জ্যাক উইলিয়ামসন। অনুবাদ: শওকত হোসেন
আলুথালু বিছানা থেকে গড়িয়ে নেমে এল মিস্টার এরিক স্টোক্স-হার্ডিং। বেগুনি ডোরাকাটা পায়জামা পরা এক বেপরোয়া লোক। ঘুমন্ত স্ত্রীর মুখের দিকে এক নজর তাকিয়ে মুচকি হেসে তারপর যান্ত্রিক ভঙ্গিতে সকালের শারীরিক কসরত শুরু করল। কিন্তু প্রথম দফা সামনে ঝুঁকতে গিয়েই ককিয়ে উঠল সে, ক্ষান্ত দিয়ে জানালা খুলতে ঘুরে দাঁড়াল।
ওর ঠিক নিচেই বিছিয়ে আছে দৃষ্টিনন্দন পার্কটা। ওখানে ছড়ানো-ছিটানো টেরেসড পিরামিডগুলো সিটি রুফের দিকে উঠে গেছে। কাচের গম্বুজের ওপাশে ২৪৩২ সালের নিউইয়র্ক শহরের ওপর দিয়ে বইছে শীতের তুষার ঝড়। অবশ্য স্টাডির দিকে পা বাড়ানোর আগে বসন্তের সিন্থেটিক সুবাসিত হাওয়া বুকে টেনে নিল সে।
এরিক একজন লেখক। ওর স্টাডির একটা প্রান্ত ঝকঝকে প্রচ্ছদ আর বেশুমার সংস্করণের বইয়ের দেয়ালে পরিণত হয়েছে। তার এজেন্টের ভাষায় বহু যুগ আগের ‘রোমাঞ্চকর অ্যাকশন রোমান্স’ লেখে সে, ‘যখন মানুষের আদিম জীবনের আবেগ আর পূর্ণতা ছিল।’
রোমাঞ্চের উৎসের ব্যাপারে নিরপেক্ষ সে—চারপাশে এক ধরনের ইউটোপিয়া নিশ্চিত করার পক্ষে যথেষ্ট দূরের হলেই চলে। ওর নায়ক কখনো এক বগলতলায় রক্তাক্ত মুগুর আর আরেক বগলে রূপসী কোনো মেয়েকে নিয়ে বনের ভেতর হুঙ্কার ছেড়ে ছুটে চলা নরবানর, কখনো বা কোনো প্রাগৈহাসিক হাসিয়েন্দার বেপরোয়া বন্দুকবাজ কাউবয়, আবার কখনো কোনো প্রবাল দ্বীপে সঙ্গিনীসহ আটকা পড়া একজন পুরুষ।
১০০ মিলিয়ন লোক এরিকের উপন্যাস পড়েছে কিংবা ভিডিও দেখেছে। ওকে মোটা অংকের সম্মানী এনে দিয়েছে ওরা এবং অবচেতনে তার মতের সাথে একমত পোষণ করেছে যে সভ্যতা মানুষের স্বাভাবিক মর্যাদার হানি ঘটিয়েছে।
এখন, ঠিক ওর এখনকার নায়কের সঙ্গে ফাঁদে পড়া ম্যামথের পচা অস্থিমজ্জার স্বাদ চাখতে থিতু হওয়ার মুহূর্তেই স্টাডিতে হাজির হলো ওর ছিপছিপে গড়নের স্ত্রী—ওর নায়িকাদের চেয়েও সুন্দরী, ভাবল সে।
নাদা স্টোক্স-হার্ডিংও একজন লেখক। সমুদ্র, সূর্যাস্ত, ময়দানের স্কাইলার্ক আর নাইটিঙ্গেল পাখি, বুনো ফুল আর প্রকৃতির সাথে অতীন্দ্রিয় একাত্মতার ছন্দময় গীতিকবিতা লেখে সে। ওর কবিতা পড়ে লোকে ওকে প্রতিভা বলে। যদিও ওর প্রিয় পাখি আর ফুলগুলো কয়েকশ বছর আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং এই জীবনে সূর্যাস্ত দেখা হয়নি ওর।
‘এরিক, প্রিয় আমার’—নাশতা নেয়ার জন্য থামল সে, ভুরু কুঁচকে মোহনীয় ভঙ্গিতে বোতাম বাছাই করছে। ‘এসব আর কাহাতক সহ্য করা যায়?’ মুখ নাচিয়ে উঁচু ছাদের পার্কের দিকে ইশারা করল সে। ‘এখানে বন্দি হয়ে থাকা, আমাদের দুজনের প্রাণপ্রিয় আদিম প্রকৃতি থেকে এত দূরে!’
