‘হোয়াট ইম্মরটাল হ্যান্ড অর আই,/কুড ফ্রেম দাই সিমেট্রি?’—উইলিয়াম ব্লেক
জীবজগতের সবকিছু বিনিসুতোয় গাঁথা মালা। বিশ্বাস করলেন তো? রকি পর্বতমালায় মাইনাস ৬৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা হলে সেই প্রগাঢ় শীতে ববক্যাট নামের পশুটি খুঁজে নেয় এমন উপত্যকা, যেখানে একটি মাত্র নদী কখনো বরফ হয়ে যায় না, কারণ নদীর সাথে আছে অন্তর্গত লাভার যোগ। সারা শীতকাল তাকে এবং তার মতো তুষারচারীদের বাঁচিয়ে রাখে এই নরম নদী। ভোঁদড় সমুদ্রের জলে সারাদিন ভাসে আর ডুব দিয়ে দিয়ে কী খায়, আপাতদৃষ্টে একেবারে অকেজো প্রাণী তাই না? সে ডুব দিয়ে দিয়ে খায় সি-আর্চিন, যেটা না খেলে সমুদ্রে শৈবাল একেবারে কমে যেত। হাঙর এসে খেয়ে যায় বা তাড়া করে সরিয়ে দেয় সামুদ্রিক কচ্ছপ, যে কচ্ছপকে সরিয়েটরিয়ে না রাখলে সমুদ্র ঘাস ন্যাড়া হয়ে যেত, এই সমুদ্র ঘাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের ক্ষমতা রেইনফরেস্টের চেয়েও ৩৫ গুণ বেশি। এই যে অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা মালা, এই যে ‘ডিভাইন প্রিন্সিপল’, এতে একমাত্র হস্তক্ষেপ করে কোন প্রাণী? একমাত্র নষ্ট করে কোন প্রাণী? উত্তর তো আমার-আপনার সবার জানা। মানুষ। যে শারীরিকভাবে অনেক প্রাণীর চেয়ে নাজুক, অথচ মানসিক সক্ষমতায় সর্বাধিক শক্তিশালী।
কবে কখন থেকে হিংস্র বন্য প্রাণীরা রাজপুরুষদের শৌর্য-বীর্য-নারকীয় উদ্যম প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হতে লাগল, তা মানুষের ইতিহাস জানে। ব্যাবিলনে ইশতার গেটের ড্রাগন মোষ আর সিংহরা জানে (সম্রাট হাম্মুরাবি বলতেন, তিনিই স্বয়ং ড্রাগন, তিনি তরুণ সিংহ)। এসিরীয় সম্রাট অসুরবনিপালের প্রাসাদে প্রবেশদ্বারের ডানাওয়ালা পাঁচপেয়ে প্রকাণ্ড সিংহরা জানে। পশুর শারীরিক গড়ন, সাবলীলতা ও শক্তিকে প্রাচীন মিসরীয়রা রাজাদের প্রতাপ বোঝাতে ব্যবহার করত, গ্রিকরা করেছে, রোমানরা করেছে । মিসরীয়রা খ্রিস্টজন্মের ৩৫০০ বছর আগেই গড়ে তুলেছে প্রথম পশুশালা বা চিড়িয়াখানা। চীনারা ‘মৃগশালা’ গড়েছে চীনা রাজকুমারী তাংকির সময়ে। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট সাম্রাজ্য জয়ের সাথে সাথে যেসব আজব প্রাণী দেখতে পেতেন নতুন রাজ্যে, সেগুলো পাঠিয়ে দিতেন গ্রিসে।
রোমানরা পশুদের সাথে ক্রীতদাসদের রক্তারক্তি খেলা দেখে বর্বর আনন্দ পেত (সম্রাট নিরো একদিনে ৪০০ বাঘের সাথে হাতি আর ষাঁড়ের লড়াই দেখে বিনোদনলাভ করেছেন), তার নাম কিন্তু ‘সভ্যতা’। আব্বাসীয় খলিফাদের থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় রাজা (হেনরিরা, ফ্রেডরিকরা, ফ্রান্সিসরা, লুইরা) হয়ে নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ, প্রত্যেকেরই ছিল পশু সংগ্রহ।
