কোহিমার লড়াইয়ের তীব্রতা, ভয়াবহতা, জাপানিদের পরাজয়, ক্ষুধা আর মানবিক বিপর্যয় দলিল হয়ে আছে এক অজ্ঞাত জাপানি ডাক্তারের ডায়েরির পাতায়। এটি খুুঁজে পেয়েছিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি গোর্খা প্লাটুন। ইম্ফলে এক পাহাড়ে শত শত মৃতদেহের স্তূপের মধ্যে পড়ে ছিল ডায়েরিটি। এপ্রিলের শুরুতে সেই ডাক্তারের এন্ট্রি থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনারা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ফ্রন্টলাইনে থেকে তিনি যেমন গর্ব অনুভব করছিলেন, একই সঙ্গে জাপানে চেরি ফোটার ঋতুর জন্য মন কেমন করছিল। ১৫ দিনের মধ্যে তাকে অসংখ্য সেনার ডায়রিয়া ও আমাশয়ের চিকিৎসা করতে হয়েছিল। এর এক সপ্তাহ পর ক্ষুধা এমন প্রচণ্ড হয়ে উঠল যে সেনারা আর এগোনোর শক্তি পাচ্ছিল না। জঙ্গলে গভীর রাতে শুয়ে ডাক্তারের কেবল মিষ্টি আলু খেতে মন চাইছিল। পাশেই এক সেনা বলছিল, মরার আগে সে জাপানের সেরা খাবারগুলো খেয়ে মরতে চায়। বাসায় আমরা কী খেতাম সেসব কল্পনা করলেই জিভে পানি চলে আসে। বোমাবর্ষণ তার স্নায়ুকে বিদীর্ণ করে দিচ্ছিল। বাতাসে মানুষের অঙ্গ-প্রতঙ্গ গুলি-বোমায় উড়ে যেতে দেখেছেন। ব্রিটিশ ও ভারতীয় সেনারা যে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছিল তাও উল্লেখ করেছেন। তার কোম্পানির কয়েকজন সদস্যই তখন বেঁচে ছিলেন। ১৮ মে তিনি লিখেছেন, ‘মেডিকেল অফিসারদের মধ্যে কি কেবল আমিই বেঁচে আছি? আগের চেয়ে আরো বেশি চেষ্টা দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে।’ মে মাসের শেষ দিকে নামল বৃষ্টি। প্রার্থনা করলেন একটু শুকনো মাটির। তার কাঁধে একটি আঘাত ছিল, সেখান থেকে পুঁজ বের হচ্ছিল, এবার যুক্ত হলো আমাশয়। ডায়েরির শেষ এন্ট্রি ২৩ মের। সেদিন তিনি লিখেছেন, ‘এখন যদি দুর্বলতায় আমি মাটিতে পড়ে যাই তাহলে কী হবে?’ ডাক্তারের জীবনের শেষ মুহূর্তের সাক্ষী ছিলেন এক গোর্খা মেজর। জাপানের উড্ডীয়মান পতাকার নিচে বিশৃঙ্খলভাবে জড়ো হয়েছিল একদল জাপানি সৈন্য, তাদের মধ্যেই ছিলেন এ ডাক্তার। মেশিনগানের গুলিতে তারা সবাই ঝাজরা হয়ে গিয়েছিলেন। কোহিমা কিংবা ইম্ফলে এ রকম দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে অনেকবার।

মধ্য মে নাগাদ জেনারেল কোটুকু সাতো নিশ্চিতভাবেই বুঝে গিয়েছিলেন, কোহিমার লড়াইয়ে তারা হেরে গেছেন। খাবার ছিল না। খাদ্য সরবরাহ পাওয়ারও কোনো আশা ছিল না। খাবার আনার ট্রাকগুলো ইম্ফলের জন্য রিইনফোর্সমেন্ট আনার কাজে ব্যস্ত ছিল। সেখানেও জাপানের অবস্থা খারাপ হচ্ছিল। ডাক্তার লিখেছেন, সাতো বুঝতে পারছিলেন ব্রিটিশদের আর খুব বেশি দিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। সাতো ১৩ মে সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন ঢাল বেয়ে নেমে আসতে এবং কোহিমার দক্ষিণ দিকে তাদের রক্ষণাত্মক কেন্দ্রে চলে আসতে। লেফটেন্যান্ট হিরোশি ইয়ামাগামি ছিলেন ৫৮তম রেজিমেন্টের ফ্ল্যাগম্যান। তাকে বলা হয়েছিল সদর দপ্তরে রিপোর্ট করতে এবং পিছু হটার জন্য প্রস্তুত থাকতে। একজন কর্মকর্তা হিসেবে আমি এটাই আশা করছিলাম...সামনে এগোনোটা অসম্ভব ছিল...এখানে আর অবস্থান করাটা ছিল অযৌক্তিক।

