আমরা তখন জঙ্গল, নদীঘেরা একটা দ্বীপে। জোছনা রাতের জঙ্গলে ক্যাম্পফায়ারের আগুন জ্বলছে। হই-হল্লার ভেতর আল মাহমুদের মৃত্যুসংবাদ শুনি। সঙ্গে সঙ্গে সেটা কিরিচের মতো বুকে গেঁথে গেল, বুকটা আক্ষরিক অর্থেই মুচড়ে উঠল। কত কত মৃত্যুসংবাদ শুনি, কিন্তু এমন তীব্র ব্যথা হয় না।
আল মাহমুদের মৃত্যু সংবাদে আমার এক বন্ধু বলল, জ্যোত্স্না আর জঙ্গলের অন্ধকারে গাছগুলো যেন আল মাহমুদের লেখা বিভিন্ন চরিত্রে রূপ নিচ্ছে...। চমকে মনে হলো, আসলেই তেমন অনেক আদল ফুটে আছে চারপাশে। কিছুটা দূরে দেখা গেল এক খুকি, ওপাশে ঘোড়ায় বসে আছে আরেকজন, অন্যদিকে মায়ের কোলে শিশু, কাস্তে হাতে কৃষক, সোনালী কাবিনের সেই প্রেমিক-প্রেমিকা। আর এসবের সাক্ষী হয়ে ওল্টানো দুধের বাটি থেকে ঝরে পড়া জ্যোত্স্নায় সাপের চলনে দিগন্তে ভেসে যাচ্ছে আরণ্যক নদী। বাংলার এই প্রাণপ্রকৃতিই আল মাহমুদের কবিতা।
আমার মনে হলো আল মাহমুদের প্রশ্নে বাংলা ভাষার পরকাল আমাদের ক্ষমা করবে না। দ্বিধান্বিত এ রাষ্ট্রে আমরা তাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে পারিনি, তার মূল্যায়নে আমাদের অদূরদর্শিতা আছে। আল মাহমুদ অন্ধ ছিলেন, কিন্তু আসল অন্ধত্ব আমাদের। প্রকৃতপক্ষে আল মাহমুদই সবচেয়ে চক্ষুষ্মান। কেননা পূর্ববঙ্গের সাংস্কৃতিক অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের অন্যতম প্রধান নিশানা আল মাহমুদের সাহিত্য।
২.
চলন্ত ঘরের চলন্ত জানালা বহুক্ষণ পর একটা দৃশ্যে স্থির হলো। কামরার অধিবাসীদের মধ্যে আমরা তিনজন সেই স্থির দৃশ্যের দিকে তাকালাম। এর নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন। আমরা তিন কবিতাকর্মী পলিয়ার ওয়াহিদ, চঞ্চল বাশার আর আমি স্টেশনে নেমে গেলাম।
এই সেই স্টেশন যেখানে ট্রেন ফেল করে আল মাহমুদ বাড়ি ফিরে মায়ের শরীরে মুখ ঘষে ঘষে তুলে ফেলেছিলেন প্রত্যাবর্তনের লজ্জা। এখান থেকেই একদিন তিনি ফুল আঁকা টিনের স্যুটকেসে ভরে রাজধানীতে নিয়ে গিয়েছিলেন নদী, গ্রাম, ফুল আর পাখির গান।
মৃত্যুর পর এখানে আবার কবির প্রত্যাবর্তন হয়েছে। কিন্তু এতে তার আর কোনো লজ্জা নেই। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে মূলত আল মাহমুদ আর শামসুর রাহমান বাংলা কবিতার কেন্দ্র কলকাতা থেকে ঢাকার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আজ সেই ঢাকাকে আল মাহমুদ টেনে এনেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। আমরা ঢাকা থেকে আল মাহমুদের সমাধি দর্শনে চলেছি।
আমাদের তিন কবিতাকর্মীর হাতে চারটি ফুলের গাছ। বকুল, কৃষ্ণচূড়া, হাসনাহেনা আর বেলী। পলিয়ার নিয়েছেন কৃষ্ণচূড়া, চঞ্চল হাসনাহেনা, আমি বকুল আর বেলী ফুলটা হলো নাম না জানা এক মালীর। তার হয়ে আমরা ওটাকে বয়ে নিয়ে নিচ্ছি কবির সমাধির দিকে।
