যুদ্ধ শেষ
হওয়ার পর
পরই কোহিমার
যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনে
যান লর্ড
লুই মাউন্টব্যাটেন।
১৯৪৪ এর
শেষ দিকের
ঘটনা। ঘটনাস্থল
এবং যুদ্ধের
গতিবিধি পর্যবেক্ষণ
করে উপস্থিতভাবে
তিনি বলে
ওঠেন, ‘কোহিমা
ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ
লড়াইগুলোর একটি
হিসেবে স্বীকৃত
হবে।’ ব্রিটিশ
ফিল্ড মার্শাল
স্যার উইলিয়াম
জে. স্লিমও
পরবর্তী সময়ে
মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে
একমত হয়েছিলেন।
১৯৫৬ সালে
তিনি লেখেন,
‘এর
চেয়ে দীর্ঘকালীন
অবরোধ হয়েছে,
কিন্তু এর
চেয়ে কঠোর
পরিস্থিতি খুব
একটা দেখা
যায়নি। কোহিমার
গ্যারিসন যারা
রক্ষা করেছেন
তাদের চেয়ে
মর্যাদাবান আর
কেউ নন।’
১৯৪৪ সালের
এপ্রিল ও
জুনে সেকালের
ভারতবর্ষের পূর্বাংশের
কোহিমা শহর
দুনিয়ার নানা
প্রান্তের মানুষের
মনোযোগের কেন্দ্র
হয়ে উঠেছিল।
সেখানে মরণপণ
লড়াই করছিল
মিত্র বাহিনী
ও জাপানিরা।
দুই পক্ষই
কখনো রক্ষণাত্মক,
কখনো আক্রমণাত্মক
ভূমিকায় অবতীর্ণ
হচ্ছিল।
কোহিমার লড়াই
খুব বিস্তৃত
এলাকাজুড়ে ছিল
না, কিন্তু
তার ফলাফল
প্রভাবিত করেছিল
মাঞ্চুরিয়া থেকে
ভারত পর্যন্ত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
ফ্রন্টকে। ওয়াশিংটন
থেকে লন্ডন
পর্যন্ত সবার
মনোযোগ ছিল
কোহিমার দিকে।
আজকের দিনে
কোহিমাকে দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ
লড়াইগুলোর একটি
হিসেবে বিবেচনা
করা হয়।
১৯৪১ সালের ডিসেম্বর নাগাদ থাইল্যান্ডের মধ্য দিয়ে জাপানি সেনারা বার্মায় প্রবেশ করে। ১৯৪২-এর প্রথম কয়েক মাসেই এ জাপানি ফিফটিনথ আর্মি বার্মায় অবস্থান করা ভারতীয়, চীনা ও ব্রিটিশ সেনাদের দেশ ছাড়া করে। কাছাকাছি সময়ে জাপানি সেনারা মালয়, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এ ফিফটিনথ আর্মির অগ্রযাত্রা থামে ভারত ও চীনের সীমান্তে, বার্মা রোড হয়ে চীনের সঙ্গে শেষ সড়ক যোগাযোগপথটি কেটে দেয়ার পর।
১৯৪৩-এ
মিত্র বাহিনী
এ অঞ্চল
থেকে জাপানিদের
খেদাতে দুটো
অভিযান চালায়।
একটি আরাকানে
কিন্তু শোচনীয়ভাবে
ব্যর্থ হয়।
অন্যটি ছিল
ব্রিটিশ ব্রিগেডিয়ার
সি. উইনগেটের
নেতৃত্বে অভিযান।
কিন্তু এগুলোর
কোনোটাই জাপানিদের
সরিয়ে কৌশলগত
কোনো নতুন
ভারসাম্য আনতে
পারেনি। ১৯৪৩
সালের শেষ
দিকে লেফটেন্যান্ট
জেনারেল জোসেফ
স্টিলওয়েল চীন
ও আমেরিকানদের
যৌথ বাহিনী
নিয়ে বার্মার
উত্তরাংশ দিয়ে
অভিযান শুরু
করেন। উদ্দেশ্য
ছিল মিটকিনা
শহর হয়ে
বার্মা ও
চীনের মধ্যকার
সড়ক যোগাযোগপথটি
মুক্ত করা।
কিন্তু এবার
আর জাপানিরা
আগের মোকাবেলাগুলোর
মতো রক্ষণাত্মক
ভূমিকায় ছিল
না। এবার
তারা আক্রমণাত্মক
চেহারা ধারণ
করে। লেফটেন্যান্ট
জেনারেল কাওয়াবে
মাসাকাজুর বার্মা
এরিয়া আর্মি
গুরুত্বপূর্ণ সব
এলাকায় শক্ত
অবস্থান নেয়।
বার্মার মধ্যভাগে
তিনটি ডিভিশন
নিয়ে অবস্থান
নিয়েছিলেন জাপানের
লে. জে.
