকলে বা খানিক নিচু থাকলে কী হতো! আকাশ থেকে ঢাকা শহরকে অচেনা লাগে মাহমুদের। অন্তরের চোখ দিয়ে এমনকি প্রাচীন নগরের আত্মাকে দেখে। তার মনে হয়: ‘... মানচিত্রটা হলো একটা ফালতু ব্যাপার। ব্রহ্মাণ্ডের শুধু একটাই মানচিত্র হতে পারে মাহমুদ ভাবল, আর তা পর্বত, নদী, সমুদ্র ও নোংরা নগরাদির চিহ্নহীন একটা নিরেট সবুজ বলের অনুরূপ। অবশ্য এ ধরনের কোনো মানচিত্র বেশ চালাকচতুর হয়ে ওঠা মানবজাতির কোনো কাজে লাগবে না।’ ‘ইথারের ওপর শাদা উটপাখির ডিম’-এর মতো সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী, যা কিনা সিগারেট হতেই সৃষ্ট, দাবি করে বসে গৃহকর্মীর পুরো জীবদ্দশার মাইনে। কারণ হিসাবে বলে: ‘তেইশ বছর যাবত সে পৃথিবীতে আছে। খাটছে। যা কিছু ধুয়ে দেবার ধুয়ে দিচ্ছে। যা কিছু ফলিয়ে তুলবার ফলিয়ে দিয়েছে। তার শরীর তুমি দেখেছ। কোনো খুঁত নেই। তার সাধ্যমতো সে ভরিয়ে রেখেছে। গড়ে তুলেছে। এখন তার পাওনা মিটিয়ে দিতে হবে না?’ এইভাবে একজন কর্মী মানুষের পুঁজিবাদের কাছে কেবল নয় সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের কাছে প্রাপ্য সম্পর্কে আমাদের চেতনাটা জ্যান্ত করেন আল মাহমুদ।
এই পাঁচ গল্পে আমরা দেখতে পাচ্ছি গল্পের চরিত্ররা অনেক বেশি শরীরকাঙাল। লুকিয়ে-চুরিয়ে নানাভাবে নারী শরীরের নানা মণিমাণিক্যের সন্ধান তারা দক্ষ ডুবুরীর কায়দায় করতে চায়। কোথাও প্রতারণা অনুষ্ঠিত হয়, কোথাও এমনকি অজাচারের অন্যায়ে গল্পের বর্তমান অগ্রাহ্য করে ভেসে যায় দুটি নারী-পুরুষবাহী নৌকা। পরের তিন গল্পে লেখকের সন্ধানের অনেকটাজুড়ে মানুষের মন।
২
‘মাংসের তোরণ’ গল্পের তরুণ প্রকৌশলী পয়সার বিনিময়ে কিনতে চেয়েছিল নিটোল নারীদেহ। কিন্তু এই নারী একইসঙ্গে জননীও। ছেলের স্কুলব্যাগ কিনে দিতে হবে পরদিনই। তাই ধনী পুত্রের খামখেয়ালের কাছে ভেসে গেলে তার চলে না এবং এ কারণেই বিন্দুমুহূর্তের জন্য প্রকৌশলী জননীর ভুল বোঝা আবেগের জন্য ক্ষণিকের জন্য বর্তমান বিস্মৃত হলেও তাকে টাকাটা ঠিকই তুলে নিতে হয়। এবং যাওয়ার বেলায় মাতাল ও ঘুমে প্রায় তলিয়ে যাওয়া আনজামের কাছে হয়তো পয়সাটা সঠিক উপার্জনের জন্যই সে নগ্ন হয়ে দাঁড়ালে আমরা বাংলা গল্পের ম্যাজিক দেখি ‘আনজাম দিলারার শাদা তলপেটের ওপর বাতিটার সবুজ আলোর বিকিরণ দেখতে লাগল। কিন্তু মাথা বা বাহু কিছুই নাড়াতে পারল না। তার স্থিরনিবদ্ধ চোখে দিলারার বিস্তৃত সবুজাভ নাভিমূলকে বাংলাদেশের মানচিত্র বলে মনে হলো কিনা, কে জানে। কারণ সেখানে এককালের সন্তান ধারণের ফাটল অর্থাৎ বলিরেখা সুস্পষ্ট থাকায় চিহ্নগুলো মাতাল চোখে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বা ধলেশ্বরী বলে ভাবা এখন আনজামের পক্ষে বিচিত্র নয়।’