আল মাহমুদের মৃত্যুর দিন ঢাকার বাইরে থাকায় তাকে শেষ দেখা বা সমাহিত করার সময় থাকতে না পারার একটা দুঃখ ভেতরে ভেতরে কাজ করছিল। ভাবছিলাম তাকে দেখতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সমাধিস্থলে গেলে একটা সান্ত্বনা পাওয়া যাবে।
এরই মাঝে আল মাহমুদের মৃত্যুর চারদিন পর ফেসবুকে সাহিত্যিক সুমন রহমানের পোস্ট করা একটা ছবি দেখে খুব আনন্দ হলো। সন্ধ্যার অন্ধকারে তাকে দেখা যাচ্ছে আল মাহমুদের কবরের পাশে। সুমন ভাইকে দেখে নিজের যাওয়ার ইচ্ছা আরো প্রবল হলো। সেটাতে হেঁচকা টান দিল পলিয়ার। পথঘাট সব তার চেনা। ফলে আর দেরি না করে আমরা ফেব্রুয়ারির ২৪ তারিখ ভোরে ট্রেনে রওনা দিলাম তিতাস নদীর তীরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। কবির কবরে রুয়ে আসার ইচ্ছায় সঙ্গে নিলাম ফুলের গাছ।
কিন্তু এই যে তিনজন বয়ে নিচ্ছি চারটা ফুলের গাছ, এর পেছনে একটা গল্প আছে। যাওয়ার আগের রাতে ঢাকা থেকেই ফুল গাছগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল। তিনজন আমরা তিনটা চারা নেব। সেই উদ্দেশ্যে ধানমন্ডির এক নার্সারিতে গিয়ে গাছের চারা কেনা হয়। মালীকে বলা হয় খুব ভালো করে গাছগুলো বেঁধে দেয়ার জন্য, এগুলো ঢাকার বাইরে যাবে। মালী জানতে চাইলেন, কোথায়। পলিয়ার বলল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। মালী আবার বললেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেন? পলিয়ার বলল, কবি আল মাহমুদের কবরে এগুলো লাগানো হবে।
মালী আল মাহমুদকে চিনলেন। বললেন, ‘মামা, কবির কবরে আমার তরফে একটা ফুল গাছ লাগায়া দিয়েন। এই নেন আমি এই বেলী ফুলের গাছটা দিলাম।’
আমরা সেই বেলী ফুলের গাছ বয়ে চলেছি। কবির কবর খুঁজে পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। শিশুর সরল আহারের মতো সহজ পথ বেয়ে আমরা সেখানে পৌঁছে গেলাম। স্টেশন থেকে নেমে খানিকটা দূরে।
আমরা গিয়ে পৌঁছলাম সামাজিক এক কবরস্থানে। চারপাশে দেয়াল তোলা। ভেতরটা পরিচ্ছন্ন, গাছপালাও যথেষ্ট। একটা শান্ত, নিরিবিলি জায়গা। সারি সারি অনেক কবর।
এক শিশু আমাদের আল মাহমুদের কবর চিনিয়ে দিল। সামাজিক এ গোরস্থানে এলাকার সবার জন্য জায়গা ভাগ করা। সেখানেই মোল্লাবাড়ির অংশে মা-বাবার পাশে আল মাহমুদের ন্যাড়া কবর। একদম সাধারণ একটা কবরে শুয়ে আছেন বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম কবি। সেখানে কোনো নামফলকও নেই।
অনেকক্ষণ নীরব হয়ে আমরা যার যার মতো সেই সমাধির পাশে সময় কাটালাম। পলিয়ার শিশুদের সঙ্গে করে এরই মাঝে শাবল আর বালতি ভরে পানি জোগাড় করে ফেলেছে। আমরা কবির শিথানে পৈথানে পুবে আর পশ্চিমে চারটি ফুল গাছ লাগিয়ে বিদায় নিলাম। যদি কোনো দিন একটা ফুল গাছও ফুল দেয়, কবির কবরে ঝুঁকে ছায়া দেয়!