‘প্রগতি।’ অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে অনুগত মেশিন থেকে সিন্থেটিক ফলের ডিশটা নিল এরিক। ‘প্রায়ই ভাবি, আমরা যদি হাজার হাজার বছর আগে জন্মাতাম, প্রগতি শুরুর আগে।’
‘আমরা কি কোনোভাবে পালিয়ে যেতে পারি না?’
‘যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। বুনো পশ্চিম, অন্ধকার মহাদেশ, দক্ষিণের সাগর’—বিষণ্ন চেহরায় হাইড্রোপনিক পিচে কামড় বসাল সে। ‘২০০ বছর আগেই শেষ সীমান্ত সিটি রুফের নিচে হারিয়ে গেছে।’
‘ইশ, আমরা যদি অন্তত শুক্রেও যেতে পারতাম! কাল রাতে একটা সায়েন্স ফিচার দেখেছি এ নিয়ে। ওখানাকর সবচেয়ে উঁচু মালভূমিগুলো কেউ যতটা কল্পনা করতে পারে, তার চেয়েও ভেজা এবং ঠাণ্ডা। আদিম জীবন নিয়ে আদিম মহাদেশ। এই জঘন্য সভ্যতার সমস্ত কৃত্রিমতা বাদ দিয়ে আমরা যদি কোনোভাবে ওখানে যেতে পারতাম’—
‘হয়তো পারা যাবে!’ পিচটা ফেলে দিয়ে স্ত্রীকে চুমু খেল তরুণ লেখক। ‘কসমিক এক্সপ্রেস আছে না!’
‘কসমিক কী?’
‘একটা নতুন আবিষ্কার, সবে শেষ হয়েছে।’
‘তুমি জানো ওসব নতুন আবিষ্কারটাবিষ্কারে আমার আগ্রহ নেই।’ পিচটা তুলে নিল সে। ‘বিলিয়ন বিলিয়ন হাস্যকর লোকের হাস্যকর কৃত্রিম কাজকারবার দিয়ে প্রকৃতির মন্দিরকে অপবিত্র করেছে ওরা।’
‘কিন্তু কসমিক এক্সপ্রেস সত্যিই দুর্দান্ত, ডিয়ার। এখানে, ওদের নিউইয়র্ক অফিসে আমার এক ছোকরা ভক্তের কাছে শুনেছি। এটা আলোর গতিতে ভ্রমণের একটা কায়দা।’
পিচে কামড় দিল মেয়েটা। ‘সেটা কি অসম্ভব না?’
‘বস্তুর বেলায়, হ্যাঁ,’ মাথা দোলাল লেখক। ‘কিন্তু যাত্রীর ভরকে রেডিয়েন্ট এনার্জি বিমে রূপান্তর করা হয়। সেই বিমের গতি আলোর গতির সমান। ফোকাল পয়েন্টে এনার্জি আবার ভরে পরিণত হয়।’
‘শুক্রে এই ফোকাল পয়েন্ট থাকতে পারে?’
‘গ্রহটা আওতায় থাকলে। যেমন এখন আছে।’
‘তুমি তাহলে’—চুপ করে গেল নাদা। ‘সত্যি আমরা শুক্রে যেতে পারব?’
