আঠারো শতকে বাংলার তাঁত শিল্পের পতন নিয়ে বিতর্ক আছে। কারো মতে, এ পতনের কারণ উৎপাদন পদ্ধতির সনাতনী ও অপরিবর্তনশীলতা। আবার অনেক গবেষক মনে করেন, এ পতন ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের ফল। ব্রিটিশ কোম্পানির মুনাফার লোভ আর তাদের সঙ্গে দেশীয় উৎপাদকদের দ্বন্দ্ব এ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে প্রয়োজনীয় শর্ত জোগায়। এ পরিস্থিতিকে গবেষক হামিদা হোসেন তার গ্রন্থ দ্য কোম্পানি উইভারস অব বেঙ্গল: দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অ্যান্ড দি অর্গানাইজেশন অব টেক্সটাইল প্রডাকশন ইন বেঙ্গল ১৭৫০-১৮১৩-এ অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যা করেছেন। বইটি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিএইচডি গবেষণার থিসিসের ফসল। গত শতকের আশির দশকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে  ইতিহাসবিদ অধ্যাপক তপন রায় চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে পিএইচডি গবেষণা করেছিলেন হামিদা হোসেন। বইটি ১৯৮৮ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, নয়াদিল্লি থেকে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশে বইটি প্রকাশ করেছে দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড।

আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ইউরোপীয়দের মাধ্যমে বস্ত্র শিল্পের বাজার সম্প্রসারিত হয় ইউরোপ-আমেরিকায়। বাজারের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে বাংলার বস্ত্র শিল্পের প্রসার ঘটে, বস্ত্র হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ এক রফতানি পণ্য। অনেক জায়গা হয়ে ওঠে বস্ত্র শিল্প কেন্দ্র, তাঁতিরা নির্দিষ্ট এক পেশাজীবী হয়ে ওঠে। বস্ত্র শিল্পের এমন জমজমাট অবস্থা চলে অর্ধশতকের কিছু বেশি সময় ধরে। ১৮১৩ সালের পর এর ক্ষয় শুরু হয়। ক্ষয়ের কারণগুলো কী ছিল, হামিদা হোসেনের গবেষণায় তা আলোচিত হয়েছে। হামিদা হোসেন দেখিয়েছেন, মূলত তাঁতিদের এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কোম্পানির মুনাফাকে সর্বোচ্চ করতে গিয়েই বাংলার বস্ত্র শিল্প ও তাঁতিদের জীবনে দুর্যোগ নেমে এসেছিল।

আঠারো শতকের বাংলা ছিল ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ। মোগল শাসনের সূর্য তখন ডুবন্ত, তবে বাংলায় মোগল সুবাদাররা তেমন রাজনৈতিক, প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হতে দেননি। কিন্তু কেন্দ্রে মোগল শাসন দুর্বল হয়ে পড়ায় বিভিন্ন শক্তি আধিপত্য বিস্তারে সক্রিয় হয়েছিল। ১৭৩০ পরবর্তীকালে বাংলায় যুদ্ধ, সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। এর কারণ ছিল পশ্চিম দিকে মারাঠা আক্রমণ, পূর্ব দিকে মগ আক্রমণ, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, বাংলার নওয়াবদের সঙ্গে কোম্পানির সংঘাত। এ অস্থিতিশীলতার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে।

বাংলায় বাণিজ্যিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চেষ্টার ফল হচ্ছে পলাশী ও বক্সারের যুদ্ধ। এ দুই যুদ্ধ ছিল একটি বাণিজ্যিক কোম্পানির প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ তারা তাদের বাণিজ্যের স্বার্থে প্রশাসনিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এমনটা নয় যে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ও মীর কাসিম কোম্পানির বাণিজ্য কুঠির প্রতি শত্রুমনোভাবাপন্ন ছিলেন। কিন্তু তাদের ভয় ছিল এসব প্রতিষ্ঠানের কারণে অন্য বণিকরা বিপদে পড়বেন, সরকারের রাজস্ব কমবে এবং তাদের শাসনক্ষমতাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অন্যদিকে কোম্পানি তার কারখানাগুলোকে দুর্গের চেহারা দেয়ায় এবং নিজেদের কর্মকর্তা ও বণিকদের রক্ষায় বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়ায় মীর কাসিমের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।&dquote;&dquote;

