আল মাহমুদ পরিণত বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। তবুও পরিচিত বা প্রিয় কারো মৃত্যু আমাদের ব্যথিত করে। আল মাহমুদ ব্যতিক্রম নন। বহু বছর আগে যখন তিনি অসুস্থ নন, তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কলকাতা থেকে ফিরছিলাম। কলকাতা এয়ারপোর্টে তার সঙ্গে দেখা। কবিদের বিস্তর কথা জমা থাকে, যা কেবল কবিদের পরস্পরের সঙ্গেই উজাড় হয়। তাই হলো। ঢাকায় উড়োজাহাজ নাক নিচু করে যখন নামছিল, তখন হঠাৎ আমাকে বললেন, ‘এই শহরে ফরহাদ মজহারও বাস করেন।’ জিজ্ঞাসা করলাম, কেন বললেন? তার উত্তর ছিল, কবিদের ভিড় ও মঞ্চ থেকে আমি সারা জীবন দূরে থেকেছি, কিন্তু কবি ও কবিতা নিয়ে তর্কবিতর্কে আমি ঠিকই হাজির ছিলাম। বললেন, আপনার সঙ্গে কদাচিৎ দেখা হলেও এ শহরে আপনি বাস করেন, সেই সত্য সরবে জারি আছে।
তবে এ কথাগুলো আমাকে বলার চেয়েও তার নিজের সম্পর্কে আক্ষেপই বরং ব্যক্ত হয়েছিল। তথাকথিত কবিদের ভিড় ও মঞ্চ থেকে তিনিও তখন দূরে। কিন্তু সেটা স্বেচ্ছায় নয়, বাংলাদেশে কবিদের দলাদলি ও নির্লজ্জভাবে রাজনৈতিক দলের মাস্তান বাহিনীতে পর্যবসিত হওয়ার পরিণতি। কিন্তু ভুল হবে যদি দাবি করি, আল মাহমুদ ‘সমাজতন্ত্রী’ থেকে ‘বিশ্বাসী’তে পরিণত হওয়ার ফলে তার সঙ্গে সেই দূরত্ব ঘটেছে। আল মাহমুদ সম্পর্কে এ ভুল ভাঙাটা জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রথমত ভুলে যাওয়া উচিত নয়, আল মাহমুদ বাংলাদেশে খুবই সুবিধাভোগী একজন কবি। তিনি বঞ্চিত কবি নন। তাকে নিয়ে আমাদের আবেগ ও ভালোবাসার মূল্য আছে। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর তাকে নিয়ে আক্ষেপ করার বিশেষ কিছু নেই। তার প্রতি এ সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার কুিসত উপেক্ষা আমাদের মর্মাহত করে, কিন্তু এ ধরনের সরকার ও রাষ্ট্র গড়ে ওঠার পেছনে আল মাহমুদের নিজের অবদানও কম নয়। যেমন রয়েছে শামসুর রাহমানের ভূমিকাও। এক্ষেত্রে তাদের একা দোষী করার কোনো যুক্তি নেই। বাংলাদেশে কবিতা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বৃহৎ অংশই এর জন্য দায়ী।
কাব্যচর্চার শুরু থেকেই আল মাহমুদ স্বীকৃত ও প্রশংসিত। উচ্চবর্ণের হাতে কলকাতায় যে সাহিত্য, সেই মহলে মুসলমান বাংলা জানে, সেটা ষাটের দশকেও ছিল অবিশ্বাস্য ব্যাপার। এ পরিপ্রেক্ষিতে ত্রিশের কাব্য ভাষায় আধুনিক কবিতা লেখা ছিল অকল্পনীয় ঘটনা। বাংলা সাহিত্যে ধূমকেতুর মতো নজরুলের আবির্ভাব ঘটলেও পঞ্চাশ-ষাটের দশকে মনে করা হতো, মুসলমান বাঙালি বড়জোর জসীমউদ্দীন হতে পারবে। ‘পল্লীকবি’ হিসেবে জসীমউদ্দীন স্বীকৃত ছিলেন, কিন্তু আধুনিক কবি হিসেবে নয়। বুদ্ধদেব বসুর কাছে নজরুল ছিলেন বালখিল্য কবি। আধুনিক কবিতা, যা বুদ্ধদেব বসু তার ‘কবিতা’ পত্রিকায় ছাপানোর যোগ্য গণ্য করেন, একজন মুসলমান কবি সেই ভাষায় কবিতা লিখতে পারবেন বলে মনে করা হতো না। তথাকথিত আধুনিক কাব্য ভাষায় বাঙালি মুসলমান কবিতা লিখতে পারা পঞ্চাশ বা ষাটের দশকেও অচিন্ত্যনীয় ছিল। এখনকার তরুণ কবি ও বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার পাঠকদের এ ইতিহাস জানা নেই। মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ভাষা বা জবান বাংলা ভাষার অন্তর্গত বলেও স্বীকৃত ছিল না। কলোনিয়াল শাসনের আগে মোগল ও বাংলার সুলতানদের আমলে বাংলায় আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারের যে ধারা ছিল, সেখানে ছেদ ঘটে গিয়েছিল। ঔপনিবেশিক আমল থেকেই উচ্চবর্ণের হিন্দুর রচিত বাংলা সাহিত্য দ্রুত বদলে গিয়েছিল। বাংলা সাহিত্য ও বাংলা আধুনিক কাব্যচর্চায় এটাই শুধু স্বীকৃত ছিল যে সংস্কৃতই বাংলা ভাষার জননী। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বিরোধিতা কিংবা প্রাকৃত অথবা মাগধি প্রাকৃতের সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্পর্কের সূত্র ডক্টর শহীদুল্লাহর গবেষণায় দাবি করা হলেও সে দাবি গ্রহণযোগ্য হয়নি। পশ্চিম বাংলার বাংলা সাহিত্যচর্চায় তার কোনো প্রভাব পড়েনি। বরং ত্রিশের দশকে সুধীন দত্ত কিংবা বিষ্ণু দে যখন কবিতা লিখছেন, তখন তাদের কাব্য ভাষায় সংস্কৃতেরই প্রতাপ ও অনুরণন। সংস্কৃত বহুল শব্দ কিংবা তার তথাকথিত তৎসম রূপের বাহুল্যে বাংলা ভাষা সাধারণ মানুষের ভাষা থেকে দূরে চলে গিয়েছিল। সেই মুহূর্তে আল মাহমুদ বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকার সুবাদে আধুনিক বাংলা ভাষার কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। যে ভাষা মূলত কলকাতায় তৈরি। এটা তাত্পর্যপূর্ণ। স্বীকৃতি
পেয়েছিলেন শামসুর রাহমান ও শহিদ কাদরীও। এরপর আল মাহমুদকে কখনই আর কখনো আধুনিক কবি হওয়ার জন্য কারো পেছনে ছুটতে হয়নি।
তিনি সারা জীবন নানা পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন। বঞ্চনা জুটেছে, এটা তার ক্ষেত্রে সঠিক নয়। রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদকসহ (১৯৮৭) তিনি বহু সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৮), জয়বাংলা পুরস্কার (১৯৭২), হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৪), জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৪), সুফী মোতাহের হোসেন সাহিত্য স্বর্ণপদক (১৯৭৬), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬), নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯০), সমান্তরাল (ভারত) কর্তৃক ভানুসিংহ সম্মাননা পদক ২০০৪ প্রভৃতি। এছাড়া রয়েছে, অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, লেখিকা সঙ্ঘ পুরস্কার, ফররুখ স্মৃতি, হরফ সাহিত্য পুরস্কার প্রভৃতি। আরো থাকতে পারে, আমি এই কয়টি সম্পর্কে জানি। কবি হিসেবে আল মাহমুদের আক্ষেপের কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।
আল মাহমুদ নিজেও তা মনে করতেন না। তিনি ১৯৯৬ সালে লিখেছেন, ‘কবিতা লিখে এ দেশে যতটুকু ভালোবাসা আদায় করা যায়, আমার ভাগ্যে তা জুটেছে। অখ্যাতিও কম জোটেনি। মাঝে মধ্যে প্রশ্ন জাগে, অপূর্ণতাটা কোথায়? না, দেখতে পাই না।’ (মাহমুদ, ১৯৯৭)। নিজের জীবনকে মাহমুদ পরিপূর্ণ গণ্য করতেন। একটা পরিপূর্ণ জীবন কাটিয়ে আল মাহমুদ পরিণত বয়সেই ইন্তেকাল করেছেন।
এটা ঠিক যে তার মৃত্যুর পর সরকারি বা রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক প্রকাশ করা হয়নি। গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকাও ছিল কুিসত ও ভয়ংকর। কিন্তু সেটা ভিন্ন বিতর্ক। বর্তমানের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডল হঠাৎ গড়ে ওঠেনি। সেক্ষেত্রে রাজনীতির ভূমিকা ছাড়াও আধুনিক কবি, সংস্কৃতিকর্মী ইত্যাদি নামে দলবাজ মাস্তান বাহিনীর উত্পত্তি ও শক্তির সামাজিক-সাংস্কৃতিক পর্যালোচনা আলাদা বিষয়।
