সামিয়া খাতুন বাংলাদেশী গবেষক। অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন দীর্ঘদিন। সেই পাট চুকিয়ে এখন দেশে আছেন। তবে গল্পের শুরুটা অস্ট্রেলিয়ায়। ২০০৮ সাল তিনি অস্ট্রেলিয়ায়, হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় অস্ট্রেলিয়ার এক ইতিহাস বইয়ের ভেতরে ছাপা একটি ছবিতে। বইয়ে থাকা অস্ট্রেলিয়ার ভেতরের দিকে মরুভূমির প্রান্তে উনিশ শতকের ভগ্নপ্রায় মসজিদের ভেতরে পুরনো, ছেঁড়াখোঁড়া একটি গ্রন্থের ছবি তার মনোযোগ আকর্ষণ করে। বইতে ছবির ক্যাপশনে বলা হয়ছিল এটা পবিত্র কোরআন। ছবিতে বইয়ের অক্ষরগুলো ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছিল না। তবে সামিয়ার কাছে অক্ষরগুলো বাংলা ভাষার বলেই মনে হচ্ছিল। সামিয়ার মনে তখন যে প্রশ্নটি উঁকি দিয়েছিল, ‘তাহলে কি অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে কোরআনের উনিশ শতকের কোনো বাংলা অনুবাদ বই হাজির হয়েছিল?’ জবাব খুঁজতে সামিয়া পরের বছর শীতকালে হাজির হলেন সেই পুরনো মসজিদে। তারপর আরো ব্যাপক বিস্তৃত গবেষণা ও অনুসন্ধান। সেই গল্প নিয়েই রচিত হয়েছে অস্ট্রেলিয়ানামা : দ্য সাউথ এশিয়ান ওডেসি ইন অস্ট্রেলিয়া।
সিডনি থেকে এক হাজার কিলোমিটার ভেতরের দিকে ব্লু মাউন্টেনের অবস্থান। সেখানেই এই ছোট্ট লাল মসজিদ। এ মসজিদের পরই শুরু হয়েছে মরুভূমি। মসজিদটি নির্মিত ঢেউটিন দিয়ে এবং এটি নির্মাণ করা হয় আনুমানিক ১৮৮৭ সালের দিকে। সেসময় এ জায়গাটি ছিল ব্রোকেন হিল টাউন। মসজিদের ভেতরটা সবুজ এবং সেখানে সরল আরবি নকশা করা। এ মসজিদ একসময় ভারত মহাসাগরের পাড় থেকে আসা মুসলিমদের কাছে পবিত্র এক জায়গা ছিল।
ব্রোকেন হিল শহরটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল উইলজাকালি আদিবাসীদের এলাকায়। ১৮৮৫ সালের জুনে ওই এলাকায় ঘুরছিল খনিজ সম্পদের হদিস খুঁজতে থাকা একটি দল। তখন এক আদিবাসী সেই দলটিকে খনিজ ধাতুর খনির সন্ধান দেন, সেই অনুসন্ধানকারী দলটি আদিবাসী পথপ্রদর্শককে ডাকত ‘হ্যারি’ নামে। এটা ছিল রুপার খনি। শিগগিরই মধুর সন্ধানে যেমন মৌমাছি আসে, তেমনি এ খনিকে কেন্দ্র করে ভিড় জমাল উটের সারি, দক্ষিণ এশিয়ার বণিকরা। অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে ঔপনিবেশিক শিল্পায়নে উটের বেশ সহায়ক ভূমিকা ছিল। বিকাশমান ফার্ম ব্রোকেন হিল প্রোপ্রিয়েটি লিমিটেডের (বিএইচপি) সঙ্গে সঙ্গে ব্রোকেন হিল শহরের ভাগ্যও বদলাচ্ছিল। বর্তমান দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মাইনিং কনগ্লোমারেট বিএইচপি-বিলিটনের প্যারেন্ট কোম্পানি হচ্ছে এই বিএইচপি। মাইনিং ফার্ম উইলজাকালিদের মাটি থেকে সিসা, লোহার আকরিক আর রুপা তুলে সেগুলো পাঠাচ্ছিল ভারত মহাসাগরের বন্দর ও ব্রিটিশ বাজারে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মানচিত্রে ব্রোকেন হিল অন্যতম এক ব্যস্ত শিল্প কেন্দ্রে পরিণত হয়।
