দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কেবল ভারতেই নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সার্বিক প্রেক্ষাপটে সুভাষ চন্দ্র বসু এবং তার ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষত, কোহিমার যুদ্ধ তো সত্য এবং কিংবদন্তি মিলিয়ে আজও আলোচিত। এ যুদ্ধের ফলাফল পরবর্তী সময়ে বিশ্বযুদ্ধ, ব্রিটিশ আর্মি, ভারতের জাতীয় রাজনীতি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

গঠনের পরপর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (আইএনএ) ভবিষ্যৎ নিয়ে নানাজনে নানা কথা ভেবেছিল। ১৯৪৩ সালে সুভাষ সিঙ্গাপুরে সাদর অভ্যর্থনা লাভ করলে তা কেবল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মিই নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বসবাসরত ভারতীয়দের উদ্বুদ্ধ করেছিল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন চলছে অনেকদিন; গান্ধীর অসহযোগ, নেহরুর নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক লড়াই থেকে সরে গিয়ে সুভাষ সামরিক শক্তি প্রয়োগের কথা বলেই ক্ষান্ত হননি, মাঠে নেমে কাজও শুরু করেছিলেন। তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজো এবং সমরকর্তা রেনেয়া মুতাগুচিকে নিশ্চিত করেছিলেন যে জাপান-আইএনএ যৌথভাবে ভারতের মাটিতে প্রবেশ করলে অচিরেই সেখানে রীতিমতো একটি বিদ্রোহ হবে। জাপানি সেনানায়ক মুতাগুচিও বহুদিন ধরে ভারত তথা ব্রিটিশ আর্মির বিরুদ্ধে বিজয় অর্জনের স্বপ্ন বুনছিলেন। সুভাষের তদবির সে স্বপ্নের পালে হাওয়া দিল।

সুভাষ ও মুতাগুচির যৌথ প্রচেষ্টায় এ পরিকল্পনা বাস্তব রূপ নিতে আরম্ভ করে। ১৯৪৪ সালের ৭ মার্চ টোকিও রেডিওতে জানানো হয়, ১৫তম জাপানি আর্মি ভারত আক্রমণ করেছে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল রেনেয়া মুতাগুচির অধিনায়কত্বে ‘ইউ গো’ নামের এ মিশনে মূল বাহিনীকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটিতে ১৫ হাজার করে সৈন্য নিয়ে ১৫, ৩১ ও ৩৩তম বাহিনী তৈরি হয়েছিল। এ সেনাদলকে দিল্লি দখলের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল যেন তারা ‘ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে সরাসরি বাংলার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যায়।’ লড়াইয়ের জন্য জেনারেল কোতুকু সাতো তার বাহিনীকে তিন কলামে ভাগ করে (১) হোমালিন-উখরুল-মারাম-কোহিমা, (২) সোমরা-খারোসাম-মায়ু-কোহিমা ও (৩) তামান্থি-লায়সি-জেসামি-ফেক হয়ে কোহিমা পর্যন্ত পৌঁছার নির্দেশনা দেন। অর্থাৎ কোহিমা হয়ে ওঠে জাপানি সেনাদলের গন্তব্য। জাপানি জেনারেলরা আইএনএকে স্বতন্ত্রভাবে কোহিমার দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, এ অভিযানে কোন সেনাদলের কেমন মর্যাদা থাকবে এবং সফল হলে ভারতে কোন শক্তির অধিষ্ঠান হবে। এক্ষেত্রে সুভাষ বসুর সঙ্গে জেনারেল কাওয়েবের সমঝোতা স্থাপিত হয় যে ‘আইএনএ’ ও জাপানি সেনারা সমমর্যাদায়, একটি নির্দিষ্ট কৌশল ও কমান্ডের অধীনে এবং আইএনএ নিজস্ব সামরিক আইন দ্বারা পরিচালিত হবে। পাশাপাশি এ অভিযান সফল হলে ভারতের মাটিতে শুধু ‘ত্রিরঙা’ (ভারতের পতাকা) উড়বে, অর্থাৎ সেখানে জাপানের কোনো অধিকার থাকবে না। তিন ব্রিগেড থেকে বাছাই করা সৈন্য নিয়ে একটি বিশেষ ব্রিগেড গঠনের সিদ্ধান্ত নেন সুভাষ বসু। গান্ধী, নেহরু ও আজাদ ব্রিগেড থেকে সৈন্য নিয়ে তৈরি এ গেরিলা রেজিমেন্টের কমান্ডের দায়িত্ব শাহ নাওয়াজ খানকে দেয়া হয়। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, এখানে সৈন্যদের সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নৈতিক এবং আত্মিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। সুভাষকে ভালোবেসে সৈন্যরা পরবর্তীতে এ ব্রিগেডের নাম দিয়েছিলেন ‘সুভাষ ব্রিগেড’।

