৪ জুলাই ১৯৪৩
সাল। সিঙ্গাপুরের
ঐতিহাসিক ক্যাথে
অডিটরিয়াম। পূর্ব
এশিয়ার বিভিন্ন
দেশের ভারতীয়
স্বাধীনতা সংঘের
প্রায় দুই
হাজার প্রতিনিধি
এসে মিলিত
হলেন। এ
সভায়ই মহাবিপ্লবী
রাসবিহারী বসু
আজাদ হিন্দ
আন্দোলনের সমস্ত
দায়িত্ব নেতাজি
সুভাষ চন্দ্র
বসুর ওপর
ন্যস্ত করেন।
দায়িত্ব গ্রহণ
করেই নেতাজি
ভারতীয় স্বাধীনতা
সংঘ (ইন্ডিয়ান
ইনডিপেনডেন্স লিগ)
ও আজাদ
হিন্দ ফৌজ
(ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল
আর্মি) পুনর্গঠনে
মনোনিবেশ করেন।
২৫ আগস্ট
১৯৪৩ সাল।
নেতাজি আনুষ্ঠানিকভাবে
আজাদ হিন্দ
ফৌজের সর্বাধিনায়কের
(সুপ্রিম কমান্ডার)
দায়িত্বভার গ্রহণ
করেন। আজাদ
হিন্দ বাহিনীতে
নতুন সদস্যদের
যোগদান ও
তাদের সামরিক
প্রশিক্ষণ দ্রুতগতিতে
চলতে থাকে।
অক্টোবরের মধ্যেই
তৈরি হলো
প্রায় ৫০
হাজারের এক
নিবেদিতপ্রাণ সেনাবাহিনী।
এ বাহিনীকে
নির্দেশ দেয়া,
পরিচালনা করা
তথা মুক্তাঞ্চলে
স্বাধীন অসামরিক
প্রশাসন গড়ে
তোলার লক্ষ্যে
নেতাজি একটি
অস্থায়ী স্বাধীন
সরকার গঠনের
প্রয়োজন অনুভব
করেন।
২১ অক্টোবর
১৯৪৩ সাল।
সিঙ্গাপুরের ক্যাথে
হলেই রচিত
হলো সেই
অনন্য ইতিহাস।
ভারতের স্বাধীনতা
যুদ্ধ পরিচালনার
জন্য তৈরি
হলো ‘আরজি
হুকুমৎ-ই-আজাদ
হিন্দ’, নেতাজির
শ্রেষ্ঠ কীর্তি—অস্থায়ী
আজাদ হিন্দ
সরকার। রাসবিহারী
বসুকে সরকারের
মুখ্য উপদেষ্টা
করে নেতাজি
এ সরকারের
রাষ্ট্রপ্রধান ও
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার
গ্রহণ করেন।
দিন কয়েকের
মধ্যেই এ
সরকারকে স্বীকৃতি
জানাল জাপান,
জার্মানি, ইতালি,
বার্মা, নানকিং
চীন, থাইল্যান্ড,
ফিলিপাইন, মাঞ্চুরিয়া,
ক্রোয়েশিয়াসহ নয়টি
রাষ্ট্র।
অস্থায়ী আজাদ
হিন্দ সরকার
গঠনের পরদিনই
নেতাজি সিঙ্গাপুরে
নারীদের নিয়ে
গঠিত ঝাঁসির
রানী রেজিমেন্টের
শিবির উদ্ঘাটন
করেন। বিশ্ব
বিপ্লব ও
যুদ্ধ প্রচেষ্টার
ইতিহাসে আজাদ
হিন্দ ফৌজের
ঝাঁসির রানী
রেজিমেন্টই হলো
পৃথিবীর সর্বপ্রথম
পূর্ণাঙ্গ নারী
রেজিমেন্ট। ক্যাপ্টেন
ডা. লক্ষ্মী
স্বামীনাথান এ
বাহিনী পরিচালনার
দায়িত্ব পেলেন।
২৩ অক্টোবর
১৯৪৩ সাল।
সারা রাত
ধরে চলা
আজাদ হিন্দ
সরকারের মন্ত্রিসভার
প্রথম বৈঠকের
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী
নেতাজি ব্রিটেন
ও আমেরিকার
বিরুদ্ধে যুদ্ধ