তবে সংক্ষেপে হলেও আমাদের আলোচনার জন্য যে দিকটা মনে রাখা রাখা জরুরি সেটা হলো সামরিক সরকার এরশাদের সেনা অভ্যুত্থান এবং সমরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আশির দশকের লড়াইয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে জাতীয় কবিতা পরিষদ ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গড়ে ওঠে। অর্থাৎ সেটা ছিল সমরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দল নির্বিশেষে গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ। কিন্তু এ অবস্থা খুবই স্বল্পকাল জারি ছিল। এখানে যারা যুক্ত, এদের অধিকাংশই ছিল চরম সুবিধাবাদী পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীর অন্তর্গত। ফলে শ্রেণীগত কারণে অচিরেই এরশাদ সরকারের পতনের পর ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে তাদের সখ্য গড়ে ওঠে। জাতীয় কবিতা পরিষদ ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিকভাবে চরম ইসলামবিদ্বেষী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংগঠন। অচিরেই এ দুটি সংগঠন কার্যত দলের অঙ্গসংগঠনে পরিণত হয় এবং জাতিবাদী ফ্যাসিস্ট সংস্কৃতির ধারক ও বাহকে পরিণত হয়।
একে মোকাবেলা করার সম্ভাব্য পথ ছিল কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভিন্ন সংগঠন ও তত্পরতা গড়ে তোলা। সেক্ষেত্রে বলা বাহুল্য, আল মাহমুদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন। জাতীয় কবিতা পরিষদের নেতৃত্বে ছিলেন শামসুর রাহমান। তার বিপরীতে আল মাহমুদ হতে পারতেন গণমানুষের কাব্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি। কিন্তু আল মাহমুদ সেটা করেননি। তিনি ক্ষমতাসীন এরশাদ সরকারের সাহায্যপুষ্ট হয়ে যোগ দিলেন জাতীয় কবিতা পরিষদের প্রতিপক্ষ হিসেবে গড়ে ওঠা আরেকটি সংগঠনে। যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সামরিক শাসক এরশাদের বন্ধু ফজল শাহাবুদ্দিন। এরশাদের সাহায্যপুষ্ট হয়ে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক কবিতা সম্মেলনও হয়েছে।
বাংলাদেশে সামরিক শাসক এরশাদের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছিলেন আল মাহমুদ। হুসেইন এরশাদকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তার প্রয়াসে ঘাটতি ছিল না। তার কাব্যশক্তির প্রতিভা তিনি সামরিক শাসকের কাছে বেচতে দ্বিধা করেননি। আল মাহমুদ নিজেই জানিয়েছেন, এরশাদ বনানীতে তাকে একটা জমি দিয়েছিলেন এবং তিনি সেখানে বাড়ি করেছিলেন। বাড়িটা তিনি করেছিলেন লোন করে। এদিকে তার ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার জন্য সব বিদেশে। মাহমুদ একটি সাক্ষাত্কারে বলেছেন, তারা ফোন দিয়েই বলে, আব্বা টাকা পাঠাও, আব্বা টাকা পাঠাও। বাড়ি সেই টাকার জোগান দিতেই ১ কোটি ৬০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। তাহলে বলা যায়, সামরিক শাসক এরশাদের কাছ থেকে তিনি নগদে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ভোগ করেছেন। (দেখুন, ‘এরাই আমাকে জামায়াত বানিয়েছে’, প্রিয় ডট কম)
কবিরাও মানুষ এবং তাদেরও পরিবার, ছেলেমেয়ে রয়েছে। এই বিচারে আল মাহমুদের প্রতি আমরা সদয় থাকব কিনা তা নিয়ে কূটতর্ক হতে পারে। কিন্তু সংস্কৃতি, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে এর কুফল আমাদের সবাইকেই ভোগ করতে হচ্ছে। আরো কতদিন ভোগ করতে হবে কে জানে!