নিজেদের আনন্দলাভের জন্য, চিত্তবিনোদনের জন্য, শৌর্যের প্রতীক হিসেবে পশুর ব্যবহার করতে লাগল মানুষ। রাজা যা করে তা স্থায়িত্ব পায় বলে চিড়িয়াখানাও স্থায়ী হয়ে গেল সভ্যতায়। দিকে দিকে মানুষ দখল করছে জনপদ, বন কেটে বসত গড়ছে, গড়ছে নগর, শ্বেতকুষ্ঠের মতো সেই নগর ছড়িয়ে পড়ছে, বড় হচ্ছে, দগদগে হচ্ছে। এসব নাগরিকের বিনোদন চাই। ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি’ও জরুরি বিষয়, ঔপনিবেশিক শক্তির জন্য অবশ্যপাঠ্য বিষয়, প্রকৃতির কল্যাণীয়া ক্রোড়ে তখনো রয়ে গেছে বহু শিল্পের উপাদান, বহু রোগের উপশম, বহু মুনাফার উপায়। ফলে প্রকৃতিবীক্ষণ-প্রকৃতিচর্চার একটি অবশ্যপালনীয় অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে গেল চিড়িয়াখানা। যারা চরে বেড়াত অবাধ অরণ্যে, তাদের অরণ্যের দখল লোপ পেতে থাকল, অরণ্যই লোপ পেতে থাকল, তারা ঠাঁই পেল অপরিসর খাঁচায়। তার রাগ-ক্রোধ-ক্ষোভ-দুঃখ-অশ্রু-মৃত্যু সবকিছুই একদা আনন্দের খোরাক হয়েছে রাজাদের, এবার হলো গণমানুষের। ১৮২৬-এ ‘জুলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডন’ গঠিত হলো, দুই বছর পর নির্মিত হলো ‘লন্ডন জু’। ২৫ বছর পর জলচারী প্রাণীদের প্রদর্শনীর জন্য খোলা হলো প্রথম ‘পাবলিক অ্যাকুয়ারিয়াম’, মহাসমুদ্রের প্রতাপশালী অসুরবনিপালরা আটক হলো ক্ষুদ্র কাচের খাঁচায়। কাছাকাছি সময়ে নোভাস্কোশিয়ায় চিড়িয়াখানা হলো, চিড়িয়াখানা খোলা হলো ডাবলিনে, পোল্যান্ডে, মেলবোর্নে, যুক্তরাষ্ট্রে। যুদ্ধের সময় আবার এই চিড়িয়াখানার প্রাণীদের লিকুইডেট করা হতো, মানে মেরে ফেলা হতো।
১৯০৭ সাল নাগাদ চিড়িয়াখানার ডিজাইনে কিছু পরিবর্তন এল, খাঁচার বদলে খোলামেলা জায়গা বরাদ্দ করে তার চারদিকে পরিখা খনন করে দেয়া হলো। ত্রিশের দশকে ইংল্যান্ডের বেডফোর্ডশায়ারে খোলা হলো সাফারি পার্ক, এতে দর্শনার্থীরা প্রাণীদের বিচরণক্ষেত্রের ধারকাছ দিয়ে যেতে যেতে কাছ থেকে এদের দেখতে পাবেন। কে বলেছে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে? কোপার্নিকাসকে মিথ্যে করে দিয়ে পৃথিবী মানুষের চারদিকে ঘুরছে, মানুষের জন্য নিষ্কাশিত হচ্ছে ভূগর্ভের জ্বালানি আর জল, মানুষ খবরের কাগজ পড়বে বলে উজাড় হচ্ছে বন। মানুষ দেখে মজা পাবে বলে আমৃত্যু খাঁচায় থেকে ধুঁকে ধুঁকে মরছে প্রাণী...এ কথাটি বললে যদি নিজেকে পশু-পশু মনে হয়, তাই বলা হচ্ছে, মানুষ জ্ঞানলাভ করবে বলে খাঁচায় ধরা দিচ্ছে প্রাণীরা। যে হাতি আফ্রিকার প্রান্তরে দিনে ৪৫ কিলোমিটার পাড়ি দিত, সে ৪০ বাই ৪০ খাঁচায় এসে কাকে কী শেখাচ্ছে কে জানে!