‘মনে হয় সে ব্যবস্থা করা যাবে।’ হাসতে হাসতে ডেস্কের নিচের একটা লুকোনো স্প্রিংয়ের খোঁজ করল এরিক। ‘আমার তরুণ এ বন্ধুটির দুনিয়াজুড়ে ওর কোম্পানির নির্ধারিত বিভিন্ন টার্মিনাল বাদে অন্য কোথাও যাত্রী পাঠানোর কথা নয়। কিন্তু একটা দুর্বল জায়গা আছে ওর।’
ওর কোল থেকে পিছলে নেমে সাগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল নাদা।
‘একটা আদিম সাইকো-কেমিক্যাল।’ একটা ছোট রুপার ফ্লাস্ক বের করল এরিক। ‘এটা হলো হোয়াইট মিউল। আমার বইয়ে এটার কথা পড়েছে আমার এই বন্ধু, এখন চেখে দেখবে বলে কাকুতি-মিনতি করে যাচ্ছে।’
‘ওহ, এরিক!’ ফের পিচটা ফেলে দিল সে। ‘চলো, যাই।’
১০ মিনিট বাদে একটা লম্বা ক্রোম গ্রিলের বাইরে একটা ছোট ওয়েটিং রুমে দেখা গেল ওদের। অলস, লম্বা চুলওয়ালা এক তরুণ একটা কাউন্টারের ওপর ঝুঁকে আছে। তার পেছনে গ্রিলে অর্ধেকটা আড়ালে চলে যাওয়া বিরাট চকচকে একটা মেশিন দেখা যায়।
‘জলদি!’ গ্রিলের বাইরে বিশাল কালো ব্যাগ হাতে তড়পাচ্ছে বেঁটেখাটো এক লোক। ‘প্যারিতে একটা রোগী আছে আমার’—
‘রসো, মিস্টার,’ টেনে টেনে বলল লম্বা চুল তরুণ। ‘এখন একটা ভাড়া আসছে। মস্কো থেকে রিও যাচ্ছেন রাশিয়ান কূটনীতিক। তোমার পালা আসছে...৯৮০ ডলার পড়বে...আমাদের সেবা এখনো পরীক্ষামূলক; তো আমরা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা বা সোলার ফ্লেয়ারের দায়দায়িত্ব নেব না...ঠিক আছে, এবার প্যারিসের ক্লিয়ার চ্যানেল পাওয়া গেছে।’
ছেলেটা ভাঙতি টাকা মিটিয়ে দিয়ে গ্রিলের দরজা খুলল।
‘স্ক্যানার প্লেটের ওপর শুয়ে পড়ো,’ যাত্রীকে হুকুম দিল সে, ‘হাত পাশে থাকবে। স্থির হয়ে থাকবে। আমি তিন গোনার পর নিঃশ্বাস বন্ধ রাখবে...এক, দুই, তিন...’
একের পর এক বোতাম চাপতে লাগল সে।
‘আরে, মিস্টার স্টোক্স-হাডির্ং যে!’ প্রাণবন্ত হয়ে উঠল তার কণ্ঠস্বর। ‘তাহলে এই মেয়েটার কথাই আমাকে বলছিলেন’—একটা ঘণ্টা বেজে উঠল। ‘সরি, আরেকজন যাত্রী এসেছে।’
ফের বোতাম চাপল সে, গ্রিলের ভেতর থেকে ইয়া মোটা এক মহিলার বেরোনোর অপেক্ষা করল, তার পেছনে পিঙ্গল রঙের একটা কুকুরছানা, হাঁপাচ্ছে ওটা।
‘আমরা শুক্রে যেতে চাই,’ ওকে বলল এরিক। ‘মেরু মালভূমির একদম চূড়ায়। তোমার রশ্মি আমাদের ওখানে পাঠাতে পারবে কিনা।’
‘সরি, মিস্টার স্টোক্স-হার্ডিং। আপনার উপন্যাস আমার ভালো লাগে, কিন্তু আমি ও কাজ পারব না। সাময়িক ফ্র্যাঞ্চাইজির অধীনে আমাদের কার্যক্রম ১৬টি নির্দিষ্ট স্টেশনে সীমাবদ্ধ’—
‘শোনো, চার্লি।’ পেছনে এক নজর তাকিয়ে গলা নামাল এরিক। ‘তুমি সত্যিই আদিম সাইকো-কেমিক্যালে আগ্রহী হলে এটা একটু শুঁকে দেখো।’ সতর্কতার সাথে রুপালি ফ্লাস্কটা দেখাল সে। ‘সত্যিকারের হোয়াইট মিউল। আমাদের আদি পূর্বপুরুষরা যে জিনিস খেত।’