কবরস্থান থেকে আমরা চলে গেলাম আল মাহমুদের প্রিয় নদী তিতাসের তীরে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল কাল ভৈরবের মন্দির, তার পাশে শ্মশান ঘাট, তারপর বেওয়ারিশ লাশের গোরস্থান, তার পাশে নাথ সম্প্রদায়ের শ্মশান, এর পাশে এক মাজার, আর তার পাশে এক হাফেজিয়া মাদ্রাসা। নদীর ধারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটা সাংস্কৃতিক বাঁধের মতো এরা দাঁড়িয়ে আছে যেন। কেউ কাউকে কিচ্ছু বলছে না। কারো এই যূথবদ্ধতায় আপত্তি নেই। আল মাহমুদ এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার, এই তিতাসের ছেলে। তিনি এ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই সন্ধান করেছেন নিজ লেখায়।
৩
সনাতন, ব্রাহ্মণ, বৌদ্ধ ও শেষে ইসলাম ধর্মে মোল্টেড পূর্ববঙ্গের মানুষের লৌকিক আচরণ, ধর্মাচার, সে কতটা সুফি, কতটা মরমি, কতটা সনাতন আর কতটা ইসলাম, তার নিশানাই আল মাহমুদের সাহিত্য।
আল মাহমুদের বাংলার ইতিহাস ফলে ৫০ বছরের বাংলাদেশের ইতিহাসমাত্র নয়। হাজার হাজার বছরের পূর্ব বাংলার ইতিহাস। তাকে মূল্যায়ন করতে হলে সেই ইতিহাস থেকে শুরু করতে হবে।
সেই ইতিহাসের ভেতর এ মাটির সন্তানকে অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, অসুর নমঃশূদ্র, বৌদ্ধ, মুসলমান হতে হয়। শাহি বাংলা থেকে বারো ভূঁইয়া হতে হয়, সিপাহি বিদ্রোহ, ফকির বিদ্রোহ করতে হয়, দেশভাগ আর বায়ান্ন হয়, হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। শাহবাগ আর হেফাজতের লড়াই ও বিভেদ সেই ইতিহাসেরই দ্বিধান্বিত দুই মেরুর মতো। এ ভেদাভেদের মাঝখানে এক মিলনবিন্দু আছে, সেই মিলনবিন্দুর অন্যতম নিশানা আল মাহমুদ। সেই নিশানায় বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি নেই, তা নয়।
কিন্তু সেখানেই ধান দূর্বা বধূবরণ গাঙ আর কবুল কবুল সব এক হয়ে যায়। আল মাহমুদ পূর্ববঙ্গের সেই জীবনাচারের লোক, যেখানে বধূবরণের নামে কুলায় ধান দূর্বা হাতে দাঁড়ায় মহামাতৃকুল, গাঙের ঢেউয়ের মতো বলে কন্যা কবুল কবুল। তিনি লৌকিক ধর্মের স্বরূপই তুলে ধরেছেন নিজ লেখায়।
মানুষ পেছনের দিকে তার ইতিহাসের সমান, আর সামনের দিকে তার আশার সমান বড়। আজকের বাংলাদেশকে সেই বিশাল ইতিহাসের ভেতর বসে নিজেকে চিনে নিতে হবে। নিজেকে চিনে আসলেই নেয়া বড় কঠিন কাজ।
৪.