কোম্পানি চাইছিল বাংলার ক্ষমতা গ্রহণ করে তাদের বাণিজ্য সুবিধা অবারিত করা, আর নবাব সিরাজ চাইছিলেন কোম্পানির প্রভাবকে প্রতিরোধ করতে। যাহোক, পলাশী (১৭৫৭) ও বক্সারের (১৭৬৪) যুদ্ধের পর ১৭৬৫ নাগাদ বাংলায় কোম্পানির ভূমিকা আর নিছক কোনো বাণিজ্য সংগঠনের রইল না। এখন থেকে বাংলার ভৌগোলিক বিস্তার ও রাজস্বের ওপর কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণকে কোম্পানি তার বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করতে শুরু করে।

বাংলার বস্ত্র শিল্পের দুটি বৈশিষ্ট্য একে বিভিন্ন রাজ্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর এবং রফতানি বাজারে চাহিদাসম্পন্ন করে তুলেছিল। পণ্যের উন্নত মান ও কম দাম। কম দামের কারণে এ বস্ত্রটি দূরের গন্তব্যে রফতানির জন্য উপযুক্ত পণ্য হয়ে ওঠে। প্রাথমিক সময়ে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রফতানি বাণিজ্য ও উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেছিল। এ সময় উৎপাদকরা বেশ স্বাধীন ছিলেন। বণিকদের দালালদের কাছ থেকে তাঁতিরা পুঁজিরও জোগান পেতেন। স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন সম্পর্ক টিকে ছিল। কিন্তু এ উৎপাদন সম্পর্ক কোম্পানির ক্রয় প্রক্রিয়ার জন্য লাভজনক ছিল না। কোম্পানির জন্য প্রয়োজন ছিল তাদের কোর্ট অব ডিরেক্টরসদের নির্ধারণ করা দামে নিয়মিতভাবে কাপড়ের সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু যে বাজারে বিভিন্ন ধরনের এবং স্তরের ক্রেতারা ভিড় করেন, সেই বাজার থেকে এ ধরনের নিশ্চয়তা মেলা কঠিন। কোম্পানিও ধীরে ধীরে সেটা বুঝতে পারছিল। কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট, যারা তাঁতিদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত ছিলেন, তারা কোম্পানিকে জানান যে লন্ডন থেকে স্থানীয় উৎপাদন খরচ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে কোর্ট অব ডিরেক্টরস বুঝতে পারছিলেন স্থানীয় এজেন্টরা কাপড়ের দাম ও ক্রয়কে নিয়ন্ত্রণ করে সেটা কোম্পানির স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে। তাই কোম্পানির দরকার হয়ে পড়েছিল সরবরাহে সরাসরি প্রবেশাধিকার। বাণিজ্য ও ঋণদানের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে তাঁতিদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছিল কোম্পানি।  

রফতানির হিসাব থেকে দেখা যায়, বাংলার বস্ত্র শিল্পের গুরুত্ব আঠারো শতকে অটুট ছিল। ১৭৫১-৬০ সময়কালে বাংলার টেক্সটাইলের রফতানি ছিল মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ের চেয়েও বেশি।

১৭৫৭ সালের দিকে গ্রামীণ পেশাজীবীদের পেশাভিত্তিক দলে সংঘবদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এ ব্যবস্থায় প্রত্যেক কারিগরকে জমিদারের কাছ থেকে কাজ করার জন্য লাইসেন্স নিতে হয়। এর বিনিময়ে কারিগর জমিদারকে বার্ষিক কর দিতেন।

বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ ও টেক্সটাইল উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কোম্পানির প্রথম আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ ছিল ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল পাস করা একটি রেজল্যুশন। ১৭৮৬ সালের রেগুলেশনে তাঁতিদের ‘কোম্পানি উইভার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। একই সঙ্গে গোপনে পণ্য বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এ আইন না মানলে তাঁতিদের দেওয়ানি আদালতে শাস্তি দেয়ার বিধান ছিল। দোষী সাব্যস্ত হলে বিক্রি করা পণ্যের পুরো দাম বাজারমূল্যে তাঁতিকে ফেরত দিতে হতো কোম্পানিকে। কয়েকটি অভিযোগে কোম্পানি তার তাঁতিদের আদালতে তুলতে পারত— উৎপাদনে বিলম্ব, আড়ংয়ে অসম্পূর্ণ ডেলিভারি এবং গোপনে বিক্রি। ডেলিভারির তারিখ বজায় রাখতে না পারলে তাঁতিকে জরিমানা ও শাস্তির মুখে পড়তে হতো। দেরি করলে তাদের বাড়িতে পেয়াদা নিয়োগ করা হতো।&dquote;&dquote;