চোখ পিটপিট করে ফ্লাস্কের দিকে দুই দফা তাকাল ছেলেটা। পরক্ষণে এরিকের হাত থেকে ছিনিয়ে নিল ওটা।
‘সত্যিকারের প্রাগৈতিহাসিক অ্যালকোহল!’ কাউন্টারের নিচে ওটা লুকিয়ে ফেলল সে। ‘এটার জন্য আপনাকে স্বর্গেও পাঠাতে পারি আমি, যদি আমাকে ট্রান্সমিটারসেটিং বলতে পারেন।’
‘এরিক!’ খুশিতে চেঁচিয়ে উঠল নাদা। ‘সত্যি আদিমতায় ফিরে যাচ্ছি আমরা।’
‘আপনাদের সাবধান না করে পারছি না।’ নাখোশ দেখাচ্ছে ছেলেটাকে। ‘না বলে পারছি না, শুক্র কিন্তু মোটেও স্বর্গ না।’
‘আমরাই আমাদের স্বর্গ তৈরি করে নেব।’
‘কিন্তু, আপনি তো শুক্র দেখেননি। আমি দেখেছি। ফাইন্ডারস্কোপ দিয়ে। নিচু এলাকাগুলো পোড়া মরুভূমি, কিছুই জীবন্ত নেই। মেরু মালভূমি আরো খতরনাক।’ শিউরে উঠল সে। ‘গাছপালা, বিচ্ছিরি আবহাওয়া আর জন্তু-জানোয়ার।’
‘একেবারে আদিম প্রকৃতি!’ চকচকে চেহারায় বলে উঠল নাদা। ‘আমাদের দারুণ ভালো লাগবে।’
‘আমি অত নিশ্চিত নই। কতদিন থাকতে চান?’
‘ধীরে-সুস্থেই ফিরব আমরা,’ বলল এরিক। ‘মাসখানেক বাদে আমাদের খোঁজ নিতে পারবে না?’
‘মনে হয় না পারব। গ্রহটা রেঞ্জের বাইরে চলে যাচ্ছে। সোলার ফ্লেয়ার বাধা সৃষ্টি করছে। প্রায় এক বছর সূর্যের ওধারে নাগালের বাইরে থাকবেন আপনারা।’
নাদার দিকে ফিরল এরিক।
‘আমরা প্রাণভরে খাঁটি প্রকৃতির স্বাদ নিতে চাই,’ বলল নাদা। ‘এক বছর সময়ই দাও আমাদের।’
‘পুরো এক বছরই সই,’ বলল এরিক। ‘আমরা আমার ল্যান্ডিং পয়েন্টে ফিরে আসব।’
‘কাজটা করা উচিত হচ্ছে না’—কাউন্টারের নিচে হাতড়াল ছেলেটা, রুপালি ফ্লাস্কটার দিকে তাকিয়ে স্বপ্নিল ভঙ্গিতে হাসল। ‘সত্যিকারের প্রাগৈতিহাসিক মাইন্ড-এক্সপান্ডার!’ চট করে গ্রিলের দরজা খুলতে হাত বাড়াল সে। ‘কোনো কিছু হলে তার দায় কিন্তু আপনাদের।’
ওদের সে গ্রিলের ভেতর দিকে ঝলমলে প্রিজমের দেয়াল ও পলিশ করা স্ফটিকের মেঝের স্ল্যাবওয়লা একটা সংকীর্ণ সেল দেখাল।
‘স্ক্যানার প্লেটের ওপর শুয়ে পড়ুন,’ বলল সে। ‘হাত পাশে রাখবেন। আমি তিন গোনার পর দম ফেলবেন না...আমি নিয়মিত যাত্রী পাওয়ার আগেই সেরে ফেলুন।’
নাদাকে সেলে ঢুকতে সাহায্য করল এরিক।
‘ঠিক আছে! একটা গ্রহই কিনে ফেলেছেন আপনারা। ভালো একটা জায়গা খুঁজে দেখি তাহলে...এটায় কাজ হতে পারে। আপনারা গাছপালা আর আবহাওয়া পছন্দ করলে, ঠিক এই মুহূর্তে আশপাশে বিরাট কোনো জন্তু-জানোয়ার নেই।’
‘শুরু করো।’
‘আপনাদের উদ্দেশেই পান করব আমি’—ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে। ছেলেটা গুনছে। ‘এক...দুই...তিন!’