ঘোষণা করেন।
৫ নভেম্বর
১৯৪৩ সাল।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী
হিদেকি তোজোর
সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত
বৃহত্তর পূর্ব
এশিয়া সম্মেলনে
বিশেষ আমন্ত্রিত
হিসেবে নেতাজি
উপস্থিত থাকেন।
এ সম্মেলনে
সব সদস্য
দেশ ভারতের
স্বাধীনতার প্রস্তাব
সমর্থন করেন।
এছাড়া ব্রিটিশ
আধিপত্য থেকে
মুক্ত হওয়া
আন্দামান ও
নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ
আজাদ হিন্দ
সরকারের হাতে
তুলে দেয়ার
ঘোষণাও করেন
তোজো। টোকিও
থেকে নানকিং,
সায়গন হয়ে
নেতাজি সিঙ্গাপুরের
সদর দপ্তরে
ফিরে এলেন
২৫ নভেম্বর।
ভারত অভিযানকল্পে
নেতাজি জাপানি
সামরিক কর্তৃপক্ষের
সঙ্গে একটি
চুক্তি সম্পাদন
করেন। এ
চুক্তিমতে আজাদ
হিন্দ ফৌজ
ও জাপানি
সেনাবাহিনী অভিন্ন
রণনীতি অবলম্বন
করলেও আজাদ
হিন্দ ফৌজ
তাদের নিজস্ব
সামরিক আইন
মেনে চলবে
বলে স্থির
হয়। ভারতের
মুক্তাঞ্চলগুলো আজাদ
হিন্দ ফৌজ
ও সরকারের
নিয়ন্ত্রণে থাকবে
এবং এসব
অঞ্চলে কেবল
ভারতের জাতীয়
পতাকাই উড্ডীন
থাকবে। ৩১
ডিসেম্বর নেতাজি
পোর্টব্লেয়ারে এসে
ভারতের ত্রিবর্ণ
রঞ্জিত জাতীয়
পতাকা উত্তোলন
করেন এবং
আন্দামান ও
নিকোবরের নতুন
নামকরণ করেন
‘শহিদ’
ও ‘স্বরাজ’।
এদিকে যুদ্ধ
পরিচালনার সুবিধার্থে
আজাদ হিন্দ
ফৌজ ও
অস্থায়ী আজাদ
হিন্দ সরকারের
সদর দপ্তর
সিঙ্গাপুর থেকে
ইয়াঙ্গুনে স্থানান্তর
করা হলো।
৪ জানুয়ারি
১৯৪৪ সাল।
সৈন্যদের যুদ্ধযাত্রার
আয়োজন নিজে
তদারক করতে
নেতাজি ইয়াঙ্গুন
এলেন।
আজাদ হিন্দ
বাহিনীতে ছিল
তিন ডিভিশন
সৈন্য। এদের
কমান্ডার ছিলেন
মেজর জেনারেল
মহম্মদ জামান
কিয়ানি, কর্নেল
আজিজ আহমেদ
ও লে.
কর্নেল এনএস
ভগৎ। ভারত
অভিযানে সহযোগী
জাপানি বাহিনীরও
ছিল তিন
ডিভিশন সৈন্য।
এ ডিভিশনগুলোর
অধিনায়ক ছিলেন
ফিল্ড মার্শাল
মুতাগুচি। ভারতবর্ষের
স্বাধীনতা যুদ্ধে
ভারতীয় সৈন্যরাই
প্রথম শত্রুসৈন্যের
ওপর আক্রমণ
হানবে, এ
ছিল নেতাজির
দৃঢ় প্রত্যয়।
তাই গান্ধী
ব্রিগেড, আজাদ
ব্রিগেড ও
নেহরু ব্রিগেড
থেকে বাছাই
করা সৈন্য
নিয়ে তৈরি
হলো ১
নং গেরিলা
রেজিমেন্ট। সৈনিকরা
এর নাম
দিল সুভাষ
ব্রিগেড। মেজর
জেনারেল শাহনওয়াজ
খান হলেন
এ ব্রিগেডের
কমান্ডার, কর্নেল
ঠাকুর সিং
হলেন সরকারী
কমান্ডার। আজাদ
হিন্দ ফৌজের
যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে
নেতাজির বিরামহীন
কর্মধারা ও
ওজস্বী আহ্বান
স্বাধীনতাকামী সৈন্যদলের
মধ্যে এক
অপূর্ব চেতনা
সৃষ্টি করল।
৩ ফেব্রুয়ারি
১৯৪৪ সাল।
দুই ডিভিশন
সৈন্যকে রণক্ষেত্রের
দিকে এগিয়ে
যাওয়ার সময়
নেতাজি উদাত্ত
কণ্ঠে বলেন,
‘দূরে,
বহু দূরে,
ওই নদী,
ওই বন,
উপবন, ওই
পাহাড়-পর্বত-উপত্যকা
ছাড়িয়ে আমাদের
দেশ। ওই
পুণ্যভূমিতেই আমরা
জন্মগ্রহণ করেছি—আবার
ফিরে যাব
ওই দেশেই।
ওই শুনো,
ভারতবর্ষ আমাদের
ডাকছে—ভারতের
রাজধানী দিল্লি
আমাদের ডাকছে—আত্মীয়েরা
ডাকছে। ওঠো,
জাগো, নষ্ট
করার মতো
সময় নেই
হাতে। অস্ত্র
তুলে নাও।
শত্রুর সেনাবাহিনীর
ভেতর থেকে
আমরা আমাদের
পথ করে
নেব। অথবা
ঈশ্বর যদি
চান তবে
শহীদের মতো
মৃত্যুবরণ করব।
যে পথ
দিয়ে আমাদের
সেনাবাহিনী দিল্লি
পৌঁছবে, শেষ
শয্যা গ্রহণ
করার আগে
সেই পথ
একবার চুম্বন
করে নেব।
দিল্লির পথই
স্বাধীনতার পথ—চলো
দিল্লি, দিল্লি
চলো!’
৪ ফেব্রুয়ারি
১৯৪৪ সাল।
আরাকানের জঙ্গলে
আজাদ হিন্দ
ফৌজ শত্রুসৈন্যের
ওপর প্রথম
গোলা নিক্ষেপ
করে। লে.
কর্নেল এলএস
মিশ্র ও
মেজর মেহের
দাসের পরিচালনায়
দুর্বার গতিতে
এগিয়ে চলে
তারা। মায়ু
উপত্যকায় বিট্রিশ-ইনডিয়ান
আর্মির সপ্তম
ডিভিশনকে অবরুদ্ধ
করে অধিকাংশ
সৈন্যকে নিকেশ
করে তারা
অগ্রবর্তী ঘাঁটি
বুথিয়াডং দখল
করে। আরেক
বাহিনী ইয়াঙ্গুন
থেকে প্রোমের
দিকে এগিয়ে
যায়। দেড়
মাসের মধ্যে
তারা দখল
করে নিল
আরাকান, তাউং
বাজার, মিয়া-মিয়াং,
কালাদান, হাকা
ও ফালাম,
ফোর্ট হোয়াইট
ও কেনেডি
পিক। আজাদ
হিন্দ ফৌজের
যুদ্ধাভিযানে ১৮
মার্চ দিনটি
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিন তারা
সীমান্ত অতিক্রম
করে ভারতবর্ষের
ভূমিতে প্রবেশ
করে। মাতৃভূমির
মাটিতে প্রবেশ
করেই সৈন্যরা
আনত হয়ে
ভূমিতে চুম্বন
করতে লাগল।
২১ মার্চ
সংবাদ সম্মেলন
করে নেতাজি
বিশ্ববাসীকে জানালেন
সেই সংবাদ।
আজাদ হিন্দ
ফৌজের কীর্তি
সম্বন্ধে ভারতবাসীকে
কিছুই জানতে
দেয়নি সাম্রাজ্যবাদী
শাসকগোষ্ঠী। মিত্রপক্ষের
বিপক্ষ রাষ্ট্রের
খবর শোনা
নিষিদ্ধ করে
দেয়া হয়েছিল।
তথাপি কোহিমা-উখরুল
এলাকার সাধারণ
মানুষ দেশপ্রেমিক
আজাদ হিন্দ
ফৌজের মানবিক
ব্যবহার লক্ষ
করে তাদের
সাহায্যে এগিয়ে
আসে। কোহিমার
যুদ্ধে আজাদ
হিন্দ ফৌজ
ও জাপানি
বাহিনীর যুক্ত