এ সময় কোহিমার দায়িত্বে থাকা সেনা কর্তারা নানাভাবে চেষ্টা করছিলেন রসদ সংগ্রহের, কিন্তু এ চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। ২৫ মে সাতো মুতাগুচিকে বার্তা পাঠান কোহিমা থেকে সেনা প্রত্যাহারে ইচ্ছা প্রকাশ করে। ‘রেটসু ডিভিশনের সেনা ও ঘোড়া কারো জন্যই আর খাবার নেই। গোলাবারুদও সামান্যই অবশিষ্ট আছে। ১ জুনের মধ্যে এ ডিভিশন সরে আসবে এমন কোনো জায়গায় যেখানে রসদ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।’ এ বার্তা পেয়ে প্রচণ্ড ক্ষেপে যান মুতাগুচি। তার জবাবে সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ‘রসদের অভাবের মতো অজুহাত দিয়ে কোহিমা ছাড়ার কথা বলার সাহস কীভাবে হলো তোমার? আমার নির্দেশ হলো তুমি আরো ১০ দিন তোমার পজিশন ধরে রাখবে।’ নির্দেশনার সঙ্গে একটি প্রবাদও উল্লেখ করেন—মানুষের দৃঢ়প্রতিজ্ঞার সামনে দেবতারাও পথ ছেড়ে দেন।

কিন্তু সত্য হলো দৃঢ়প্রতিজ্ঞা দিয়ে ক্ষুধাকে দূরে রাখা যায় না। অন্যদিকে ব্রিটিশ জেনারেল স্লিমের সেনাদলের সঙ্গে লড়াই করার মতো অবস্থা তাদের ছিল না। ২৬ মে বিকালে ৪/১ গোর্খা রাইফেলস নাগা হিলসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ দখলে নেয়। এর কয়েক দিনের মধ্যে কুইনস রয়াল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়ন কোহিমা থেকে সর্বশেষ জাপানি সেনাকে তাড়িয়ে দেয়। সাতো ফিফটিনথ আর্মিকে জানালেন, এখন তিনি নিজের বিচারবুদ্ধি অনুসারে সিদ্ধান্ত নেবেন। অর্থাৎ এবার তিনি মুতাগুচিকে সরাসরি উপেক্ষা করলেন। সাতো লিখলেন, ‘তার (মুতাগুচির) নির্দেশনা মানার মতো কোনো বাস্তব পরিস্থিতি মাঠে নেই।’

২৬ মে রাতে জেনারেল কোটুকু সাতো আবার বার্তা পাঠালেন যেমনটা ইম্পেরিয়াল জাপানিজ আর্মিতে আর কখনো ঘটেনি। ‘আমরা দুই মাস সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছি। আমরা এখন মানবিক সহ্যশক্তির শেষ সীমায় এসে দাঁড়িয়েছি। আমাদের তরবারি ভেঙে গেছে, তীরগুলো উধাও। চোখে বেদনার জল নিয়ে আমি এখনই কোহিমা ত্যাগ করছি। এটা যেকোনো জেনারেলের হূদয় ভাঙার মতো ঘটনা।’

মুতাগুচি বললেন, সাতো পিছু হটলে তার কোর্ট মার্শাল হবে। সাতো জবাব দিলেন, আপনার যা ইচ্ছা করতে পারেন। কিছুক্ষণ পর সাতো তার ওয়্যারলেস বন্ধ করে দেন।

 

এসএম রশিদ: লেখক