তপ্ত আগুন ঘিরে ফেলল ওদের।
তরুণের কণ্ঠস্বর হঠাৎ মিলিয়ে গেল। শীতল স্ল্যাব আর তপ্ত শিখা হারিয়ে গেছে। শরীরের নিচে নরম কিছুর অস্তিত্ব টের পেল এরিক। মুখের ওপর বৃষ্টির ছাঁট। ওর পাশে শুয়ে আছে নাদা। ঢোক গিলে উঠে বসল ওরা। কালচে কাদায় মাখামাখি অবস্থা।
চারদিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বনভূমি, অন্ধকার, অদ্ভুত এবং ভীষণ স্যাঁতসেঁতে। কিছুটা নারকেল বা ফার্ন ধরনের গাছগুলোর বিচিত্র পাতা বৃষ্টির পানি পড়ে নাচছে। বিজয়ের আনন্দে ঘোর লাগা অবস্থায় হাছড়ে-পাছড়ে উঠে দাঁড়াল ওরা।
‘অবশেষে!’ ফিসফিসিয়ে বলল নাদা। ‘সত্যিই প্রকৃতির কাছে ফিরেছি।’
‘যন্ত্রের কবল থেকে পালিয়েছি।’
‘ওফ, এরিক! তুমি দারুণ।’ কাদামাখা শরীরেই ওকে জড়িয়ে ধরল ও। ‘ঠিক তোমার নায়কদের মতো।’
‘তুমি নিখুঁত, নাদা।’ কাদার ওপরই ওকে চুমু খেল সে। ‘এর চেয়ে ভালো আর হতে পারে না। তবে এখন আমাদের অবশ্যই বাস্তবতায় ফিরতে হবে। সবার আগে সুবিধাজনক শুকনো একটা গুহা খুঁজে বের করতে হবে। জন্তু-জানোয়ার দূরে সরিয়ে রাখতে ওটার মুখে আগুন জ্বালাতে হবে।’
‘বাসনকোসন বানাতে মাটি লাগবে আমাদের।’ মুখ থেকে বৃষ্টির জল মুছে বলল নাদা। ‘আমাদের বাগানের জন্য খাওয়ার যোগ্য গাছের বীজ জোগাড় করতে হবে। কম্বল আর পোশাকের জন্য পশুর চামড়া জমাতে হবে তোমাকে।’
‘কিন্তু, সবচেয়ে আগে পাথরের একটা বিছানা খুঁজে বের না করলে চলছে না,’ বলল এরিক। ‘সরঞ্জাম বানাতে আর আগুন জ্বালাতেও লাগবে ওটা। খাঁটি তামাও খুঁজতে হবে। খাঁটি পাওয়া যায় এটা, পাথরের যন্ত্রপাতিতে কাজে লাগাতে পারব।’
মেরু মালভূমির ওপর দিয়ে আগে বাড়ল ওরা। কিছুটা পথ ওর পাশে জোর কদমে চলল নাদা, তারপর টলমল পায়ে পিছিয়ে গেল। জোরালো হয়ে উঠেছে বৃষ্টির ধারা, আঁকড়ে ধরছে কাদামাটি। তামা কি পাথর, কোনোটার নিশানা নেই।
‘প্রিয় এরিক, আমি তো আটকা পড়ে যাচ্ছি,’ থমকে দাঁড়াল নাদা, হাঁপাচ্ছে। ‘কোনো পাথরও দেখছি না। আমার মনে হয়, আগুনে চোখা করে কাঠের যন্ত্রপাতিই ব্যবহার করতে হবে।’
‘মনে হয় ঠিকই বলেছ,’ সায় দিল এরিক। ‘এগুলো নিশ্চয়ই পলিমাটি। সমস্ত স্থানীয় পাথর আর ধাতু নাগালের বাইরে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকলে অবাক হব না।’
‘তুমি আগুন জ্বালাতে পারবে তো?’ ক্ষীণ উত্কণ্ঠা ওর কণ্ঠে। ‘পারবে না, প্রিয়?’
‘অবশ্যই পারব,’ ওকে বলল ও। ‘স্রেফ ঘষার জন্য কিছু শুকনো ডালপালা দরকার।’
টলমল পায়ে এগিয়ে চলল ওরা। আরো প্রবল হয়ে এল বৃষ্টি। আরো অন্ধকার লাগছে আকাশটাকে। আরো বড় বড় চাঙর হয়ে লটকে থাকছে কাদা। শুকনো কাঠ আদিম তামার মতোই বিরল ঠেকছে।
‘সাথে দেশলাই আনোনি, প্রিয়?’