কমান্ডের সেনাপতি
ছিলেন ক্যাপ্টেন
মগর সিং।
১৯ মার্চ
১৯৪৪ সাল।
কোহিমায় উত্তোলন
করা হলো
ত্রিবর্ণ রঞ্জিত
ভারতের জাতীয়
পতাকা। আজাদ
হিন্দ ফৌজের
বাহাদুর গ্রুপের
জোয়ানরা ইউনিট
কমান্ডার কর্নেল
এসএ মালিকের
নেতৃত্বে মণিপুরের
রাজধানী ইম্ফলের
অদূরে মৈরাঙে
এসে পৌঁছে।
১৪ এপ্রিল
১৯৪৪ সাল।
কমান্ডার মালিক
মৈরাঙের কাংলার
মাঠে অস্থায়ী
আজাদ হিন্দ
সরকারের প্রতিভূ
হিসেবে ত্রিবর্ণ
জাতীয় পতাকা
উত্তোলন করেন।
দিন কয়েকের
মধ্যেই বিষেণপুর,
উখরুল, তিড্ডিম
ও তামু
আজাদ হিন্দ
ফৌজের দখলে
আসে। ইম্ফলকে
চারদিক থেকে
বিচ্ছিন্ন করে
দেয়া হয়।
অবরুদ্ধ ইঙ্গ-মার্কিন
বাহিনীর জন্য
খোলা থাকে
শুধু আকাশপথ।
ইম্ফলের পতন
যখন আসন্ন
ঠিক সে
সময়ই নামল
অঝোরে অকালবর্ষণ।
একটানা সাতদিন
ধরে বৃষ্টির
ফলে বার্মার
সব সরবরাহপথ
জল-কাদায়
বয়ে যায়।
রসদবাহী লরিগুলো
বিকল হয়ে
গেল। অনেক
গোলাবারুদও ভিজে
নষ্ট হয়ে
যায়। জাপানি
সামরিক কর্তৃপক্ষ
সে সময়
বোমারু বিমানগুলো
অন্যত্র সরিয়ে
নিয়ে যায়।
নেতাজির বারবার
অনুরোধ সত্ত্বেও
জাপ কর্তৃপক্ষকে
বিমান পাঠাতে
রাজি করানো
গেল না।
সুযোগ বুঝে
ইঙ্গো-মার্কিন
বাহিনী অসংখ্য
বোমারু বিমান
এনে ঝাঁকে
ঝাঁকে শুরু
করে গোলা
বর্ষণ। হাজার
হাজার সৈন্য
নিহত ও
আহত হলো।
জাপ সেনাবাহিনী
পশ্চাদপসরণে বাধ্য
হলো। নেতাজিও
অনন্যোপায় হয়ে
তার দেশপ্রেমিক
সৈনিকদের পশ্চাদপসরণ
করার আদেশ
দিলেন। গভীর
বেদনা বুকে
নিয়ে ১৯৪৪
সালের ২৪
এপ্রিল মণিপুরের
পার্বত্য বনভূমির
পথ ধরে
বার্মা অভিমুখে
আজাদ হিন্দ
ফৌজের রিট্রিট
মার্চ শুরু
হলো। রসদের
অভাবে অনাহারে-অর্ধাহারে
আজাদি সৈন্যদের
এ দীর্ঘ
পশ্চাদপসরণ বিপ্লবী
ইতিহাসে এক
চরম আত্মত্যাগ
ও পরম
দুঃখবরণের চিরস্মরণীয়
অধ্যায় হয়ে
রইল। আজাদ
হিন্দ ফৌজের
যুদ্ধ রণাঙ্গনে
ব্যর্থ হলেও
যুদ্ধ শেষে
বন্দি আজাদ
হিন্দ সৈন্যদের
যখন দলে
দলে দেশে
নিয়ে আসা
হয় বিচারের
জন্য তখন
সারা দেশ
উত্তাল হয়ে
ওঠে। করাচি-মুম্বাই
প্রভৃতি বন্দর
এবং অন্যান্য
সামরিক ছাউনিতে
সংঘটিত হয়
নৌ ও
সেনা বিদ্রোহ।
আত্মত্যাগী বিপ্লবীদের
সেসব ঘটনা
বিস্মৃত হয়
না ইতিহাস।
নীহার রঞ্জন পাল: নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজের ইতিহাস নিয়ে গবেষণারত আসামের বরাক উপত্যকা অঞ্চলের প্রবন্ধকার