পণ্যের পরিবহন বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উটের বণিক ও চালকদের আগমন বেড়ে যায়। বিশ শতক শুরু হতে হতে ব্রোকেন হিলে ৪০০ দক্ষিণ এশীয় বসবাস করতে শুরু করে। তারা সেখানে দুটি মসজিদ তৈরি করেছিল, যার মধ্যে একটি এখনো টিকে আছে।
১৯৬০-এর দশকে ব্রোকেন হিল হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি আলোচ্য মসজিদটি সংস্কার করে। এ কাজ করার সময় তারা মসজিদ চত্বরে একটি বই খুঁজে পায়। বালি আর ধুলোয় ডুবে থাকা বইটি কর্তৃপক্ষ পরিষ্কার করে মসজিদের ভেতরে রাখে এবং এর সঙ্গে একটি পরিচয়মূলক বিবরণী লিখে রাখে। তারা বইটিকে ‘পবিত্র কোরআন’ নামে ক্যাপশন দেয়। ইতিহাসবিদ ক্রিস্টিন স্টিভেনস ১৯৮৯ সালে তার অস্ট্রেলিয়ায় আফগানিস্তানের উটচালকদের ইতিহাসবিষয়ক গ্রন্থে মসজিদের ভেতরের বইটির একটি ছবি যুক্ত করেন। কাহিনী এগিয়ে নেয়ার আগে পাঠককে জানিয়ে রাখা দরকার যে ব্রোকেন হিল হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি মসজিদের ভেতরের সেই গ্রন্থটিকে চিনতে পারেনি এবং তারা বইটির ক্যাপশনে ভুল করে রেখেছিল। এই ভুল শেষমেশ কবে ভাঙত, তা সময়ের হাতেই ছেড়ে দেয়া ছিল। অবশেষে ২০০৯ সালে সেই ভুল ভাঙল বাংলাদেশী ইতিহাস গবেষক সামিয়া খাতুনের হাত ধরে।
২০০৯ সালের জুলাইয়ে সামিয়া ব্রোকেন হিলের মসজিদে হাজির হন। ছবির সেই বইটির জন্য তিনি মসজিদের ভেতরের শেলফগুলোয় খুঁজতে শুরু করেন এবং একসময় সেই বড় আকারের বইটি পেয়েও যান। কয়েক পাতা উল্টিয়েই সামিয়া বুঝতে পারেন বইটি কোরআন শরিফ নয়, এটি হলো কাসাসুল আম্বিয়া এবং সবচেয়ে চমকে দেয়ার মতো তথ্য হচ্ছে বইটি বাংলা ভাষায় লিখিত। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতায়। ১৮৬১ থেকে ১৮৯৫ সালের মধ্যে আট খণ্ডে পূর্ণাঙ্গ কাসাসুল আম্বিয়া প্রকাশিত হয়। মসজিদের বইটি এই আট খণ্ড একত্রে প্রকাশিত সংকলন এবং এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫০০। কাসাসুল আম্বিয়ার এ কপিটি ছিল কাজি সফিওদ্দিন, মুন্সি রেজাউল্লা ও মুন্সি আমিরদ্দিনের অনুবাদ।
১৯৬০-এর দশকে বইটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। এর ওপর কেবল ধুলোবালি জমতে থাকে। চার-চারজন অস্ট্রেলীয় ইতিহাসবিদ বইটিকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তার পরও কেন এর ভুল নাম দেয়া হলো? তার ওপর ক্রিস্টিন স্টিভেনস লিখেছেন, মসজিদটি নির্মাণ করেছে আফগানিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে আসা অভিবাসীরা। কিন্তু তাহলে এখানে বাংলায় লেখা বই এল কোথা থেকে?