‘দেশলাই! ছো! প্রকৃতির কাছে ফেরা?’
নাক টানল নাদা।
‘সরি, ডার্লিং।’
‘আমার কথা ভাবতে হবে না, প্রিয়। স্রেফ আমাদের জন্য একটু আগুন জ্বালাও।’ হোঁচট খেয়ে এগিয়ে চলল ওরা। ‘কাঠের খোঁজ করার ফাঁকে এসো খাওয়ার মতো কিছু মেলে কিনা দেখি। আ-আমি ক্ষুধার্ত, প্রিয়।’
জামের ঝোপ, নারকেল গাছ, কলা গাছ আর বাদাম গাছের খোঁজ করল ওরা, কিন্তু কোনোটাই খাওয়ার উপযোগী বলে মনে হলো না। ক্লান্তি অবশেষে থামাল ওদের। কাদায় শুয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল নাদা, এদিকে এরিক গোটাকতক মরা ডালপালা একটা বিরাট উপড়ানো গাছের সাথে ঠেস দিয়ে ভঙ্গুর একটা শেল্টার বানাল।
‘বৃষ্টি থামলে,’ আশান্বিত কণ্ঠে প্রতিশ্রুতি দিল সে, ‘আরো ভালো কিছু তৈরি করা যাবে।’
হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরে ঢুকল ওরা।
‘রাত নামছে,’ এরিকের গায়ের সাথে সেঁটে শিউরে উঠল নাদা। ‘আগুন থাকলে খুব ভালো হতো।’
‘আমারও তাই মনে হচ্ছে; রাত নামলে কয়েক মাস লম্বা হবে সেটা। কারণ এই গ্রহের আহ্নিক গতি ধীর। তবে এটা হয়তো স্রেফ সামান্য ঝড়ও হতে পারে।’
রাত কিংবা ঝড় যা-ই হোক, জঙ্গলে অন্ধকার নামল। অপার্থিব গাছপালার মাথার ওপর গর্জন তুলছে বুনো হাওয়া। আগাছার ভেতর একটা কিছু লুটিয়ে পড়ছে, কিসে যেন হুঙ্কার ছাড়ছে।
‘কী—কী ওটা?’
‘মনে হয় চার্লি যে জানোয়ারের কথা বলছিল।’ ছোট, হুল ফোটানো একটা কিছুকে চাপড় কষল সে। ‘আমাদের হয়তো খুঁজে পাবে না ওটা।’
আরো কাছাকাছি আবার গর্জাল একটা কিছু।
‘এরিক, প্রিয়’—ওকে আঁকড়ে ধরল নাদা। ‘এখানে একটা বছর কাটাতে পারব ভাবছ?’
‘এটাই প্রকৃতি, ডার্লিং,’ অটল কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল এরিক। ‘শুভের আদিম শক্তি। এটা আমাদের শুদ্ধ করে তুলবে। শক্তিশালী করবে। আমাদের অবশ্যই ধৈর্য ধরতে হবে।’
‘আমার ধৈর্য থাকছে না।’ ওর গায়ে ঠেস দিয়ে ফোঁপাচ্ছে নাদা। ‘আমাদের পুরনো অ্যাপার্টমেন্টের কথা না ভেবে পারছি না। আমার সব জিনিসপত্র, বন্ধুবান্ধব আর বোতাম টেপামাত্র গরম গরম খাবার বেরিয়ে আসার কথা না ভেবে পারছি না।’ মিনতিভরা অনুযোগ ফুটে উঠল ওর কণ্ঠে। ‘আর তুমি এমনকি আগুনই জ্বালাতে পারছ না!’