রেনেয়া মুতাগুচি।
তাদের সহায়তা
করছিল ইন্ডিয়ান
ন্যাশনাল আর্মির
ডিভিশন আকারের
একটি দল।
উইনগেটের ১৯৪৩
সালের ব্যর্থতা
মুতাগুচিকে সাহস
দিয়েছিল। তার
মনে হয়েছিল,
পার্বত্য অঞ্চল
ভেদ করে
ভারতের দিকে
এগোনো যায়,
বিশেষত ইম্ফলের
কাছে। ইম্ফল
ও তার
আশপাশের এলাকাগুলো
দখল করতে
পারলে ভারতের
পূর্বাংশে ব্রিটিশদের
সামরিক উপস্থিতি
উচ্ছেদ হয়ে
যাবে এবং
এ রকম
হলে তা
ভারতীয় ব্রিটিশ
শাসনের বিরুদ্ধে
বিদ্রোহ করতে
নতুন প্রেরণা
জোগাবে। মুতাগুচি
আরো ভেবেছিলেন
ভারতে এমন
একটি সফল
অভিযান চালাতে
পারলে তার
ও জাপানের
ভাবমূর্তি উজ্জ্বল
হবে। ১৯৪৪
সালের জানুয়ারিতে
জাপানের ইম্পেরিয়াল
জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স
মুতাগুচির পরিকল্পনায়
অনুমোদন দেয়।
এখানে আরেকটি
বিষয়ও প্রভাবক
হয়েছিল। জেনারেল
স্লিমের অধীনে
ব্রিটিশ ও
ভারতীয় ফোরটিনথ
আর্মি ডিমাপুর
ও ইস্ফলে
লাজিস্টিক বেজ
তৈরি করছিল।
উদ্দেশ্য ছিল
বার্মায় অভিযান
চালিয়ে সেখান
থেকে জাপানিদের
উত্খাত করা।
১৯৪৪ সালের
ফেব্রুয়ারি। ভারতের
কেন্দ্রের দিকে
এগোনোর চূড়ান্ত
প্রস্তুতি নেন
মুতাগুচি। টোকিও
বলেছিল তাদের
ফিফটিনথ আর্মির
এ অভিযান
‘মার্চ
টু দিল্লি’,
কিন্তু ময়দানের
সেনাপতি মুতাগুচি
পুরো ভারতবর্ষ
দখলের স্বপ্ন
দেখছিলেন। কাওয়াবের
নির্দেশনা আপাতত
মুতাগুচিকে ইম্ফল
ও তার
চারপাশের অঞ্চল
দখলে নেয়ার
মধ্যেই সীমাবদ্ধ
করে দেয়।
এ নির্দেশনা
অনুযায়ী কর্মযজ্ঞ
শুরু হয়ে
যায়—ফিফটিনথ
ও থার্টিথ্রি
ডিভিশন এবং
ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল
আর্মি ইম্ফল
আক্রমণ করে
তিন দিক
থেকে। অন্যদিকে
লে. জে.
সাতো কোতোকুর
নেতৃত্ব থার্টিফার্স্ট
ডিভিশন কোহিমার
দখল নেয়।
এ আক্রমণ
ছিল জাপানের
‘ইউ-গো’
নামে পরিচিত।
এ পর্যায়ে কোহিমা শহরটির অবস্থান ও অন্যান্য বিষয় খেয়াল করা প্রয়োজন। কোহিমা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের (এখনকার সেভেন সিস্টার্স) একটি পাহাড়ি শহর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা পাঁচ হাজার ফুট এবং নাগা হিলসের মধ্যে অবস্থিত। ১৯৪৪ সালের এপ্রিল থেকে জুন এ ছোট শহরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ একটি লড়াই হয়েছিল। ডিমাপুরের সাপ্লাই ডিপো থেকে ইম্ফলে রসদ নিয়ে যাওয়ার একটিমাত্র রাস্তা ছিল আর তাতেই গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন কোহিমা। ডিমাপুর থেকে এর দূরত্ব ৪০ মাইল এবং ইম্ফল থেকে ৮০ মাইল। জাপানিদের পরিকল্পনা ছিল থার্টিফার্স্ট ডিভিশনকে তিনটি কলামে ভাগ করে কোহিমা-ইম্ফল সড়ক কেটে দেয়া এবং কোহিমাকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলা। ১৯৪৪ সালের মার্চের মধ্যভাগে জাপানিরা তাদের ‘ইউ-গো’ অভিযান শুরু করে। ইম্ফল সংলগ্ন এলাকায় থাকা ব্রিটিশ ফোর্থ কর্পসের ২২তম এলিমেন্টস জাপানিদের সঙ্গে প্রথম সংঘর্ষে জড়ায়।