মিশেল ফুকো তার দ্য অর্ডার অব থিংস বইয়ে স্পেনের চিত্রকর দিয়েগো ভেলাসকেসের চিত্রকর্ম লাস মেনিনাস (১৬৫৬) ব্যবহার করে ডিসকোর্স ও বিষয়ী প্রসঙ্গে বিস্তর আলোচনা করেছিলেন। নিজেকে বা বিষয়ীকে খুঁজে পাওয়া একেবারেই যে সহজ নয়, সেটা তিনি সেই ছবিটি ব্যবহার করে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।
ছবিটিতে আমরা দেখি এক চিত্রকর তার সামনে রাখা এক ক্যানভাসের দিকে চেয়ে আছেন। ক্যানভাসে কী আছে, দর্শকরা তা দেখতে পারছে না, কারণ ক্যানভাসটা ওল্টো করে রাখা। দর্শক যেন ক্যানভাসের পেছনে বসে আছে। ক্যানভাসের সামনে সেই চিত্রকর, ছোট রাজকুমারী, তার পরিচারিকা, বামন, কুকুর নানা চরিত্র। ছবিটির দিকে তাকালে মনে হয় রাজকুমারী এ ছবির মূল চরিত্র। কিন্তু সেটা নয়। ছবিটির সবচেয়ে গৃহীত ব্যাখ্যাটি হলো সবার পেছনে দেয়ালে একটা আয়নায় রাজা-রানীর একটা প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে। তারাই আসলে এই ছবির মূল বিষয়। তারাই বসে আছেন ক্যানভাসের পেছনে, যে অংশটা চিত্রকর দেখাননি। কিন্তু তাদের ছবিই আঁকা হচ্ছে, তাদের দিকেই সবাই তাকিয়ে আছে, ছবিটা এমনভাবে আঁকা। অনুপস্থিত এখানে বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অনুপস্থিত সবচেয়ে বেশি উপস্থিত। তার ইশারা হয়ে ফুটে আছে আয়নায় ওই রাজা-রানীর প্রতিবিম্ব। কিন্তু সবাই সেই মূলকে খুঁজে পাবে না।
আল মাহমুদ সেই কবি, যিনি আয়নায় পূর্ববঙ্গের মানুষের ছবি এঁকেছেন। কিন্তু আমরা সেই ছবিটিকে চিনে উঠতে পারছি না। লাস মেনিনাস ছবির মজাটা হলো, ছবিতে অনুপস্থিত রাজা-রানী আসলে সেই জায়গাটিতে আছে, যেখানে দাঁড়িয়ে দর্শক ছবিটি দেখে। আসলে দর্শকই ওই চরিত্র, যার ছবি এঁকেছেন ভেলাসকেস। কিন্তু দর্শক গভীরভাবে না দেখলে সেটি বুঝে উঠতে পারবে না। আল মাহমুদও সেভাবেই আমাদের প্রতিবিম্ব এঁকেছেন, কিন্তু আমরা নিজেদের শরীরটা খুঁজে পাচ্ছি না। বুঝতে পারছি না যে প্রতিবিম্বতা আসলে আমাদের। ভেলাসকেসের ছবিতে দর্শক যেভাবে সহজেই বুঝতে পারে না তার অবস্থান। চিনতে পারে না যে ছবির পেছনে দেয়ালে আসলে চিত্রকর তারই প্রতিবিম্ব এঁকেছেন।
আল মাহমুদের কবরে ওই মালীর চতুর্থ গাছটি, সেই বেলী ফুলের গাছটি হলো আরো এক লাস মেনিনাস। নাম না জানা মালীর ওই ফুলগাছ আসলে আপাত অনুপস্থিত জনমানুষের, যারা কবিকে ভালোবাসতে জানে, যারা লৌকিক বাংলার মানুষ। ওই ফুল গাছ এক আয়না, যার মধ্যে সেই জনপদের প্রতিবিম্ব ফুটে উঠেছে। শুধু গভীরভাবে দেখলেই বোঝা যেতে পারে ওই ফুল গাছ কোনো নামের দেয়া নয়, সর্বনামের।






