এলাকাটাকে বলা হয় পাথরের নির্জনতার সাক্ষী। কেউ জিজ্ঞেস করে না, এমন শত শত প্রশ্নের জবাব নৈঃশব্দের মধ্যে নির্মিত হতে হতে পাথর হয়ে আছে। এজন্যই এলাকাটি পাথরের পচিনা। এ এলাকায় সাধারণত মানুষ জরুরি কোনো কাজ না থাকলে যায় না। আর গেলেও যাওয়ার আগে প্রভুর কাছে প্রার্থনা করে—আমি এই নিষিদ্ধ নগরীতে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। আমার কোনো লোভ নেই, আমার কোনো লালসা নেই। এই মৃত নগরী হাজার হাজার বছর আগে ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়েছিল বলে শোনা যায়। যেহেতু এই পরিত্যক্ত নগরীতে কারো কোনো প্রয়োজন না থাকলে প্রবেশের আয়োজন থাকে না। কেউ যায় না। সেহেতু কেউ সেখান থেকে কোনো কিছু বাইরে এসে তা প্রচারও করে না। সে কারণে প্রচারহীন, প্রবেশহীন নিষিদ্ধ এলাকারূপে এ উপত্যকা এখনো পড়ে আছে। কেউ তেমন যায় না। গেলেও দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে।

এ এলাকাকে বহুকাল ধরে নিষিদ্ধ এলাকা বা আল্লাহর গজব নেমে আসার স্থান বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। কেউ কেউ গবেষণার কাজে গেলে প্রয়োজন ফুরালেই দ্রুত বেরিয়ে আসে। কোনো অভিজ্ঞতার কথা সাধারণত প্রবেশকারীদের মুখে শোনা যায় না। শুধু এটুকুই জানা যায় যে হাজার বছর আগে এ স্থানে একটি জাতি বসবাস করত। তারা অস্বাভাবিক যৌন আচরণের কারণে সৃষ্টিকর্তার গজবের শিকার হয়েছিল। আর গজবে এ জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়। মুখে মুখে শোনা যায়, কওমে লুত এখানকার বাসিন্দা ছিল। তারা অস্বাভাবিক যৌন আচরণের মত্ততায় ভুগত। এজন্য আল্লাহ তাদের ওপর গজব নাজিল করেন। তাদের ধ্বংস করে দেন। যারা খোদার আদেশকে মান্য করে চলত, কেবল তারাই কয়েকজন রক্ষা পেয়েছিল। এই রক্ষা পাওয়া মানুষগুলোকে বলা হতো কওমে লুত। লুতের জাতি। তারা এতটাই অস্বাভাবিক যৌন আচরণে মত্ত ছিল যে তাদের স্বাভাবিক মানুষ বলা যায় না। এই অস্বাভাবিক যৌন আচরণ থেকে তাদের উদ্ধারের জন্য মাঝে মাঝে আল্লাহর তরফ থেকে সাবধানতার বাণী এসে হাজির হতো এবং নানারূপে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করে তাদের জীবনকে সত্পথে আনার চেষ্টা করা হতো। কিন্তু তারা এতই অনাচারে, অসৎ কর্মে লিপ্ত ছিল যে তারা আপন-পর কিছুই মানতে চাইত না। ফলে এদের ওপর আল্লাহর গজব আসন্ন হয়ে পড়েছিল।

লুত তাদের বাঁচানোর জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে লাগলেন। আল্লাহ তার প্রার্থনার জবাবে বললেন, হে লুত, আমি তোমার জাতির মধ্যে কয়েকজনকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। তবে তোমরা আমার গজবের নির্ধারিত কারণ হয়ে পড়েছ। অচিরেই তোমাদের ওপর ধ্বংস নেমে আসবে। তবে তোমরা যারা আল্লাহকে ভয় করতে, তাদের জন্য একটি সুসংবাদ! তোমরা সমূলে বিনষ্ট হবে না। তোমাদের মধ্যে কয়েকজন সত্কর্মে লিপ্ত মানব-মানবী এখান থেকে উদ্ধার পেয়ে হিজরত করবে। তোমরা হিজরতের জন্য প্রস্তুত হও। এ কথার আড়ালে আল্লাহর মহাগজব যেন বিদ্যুতের আভায় মুখ দেখিয়ে দিল। ধ্বংস আসছে। পলায়নের স্থান নেই। শুধু আমার নির্দেশ অনুযায়ী যারা পেছন ফিরে না তাকিয়ে এই নিষিদ্ধ নগরী থেকে বেরিয়ে যাবে, কেবল তারাই রক্ষা পাবে। এ কথায় সমস্ত এলাকার ওপর যেন বিদুৎ চমকে ঝিলিক দিয়ে গেল। মৃত্যু আসছে এই উপত্যকায়। আল্লাহর আদেশ অমান্যকারীরা ধ্বংস হবে। আর যারা আল্লাহর আদেশের জন্য বুক পেতে দিয়ে নির্দেশ পালনের অঙ্গীকার করতে থাকবে, কেবল তারাই রক্ষা পাবে।

