আবিদ আজম, ভূমিকা
কবিতা লেখার দাবি জানালে খুশি হওয়ার চেয়ে অধিক গম্ভীর আর ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়তেন অপরাজেয় কবি আল মাহমুদ। তার ঈষৎ কম্পিত চেহারার দিকে তাকিয়ে তখন আমার মনে হতো, কোনো প্রার্থনারত মুনি, ঋষি বা আধ্যাত্মিক সুফি দরবেশকে যেন আমি দেখছি, যিনি মন্ত্র-শ্লোক-বাণী আওড়াচ্ছেন, তারুণ্যের আনাড়ি হাতে আমি তা লিপিবদ্ধ করছি কাগজে। প্রায় দেড় দশকের পরম ভাগ্যবান এক শ্রুতলেখক-ছায়াসঙ্গী হিসেবে আমার মনে হয়েছে, তার এ সময়ের অধিকাংশ কবিতাই মৃত্যুগন্ধী; যা রচিত হয়েছে প্রেম, প্রকৃতি, প্রার্থনাসহ বিচিত্র বিষয়কে উপজীব্য করে। স্বীকার করতেই হবে, কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও এসব কবিতার অধিকাংশই আল মাহমুদকে লিখতে হয়েছে প্রয়োজনের তাগিদে, আবদার-অনুরোধ রক্ষা করতে। ‘ভালো একটি কবিতা লিখতে আমি রীতিমেতা প্রার্থনা করি’—কবির জবানি। শুক্রবারে কবির লোকান্তরের বিষয়টি তার প্রার্থিত ছিল। ‘আমি দূরগামী’ কাব্যগ্রন্থের স্মৃতির মেঘলা ভোরে তিনি বলছেন, ‘কোনো এক ভোরবেলা—রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে, মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ; অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো-অন্ধকারে, ভালোমন্দ যা ঘটুক, মেনে নেবো: এ আমার ঈদ।
মাতৃভাষা
মাতৃভাষা সবার আশা
হূদয় ছুঁয়ে যায়
মানুষদেরই আছে ভাষা
আর কি কারো নাই?
অন্য প্রাণী ডাকতে পারে
হাঁকতে পারে করতে পারে
ইশারা ইঙ্গিত
এ সকলই ভাষা তো নয়
ভাষার বিপরীত।
কেবল মানুষ চলতে পারে,
বলতে পারে
ভাষা যে তার মা,
ভাষার মতো আর কিছু নাই
ভাষা সোনার গাঁ।
ভাষার জন্য প্রাণ দেয়াটা
সহজসাধ্য নয়,
যারা দিলো প্রাণের কুসুম
হলো তাদের জয়।
ছিন্ন-ভিন্ন হলো হূদয়
আল মাহমুদ
ভালোবাসি এই কথাটা বলবো কারে,
দেখি, সবাই দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারে।
আলোর চিহ্ন নেই কোথাও দেখি না’ তো,
ছিন্ন-ভিন্ন হলো হূদয়, পুড়ছে গা’ তো।
যা মেনেছি তার নাম কি ভালোবাসা,
তার উপরে নাই তো তৃষ্ণা নাই পিপাসা।
ইতিহাস দেখো বাঁক ঘুরে গেছে ফের ইতিহাসে
পৃথিবীর বাঁকে দাঁড়িয়ে শুনছি
নাম ধরে ডাকে আমাকে কে যেন
আমি হেসে বলি—এই তো রয়েছি তোমার পাশে—
ইতিহাস দেখো বাঁক ঘুরে গেছে ফের ইতিহাসে।
ভুলে যেতে হবে
একটি কবিতা চেয়ে আছে মুখপানে
আমি তারে সাধি আমি তারে বাঁধি
আমি তারে সাধি যৌবনে গানে গানে।
ভালোবাসি তারে স্মৃতির মিনারে
ছুঁতে চাই তারে বুকের ভিতরে।
আমি ডাকি তারে; সে জবাব দেয়—
মনে প্রাণে
সবখানে।
আমি তো একাকী শুধু চেয়ে থাকি—
তার মুখপানে।
সব শেষ হলো—সন্ধ্যা ঘনালো
বেলা শেষ তবে, দূরে যেতে হবে
ভুলে যেতে হবে নাম ও ঠিকানা
নাহি কোনো মানা।
শ্রুতলিখন: নাজমুস সায়াদাত