‘দুঃখিত, ডার্লিং।’ আরো বড় আকারের একটা কিলবিলে জিনিসে বাড়ি মারল সে। ‘হয়তো’—ঢোক গিলে নাদাকে আলিঙ্গন করল। ‘হয়তো আমার ভুল হয়েছে’—
আরো কাছে কোথাও জোরালো আওয়াজ থামিয়ে দিল ওকে। অন্ধকারে কিসে যেন ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলছে, হুঙ্কার ছাড়ছে। উপড়ানো গাছের সাথে টক্কর খেল একটা কিছু। ভঙ্গুর ছাদ খসে পড়ল ওদের ওপর। জট লেগে যাওয়া ডালপালার ভেতর থেকে কোনোমতে শীতল, প্রবল বৃষ্টিতে বের হয়ে এল ওরা।
‘তুমি তোমার প্রকৃতি নাও!’ ঢোক গিলে বলল নাদা। ‘আমাকে সভ্যতা দাও।’
তপ্ত আগুন ঘিরে ফেলল ওদের।
নিজেদের কসমিক এক্সপ্রেসের নিউইয়র্ক টার্মিনালের সেই স্ফটিক স্ল্যাবে আবিষ্কার করল ওরা, শরীর থেকে জল ঝরছে, থরথর করে কাঁপছে। একটা ছোট গোলাপি রঙের অগুনতি পায়ের একটা জন্তু এরিকের শার্টের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। ভীষণ জোরে ওটাকে চাপড় দিল সে।
‘এই যে, স্যার। এখন আপনারা নিরাপদ, মিস। নিন আমার হাত ধরুন।’ ঘর্মাক্ত, লালচে চেহারার এক লোক ট্রান্সমিটার সেলের বাইরে থেকে ওদের সাহায্য করতে ঝুঁকে আছে। ‘বিশ্বাস করুন, স্যার, আমরা খুবই দুঃখিত।’
‘আমরাও,’ বলে শিউরে উঠল এরিক। ‘ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা!’
‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’ সেঁটে থাকা কাদা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল কর্মকর্তা। সবে ইস্তান্বুল থেকে এসেছি। এখানে এজেন্টকে অর্ধচেতন অবস্থায় পেয়েছি। কী এক জঘন্য টাইপের সাইকো-কেমিক্যালের গন্ধে ভকভক করছিল, আমাদের ডাক্তার চিনতে পারেনি।’
‘আমি বলতে’—এরিকের দিকে এক নজর তাকিয়েই মুখে কুলুপ আঁটল নাদা। ‘আমি ভাবতেই পারছি না!’
‘যা হোক, ওর যাত্রীরা উল্টাপাল্টা দিকে চলে গেছে, আর রেকর্ডপত্রের অবস্থা যা-তা। আপনাদের নিয়ে কী করেছে বলার মতো সুস্থ করে তুলতে পেরেছি ওকে।’ দম নিতে হাঁপিয়ে উঠল লোকটা। ‘খুবই দুঃখজনক দুর্ঘটনা! আশা করি আপনারা বড় ধরনের ক্ষতিপূরণ চাইবেন না।’
‘বিলকুল না।’ দুর্বল হাসল এরিক। ‘আমি শুধু চাইব তোমরা যেন তোমাদের এই এজেন্টকে কোনো শাস্তি না দাও। আমাদের বেলায়’—নাদার দিকে ফিরে দুর্বলভাবে হাসল ও। ‘আমরা স্রেফ সভ্যতায় ফিরতে পেরেই সন্তুষ্ট।’
অ্যাপার্টমেন্টে ফেরার পর দুই তরুণ লেখক শুক্রের আদিম কাদামাটি ধুয়ে ফেলল। উপাদেয় খাবারের জন্য বোতাম চাপল ওরা। তারপর টানা ১২টা ঘণ্টা বিছানায় কাটিয়ে দিল।
মাসের শেষ নাগাদ মিস্টার এরিক স্টোক্স-হার্ডিং ওর লিটারেরি এজেন্টের হাতে নতুন একটা উপন্যাস তুলে দিল। রূপসী সঙ্গিনীকে নিয়ে শুক্রে আটকে পড়া একজন পুরুষের রগরগে প্রেমের গল্প এটা। তীক্ষ বুদ্ধি এই নায়ক আগুন জ্বালাতে কাঠি ঘষে, পাথর আর আদিম তামায় যন্ত্রপাতি বানায় এবং বুনো দানবীয় সরিয়ানদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। শ্বাসরুদ্ধকর ক্লাইমেক্সে নিচু জমিন থেকে হাজির হওয়া হিংস্র অগ্নিবাদুড়ের হাতে ঝড়ো পাহাড়ি চূড়ায় অবরুদ্ধ অবস্থায় নিজস্ব ম্যাটার ট্রান্সমিটার বানিয়ে প্রেমিকাকে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনে সে।
মারমার কাটকাট অবস্থা বইটার।