প্রশ্নের জবাব খুঁজতে সামিয়া ব্রোকেন হিল হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির দলিলাদির পাতা ওল্টাতে শুরু করেন। তার খোঁজ ছিল অস্ট্রেলিয়ার মহাফেজখানায় বাংলা ভাষায় লেখা কোনো দলিল। খুঁজতে গিয়ে সামিয়া অস্ট্রেলিয়ার বুকে সেই উট ব্যবহারের যুগে অনেক দক্ষিণ এশীয় ভাষার উপাদান পেলেন, যা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসবিদরা পাশে সরিয়ে রেখেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার সংবাদপত্রেও সেসময় ভারত মহাসাগরের পাড় থেকে আসা মানুষদের উর্দু, ফারসি, আরবি ভাষায় বিবরণীর প্রচুর নিদর্শন পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিল অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভাষায় অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানো দক্ষিণ এশিয়ার মানুষদের বিবরণ।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সেই যুগে অস্ট্রেলিয়ার দেশটির আদিবাসী এবং দক্ষিণ এশিয়ার মানুষদের যোগাযোগের সূত্র ছিল বিভিন্ন শিল্প। এসব শিল্পে অশ্বেতাঙ্গ শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
অস্ট্রেলিয়ায় দক্ষিণ এশীয়দের ইতিহাসে বিরাট জায়গা নিয়ে আছে উট। ১৮৬০-এর দশক থেকেই অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে লম্বা দূরত্বে যাতায়াতের জন্য উটই হয়ে ওঠে প্রধান বাহন। এ সময় স্থানীয় অনেক বাণিজ্য পথ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। উট চলা পথগুলো আদিবাসীদের এলাকার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। উট অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান বন্দরগুলো থেকে আর সঙ্গে এসেছিল উটের দক্ষিণ এশীয় মালিক ও চালক। তারা সবাই সাধারণ পরিচয় ‘আফগান’ নামে পরিচিত হন। এ ‘আফগান’ নামে পরিচিত দক্ষিণ এশীয়রা পুরো অস্ট্রেলিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল, ট্রান্সকন্টিনেন্টাল নর্থ-সাউথ রেলওয়ের দুই প্রান্ত যখন অস্ট্রেলিয়ার মধ্যাঞ্চলে ১৯২৯ সালে মিলে যায়, তখন সেটলাররা ‘আফগান এক্সপ্রেস’-এর আগমন বলে উল্লাস প্রকাশ করেছিল। ১৯২০-এর দশকে মোটরগাড়ি দিয়ে প্রতিস্থাপিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ চলাচলে উট অন্যতম বাহন ছিল। ট্রান্সকন্টিনেন্টাল রেলওয়ের নাম এখনো ‘দ্য গান’ রয়ে গেছে।
অশ্বেতাঙ্গদের বিপুল আগমনের কারণে উনিশ শতক শেষ হতে হতে অস্ট্রেলীয় সরকার রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থার বিভিন্ন উপাদানের প্রয়োগ শুরু করে— আদমশুমারি, পাসপোর্ট, সাক্ষরতার পরীক্ষা। কাসাসুল আম্বিয়াকে ‘কোরআন’ বলে আখ্যা দেয়াটা ঔপনিবেশিক জ্ঞানতত্ত্বের প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। ১৮৯৫ সালে কলকাতায় যখন বাংলা কাসাসুল আম্বিয়ার শেষ খণ্ডটি প্রকাশিত হয়, ততদিনে অস্ট্রেলিয়ার সরকার বর্ণবাদী রাষ্ট্র কাঠামো গড়তে নজরদারি প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল। আর ততদিনে কলকাতার বন্দরের সঙ্গে বাষ্পীয় জাহাজের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার বন্দরগুলোর যোগাযোগ ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। ১৮৮০-এর দশকেই অস্ট্রেলিয়ার বেলটানা শহরের দক্ষিণ এশীয় বণিকরা উট আমদানির বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় সবচেয়ে প্রভাবশালী দক্ষিণ এশীয় বণিকরা নিজেদের আফগান বলে পরিচয় দিতেন। তারা কেউ আফগানিস্তান, কেউবা ব্রিটিশ ভারত থেকে উট আমদানি করতেন। উট বাণিজ্যের যাত্রাপথ অনুসরণ করলে দেখা যায়, অনেক বণিক উট আনতেন বাংলার মধ্য দিয়ে। সেসময়ের অস্ট্রেলিয়ার পত্রিকার বিজ্ঞাপনে দুই ধরনের উটের কথা পাওয়া যায়— ‘কলকাতার উট’ এবং আফগানিস্তান ও বালুচিস্তানের ‘পাহাড়ি জাত’।