কিন্তু প্রথমেই আইএনএ সৈন্যদের সম্মুখসমরে গ্রহণ করা হয়নি। বরং তাদের সাধারণ সৈন্য হিসেবে জাপানিদের সহযোগী হিসেবে রাখা হয়েছিল। নাগা পাহাড়ে জাপানি সৈন্যদের চলাচলের পথ তৈরি এবং খাদ্য সরবরাহের জন্য সৈনিকদের কাজ দেয়া হলে তারা ক্ষুব্ধ হন। আইএনএর লেফটেন্যান্ট এমজি মুলকার ১৯৪৪-এর ৩ এপ্রিল তার ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘এ পথে চলাচলের সময় আমরা বিশেষ এক ধরনের চাষ পদ্ধতি লক্ষ করেছি।’ ১৯৪৪ সালের ৭ এপ্রিলের ডায়েরিতে মুলকার লিখেছেন, ‘আমরা কোহিমা শহর দখল করেছি।’

মণিপুর, নাগাল্যান্ড তথা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষ এখনো ওই সময়ের স্মৃতিচারণ করে। এদের মধ্যে খুম্বো আঙ্গামি কোহিমার যুদ্ধের স্মৃতি হাতড়ে বলেছেন, সে সময় তিনি এ অঞ্চলে অনেক ভারতীয়কে সেনা পোশাকে দেখেছেন, তারা ছিলেন আইএনএর কর্মকর্তা। তারা স্থানীয়দের ভারতীয় পতাকা ও অনেক ব্যাজ দেখিয়েছিলেন। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের কেবল সাহায্যকারী হিসেবেই জাপানিরা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ আক্রমণে জাপানি বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ার পর তারা সুভাষ ব্রিগেডের সহায়তা চেয়েছিল। সম্ভবত এ কারণেই কোহিমা যুদ্ধ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিবরণী কিংবা প্রাথমিক কোনো উৎসে আইএনএর উল্লেখ পাওয়া যায় না। বিশেষত আইএনএ স্বতন্ত্রভাবে কোহিমার কোনো সেক্টরে আক্রমণ করেছে এমন কোনো উল্লেখ নেই। লড়াই তারা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলেছে লোকবল ও অস্ত্র-গোলাবারুদের অভাবের কারণে।

এ যাত্রা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একটা প্রশ্ন জাগে, বার্মা হয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চল দিয়ে কেন্দ্রের দিকে প্রবেশের চিত্রটা কেমন ছিল। রবার্ট লেম্যান তার ‘এন্ড অব এম্পায়ার’ বইয়ে ফেক অঞ্চলের এক গ্রামবাসীর স্মৃতি উল্লেখ করেছেন, যিনি বলেন, ‘ভারতীয় অফিসাররা জাপানিদের পথ দেখিয়ে এনেছিল এবং যখন তারা আমাদের গুরুজনদের সঙ্গে কথা বলেছেন সেখানে হুমকির নামগন্ধ ছিল না।’ একই গ্রামের আরেক অধিবাসী বলেছেন, ‘আমি জাপানিদের সঙ্গে ভিন্ন বর্ণের মানুষদের দেখেছি।’ অর্থাৎ জাপানি সেনাবহরের সঙ্গেই ভারতীয় সেনারা এসেছিলেন এবং অবশ্যই এ সেনারা ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাসদস্য নন, বরং সুভাষ চন্দ্র বসুর আইএনএ অর্থাৎ ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সৈন্য ছিলেন। কৌশলগত দিক থেকে এ সিদ্ধান্ত প্রশংসার দাবিদার। প্রথমত, ভারতীয় সৈন্যদের উপস্থিতি ওই অঞ্চলের মানুষদের আশ্বস্ত করেছিল যে তারা আক্রমণের শিকার নয়, বরং ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা আরম্ভ হয়েছে। অন্যদিকে জাপানিদের তুলনায় আইএনএ সৈন্যদের পক্ষে মণিপুর, নাগাল্যান্ডের মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা তুলনামূলক সহজ ছিল।