আধুনিক চিড়িয়াখানা অবশ্য অতটা নির্দয় নয়। গণহারে বন উজাড় হচ্ছে এবং বনায়নের হার সে তুলনায় নগণ্য বলে অজস্র প্রাণী তাদের সহায় হারাচ্ছে, মাতৃভূমির আশ্রয় হারাচ্ছে, সঙ্গীদের হারাচ্ছে। এসব প্রাণীকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে বা সেই পথে তার গতি ধীর করে দিতে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে আধুনিক চিড়িয়াখানা। কনজারভেশনের সাথে চিড়িয়াখানার সম্পর্ক নিয়ে আজ আর সন্দেহের অবকাশ নেই। নিশ্চিতভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে যেসব প্রাণী, যাদের চারণক্ষেত্রই আর নেই—নিয়মিত খাদ্যের জোগান নেই, তাদের জন্য চিড়িয়াখানাই বেঁচে থাকার একমাত্র স্থান।
কোনটা ভালো চিড়িয়াখানা আর কোনটা খারাপ? চিড়িয়াখানায় পশুর সেবাযত্ন কোন পর্যায়ের, পশুচিকিৎসার কী অবস্থা, প্রকৃতির সাথে পশুর কানেকশন কতটা—এসব অনেক মাপমান আছে, যার নিরিখে এই চিড়িয়াখানার ভালো-মন্দ যাচাই করা হয়। মাঝে মাঝে তবু খবর আসে। খবর আসে অসহ্য ক্রান্তীয় উত্তাপে পাগল হয়ে যাওয়া খাঁচার মেরুভল্লুক বা পোলারবিয়ারকে নিয়ে। অরল্যান্ডোর সি-ওয়ার্ল্ডে অর্কা বা কিলার হোয়েলদের নির্যাতনের খবর আসে, টিলিকুম নামের একটা অর্কাকে মেরে ফেলা হলো ট্রেইনারকে মেরে ফেলেছে বলে। কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে ছাড়া পাওয়া স্নো লেপার্ডকে গুলি করে মেরে ফেলার খবর আসে। সিনসিনাটি জুর হারাম্বে নামের সেই গোরিলাটিকে মেরে ফেলার খবর আসে, একটি বাচ্চা তার খাঁচায় পড়ে গিয়েছিল বলে তত্ক্ষণাৎ গোরিলাটিকে মারা হয়।
আচ্ছা, চিড়িয়াখানা সম্পর্কে একটা কথা বলা হয়, এটা এমন এক জায়গা, যা পশুদের সম্পর্কে যত না জানায়, তার চেয়ে বেশি জানায় যে সমাজে যে সময়ে চিড়িয়াখানাটি চালু ছিল সেই সময় এবং সেই মানবসমাজের কথা। মজার না? আপনি ভাবছেন চিড়িয়াখানায় প্রদর্শনী হচ্ছে পশুদের। অথচ আসলে বেরিয়ে পড়ছে আপনার ও আপনার সমাজের প্রকৃত চেহারা। চিড়িয়াখানায় যখন কালো নারী-পুরুষকে প্রদর্শনীতে রাখা হতো আর ভিড় করে লোকে তাদের দেখতে আসত, সেই সময়ের কথা চিন্তা করে দেখুন। দক্ষিণ আফ্রিকার খৈখৈ জাতের একটি মেয়েকে (সারা বার্টম্যান) প্রাণী হিসেবে পাচার করা হয়েছিল উনিশ শতকে বিলেতে, ‘ক্রীতদাস প্রথা’ বাতিল হওয়ার তিন বছর পরও লোকে