আমরা আলোচনা করছি স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কবিদের ভূমিকা নিয়ে। কিন্তু যে ভুল ভাঙতে চাই বলে এ আলোচনা, তার প্রথম সত্য হচ্ছে, আল মাহমুদ ইসলামপন্থী বলে কিংবা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, গণবিচ্ছিন্ন হয়েছেন, এ কথা সত্য নয়। তার গণবিচ্ছিন্নতার শুরু সামরিক অভ্যুত্থান, সামরিক শাসন ও সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধের শুরুতেই। জনগণের বিরোধী পক্ষে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নিয়েছিলেন। ইসলামপন্থী হওয়া বা জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া অনেক পরের ঘটনা। তিনি নিজে বলেছেন, বারবারই দাবি করেছেন, তিনি কখনই দলীয়ভাবে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেননি। আমরা তাকে বিশ্বাস করি। তার ইসলামপ্রীতি দোষের কিছু নয়। কিন্তু এ প্রীতি গণমানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতি অভিগমন নয়। এরশাদ আমলে তার গণবিরোধী রাজনীতিরই ধারাবাহিকতামাত্র।
কিন্তু বাংলাদেশে কবিদের ভূমিকা বিচার করতে বসলে আল মাহমুদ একা অপরাধী নন। অন্যদিকে তার প্রতিপক্ষরা গণতন্ত্র, প্রগতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদির বুলি আউড়িয়ে ইসলামবিদ্বেষ ও স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলীয় শক্তির লেঠেলের ভূমিকা পালন করেছে। তবে শামসুর রাহমানের মৃত্যুর পর আল মাহমুদের চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে একটা কালপর্বের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। জাতীয় কবিতা পরিষদের কোনো তাত্পর্য আর অবশিষ্ট নেই। সঙ্গে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটেরও আগের রমরমা নেই, শেখ হাসিনার শক্ত শাসনের আমলেও। সবচেয়ে করুণ দিক হচ্ছে, তারা পরিণত হয়েছে কার্যত আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের ভূমিকায়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এখন ঠিক করে দেয়, মারা যাওয়ার পর সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের কাকে শহীদ মিনারে আনা হবে আর কাকে আনা হবে না। সংস্কৃতির একটা চরম ক্যারিকেচার ও বিনোদন হিসেবে তারা কতদিন আমাদের আনন্দিত রাখে, সেটা এখন দেখার বিষয়।
তাহলে বাংলাদেশের সাহিত্য, কাব্য ও সংস্কৃতির বিচার আমরা সমাজ ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্নভাবে করতে পারি না। বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হিসেবে আল মাহমুদের সমালোচনাও আমাদের উদ্দেশ্য হতে পারে না। বাংলাদেশের শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দুটো বিকৃত রাজনৈতিক ধারার পরিপ্রেক্ষিতেই এবং বাংলাদেশের বাস্তব রাজনৈতিক ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতেই তাদের পর্যালোচনা করতে হবে। ব্যক্তি হিসেবে আল মাহমুদ তার কালের বিরোধ, দ্বন্দ্ব ও করুণ রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি থেকে মুক্ত নন।