চিররোগা একটি মেয়েকে গভীরভাবে ভালোবাসার গল্প ‘ভেজা কাফন’। দুনিয়ায় কোনো কোনো প্রেমে মানুষ এমনভাবে, এমন আক্ষরিক অর্থে ‘পড়ে’, যেখানে উদ্ধারের পথ থাকে না। এই নূরী মেয়েটি যার গোড়ালিকে গল্পের নায়কের মনে হতো ‘বোশেখের মেঘের ফাঁকে বিদ্যুতের চমক’, যে কিনা লিখত প্রচুর চিঠি, সে মরে গেছে। মাত্র পাঁচ পৃষ্ঠার গল্পে মেয়েটির স্পষ্টবাদিতা, প্রেম, অঝোর পত্রাবলি, যৌন তৃপ্তি ও অতৃপ্তি, সন্তান আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও মরে যাবে জেনে মা না হওয়া সব এমনভাবে চিত্রনাট্যধরনে উল্লিখিত যে মনের ভেতর প্রচণ্ড শুকনো এক হাহাকার চৈত্র দুপুরের অনেক ঝরাপাতার ঘূর্ণির অভ্যন্তরভাগের মতো শূন্যতা তৈরি হয়। ‘আমি দেখলাম নূরীর নাকফুলটি তার নাকে না থাকায় চিরচেনা মুখটি বড়ো অপরিচিত লাগছে। মাঝে মাঝে আমাদের বাড়ির পুকুর থেকে যখন লাল শাপলার গুচ্ছ তুলে ফেলা হয়, তখন পুকুরের টলটলে পরিচ্ছন্ন পানিকে যেমন লাগে তেমনি।’ শেষ দুই বাক্য পাঁচ পৃষ্ঠার গল্পকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
‘নীল নাকফুল’ সে-ই চিরপরিচিত বৃদ্ধ জোতদারের গৃহকর্মী সুন্দরী তরুণীকে বিয়ে করার গল্প হলেও এ গল্প জোতদার, ভূমিহীন কৃষক, মজুর—এই চরিত্রদের তাদের আচরণ, খাদ্যাভ্যাসসহ এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে এটি বাংলাদেশের শস্যফলনের গল্প, এখানেও শস্য ও নারী সমার্থক। গল্পকার বড়ো নিষ্ঠুর কেন না ওসমানকে একটা অসহ্য বেদনাভার চেপে রেখে কদমবুসি করতে হয় ছোট চাচীকে। আহা! সে কী তখন প্রেমিকার পা স্পর্শের বিন্দু আনন্দ পেয়েছিল! কিন্তু নীল নাকফুল তবু সে স্মৃতির অলংকার করে রাখেনি।
বাংলা কবিতা যতটুকু বুঝি, বাংলাদেশের সবচেয়ে অনুভবী-পরিশ্রমী কবি আল মাহমুদ।
অনেকেই জানবেন, মুক্তিযুদ্ধের আগেই কলকাতায় সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও তার বন্ধুরা যে মিনিবুক আন্দোলন গড়ে তোলেন, ছোট বুকপকেটের মতো বইয়ের সেই বই সিরিজে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি ‘সোনালী কাবিন’ ও তিনি।
আমাদের ছদ্ম প্রগতিশীলতা যা কিনা কবিতার বিশুদ্ধ অবয়ব না বুঝে তার ওপর রাজনীতি আরোপ করে, তারা শেষ বিচারে বাংলা কবিতার শত্রু।
আমার কাছে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার দুষ্প্রাপ্য একটি সংখ্যা আছে। সেখানে শামসুর রাহমান আর আল মাহমুদ দুই বন্ধুর কবিতা পাশাপাশি। বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে বড় কবিতাবোদ্ধার সমস্যা হয়নি। আমরা কবিতার চেয়ে রাজনীতি বেশি বুঝি, তাই তাকে ভালোবাসতে, মর্যাদা দিতে আমাদের সমস্যা হয়। আট গল্পের ধারাবাহিক পাঠে আমরা দেখলাম বাংলা সাহিত্যের সম্পদ এ গল্পগুলো অস্বীকার করলে আমরা আমাদের নির্বুদ্ধিতারই প্রকাশ ঘটাব।