বাংলা কাসাসুল আম্বিয়া কাদের মাধ্যমে ব্রোকেন হিলে পৌঁছেছিল? সম্ভাবনার বিচার করলে সেটা কোনো বাঙালির মাধ্যমেই ঘটেছিল বলে মনে হয়। সেই কাসাসুল আম্বিয়ার ভূমিকায় বলা হয়েছে বইটি কলকাতার কাছেই বন্দর খিদিরপুরে বেশ জনপ্রিয় ছিল। খিদিরপুরে অনেক সুফি দরগা ছিল এবং সেখানে নিয়মিত জলসা হতো। অন্যদিকে এখানেই শিপিং কোম্পানিগুলো অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য গন্তব্যে পাঠানোর জন্য বাঙালি নাবিকদের বাছাই করত। বাংলা কাসাসুল আম্বিয়া যখন খিদিরপুরের গলি-ঘর-দরগায় ছড়িয়ে পড়ছে, তখন ৩৮ বছর বয়সী আন্নো খান লস্কর হিসেবে এসএস দারিয়ুসে চেপে বসেন। আন্নো খান ১৮৯৫ সালের ৩১ মার্চ দারিয়ুসে চেপে কলকাতা ছাড়েন। জাহাজটি অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যযাত্রায় নিয়োজিত ছিল। ৩০ এপ্রিল এসএস দারিয়ুস পৌঁছে এডিলেড বন্দরে। আন্নো খানসহ ১৪ জন লস্কর তাদের প্রতিকূল কর্মপরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে জাহাজ ছেড়ে যান। মেরিন সুপারিনটেনডেন্টের কাছে প্রতিবাদ জানিয়ে লাভ হয়নি। তাদের আবার জাহাজে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু আন্নো খান আরো কয়েকজন নাবিকের সঙ্গে পালিয়ে যান। গবেষক সামিয়া খাতুন নিশ্চিত হতে পারেননি ব্রোকেন হিল মসজিদের কাসাসুল আম্বিয়া গ্রন্থটি আন্নোর বাক্স পেটরার মধ্যেই ছিল কিনা। উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ায় বাঙালি লস্কররা অনেকগুলো ধর্মঘট করেছিলেন। ১৯০৪ সালে এ প্রতিবাদকারীরা একটি কোম্পানিকে মেলবোর্নের আদালত পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৮৯৬ সালের ২২ জুন জাহাজ ‘এসএস বুসফেলাস’ কলকাতা থেকে সিডনি পৌঁছায়। এতে থাকা ক্রুদের তালিকায় ঢাকা ও সিলেট থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের নামও ছিল।
অস্ট্রেলিয়ার বন্দরে জাহাজ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন অনেক দক্ষিণ এশীয় লস্কর। শিপ জাম্পার নামে পরিচিত এ লস্কররা অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করে অনেকেই ব্রোকেন হিলে গিয়ে উট চালানোর কাজ করেছেন। একজন বালুচ উটচালকের স্মৃতিচারণে পাওয়া যায় ব্রোকেন হিলে এ কাজে কলকাতার অনেক মানুষ জড়িত ছিল। কাসাসুল আম্বিয়া যদি আন্নো কিংবা অন্য কোনো বাঙালি নাবিকের হাত ধরে ব্রোকেন হিলে পৌঁছতে পারে, তবে একটা বিষয় নিশ্চিত যা সামিয়া তার অস্ট্রেলিয়ানামা: দ্য সাউথ এশিয়ান ওডেসি ইন অস্ট্রেলিয়া গ্রন্থে লিখেছেন, ‘‘যদি কাসাসুল আম্বিয়া বইটি একজন নাবিকের মাধ্যমে পৌঁছে থাকে, তাহলে এটা কেবল ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানের ‘লস্কর’ ও ‘এশিয়াটিক’দের গল্পকেই সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ করেনি বরং সঙ্গে তাদের সামষ্টিক প্রতিবাদের শক্তিশালী অধ্যায়কেও বয়ে নিয়ে চলেছে।”
২.
১৮৯৫ সাল। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অ্যালবেরি ক্রিক স্টেশন। এক মঙ্গলবারের বিকালে দুই আদিবাসী তরুণী সেই রেলস্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল বিকাল ৫টা ৪৬-এর ট্রেন ধরা। তারা ছিলেন দুই বোন। হঠাৎ দিগন্তে উটের পালসহ দুই দক্ষিণ এশীয় পুরুষকে দেখা গেল। ওদিকে রেলগাড়ি দেরি করায় দুই বোন ক্রমেই বিরক্ত হচ্ছিলেন। এরপর একসময় সেই দক্ষিণ এশীয় পুরুষদের সঙ্গে দুই বোনের সামনাসামনি সাক্ষাৎ হলো। পরবর্তী কাহিনী দশকের পর দশক অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত হয়ে যায়।
১৯৬০-এর দশকে মোনা মেরিক আরবুনা ভাষায় সেই গল্প স্মরণ করেন— দুই আফগান তাদের উটের পাল নিয়ে যাচ্ছিল। তারা অ্যালবেরি ক্রিক রেলস্টেশনের পাশের বাঁধে তাদের উটগুলোকে পানি পান করাতে নিয়ে যাচ্ছিল। স্টেশনে সেই দুই আদিবাসী তরুণীকে দেখে তারা তাদের কাফেলাকে থামিয়ে দেয়। সেই দুই পুরুষ পরিষ্কারভাবে মেয়েদের বলে তোমাদের স্তন দেখাও। আমরা দেখতে চাই। ট্রেন আসার কোনো লক্ষণ নেই, বাধ্য হয়ে ভয়ে দুই বোন তাদের স্তন প্রদর্শন করে। দুই বোন মনে মনে ভাবছিল ট্রেন কতক্ষণে আসবে, এই সাদা মানুষদের হাত থেকে তারা কখন রক্ষা পাবে। ভীত সেই আদিবাসী মেয়েদের গায়ের রঙ ছিল ‘বাদামি-লালচে’। তারা বেশ নাদুসনুদুস ছিল। এবার সেই পুরুষদ্বয় তাদের ঊরু দেখতে চাইল। মেয়েরা তাও দেখাল। কিন্তু এবার তাদের মনে নতুন আতঙ্ক দানা বাঁধছিল। পুরুষ দুজন তাদের শরীর দেখতে চাইলেও তাদেরকে স্পর্শ করছিল না এবং সেরকম কোনো লক্ষণও দেখাচ্ছিল না। তখন তাদের কাছে মনে হলো এরা আসলে তাদের মাংস খেতে চায়!
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ভাষায় সেখানে যাওয়া দক্ষিণ এশীয়দের নিয়ে নানা ইতিহাসে সংরক্ষিত হয়েছে সাত দশক ধরে। এ সময়কালে অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ চলাচলের অন্যতম মাধ্যম ছিল উট। মোনা মেরিকের জন্ম ১৯১২ সালে। উপরের আরবুনা গল্পটি তিনি শুনেছিলেন তার আদিবাসী মা বারালডার কাছে। মোনার বাবা অবশ্য শ্বেতাঙ্গ। দক্ষিণ এশীয়রা আদিবাসী মেয়েদের খেয়েছে, এ রকম গল্প মোনার মা হয়তো মেয়েকে অনেকগুলোই শুনিয়েছিলেন। আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন এ আরবুনা ভাষাটি মারি শহরের আশপাশে বসবাসরত আদিবাসীরা ব্যবহার করেন। ১৮৮৪ সালে রেললাইন মারি শহরে চলে আসে। তখন এটি অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরের অন্যতম উটের যোগাযোগ কেন্দ্রে পরিণত হয়। স্থাপিত হয় উটের খামার। এখানে দক্ষিণ এশীয় উটের মালিকদের অধীন কাজ করতে আসতে শুরু করেন স্থানীয় আদিবাসীরা।