দেখতে আসত এই ‘হটেনটট ভিনাস’কে, পাঁচ বছরের অত্যধিক অত্যাচারে এবং যৌনরোগে তিনি মারা যান। তার প্রদর্শনী উনিশ শতকের ইংরেজ আর ফরাসিদের সমাজ নিয়ে কী বলে আমাদের? ১৯০৬ সালের কঙ্গোলিজ পিগমি নারী নিউইয়র্কের চিড়িয়াখানায় শিম্পাঞ্জি কোলে নিয়ে ওরাং ওটাংয়ের খাঁচা থেকে দর্শণার্থীদের দিকে তাকিয়ে আছেন, এ ছবিটা দেখেছেন তো আপনারা? মানুষকে চিড়িয়াখানায় ও প্রদর্শনীতে ব্যবহার খুব বেশি পুরনো নয় কিন্তু, ১৯৩১-এ ফ্রান্সে হয়েছে, ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ব্রাসেলসে হয়েছে। লোকে ভিড় করে পিগমিদের দেখছে ভাবছে, আসলে দেখুন দেখা যাচ্ছে এমন এক সভ্যতাকে, যে আত্মগর্বমদে বাকি বিশ্বকে মনুষ্যেতর ভেবে নিচ্ছে। অতএব সমাজদর্পণ ছাড়া চিড়িয়াখানা আর কিছু নয়।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্পই করি। ‘চিড়িয়া’দের সাথে আমাদের নাগরিক শৈশবের যোগাযোগ কেমন? আমরা আশপাশে দেখি টিংটিংয়ে বেড়াল আর নেড়িকুকুর, বকরি ঈদে দেখি গরু-মহিষ-ছাগল-ভেড়া, প্রাণিবিদ্যার পাঠ্যবইয়ে আমাদের গোচরীভূত হয় কেঁচো-ব্যাঙ-তেলাপোকা। তাহলে বাদবাকিদের প্রতি আমরা আদরে ভরে উঠব কেমন করে? কেনই বা দেখামাত্র টুঁটি টিপে মারব না? প্রাণী যে সুন্দর, সে যে আদি পৃথিবীর অকুতোভয় সন্তান, তেমনটা শিশুকালে কখনো বোধ করার মতো কিছু ঘটেছে কি? একটি মাত্র প্রাণীর গায়েও হাত না বুলিয়ে, একবার ঘাসের মাঠে নাঙ্গা পায়ে না হেঁটেও তো আমরা কতজন বড় হয়ে গিয়েছি আমাদের অ্যাসফল্টের জঙ্গল এই শহরে। বহুকাল আগে (আমি যখন স্কুলছাত্রী) তখন শেষবার মিরপুর চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম। ব্ল্যাক প্যান্থার কত উঁচু দেয়ালের ওপর উঠে বসে আছে, তা দেখে বিস্মিত হয়েছি, বাঁদরের খাঁচার সামনে লোকজন ভিড় করে তাদের পরদাদাকে উত্ত্যক্ত করছে-ঢিল মারছে-খাবার সাধছে, সিংহ পড়ে আছে নিজের প্রস্রাব-পায়খানায়, একটা ছোট্ট খাঁচায় এদিক থেকে ওদিক ক্রমাগত পায়চারি করছে একটা শেয়াল, টাপিরের চৌবাচ্চার বাইরে লেখা ‘একটি নিঃসঙ্গ টাপির’। আমি একটা বানরকে কখনো ভুলব না, ঠনঠনে খালি ধাতব থালাটা তুলে ছুড়ে মারছে আর অনুনয় করে তাকাচ্ছে মানুষের দিকে, আবার কুড়িয়ে এনে ছুড়ে মারছে, কতদিন খায়নি সে? পরে তেলতেলে হেসে চিড়িয়াখানার এক কর্মকর্তা স্টাফড অ্যানিমেলের চিড়িয়াখানা