তাহলে গুরুতর জিজ্ঞাসা হচ্ছে, কবি হিসেবে আল মাহমুদের মহিমা কোথায়? সেটা আমরা আল মাহমুদের নিজের উপলব্ধি থেকেই উদ্ধৃত করতে পারি। একটি সাক্ষাত্কারে তিনি বলছেন:
“আমাদের সাহিত্যে, অখণ্ড বাংলা সাহিত্যে আধুনিক কালে মুসলমানদের সাহিত্যচর্চার প্রমাণ আমরা খুব কমই দেখেছি। আমার একটা চেষ্টা ছিল এই যে তখন ধর্ম নিয়ে যতটা না ভেবেছি, তার চেয়ে বেশি ভেবেছি কবিতা নিয়ে। আমি যে শহরে জন্মেছি, সেখানকার সাধারণ মানুষের অভ্যাস-আচরণ, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা ও ঘৃণা, তাদের লড়াই ও সংগ্রাম—এসব আমি কবিতায় আনার চেষ্টা করেছি। তখনকার আধুনিক সাহিত্য বলতে যা বুঝেছি, তার মধ্যে মুসলমানদের অভ্যাস-আচরণ, প্রেম-ভালোবাসার কথা আমি কোনো বইয়ে পড়িনি। সবসময় আমার চেষ্টা ছিল, আমি যেমন ঠিক তেমনই লিখব। মূলত আমরা তিরিশের দশকের কবিদের কবিতা পড়ে আধুনিকতার ধারণা পেয়েছি। এটা অস্বীকার করলে ঠিক হবে না। এর সাথে আমি আমার দেশপ্রেম, সমাজ, পরিবার, ধর্ম ইত্যাদি যুক্ত করেছি। আমি আমার পরিবেশ থেকে শব্দ ব্যবহার করেছি। এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছি, যা আগে ব্যবহার করেনি। ইচ্ছাকৃতভাবে যে করেনি তা নয়। সাহিত্যে স্ট্যান্ডার্ডের মধ্যে এ ধরনের শব্দ প্রবেশ্য ছিল না বা প্রবেশ্য ছিল, কিন্তু প্রবেশ করানো হয়নি। এটা শুরু হলো নজরুল থেকে। নজরুল যখন লিখলেন: ‘গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা,/ আম্মাগো পানি দাও ফেটে গেলো ছাতি মা,’ আশ্চর্য হয়ে গেলাম ‘আম্মা’ শব্দের ব্যবহার দেখে। এটা সম্ভব তাহলে! আমি চেষ্টা করলাম এর মধ্যে আমার অভ্যাস-আচরণ, আমার খাসলতে এটা প্রবেশ করানোর। আমার প্রথম কবিতা থেকেই এটা লক্ষ করা যাবে।”
ঠিক এখানেই, অখণ্ড বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নজরুলের পর আল মাহমুদের সজ্ঞান আবির্ভাব। এটা নিছকই প্রতিভাবান মুসলমান কবির আবির্ভাব, কিংবা স্রেফ মুসলমানি শব্দের ব্যবহার মাত্র ছিল না। আল মাহমুদের আগে এ ব্যবহার আমরা আহসান হাবিব, ফররুখ আহমদেও দেখেছি। কাব্যগুণ হিসেবে তাদের কবিতার মর্যাদা কম নয়। কিন্তু আল মাহমুদ সদর্পে হাজির হয়েছেন আধুনিক বাংলা কবিতায় বাংলা ভাষার কবি হিসেবে তার ন্যায্য হিস্যা আদায় করে নেয়ার জন্য। উচ্চবর্ণের হাতে তৈরি সাহিত্যের বিপরীতে তিনি ‘মুসলিম সাহিত্য’ বা ইসলামী সাহিত্য করতে আসেননি। তার মধ্য দিয়ে বরং বাঙালি বা বাংলাভাষীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের উত্থান আমরা লক্ষ করি। এর রাজনৈতিক তাত্পর্য অসাধারণ।
১৯৬৩ সালে ‘লোক লোকান্তর’ প্রকাশিত হয়। আল মাহমুদ লিখছেন:
হে মোহান্ত, তেমন কোন শব্দ জানো কি
যার উচ্চারণকে মন্ত্র বলা যায়?