মোনা মেরিক মারির ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত অ্যালবেরি ক্রিকের কাছে বড় হয়ে উঠছিলেন ১৯১০, ১৯২০-এর দশকে। তখন সেখানে অনেক আদিবাসী ও দক্ষিণ এশীয় পারিবারিক এবং পেশাগত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। মোনা সেই গল্পে বলতে চেয়েছেন মেয়ে দুটি তাদের বাড়ি ফেরার জন্য ট্রেনের অপেক্ষা করছিল আর দক্ষিণ এশিয়ার পুরুষদ্বয় চেয়েছিল তাদের সঙ্গ। পুরো গল্পের বর্ণনায় মোনার শেষ লাইন দুটি ছিল এ রকম— ‘দুই আফগান চায়নি ট্রেনটা আসুক, তারা কেবল মেয়েবন্ধু চেয়েছিল।’ সামিয়া খাতুন লিখেছেন এ শেষ বাক্যটি দক্ষিণ এশীয়দের প্রতি মোনার মনোভাবের দোদুল্যমানতা বোঝা যায়। মোনা তার জীবনের অনেকটা সময়ই কাটিয়েছেন উটের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক দক্ষিণ এশীয় পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায়।
বহু দশক ধরে অস্ট্রেলিয়ায় চলে আসা, আরবুনা থেকে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত গল্পটিকে সামিয়া তার অস্ট্রেলিয়ানামা গ্রন্থে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তার কথায়, ‘মোলাকাতের এ আরবুনা গল্পটিকে আজকের দিনে সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব নয়, যদি এটি কেবল প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি ভাষার ঐতিহাসিক ন্যারেটিভে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়।... বরং আদিবাসী ভাষার গল্পগুলো সেই জ্ঞানতাত্ত্বিক পাটাতনটিকে প্রকাশ করে, যার মাধ্যমে তারা অতীতকে বর্ণনা করে।’
অ্যালবেরি ক্রিকের দুই আদিবাসী মেয়ে এবং দুই দক্ষিণ এশীয় পুরুষকে নিয়ে গল্পটির ইংরেজি অনুবাদ সামিয়া প্রথমবার পড়েন অ্যাবোরিজিনাল হিস্টরি জার্নালে। তিনি গল্পটি পড়েন বিশ শতকে অস্ট্রেলিয়ায় সেটলারদের ‘চাইল্ড রিমুভাল’ নীতির প্রেক্ষাপটে। বিশ শতকের শুরুর দিকে শ্বেতাঙ্গ সেটলারদের ‘হোয়াইট অস্ট্রেলিয়া’ প্রকল্প তুঙ্গে ওঠে। আদিবাসীদের লালচে রঙের শিশুদের শ্বেতাঙ্গ অস্ট্রেলীয় শ্রমিক বানাতে দেশটির বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত হয় চিলড্রেন’স হোম। গল্পের সেই মেয়ে দুটির বাদামি-লালচে গায়ের রঙের মতোই ছিল মোনা ও তার মা বারালডার রঙ। সেই চিলড্রেন’স হোম চালু হওয়ার পর আদিবাসীরা আতঙ্কে থাকত যে কখন সরকারি প্রশাসন, পুলিশ কিংবা খ্রিস্টান মিশনারিরা তাদের শিশুদের সেই ‘বর্ণসঙ্কর’ হোমে নিয়ে যাবে। মোনার বয়স যখন ১২, তখন তার বাড়ির কাছেই অ্যালবেরি ক্রিকের কয়েক স্টেশন পরে কোলব্রুক চিলড্রেন’স হোম প্রতিষ্ঠিত হয়। বারালডা তার মেয়ে মোনাকে সেই দুই আদিবাসী বোনের যে গল্প শুনিয়েছিল, তা সম্ভবত আরাবুনা ভাষায় প্রচলিত অনেক কাহিনীর অংশ, যেগুলো তৈরি হয়েছিল লালচে গায়ের রঙের আদিবাসী শিশুদের অ্যালবেরি ক্রিক রেলওয়ে স্টেশনের কাছে ওঁৎ পেতে থাকা বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করতে।
২০০৯ সালের কাসাসুল আম্বিয়া এবং আদিবাসীদের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষদের মোলাকাতের ইতিহাস খুঁজতে সামিয়া ব্রোকেন হিলে বসবাসরত দক্ষিণ এশীয় বংশধরদের সঙ্গে কথা বলেন। এখানে তিনি দেখা পান লাল জাদা’র। এই লাল ছিলেন এককালে করাচি থেকে আসা লস্কর খান জাদার নাতির ঘরে পুতি। লাল জাদা সামিয়াকে পরিচয় করিয়ে দেন রেগ ডডের সঙ্গে। লাল আর রেগ একই বয়সী এবং তারা রেল বিভাগে কাজ করেন। বহু বছর ধরে তারা একসঙ্গে কাজে যান। এই রেগ হলেন মোনা মেরিকের পরিবারের বংশধর। রেগ সেই দুই আদিবাসী মেয়ে ও দুই দক্ষিণ এশীয় পুরুষের গল্পটি শুনেছেন। তিনি মারি শহরের আরাবুনা পিপল’স কমিটির চেয়ারম্যান। সামিয়া রেগের কাছে গল্পটি সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে চান। কিন্তু রেগ নিজেদের কথা এ গবেষককে বলতে আগ্রহী ছিলেন না। রেগের মূল কথাটি ছিল আমাদের সম্পর্কে জেনে তুমি কেন লিখতে চাও? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে রেগকে সন্তুষ্ট করা শুরুর দিকে সামিয়ার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তারপর একসময় সামিয়া কাসাসুল আম্বিয়ার বিষয়টিও বিশদভাবে বলেন। তিনি রেগকে জানান, এ বইটি গানের সুরে আবৃত্তি করা হতো। তাদের কোন পূর্বপুরুষ সে রকমটা শুনেছেন কিনা, তাও তিনি জানতে আগ্রহী। তারপর একদিন রেগ তাকে কয়েক লাইন গেয়ে শোনাতে বললেন। কিন্তু সমস্যা হলো কাসাসুল আম্বিয়া কীভাবে গাওয়া হয়, তা সামিয়া জানতেন না। তাই তিনি বিকল্প হিসেবে তার জানা একটি হিন্দুস্তানি রাগ গেয়ে শোনান— রাধা-কৃষ্ণের প্রেম নিয়ে ষোড়শ শতকের কবি হরিদাসের লেখা। রেগ হঠাৎই তার স্মৃতির ডালি খুলে বসলেন সামিয়ার সামনে। বলতে শুরু করলেন উট চালক, বণিকদের স্মৃতি। তিনি জানালেন তাদের সম্পর্কে অনেক গল্পের সঙ্গেই তিনি বেড়ে উঠেছেন, কিছু চরিত্রের নামও বললেন— মুসা, দাদলে, বেজা...
২০১০-এর শেষদিকে আরেক সাক্ষাতে রেগ জানলেন, ‘যে নারী উটচালক এবং নারীদের নিয়ে গল্পটি বলেছেন, তিনি আমার খালা।’ তিনি জানালেন তারা এ রকম অসংখ্য গল্প শুনে বেড়ে উঠেছেন। বয়সী নারীরা খুব দ্রুত এসব গল্প বলে যেতেন। অনেক গল্প ছিল সতর্কতামূলক, যেগুলো শিশুদের বলা হতো মরুভূমিতে চলাচলকারী উটচালকদের কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য। অন্যদিকে সেই উট চলাচলের সময় সেসব এলাকায় দক্ষিণ এশীয় উটচালক এবং স্থানীয় আদিবাসী নারীদের মধ্যে অনেক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ব্রোকেন হিলের খান জাদাকে বিয়ে করেছিলেন আদিবাসী নারী মেরি ইলিন জোসেফাইন। অনেক আদিবাসী নারী দক্ষিণ এশীয় উটচালকদের ক্যাম্পের অংশ হয়ে যান। আদিবাসী নারী এবং দক্ষিণ এশীয় পুরুষদের ঔরসে জন্মানো সন্তানরা অনেক সময়ই পিতৃপরিচয় পেতেন না। পুরুষরা তাদের স্বীকার করত না। এমনই এক সন্তান বেন মারে, বালুচ উটচালক বেজা দরবেশের ছেলে। বেনের কথায়, ‘আমরা বাবার নাম ব্যবহার করি না, কারণ তিনি আমাদের লালনপালনে আগ্রহী ছিলেন না। মাকেই সবকিছু করতে হয়েছে।’ রেগ অবশ্য জানালেন উল্টো ঘটনাও আছে। যেমন মানজালুন নামের এক উটচালকের নাম নিয়ে এক ছেলের নাম হয় টমি মানজালুন, কারণ মানজালুন এ আদিবাসী ছেলেটিকে দত্তক নিয়ে পালন করেছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ার মরু প্রান্তরে বাংলা কাসাসুুল আম্বিয়ার উৎস সন্ধানে সামিয়ার গবেষণা দেশটির স্থানীয় ইতিহাস এবং ইতিহাসতত্ত্বে নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। এতদিনের ঔপনিবেশিক দৃষ্টি দিয়ে তৈরি জ্ঞানতত্ত্ব নড়ে উঠেছে।