এ অবস্থায় ধ্বংসের বাতাস এই মৃত মহানগরীর ওপর দিয়ে শো শো শব্দে বইতে লাগল। তখন একজন কবি এই নগরে প্রবেশ করে। কারণ ধ্বংসের ভেতরেও চিন্তাশীলদের জন্য থাকে নিদর্শন। চারদিকে বিরানভূমি। খাঁ খাঁ করছে বিস্তৃত অঞ্চল। পাথর আর বালি ছাড়া কিছু চোখে পড়ছে না। কবি পাথরে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখে। তারপর হতাশ হয়ে ফিরে আসে। তখন পেছন থেকে একটা গায়েবি আওয়াজ ভেসে আসে। কে যেন কবিকে নাম ধরে ডাক দেয়। শহীদ... শহীদ...। শহীদের বাল্যকালের প্রেমিকা মহুয়ার কথা মনে পড়ে। শহীদ ফিরে আসে পাথরের দিকে। পাথরের গায়ে ঠোঁট সদৃশ একটা হরফ দেখে কবির প্রাণ আনন্দে দুলে ওঠে। হায়! এটা তো তার বাল্য প্রেমিকার নাম! হ্যাঁ, তার পূর্বপুরুষেরা তো এই ভাষায় কথা বলত। এই ভাষার জন্য তারা লড়াই করে। প্রাণ দেয়। আস্তে আস্তে পাথরটা ছুঁয়ে দেয় শহীদ। সাথে সাথে করুণামিশ্রিত কণ্ঠে বিলাপ করে পাথরটা। আমাকে রক্ষা করো। তখন শহীদ বলে, তুমি তো আমাকে ফেলে চলে গিয়েছিলে। তবে কেন আবার আমার কাছে ফিরে এলে। আর কেনই বা এই মৃত নগরীর মধ্যে তুমি এসেছিলে? মহুয়া কোনো উত্তর দেয় না। শুধু বলে, দেখো, আমি অনেক লোভী ছিলাম। তোমার ভালোবাসা উপেক্ষা করে সত্যি অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি। কিন্তু তুমি তো কবি। আমাকে ফেলে যেয়ো না। আমাকে ক্ষমা করো। কবির প্রাণ পাথরের স্পর্শে গলতে শুরু করে। শহীদ পাথরটাকে শাহাদাৎ আঙুল দিয়ে আরো একবার পরখ করে। পাথরটাকে উল্টিয়ে ফেলার সাথে সাথে মহুয়া পুনর্জন্ম লাভ করে। শহীদ ভয়ে কথা গুলিয়ে ফেলে। মহুয়া আর শহীদ অভিশপ্ত নগরী থেকে বেরিয়ে আসে।

এতদিনে শহীদ নতুন সংসার শুরু করেছে। সে মহুয়াকে সবকিছু খুলে বলে। মহুয়া শহীদের বাহু ধরে বলে, দেখো, আমার একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে। ইচ্ছে করলে তুমি আমায় লুকিয়ে রাখতে পারো। শহীদ অবাক হয়ে মহুয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কবির মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কীভাবে তোমাকে লুকিয়ে রাখব, জিজ্ঞেস করে শহীদ। কেন, আমি তোমার হাতের ছোঁয়ায় আবার ছোট্ট পাথর হয়ে যাব। তুমি রাতে আমাকে পাশে নিয়ে ঘুমাতে পারবে। তোমার বালিশের পাশে আমাকে রাখতে পারবে। যখন খুশি তুমি ছুঁয়ে দিলে আমি আবার মানবী হয়ে তোমাকে দেখা দেব। যদি অন্য কেউ এ পাথর ছুঁয়ে দেয়, বলে শহীদ। তুমি ছাড়া অন্য কেউ আমাকে ছুঁয়ে দিলে বুঝতে পারব। তুমি চিন্তা করো না। তবে শোনো, আমি নতুন করে জীবন পাওয়ায় কামনা-বাসনা বেড়ে গেছে খুব। আমাকে তোমার আলিঙ্গনে রেখো। চুম্বন করো, গোপনে।