তাঁতিদের নিয়ন্ত্রণের পর কোম্পানি মনোযোগ দেয় বাজারের বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার ওপর। বাজারে আরো অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী থাকায় ক্রয়ের ব্যাপারে কোম্পানির লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছিল না। ১৭৭৫ ও ১৭৭৬ সালে ঢাকার আড়ংয়ের অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ তোলেন যে সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে কোম্পানি তাদের ব্যবসায় বাধা সৃষ্টি করছে। ব্যবসায়ীদের বাজারে প্রবেশে করতে না দিয়ে তাদের কোম্পানির গোমস্তা বা আবাসিক বাণিজ্য প্রতিনিধির কাছ থেকে পণ্য কিনতে বাধ্য করা হয়।

উনিশ শতকের প্রথম ভাগের আগ পর্যন্ত বাংলার বস্ত্র শিল্প কোম্পানির জন্য লাভজনক ছিল, কিন্তু তারপর কোম্পানির কাছে এর গুরুত্ব কমতে থাকে। উনিশ শতক শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত রফতানি খাত আবর্তিত হতো বিদেশী চাহিদার ওপর নির্ভর করে। এবং এ খাত ইউরোপীয় বাণিজ্যিক উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় লাভজনক ছিল। এ কারণে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার বস্ত্র খাতে ক্রয় ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করেছিল। কিন্তু কোম্পানির এ হস্তক্ষেপের ফলে বাংলার বস্ত্র উৎপাদন বিকশিত হয়নি। আঠারো শতকের শেষ দশকে রফতানি চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে বাংলায় বস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধি পায়নি। খেয়াল করলে দেখা যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বস্ত্র খাতের বড় ক্রেতা হয়ে উঠেছিল, তখন একই সঙ্গে তারা বাংলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাও হাতে পেয়েছিল। ফলে বাংলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য যেকোনো কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা তাদের ছিল। অথচ চাহিদা বৃদ্ধির পরও বাংলায় উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছিল। হামিদা হোসেন তার বই দ্য কোম্পানি উইভারস অব বেঙ্গল: দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অ্যান্ড দি অর্গানাইজেশন অব টেক্সটাইল প্রডাকশন ইন বেঙ্গল ১৭৫০-১৮১৩-এ লিখেছেন,  ‘’This decline can not be brushed away with an economic equation : it can not be explained either in terms of supply and demand or of one superior economic force supplanting another. The overwhelming changes in European technology and trade may explain the disruption of the international market system set up for Bengal’s textiles. But they do not provide a rationale for the pressures develpoing within the supply organization which were primarily responsible for the decline or stagnation in production”&dquote;&dquote;

ইউরোপীয় বাণিজ্যের জন্য বাংলার বস্ত্র শিল্পের রফতানি বাজার বিকশিত হয়। এ বিকাশ আবার উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিবর্তনকে উৎসাহিত করেছিল। অবশ্য এ খাতে তখনো সমবিনিময় ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বাংলার তাঁত শিল্প ছিল অনুন্নত প্রযুক্তি ও নিম্ন উৎপাদন ক্ষমতাবিশিষ্ট। এখানে শ্রমবিভাগ গড়ে উঠেছিল বর্ণ ও পেশার ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে। যুগি তাঁতিরা একাধারে চাষী ও কারিগর ছিলেন। তারা একই সঙ্গে জমি ও তাঁতে কাজ করতেন। কিন্তু এখন তাকে চরকা কাটনী, তুলা পেঁজার শ্রমিক, তাঁতি, ধোপা, এমব্রয়ডারকে জায়গা ছেড়ে দিতে হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদকরা পুঁজি ও কাঁচামালের জন্য বাইরের প্রতিষ্ঠানের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন। অন্যদিকে পুরো প্রক্রিয়া আবর্তিত হচ্ছিল রফতানি বাজারকে কেন্দ্র করে। ফলে ঋণদান, পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ন্ত্রণসহকারে একটি বিস্তৃত উৎপাদন সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, যা বাংলার তাঁতিদের জীবনে নতুন ছিল। এ সম্পর্ক বণিকদের উচ্চমুনাফার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। বণিকদের দরকার ছিল পণ্যের চাহিদা, মূল্য, পুঁজি ও কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা। তবে এ সময় ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো এই স্থানীয় ব্যবস্থাকে গুরুতরভাবে বদলে দেয়নি। বণিক ও কোম্পানির সঙ্গে দরকষাকষিতে উৎপাদকদের যথেষ্ট স্বাধীনতা ছিল।