জেনারেল স্লিম
বুঝতে পারছিলেন,
জাপানিদের বড়
আকারের আক্রমণ
আসন্ন। চতুর্থ
কর্পসের বেশির
ভাগ সদস্য
ইম্ফলে জাপানিদের
মোকাবেলা করছে।
অন্যদিকে ইম্ফল-কোহিমা
সড়কটি জাপানিরা
কেটে দিয়েছে।
কোহিমায় দ্রুত
রিইনফোর্সমেন্ট প্রয়োজন
হয়ে পড়েছিল।
ব্রিটিশ সামরিক
গোয়েন্দারা প্রাথমিক
পর্যায়ে কোহিমার
বিপদটি ঠাহর
করে উঠতে
পারেননি। ধারণা
করা হয়েছিল,
কয়েক ব্যাটালিয়ন
সৈন্যই চিন্ডউইন
নদী ও
কোহিমার মধ্যকার
শৈলশিরা অঞ্চলটি
রক্ষা করতে
পারবে। কিন্তু
শেষমেশ জানা
গেল, আস্ত
একটি জাপানি
ডিভিশন কোহিমার
দিকে এগিয়ে
আসছে।
মধ্য মার্চে
কোহিমায় অবস্থান
করছিল কেবল
আসাম রাইফেলসের
কয়েকটি ইউনিট,
ফার্স্ট আসাম
রেজিমেন্ট ও
লাইন অব
কমিউনিকেশনস ট্রুপস।
এর মধ্যে
কোহিমার পূর্বাংশে
মোতায়েন ছিল
ফার্স্ট আসাম
রেজিমেন্ট। জাপানিদের
অগ্রগামী বাহিনীর
প্রবল গোলাগুলিতে
তারা পিছু
হটেছিল। পরিস্থিতি
বুঝতে পেরে
জেনারেল স্লিম
পঞ্চম ও
সপ্তম ইন্ডিয়ান
ডিভিশনকে আকাশপথে
উড়িয়ে এনে
উম্ফল ও
কোহিমায় মোতায়েন
করতে চাইলেন।
এ দুটো
ডিভিশন বার্মায়
জাপানিদের হা-গো
অপরাশেনকে মাত্রই
সফলভাবে মোকাবেলা
করেছিল। স্লিম
আরো বেশ
কয়েকটি ডিভিশন,
কোম্পানি ও
ব্রিগেডকে কোহিমায়
জড়ো করতে
চাইছিলেন। উদ্দেশ্য
ছিল কোহিমাকে
মুক্ত করে
ইম্ফলের সড়কটি
মুক্ত করা।
মার্চের শেষ
দিকে একটি
ব্রিগেড ও
একটি ডিভিশনকে
ডিমাপুরের কাছে
উড়িয়ে আনা
হয়। কোহিমা
রক্ষা করতে
লড়ছিল ১৬১
ইন্ডিয়ান ব্রিগেড,
আসাম রাইফেলস
ও ফার্স্ট
আসাম রেজিমেন্ট।
তারা এদিকে
জাপানিদের ঠেকিয়ে
রাখছিল এবং
প্রবল সংঘর্ষ
শুরু করে।
কোহিমার ডেপুটি
কমিশনারের বাংলোর
বাগান ও
সংলগ্ন টেনিস
কোর্টে জাপানি
সেনাদের সঙ্গে
ব্রিটিশদের ভয়ানক
হাতাহাতির লড়াইও
হয়েছিল। ব্রিটিশ
বাহিনী তখন
ডিমাপুর থেকে
বিচ্ছিন্ন। তাদের
নির্ভর করতে
হচ্ছিল প্রতিদিনের
এয়ার সাপ্লাইয়ের
ওপর। এ
রকম পরিস্থিতিতেও
তারা ১৩
দিন জাপানিদের
ঠেকিয়ে রেখেছিল
প্রবল পরাক্রমে।
কোহিমা ভৌগোলিকভাবে
ব্রিটিশদের জন্য
গুরুত্বপূর্ণ একটি
পয়েন্ট ছিল।
কারণ এর
শৈলশিরা মণিপুর
ও পশ্চিমের
ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার
মধ্যে একটি
প্রাকৃতিক বাধা
হিসেবে কাজ
করত। কোহিমা
আটকে দিতে
পারলে পুর্ব
দিক থেকে
আসা যেকোনো
বাহিনীর জন্য
ভারতের দিকে
এগোনো কঠিন
হয়ে যেত।
অমিত রহমান: লেখক