কোহিমার যুদ্ধ ও ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি নিয়ে উপকথার শেষ নেই। এর অন্যতম কারণ এ সেনাদলের প্রতিষ্ঠাতা সুভাষ বসু খোদ একজন কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। সুভাষ কখন, কোথায়, কোন রূপে অবস্থান করতেন, এ বিষয়ে তার জীবদ্দশায় বহু রকম কথা প্রচলিত ছিল। তার শেষ পরিণতির রহস্য তো আজও উন্মোচন হয়নি। নাগাল্যান্ডের এ অভিযানের সময়ও সুভাষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে প্রচলিত আছে। বলা হয়, জেসামির যুদ্ধ যখন এগিয়ে চলছিল তখন সুভাষ বসু, সাতো ও ফিজো উভয়ে লান্যে নদীর উপত্যকায় সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। যদিও এর কোনো উপযুক্ত প্রমাণ নেই, কিন্তু ‘প্রত্যক্ষদর্শীরা’ জানান, ফিজো (নাগা জাতীয়তাবাদী নেতা) তার ভাঙা চোয়াল হাতের তালুতে আড়াল করে দেখা করতে গিয়েছিলেন। অন্যের বরাত দিয়েই গর্ডন গ্রাহাম লিখেছেন, কোহিমা থেকে কয়েক মাইল দূরে বসুকে দেখা গেছে। ফিজো নাকি কোহিমার রণাঙ্গনে হাজির হয়েছিলেন—স্থানীয়রা এমনটা বললেও এর স্বপক্ষে কোনো ব্রিটিশ রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।

সুভাষের উপস্থিতি সম্পর্কে পশুয়ি শুয়ো নামে এক ব্যক্তি বলেছেন, কোহিমা থেকে ৭৫ মাইল দূরে রুজাজো গ্রামে সুভাষ যখন অবস্থান করছিলেন, পশুয়ি তার দোভাষীর দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে নাগাল্যান্ডের প্রশাসক পিবি আচার্য এ গ্রামকে ‘আইএনএ শাসিত প্রথম গ্রাম’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ সুভাষ স্বয়ং কোহিমা অঞ্চলে উপস্থিত ছিলেন বলেই প্রচলিত। মূলত কোহিমার এ যুদ্ধ এবং সেখানে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির ভূমিকা সম্পর্কে এ অঞ্চলের মানুষের মৌখিক স্মৃতিই মূল আকর।

যুদ্ধের সময়ে একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় ছিল, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি ও ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান আর্মি উভয়ের সদস্যই ছিলেন ভারতীয়। অর্থাৎ ভারতীয়রা ভারতীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন। এমতাবস্থায় উভয় দলের ক্ষেত্রেই নৈতিক অবস্থানে টিকে থাকায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছিল। কৌশল হিসেবে যুদ্ধের সময় আইএনএ সৈন্যরা গলা তুলে হিন্দি-উর্দুতে চিত্কার করত। ব্রিটিশদের সঙ্গ ছেড়ে ‘ভাইদের’ তারা নিজেদের দিকে আহ্বান করত। এতে কিছুটা কাজ হয়েছিল সন্দেহ নেই। অন্যদিকে সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার হিসেবে ব্রিটিশরা আইএনএ অর্থাৎ সুভাষের সঙ্গে জাপানের মৈত্রী নিয়ে নেতিবাচক খবর ছড়িয়ে সুভাষের জাতীয়তাবাদী চরিত্রের নেতিবাচক চিত্র তৈরি করে আইএনএকে নৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল।

কোহিমা যুদ্ধের ফলাফল এবং পরবর্তী চিত্র স্পষ্ট। মে মাসের শেষ নাগাদ কোহিমায় আইএনএর নিয়মিত বাহিনী হাজির হয়। কিন্তু ততদিনে সেখানে জাপানি বাহিনীর অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোহিমায় নিজেদের পোস্ট ধরে রাখার জন্য আইএনএ প্রাণপণ লড়াই করে। পিছু হটার আগে এখানে তাদের অধীনে প্রায় ২০০ বর্গমাইল ভারতীয় ভূমি ছিল। আইএনএ-প্রধান এ সময় পিছু হটতে অনিচ্ছুক ছিলেন। রমেশ মজুমদার লিখেছেন, তিনি নাগাপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন এবং তারাও আইএনএকে সরে না যেতে অনুনয় করেছিলেন। কিন্তু জাপানিরা তামুতে পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও আইএনএ জাপানিদের অনুসরণ করতে বাধ্য হয়।