কিন্তু ১৭৫০-এর দশকে কাঁচামাল ও পুঁজির প্রাপ্যতা হ্রাস উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ভারসাম্যে আঘাত হানে। এ রকম পরিস্থিতিতে কোম্পানির কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা দুই বছর আগেই কোনো অর্ডারের ব্যাপারে নির্দিষ্ট সময় ছক বেঁধে দেয়। এজন্য বাজেট ছিল পরিকল্পিত, সময় ও মূল্য সুনির্দিষ্ট। কিন্তু ছোট কর্মীদের জন্য এ ধরনের কাঠামো অনুসরণ করাটা ছিল খুব কঠিন। এ প্রক্রিয়ায় বড়, করপোরেট সংগঠনের ওপর ছোট, স্থানীয় উৎপাদকদের নির্ভরতা তৈরিতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল।

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির সময় উচ্চহারে মুনাফার লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে কোম্পানি ক্রয় এবং উৎপাদনে বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে শুরু করে। মূল উদ্দেশ্যটি ছিল তাঁতিদের উৎপাদনকে কোম্পানির ওপর নির্ভর করে তোলা। উৎপাদন ও ক্রয় উভয় ক্ষেত্রেই কোম্পানি তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়েছিল। এ উদ্দেশ্যে দুই ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল— অর্থনৈতিক এবং অ-অর্থনৈতিক। আর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দিয়ে জোরপূর্বক ক্রয়কে নিশ্চিত করা হয়েছিল। আর আইনি নিয়ন্ত্রণ উৎপাদনের ওপর আধিপত্য তৈরি করেছিল। এভাবে সৃষ্টি হয়েছিল কোম্পানির প্রতি বাধ্যতামূলক একটি ব্যবস্থা। অতীত থেকে চলে আসা স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থায় তাঁতিরা ছিলেন স্বাধীন। কিন্তু ১৭৭২ থেকে ১৭৯৩ সালের মধ্যে তৈরি হওয়া বিভিন্ন নীতি-নির্দেশনায় বকেয়া ঋণের কারণে তাঁতিদের নিজস্ব উপকরণ তাঁত, সুতা মর্টগেজ করা হয়। তাই কোম্পানির জন্য উৎপাদন করা তাঁতিরা তাদের কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে ওঠেন এবং এটি উৎপাদন কাঠামোর একটি অংশ হয়ে ওঠে।&dquote;&dquote;

ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দুটোই কোম্পানির হাতে আসায় তাদের লাভ ও আগ্রহের ক্ষেত্র বিস্তৃত হতে থাকে। কোম্পানির এ আগ্রহ অনেক সময় পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। এ পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীণ বাংলার সঙ্গে কোম্পানির এক ধরনের মধ্যবর্তী ও জটিল সম্পর্কের জাল তৈরি হয়।

কোম্পানির বোর্ড অব ট্রেডের সদস্য বা কারাখানার কর্মকর্তাদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব ক্রয়সংক্রান্ত সংগঠনগুলোকে ঝামেলায় ফেলে দেয়। এতে বিপদে পড়েন মধ্যবর্তী একটি অংশ বা আড়ং (গোমস্তা ও আড়ংয়ের সদস্য) ও পোদ্দার এবং তাঁতিদের সংগঠনের বিভিন্ন প্রভাবশালী অংশ। এদের কাজ ছিল মূলত ব্যবস্থাপনা, কিন্তু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এ কাজে খুব দক্ষতা তাদের ছিল না। তাদের কাজ ছিল তাঁতিদের সঙ্গে ডিলিংসে কোম্পানির জন্য যতটা সম্ভব মুনাফা নিশ্চিত করা। কিন্তু সবসময় একইভাবে উচ্চহারে মুনাফা নিশ্চিত করাটা অসম্ভব ছিল। পুরো ক্রয় প্রক্রিয়ায় আরো অসংখ্য সমস্যা ছিল এবং মূল লক্ষ্য ছিল মুনাফা সর্বোচ্চকরণ। আর তাই তাঁতি শোষণ করা ভিন্ন কোনো পথই খোলা ছিল না।

কোম্পানির বাণিজ্যে যারা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণী ছিলেন, তারা আগে থেকেই গ্রামীণ বাংলায় তাদের সামাজিক প্রভাব খাটাতেন। এবার কোম্পানির বাণিজ্য ও ঋণের সুবিধা পেয়ে তারা অর্থনৈতিকভাবেও তাঁতিদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন। কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক তাদেরকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক লেনদেনে প্রভাব বিস্তার করার শক্তি দেয়। পুরো প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাওয়ায় কোম্পানি ও তার কর্মকর্তাদের জন্য উৎপাদনের অর্ডার, ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগাতেন। নিজেদের আর্থিক লাভটাও তারা এ সুযোগে নিশ্চিত করে নিতেন। এভাবে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত লোভ বাংলার তাঁতিসমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল এবং উৎপাদন হ্রাস পেয়েছিল।

তাঁতিদের কাছ থেকে জমির খাজনা আদায়ের সিদ্ধান্ত তাদের রায়তদের গোত্রে নিয়ে আসে। ফলে কোম্পানির কাছে কারিগর হিসেবে তাদের গুরুত্ব কমে যায়। তবে এর আগে থেকেই কোম্পানির রাজস্ব ও বাণিজ্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গিয়েছিল। পরিণতিতে উৎপাদনকে নিরুৎসাহিত করা শুরু হয়েছিল। আগে কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন থাকায় তাঁতিরা ভাড়া ও করে কিছু ছাড় পেতেন। কিন্তু কোম্পানির আগ্রহ বাণিজ্য থেকে রাজস্বে স্থানান্তর হওয়ায় তাঁতিদের ওপর খাজনার চাপ বেড়ে যায়। কোম্পানিকে কাপড় সরবরাহ করেও তাঁতিরা কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। একদিকে রাজস্বের হার বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ মধ্যস্বত্বভোগীদের অন্যায় আবদার মিটিয়ে রফতানির জন্য পণ্য উৎপাদন তাঁতিদের আর লাভের মুখ দেখাতে পারছিল না। হামিদা হোসেন আলোচ্য গ্রন্থে লিখেছেন, “In other pre-industrial societies such as China, revenue demand had provided an incentive for the manufacture of both silk and cotton. But in Bengal under Company rule the pressure for revenue led to a shift from manufacture to agriculture, since the returns from manufacture were not enough both to pay the levies imposed by the zamindar and meet the weaver’s subsistence needs. Besides, the pattern of rural relationships which the revenue demand created made the weavers reluctant to produce cloth for the Company.” এছাড়া কোম্পানির নীতির দ্বন্দ্ব, রাজস্ব আদায়কারী ও কোম্পানির পক্ষে বস্ত্র বাণিজ্যের এজেন্টদের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি করে। এ দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যান তাঁতিরা। তাছাড়া জমিদাররা গ্রামীণ কাঠামোতে শক্তিশালী হয়ে ওঠায় অনেক সময় তাঁতিরা এক এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যেতে শুরু করেন।&dquote;&dquote;

তাঁতিদের প্রতিরোধ ছিল পরোক্ষ। তারা পুরোপুরি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু কোম্পানির অর্থনৈতিক আগ্রহ অন্যদিকে স্থানান্তর হওয়ায় তাঁতিদের মুনাফা ও কর্মসংস্থান হ্রাস পেতে থাকে। চাপ সামলাতে না পেরে তাঁতিরা হয় তাদের পেশা ত্যাগ করছিলেন অথবা অন্যত্র চলে যাচ্ছিলেন। 

বাংলার ক্ষতিগ্রস্ত তাঁতিদের সংখ্যা নির্ধারণ করাটা কঠিন। সেই সব তাঁতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, যারা রফতানিনির্ভর উৎপাদনকে তাদের মূল পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিছু জেলা যেমন— ঢাকা ও শান্তিপুরে তাঁত একেবারে মূল পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কারণ সারা বছরই রফতানির জন্য পণ্য উৎপাদন করার দরকার হতো। অন্যদিকে ভূমিহীন মানুষরা তাদের কর্মসংস্থানের জন্য বাধ্য হয়েই পুরোদস্তুর তাঁতি হয়ে ওঠেন। এ ভূমিহীন তাঁতিরা অনেক জায়গায় কোম্পানির দেয়া অগ্রিমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এবং তাদের সামনে অন্য কোনো পেশায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার সুযোগও ছিল না। এ আলোচনা শেষে হামিদা হোসেন তার বইয়ে উপসংহার টেনেছেন— ‘এভাবে করপোরেট ক্রেতারা তাঁতিদের পুঁজি সরবরাহ করত এবং তাদের বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দিত। এবং এ ক্রেতারাই ছিল তাঁতিদের দারিদ্র্য এবং এমনকি পেশা থেকে তাদের বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ।’