হে মোয়াজ্জিন, তোমার আহ্বানকে
কী করে আজান বলো, যা এত নির্দিষ্ট
আর হে নাস্তিক
তোমার উচ্চকণ্ঠ উল্লাসকে কোন আনন্দ বলো
যা এত দ্বিধান্বিত
তাই আমি নাস্তিক নই।
বিশ্বাসী নই। (পিপাসার মুখ)
তাহলে কে এই কবি, যিনি নাস্তিকও নন, আবার বিশ্বাসীও নন? এর উত্তরও আমরা পাই তারই কবিতায়।
সতর্ক আত্মার ওপর কড়ির মতোন
কড়ির মতোন
দুটি চোখ অনুভবের জাদু দিয়ে
পাশাপাশি সাজিয়ে রেখেছি
নিসর্গের ফাঁকে ফাঁকে যখন বিষণ্ন হাওয়ার রোদন
দুঃখের নিঃশ্বাস ফেলে, আমি সেই
ধ্বনির জাদুকর।
চিতল হরিণী তার দ্রুতগামী ক্লান্তির শেষ যামে
যখন প্রস্রবণে পিপাসায় মুখ নামায়
আমি সেই জলপান শব্দের শিকারি (পিপাসার মুখ)।
আস্তিকতা, নাস্তিকতা, বিশ্বাস, অবিশ্বাস ইত্যাদি কবির জন্য ঠুনকো জিনিস। এহ বাহ্য। বাইরের জিনিস। শেষাবধি কবি ‘ধ্বনির জাদুকর’, কিংবা ‘জলপান শব্দের শিকারি’। ওপরের উদ্ধৃতি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে কোনো মহৎ কবির মতোই আল মাহমুদ শব্দ শিকারি। সেই শিকার তিনি করেছেন বাঙালি মুসলমান সমাজের অভ্যাস-আচরণ সংস্কৃতি থেকে। কিন্তু মুসলমান কবি হওয়ার জন্য নয়, বরং অখণ্ড বাংলা সাহিত্যে নিজের ন্যায্য হিস্যা দাবি করার জন্য। অখণ্ড বাংলা কবিতার ইতিহাসে বাংলাভাষী কবি হিসেবে এখানে আল মাহমুদ অনন্য। পাঠক তা সহজে ধরতে পারেন না বটে, কিন্তু এ মহিমাই আল মাহমুদের স্বাতন্ত্র্য।
ফলে যখন ষাটের দশকের শেষের দিকে তার ‘সোনালি কাবিন’ বেরোয়, তখন ‘কাবিন’ শব্দটি একটা ভূমিকম্পের মতো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে উপেক্ষিত বা অদৃশ্য জনগোষ্ঠীর সবল উপস্থিতি ঘোষণা করে। মহৎ কবিরা ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা গণক। কিন্তু ‘সোনালি কাবিন’ কবিতা স্রেফ নামকরণ হিসেবেই বাঙালি মুসলমানের বাংলাভাষী ও বাঙালি হিসেবে সদর্পে হাজির হওয়ার ঘোষণা। রাজনীতি তা অনুসরণ করে মাত্র। আল মাহমুদ একাত্তরে নতুন রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর আবির্ভাবের পদধ্বনি, এ কথা আমি এর আগেও বলেছি। কবিতায় আগামী ইতিহাস আগেই ধরা দিতে থাকে চিতল হরিণীর জলপান করার শব্দের মতো। এ জায়গায় আল মাহমুদ অসামান্য। ঠিক যে তার কবিতায় ইসলামের কোনো বিপ্লবী মর্মের অনুরণন আমরা দেখি না। যখন তিনি নিজেকে শব্দের জাদুকর না ভেবে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী কবি হিসেবে ভাবতে শুরু করেছেন, তখন তিনি বাঙালি জাতিবাদের বিপরীতে জাতিবাদী মুসলমানদের বাসনারই প্রতিধ্বনি করেছেন। এই বাঙালি বনাম মুসলিম জাতিবাদের চিপা থেকে বাংলাদেশের জনগণ কবে নিষ্ক্রান্ত হবে আমি জানি না, কিন্তু হবে বটে। কিন্তু ইসলাম ও বাঙালি মুসলমানের জীবনযাপন ও ভাষা নিয়ে অখণ্ড বাংলা সাহিত্যে আল মাহমুদের সদর্প ও সরব আবির্ভাব বাংলা কাব্যকে যে গৌরব প্রদর্শন ও সামগ্রিকতার অভিমুখ ইঙ্গিত করেছে, তার তুলনা নেই।
বাঙালি জাতিবাদের বিপরীতে জাতিবাদী মুসলমানের মুকুট পরা আল মাহমুদের সাজে না। নিজের বিশ্বাস সম্পর্কে তার বক্তব্য দিয়েও আমরা তার কবিতার মহিমা ধরতে পারব না। এসব সাহিত্যের বাইরের কোলাহল, সাহিত্যে যার মূল্য সামান্যই। আল মাহমুদ সামগ্রিক অর্থে আধুনিক বাংলা কবিতার ভূগোল বদলে দিয়েছেন, সেখানেই তার সবিশেষ কৃতিত্ব।
১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, মাইজদী কোর্ট, নোয়াখালী।