জাপানিরা ব্রিটিশ-ভারতীয় আর্মির শক্তি সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করেছিল। জেসামি পার করে কোহিমায় পৌঁছেই রসদ সংকট এবং অন্যান্য সমস্যা বৃদ্ধি পাওয়া শুরু হয়। পিছু হটার সময় থেকেই প্রচুর জাপানি সৈন্য মৃত্যুবরণ করে। জাপানিদের মতো আইএনএ সৈন্যরাও একই পরিণতি ভোগ করে। অনেক সৈন্য মৃত্যুবরণ করে এবং পশ্চাদপসরণের সময় জাপানিদের কুলি হিসেবে তাদের ব্যবহার করা হয় বলে অনেকেই অভিযোগ করেছেন। পিছু হটা সম্পর্কে বলতে গিয়ে শাহ নাওয়াজ খান বলেন, ‘কোহিমা থেকে পিছু হটার এ ঘটনা পৃথিবীর যেকোনো সেনাবাহিনীর জন্যই খুব খারাপ অভিজ্ঞতা। তীব্র বৃষ্টিপাত পথের সব চিহ্ন মুছে ফেলেছিল। নতুন তৈরি করা পথও বেশি সময় থাকত না। সেসব পথও হাঁটু পর্যন্ত কর্দমাক্ত হয়ে উঠত এবং সেনারা তিন-চারদিন আগে মরে পচে যাওয়া ঘোড়া খেতে বাধ্য হয়েছিল। এর চেয়েও বড় কথা, পথ চলার সময় পথের দুই পাশে নিজেদের সৈন্যদের মৃতদেহ দেখতে হচ্ছিল।’ এমজি মুলকার তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ১৯৪৪ সালের ২৫ জুন তারা কোহিমা থেকে পিছু হটেন।

প্রশ্ন জাগতে পারে, কোহিমা লড়াইয়ে স্থানীয় নাগা-মণিপুরীদের আচরণ কেমন ছিল। মজার ব্যাপার, এ পুরো যুদ্ধের সময়েই স্থানীয় মানুষ মিশ্র আচরণ করেছিল। প্রথমত, যেসব অঞ্চল ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল বা ব্রিটিশ প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল তারা ব্রিটিশদের প্রতি ঝুঁকে ছিল। এ অঞ্চলের প্রায় ২০০ মানুষ ব্রিটিশদের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে, যাদের মধ্যে ৬৩ জন গারো, ৫৯ জন খাসি, ৫২ জন জৈন্তিয়া ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর। ব্রিটিশ প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীরা আবার আইএনএ ও জাপানি মিত্র বাহিনীর পক্ষাবলম্বন করেছে। সরাসরি না হলেও তারা নৈতিক সমর্থন দিয়েছিল, কিন্তু যুদ্ধের এ পর্যায়ে যখন জাপানি-আইএনএ যৌথ বাহিনী পিছু হটছে, সে সময় ওই অঞ্চলের মানুষ সৈন্যদের প্রতি সেভাবে কোনো সহমর্মিতাই প্রকাশ করেনি। এর পেছনে কিছু কারণও অবশ্য উল্লেখ করা হয়। রসদে টান পড়ার পর দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং সেখানে লুটপাট আরম্ভ হলে নাগারা এদের প্রতি বিরূপ হতে আরম্ভ করে। পশ্চাদপসরণকারী সৈন্যদের প্রতি তারা কোনো সহমর্মিতা প্রকাশ করেনি।