কিন্তু ঘরে যে আমার ছেলে, মেয়ে, বউ আছে।

তাহলে আমাকে অন্য কোনো ঘরে রাখো। সেখানে তুমি আমাকে সময় দেবে।

তাহলে কি আমি পরিবারের সাথে প্রতারণা করছি না?

হঠাৎ রাতে শহীদের ঘুম ভেঙে যায়। সে বালিশের নিচে রাখা পাথর খুঁজতে থাকে। না পায় না। কোথায় গেল পাথর! তার মনে পড়ে, পাশের ঘরে রেখেছিল। সেখানে গিয়ে উঁকি মারে শহীদ। সে ভয়ে কাঁপতে থাকে। মহুয়া অপরূপ সুন্দরী সেজে অন্য অনেক নারী সঙ্গীর সঙ্গে ঊরুমৈথুনে কামার্ত হয়ে আছে। তাদের সবার মুখ দিয়ে অসভ্য গোঙানি বের হচ্ছে। একে অন্যের মুখে তারা চুমু খাচ্ছে। শহীদ অচেতন হয়ে পড়ে যায়। পরে সে আবিষ্কার করে, সেই মৃত নগরীর পাথরের কাছে দাঁড়িয়ে আছে কবি। তখন মনে পড়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরীর কওমে লুতের জাতির কথা। লুতের স্ত্রী সেই ধ্বংসে নিমজ্জিত হয়েছিল। তখন শহীদ ভাবে, এই পাথর-বালি সব যেন তাদের পাপের শাস্তি ভোগ করছে।

মগবাজার, ঢাকা। ১৫.০৯.২০১৫

 

[যেভাবে লেখা হলো গল্পটি:

কোনো এক শরতের সকালে (সম্ভবত ২০১৫ সালের আগস্টের শেষ দিকে) কবি আলতাফ শাহনেওয়াজ আর আমি হাজির হয়েছিলাম আল মাহমুদের বাসায়। তখন আমার বাসা মুগদা-মাণ্ডা। বলা চলে, ঢাকা শহরের বাইরে! আর অফিস তেজগাঁও, যায়যায়দিন।

প্রথম দিন পরিচয় পর্ব। নানা কথাবার্তা হলো। যেহেতু উদ্দেশ্য কবি আল মাহমুদকে দিয়ে একটি গল্প লেখানো, ঠিক হলো প্রতিদিন সকাল আর সন্ধ্যায় আমি মাহমুদ ভাইয়ের কাছে হাজির হব। উনি গল্পটা ভেবে রেখে মুখে বলবেন, আমি টুকে নেব। শেষ হওয়ার পর উনি আবার ঠিকঠাক করে দেবেন।

কাজ শুরু হলো। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় (২-৩ ঘণ্টা) বসে থাকি, আল মাহমুদ ভাবেন, তারপর আমাকে দশ লাইন/বিশ লাইন করে গল্পটি বলে যান। পরের দিন আবার প্রথম থেকে ওনাকে পড়ে শোনাতাম। আবার ভাবনায় ডুব দেয়া। এভাবে প্রায় ১৫ দিন একনাগাড়ে যাওয়ার পর একটা গল্প লেখা শেষ হলো।

গল্পটি দেশের শীর্ষ স্থানীয় একটি দৈনিকে ছাপা হওয়ার কথা থাকলেও ঠিক কী কারণে জানি না, ছাপা হলো না। দীর্ঘদিন ধরে আল মাহমুদের এ গল্প আমি সযত্নে সংরক্ষণ করে এসেছি। আল মাহমুদ নিজেও গল্পটির কথা ভুলে গিয়েছিলেন। নয়তো তার অপ্রকাশিত কোনো কিছু থাকা প্রায় অসম্ভব।

তার মৃত্যুর পর গল্পটি ছাপা হচ্ছে!

পলিয়ার ওয়াহিদ]