দেখাচ্ছিলেন, মানে যে প্রাণীগুলো মারা যায়—ট্যাক্সিডার্মিস্ট সেগুলোকে স্টাফ করে জীবিত করে রাখে। প্রতিটি প্রাণীর মুখে মৃত্যুযন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট, অথচ কর্মচারী ও কর্মকর্তা সমস্বরে বলছেন, এরা টুপটাপ গাছ থেকে পড়ে মারা যায় এবং শুধু তার পরই এদের স্টাফড করা হয়। গর্বের হাসি হেসে তিনি বলেছিলেন, ‘দেখা যাচ্ছে, আমাদের চিড়িয়াখানায় জীবিত প্রাণীর সংখ্যা কমছে আর এই স্টাফড প্রাণীর চিড়িয়াখানা আকারে বাড়ছে। ভালোই হয়েছে, এসব স্টাফড অ্যানিমেলকে তো প্রতিদিন খেতে দিতে হয় না! দেখতেও সুন্দর। হাগা-মোতা করে বাজে গন্ধও ছড়ায় না।’ স্কুলপড়ুয়া এই আমি তখন অত কিছু জানি না, কিন্তু ফেয়ার-আনফেয়ার হিত-অহিত বুঝতে মানবশিশুর যেমন সময় লাগে না, আমাদেরও লাগল না। মনে আছে আমরা স্কুলপড়ুয়ারা শিউরে উঠেছিলাম। একটা দাঁড়ে বসানো ছিল লাল টকটকে স্টাফ করা পাখি, নিচে লেখা ‘লাল লরী’। লাল লরী তো নয়, সে গল্পের লালপরী, তাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সত্যি কি তুমি গাছ থেকে পড়ে মরে গিয়েছিলে?
পরে আমি একই রকম স্টাফড অ্যানিমেলের ছোট প্রদর্শনীঘর দেখেছিলাম যমুনা সেতুর কাছে, সেখানেও সমস্বরে কর্মকর্তারা বলছিলেন, গাছ থেকে টুপটাপ/ঝিরঝির করে খসে পড়ার পরই মৃত প্রাণীকে তারা স্টাফ করে রাখেন, লোকাল অ্যানিমেল সম্পর্কে শিশুদের জানান। ওই যে বললাম, চিড়িয়াখানা আসলে পশু প্রদর্শন করে না, করে মানবসমাজকে। বাংলাদেশের চিড়িয়াখানাও তার সমাজদর্পণ। এই যে জীবিত প্রাণীকে আমরা খেতে দিতে ইচ্ছুক না, তার খাদ্য কেড়ে নিয়ে মুনাফা করতে ইচ্ছুক, তার কানের কাছে ঝনঝনিয়ে শব্দ করে তাকে বিরক্ত করতে ইচ্ছুক, তাকে বন্দি করে তিলে তিলে মেরে ফেলতে উদ্গ্রীব, মরদেহ ঝুলিয়ে রেখে গর্ব করতে আমাদের জুড়ি নেই...আমাদের এ চেহারাটাই বাংলাদেশের প্রতিটি চিড়িয়াখানা দেখায়। সাফারি পার্কও তার ব্যতিক্রম হবে না, বিশ্বাস করুন। বিশ্বাস না হলে ইউটিউবে সার্চ করে দেখুন, সাফারি পার্কের ভেতর আমরা কেমন শব্দ করতে করতে যাই, পশু-পাখি আমাদের কাছে অন্তহীন তামাশা। একইভাবে জীবিত মানুষও তামাশা। ইংরেজিতে একটা কথা আছে—বেড়াল মারতে মারতে মানুষ মারতে শেখা যায়। বাংলায়ও তো আছে এমন কথা তাই না? ওই যে কচু ঝোপ কাটতে কাটতে মানুষ মারার শিক্ষা নেয়ার কথাটা?
সমাজের চেহারা নিয়ে ভাবার এটাই কিন্তু চূড়ান্ত সময়, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘হাই টাইম’। কারণ গ্রাম ও শহর উভয়ের মানবসমাজে আমাদের যে প্রকৃত চেহারাটি উন্মোচিত হয়ে চলেছে তা অত্যন্ত ভয়ংকর। ভিড়ে ভিতর একটি ডাক দিয়ে ‘পাবলিক’কে উন্মত্ত করে তুলতে পারছি আমরা, মেরে ফেলতে পারছি একটি জলজ্যান্ত মানুষকে। আমাদের ভেতরে ভায়োলেন্স, জিঘাংসা, রিরংসা, যন্ত্রণা দেখার এবং দেয়ার ইচ্ছা, অপদস্ত করার ইচ্ছা, শেষ করে দেয়ার ইচ্ছা এসব তীব্র। বিপরীতে সুন্দরের প্রতি আমাদের টান নেই, প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতিও আমাদের ব্যবহার ধর্ষকের মতোই, আমরা নদী দখল করি-গাছ কাটি-পরের খামারে বিষ গুলে দিই, যা অযথা অস্তিত্ব (মানে যেসব বন্য প্রাণীকে খাওয়া যায় না বা হাটে যাকে বিক্রি করে পয়সা আসে না), তাকে বাছবিচার না করে মেরে ফেলতেই আমরা বদ্ধপরিকর। আমাদের সমাজ একটি হত্যাশালা হয়ে উঠেছে, চিড়িয়াখানাই বা তার প্রতিফলন হবে না কেন? আমি তো বলব, আমাদের মিথ্যাচার, অবহেলা, অন্যায় ও প্রদর্শনী প্রবণতায় ভরা সমাজটাকে ঠিক কুমিল্লা চিড়িয়াখানার সেই ধুঁকতে থাকা সিংহ ‘যুবরাজ’-এর মতো দেখতে, আমাদের দেশকে ঠিক ঢাকা চিড়িয়াখানার মাত্র তিন বছর বয়সে মৃত সিংহ ‘হীরা’র মতো দেখতে।
বলতে ভুলে গিয়েছি, মানুষের প্রতি আমাদের প্রকৃত দরদ যত কমছে, ব্যস্তানুপাতিক হারে বাড়ছে মৌখিক দরদ। অতএব পশু-পাখির জীবন-চিড়িয়াখানার অন্যায়-অব্যবস্থা এসব কথা বললেই আমরা ঝংকার দিয়ে উঠে বলতে পারি, ‘মাইনষেই খাইতে পায় না আর বাঘ-সিংহর খাওন নিয়া পড়ছে!’ সত্যি? যতদিন অবিশ্রাম উত্পন্ন হতে থাকা মানুষের অন্নসংস্থান হবে না, ততদিন আর সবকিছু মুলতবি থাকবে? অন্নসংস্থানের সাথে প্রাকৃতিক পরিবেশের যোগ থাকবে না, জলবায়ু দূষণ নিয়ে কথা বলার এখতিয়ার থাকবে না, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করা নিয়ে কথা বলা যাবে না। তাই কি? জানেন তো, মানুষ যত বেশি করে প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে তার সম্পর্ক তার আর্থিং হারাবে, তত সে নষ্ট হতে থাকবে, তত সে নিষ্ঠুর হতে থাকবে। ধর্মবাণী ছাড়া আমাদের কাছে এমনকি পরিচ্ছন্নতার বিধিও গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলে ধর্মের বাণীই বলি। সব ধর্মে পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে কথা বলা আছে, জীবে দয়া আর ঈশ্বর সেবা এক করে দেখা আছে। পাপিষ্ঠের (বারবনিতা, তার নাম ছিল জোহরা), যার আর কোনো সত্কাজ নেই, তার একটিমাত্র জীবসেবার তুচ্ছ ঘটনায় চির পরিত্রাণ পাওয়ার কথা আছে। পরমেশ্বরের কাছে ঈমানের গর্ব নিয়ে হাজির হয়েছিলেন হজরত হাসান বসরি (রা.), আল্লাহতাআলা তাকে একবাক্যে বুঝিয়ে দিলেন সেই গর্ব কত শূন্যগর্ভ, অবশেষে একটি বেড়ালের প্রতি দয়া দেখিয়েছিলেন বিধায় পুণ্য লেখার খাতায় তার নাম রয়েছে দেখা গেল। আসুন তবে, পুণ্যার্থে হলেও খাঁচার পশুদের খেতে দিই আর পরিচর্যা করি, বনের পশুদের নিরর্থক হত্যা করা থেকে বিরত থাকি, চিড়িয়াখানা যদি থাকেই, তাকে জীবসেবার সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলি। আসুন, মানুষের মানবিক থাকার স্বার্থে প্রকৃতির সাথে শৈশব থেকেই তার যোগাযোগ সম্পন্ন করে দিই। আসুন, আমাদের চিড়িয়াখানাগুলো যেন সেই যোগাযোগে ‘অবাক বিস্ময়’ যোগ করে ‘বিপন্ন বিস্ময়’ নয়, সে ব্যাপারে চিড়িয়াখানাগুলোকে বাধ্য করি।
সেই মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে অনেক মাইল দূরের একজায়গার কথা, অনেক আলোকবর্ষ দূরের ভবিষ্যতের কথা। ততদিনে আমি নিজেই মা, শিশুসন্তানকে নিয়ে গিয়েছি চিড়িয়াখানায়, স্কুল থেকে গাড়ি ভাড়া করে এদের নেয়া হয় জুলজিক্যাল গার্ডেনে, অভিভাবকরা কেউ কেউ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যেতে পারে। ঘণ্টাখানেকের বাস ড্রাইভে বসে আমি বই পড়ছি, ঝড় আসার আগে চিড়িয়াখানায় ঢুকে মুরাকামি দেখলেন একটা খাঁচায় বেড়াল রাখা ইত্যাদি। চিড়িয়াখানায় এলাম। কোনো কোনো প্রাণীকে হাতে করে শিশুরা খাদ্য দেয়, এই খাদ্যের বরাদ্দ রাখে চিড়িয়াখানার কর্তৃপক্ষ। উবু হয়ে বসে একটা বিরক্ত ছাগলকে আমার ছেলে ‘ব্যা ব্যা ব্ল্যাকশিপ’ শোনাল, সেও বাধ্য হয়ে শুনল। প্রজাপতি ঘরে আমার ছেলে একটা বিশাল কুঞ্জ বোঝাই ছমছমে প্রজাপতিদের দেখে ভয়ে চেঁচিয়ে উঠে দৌড় দিয়েছে, চিত্কার করে ডাকছে—মা মা। দেখি তার চেঁচানি থামার পরও কে যেন আমাকে ডাকছে, মা মা। একই সুরে। তাকিয়ে দেখি আরেকটি কুঞ্জে ঘাড় কাত করে তাকিয়ে আছে একটা রেড লরি, সে আবার ডেকে উঠল—মা মা। হুবহু আমার ছেলের গলায়। টিয়াপাখির জাত, মানুষের গলা নকল করতে ওস্তাদ, এই গল্পে অভিনব কিছু নেই। কিন্তু আমার কেমন যেন লাগল, মনে হলো সেই শৈশবের ‘একটি লাল লরি’ থেকে শুরু করে সারা দুনিয়ার লরি পাখি আমাকে আমার সন্তানের গলা নকল করে ডাকছে—মা মা! সারা দুনিয়ার বিলুপ্ত হতে চলা পশু-পাখি আমাদের ডাকছে, শেষ ডাক, মাঝে মাঝে শুনতে পাই, তাদের গলার স্বর আর্তমানুষের গলার স্বর থেকে কিছু মাত্র আলাদা নয়। এই ডাক আপনিও শুনতে পান। আমি বিশ্বাস করি।