জাপানিদের হার প্রসঙ্গে মুতাগুচির গৃহীত সিদ্ধান্তের দ্রুটি উল্লেখ করা যায়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি শত্রু সম্পর্কে উপযুক্ত গবেষণা করে আসেননি। ব্রিটিশ প্রশাসন, সৈন্যবাহিনীর কৌশলকে খাটো করে দেখার পাশাপাশি আইএনএর সঙ্গে জাপানি বাহিনীর বোঝাপড়ায় ত্রুটি রয়ে গিয়েছিল। আকাশপথে আক্রমণের অভাবেও জাপানিদের মাশুল গুনতে হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে জাপানিরাই এগিয়ে ছিল, কিন্তু ব্রিটিশ ‘রি-ইনফোর্সমেন্ট’ আর আকাশপথে রসদ সরবরাহের কারণে তারা টিকে থাকতে পেরেছিল। অন্যথায় ব্রিটিশ কর্মকর্তা রোল্যান্ডের স্মৃতি থেকে জানা যায়, তিনি নিজ বাহিনীর তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বড় বাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়েছিলেন।  

ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি ও জাপানের মিত্রতার এ অভিযানের ক্ষেত্রে সুভাষ চন্দ্র বসু বরাবরই নিজের উপস্থিতি প্রকাশ হওয়া সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন। তিনি তার সৈন্যদের সঙ্গে বিভিন্ন উপায়ে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। সুভাষের জীবন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা জানি, তিনি ছদ্মবেশ ধারণে কুশল ছিলেন। সেক্ষেত্রে এও সম্ভব যে তিনি সত্যিই কোহিমায় উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু নিজের উপস্থিতি প্রকাশ করেননি। অন্যদিকে ব্রিটিশ প্রশাসনও জানত, এ মুহূর্তে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সফল হওয়া তাদের জন্য বিশেষ ক্ষতির কারণ হবে। ফলে সেভাবেই তারা কৌশল সাজিয়েছিল এবং ব্রিটিশরাই শেষ অবধি সফল হয়েছিল।

কোহিমার এ যুদ্ধ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী অবস্থা প্রসঙ্গে সে সময় প্রয়োজনীয় লেখালেখি হয়নি। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির অনেক রেকর্ড নষ্ট করা হয়েছিল এবং এমন অবস্থাই হয়েছে যে আজ অবধি কোহিমায় যুদ্ধ করা এ সেনাদলকে Forgotten Army বলে উল্লেখ করা হয়। এ ভুলে যাওয়ার কারণ মূলত রাজনৈতিক, অনেক ক্ষেত্রে সামরিক। জাপানিদের লেখা অনূদিত না হওয়ার কারণে আমরা সেসব থেকে বঞ্চিত হয়ে রয়েছি। আরেকটি বিষয় হলো জাপানিরা এখন আর এ ঘটনা স্মরণ করে ক্ষত বাড়াতেও ইচ্ছুক নয়। ১৯৯০ সালের দিকে এ বিষয়ে ভারতে নানাজনে লিখতে আরম্ভ করেন। অতিসাম্প্রতিক কালে পশ্চিমবঙ্গে সুভাষ বসুকে নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সিনেমা, সিরিজে আমরা সুভাষ, আইএনএ থেকে আরম্ভ করে কোহিমা থেকে পিছু হটার দৃশ্যের পুনর্নির্মাণ দেখতে পাই। জাপানি-আইএনএ বহরের দুর্বিষহ যাত্রার কিছুটা উঠে আসছে, কিন্তু তার অনেকটাই আবেগ থেকে তৈরি, কিয়ৎ নাটকীয়।

খোদ ব্রিটিশ সেনাবাহিনী মনে করে, কোহিমার এ যুদ্ধ ব্রিটিশ বাহিনীর অন্যতম সেরা লড়াই। সামরিক ইতিহাসের পাশাপাশি সামাজিক ইতিহাস হিসেবেও এ ঘটনার বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এছাড়া এ সময়ের পরে নাগাল্যান্ডে জাতীয়তাবাদী আন্দলনের উত্থান, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি থেকে শুরু করে ‘সুভাষকে বোঝা শক্ত’ মিথ থেকে বেরিয়ে আসার জন্যও তথ্য-উপাত্তসহ কোহিমা যুদ্ধের ব্যবচ্ছেদ সময়ের দাবি।

তথ্যসূত্র

১. সুভাষ চন্দ্র বোস অ্যান্ড দ্য ট্রেইল অব আইএনএ ইন নাগা হিলস ডিউরিং দ্য ব্যাটল অব কোহিমা, ঝোকুশেই রাখো, ইস্টার্ন মিরর

২. সুভাষ চন্দ্র বোস অ্যান্ড আইএনএ ইন নাগা হিলস, শিলং টাইমস

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক