আজকাল দিনদুনিয়ার কোনোই খবর রাখি না। অফিস যাই, বাসায় ফিরি, খাইদাই, ঘুমাই, বাকি সব ঝাপসা। যেন আশির দশকের হিন্দি সিনেমায় দেখা কুম্ভমেলার ভিড়ের ভেতরে চেনা মুখ বা হারানো কোনো সুরের খোঁজে হয়রান। তাই অন্য যা কিছুই দেখি, আসলে তা দেখি না। তার পরও কিছু কথা কানে আসে। এদিক সেদিকের ছোট ছোট দৃশ্য চোখে পড়ে। কখনো সকালের কফির জন্য অপেক্ষা করতে করতে টেবিলে বিছায়ে থাকা খবরের কাগজের এক-দুই লাইন পড়েও ফেলি।
তার কিছু আবার মনের ভেতর ঘুরপাক খায়।
কাজুও ইশিগুরোর নোবেল পাওয়ার খবরটাও ফেসবুক না থাকলে বোধহয় জানতামই না। তাও প্রথমে তো একটু ভয়ই পেয়ে গেছিলাম। ভদ্রলোক মারা গেলেন নাকি? মারা না গেলে তো সাধারণত তার লেখাটেখা কেউ তেমন পড়ে না। আমার কয়েকজন বন্ধু দেখলাম বেশ হতাশ।
কেউ বলছেন, ইশিগুরো নোবেল পাওয়ায় মুরাকামি সাইজ হয়ে গেলেন। এই পরিণামে তারা কীভাবে পৌঁছলেন কে জানে। দুজনেই জন্মসূত্রে জাপানি বলে কি? অথচ এ দুজনের লেখার ধরন, বিষয় সবই একজন আরেকজনের চেয়ে অনেক আলাদা। তবে সেটা অন্য তর্ক, আরেকদিনের জন্য তোলা থাক।
গার্ডিয়ান পত্রিকা জানাল, লেখক নিজেই নাকি এ খবরে চমকিত। ইশিগুরো লন্ডনে তার বাড়ির রান্নাঘরে বসে সকালের চা খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, এমন সময় তার এজেন্ট ফোন করে খবরটা দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে তিনি ভেবেছিলেন, এটা বানানো খবর, এ রকম তো অনেক হয় আজকাল।
পরে যখন বিভিন্ন পত্রিকা থেকে ফোন আসা শুরু হলো আর সাংবাদিকরা তার বাড়ির দরজায় লাইন দিতে শুরু করলেন, তখন বিশ্বাস করেছেন। গার্ডিয়ানকে তিনি হাসিমুখে জানিয়েছেন, ‘ব্যাপারটা একদমই বুঝতে
পারিনি। না হলে তো অন্তত চুলে শ্যাম্পু করতাম।’
সেই একই সাক্ষাত্কারে ইশিগুরো বলেছেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, আমি বোধহয় ছদ্মবেশী কেউ। অনেক যোগ্য জীবিত লেখক যেমন হারুকি মুরাকামি, মার্গারেট অ্যাটউড, সালমান রুশদী, করম্যাক ম্যাকার্থিদের আগেই এ পুরস্কার জিতে যাওয়ার বিষয়টা একদম ধৃষ্টতা! আর যেহেতু আমি এখনো পুরোপুরি একটা ঘোরের ভেতর আছি, হঠাৎ মনে হচ্ছিল, নোবেল পাওয়ার ক্ষেত্রে আমার বয়সটা নেহাতই কম। তারপর হিসাব করে দেখি, আমার বয়স ৬২। তাই বয়সের দিক দিয়ে ঠিকই আছে হয়তো।’
দুনিয়ায় অল্প যে কয়েকজন মানুষের লেখা আমার খুব ভালো লাগে, তার মধ্যে ইশিগুরো একজন। আমার সবসময় মনে হয়েছে, তার লেখায় এমন একটা জিনিস আছে, ইংলিশে যাকে বলা যায় সোল, আক্ষরিক বাংলা করলে হয় আত্মা। এ জিনিসটা সাম্প্রতিক অনেক নামকরা লেখকের বইয়েও খুঁজে পাই না। অবশ্য আমার এ অনুভূতিটা ভাষায় ঠিকঠাকভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা আগে করিনি। উপন্যাসের আত্মা বিমূর্ত একটা বিষয়— কাহিনী, বিস্তার, বিন্যাস, ভাষা অথবা কৌশলের বাইরের জিনিস। এর কোনো ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা হয় না। অথচ সমগ্র লেখায় জড়িয়ে থেকে প্রাণসঞ্চার করে। ইশিগুরোর যেকোনো বই পড়লেই মনে হয়, আমার নিজের দুনিয়া ছেড়ে অন্য আরেকটা দুনিয়ায় ঢুকে পড়লাম। তা যে একজন লেখকের বানিয়ে তোলা, সে রকম লাগে না। বরং মনে হয়, এ উপন্যাসের বাইরেও এর চরিত্ররা চলাফেরা করছে, বেঁচে আছে।
ইশিগুরোর জন্ম ৮ নভেম্বর ১৯৫৪ সালে, জাপানের নাগাসাকিতে। পাঁচ বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে বিলাতের গিল্ডফোর্ড শহরে চলে যান। এরপর জাপান গেছেন আরো ২৯ বছর পর। এ পর্যন্ত তার মোট প্রকাশিত বই আটটা। দেখলাম, প্রতিটা বইয়ের জন্যই কোনো না কোনো পুরস্কার পেয়েছেন। তার তৃতীয় বই ‘রিমেইন্স অব দ্য ডে’র জন্য বুকার প্রাইজ পেয়েছিলেন ১৯৮৯ সালে। তার অন্য তিনটা বই ‘অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’ (১৯৮৬), ‘হোয়েন উই ওয়্যার অরফান্স’ (২০০০) আর ‘নেভার লেট মি গো’ও (২০০৫) বুকার প্রাইজের শর্টলিস্টে ছিল।
এখান থেকে পেছন ফিরে তার লেখকজীবনের ইতিহাস দেখলে একটা সরলরেখার মতো লাগে। কম বয়সেই প্রকাশিত, প্রশংসিত, পুরস্কৃত। তারপর ধাপে ধাপে শুধু সামনে চলা। এমনকি পারিবারিক জীবনও তাই। সেই সত্তরের দশকে কিছুটা বামপন্থী মতাদর্শের সমাজসেবা থেকে শুরু করে বর্তমান জীবনেও স্ত্রী লর্না তার সঙ্গে আছেন।
তার প্রথম বই ‘এ পেল ভিউ অব হিলস’ প্রকাশ হয়েছিল ১৯৮২ সালে। প্যারিস রিভিউকে দেয়া একটা সাক্ষাত্কারে এ বই লেখা নিয়ে বেশ খানিকটা আলাপ আছে। ইশিগুরো নাকি ছোটবেলায় লেখক হওয়ার কথা ভাবেননি। তার ইচ্ছা ছিল সংগীতশিল্পী হওয়ার। সেখান থেকে নিরাশ হয়ে যখন ভাবছিলেন রেডিওর জন্য নাটক লিখবেন, সে সময় কাকতালীয়ভাবেই ইস্ট অ্যাংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা বিজ্ঞাপন দেখেছিলেন ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে মাস্টার ডিগ্রির জন্য। সে সময় লেখালেখি নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা খুব একটা প্রচলিত ব্যাপার ছিল না, বরং কিছুটা হাস্যকর মনে করা হতো।

এমনকি কোর্সটার এমনই দুরবস্থা ছিল তখন যে, তার আগের বছর ছাত্র না থাকায় চলেইনি। তবে ইয়ান ম্যাকিওয়ান নাকি একই কোর্স করেছিলেন আরো ১০ বছর আগে। তার চেয়েও বড় বিষয়, এখানে টিকে গেলে এক বছর সরকারি খরচে লেখাপড়া করা যাবে আর সব শেষে মাত্র ৩০ পৃষ্ঠার একটা লেখা জমা দিতে পারলেই পাস। দরখাস্ত জমা দিয়ে দিলেন। কিন্তু যখন সত্যিই টিকে গেলেন, তখন আর বিষয়টা খেলা খেলা রইল না। মনে হলো, এবার তো তার লেখা লোকে খুঁটিয়ে পড়বে আর ভালো কিছু না হলে সেটা লজ্জার কথা।
কর্নওয়ালের একদম নিরিবিলি এলাকায় একটা কটেজ ভাড়া দেয়া হবে খবর পেয়েছিলেন। সেখানে ফোন করে বললেন, এক মাসের জন্য কটেজটা তিনি ভাড়া করতে চান। কারণ লেখালেখি শিখতে হবে তাকে। ১৯৭৯ সালের গ্রীষ্মের ছুটিতে ঠিক তা-ই করলেন। তখনই প্রথম মন দিয়ে একটা গল্পের কাঠামো কেমন হবে, তা নিয়ে ভেবেছেন অথবা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে, বিভিন্ন স্বর ব্যবহার করে কীভাবে একটা গল্প বলা যায়, তা নিয়েও কাজ করেছেন।
এখানেই প্রথম জাপান নিয়ে লিখতে শুরু করেছিলেন। তার প্রতিদিনকার পারিপার্শ্বিক নিয়ে লিখতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছিলেন। অথচ জাপান নিয়ে লেখার সময় একটা তালা খুলে যাওয়ার মতো ব্যাপার হলো। এ থেকেই একটা গল্প তার ক্লাসে দেখিয়েছিলেন। গল্পটা নাগাসাকিতে বম্ব ফেলার সময়ের। এক তরুণীর দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। ইশিগুরোর অন্যান্য সহপাঠী এ গল্পটার খুব প্রশংসা করেছিল। এ গল্পই রূপান্তর হয়ে প্রথম উপন্যাস লেখা হয়েছিল।
তার উপন্যাসের নামগুলোয় প্রায়ই একটা অন্তর্মুখী বিষণ্নতা টের পাই। যেমন ‘এ পেইল ভিউ অব হিলস’। এখানে পেইলের বাংলা করা যায় ‘ফ্যাকাসে’ বা ‘বিবর্ণ’। যদিও বাংলায় ‘ধূসর পাহাড়ের দৃশ্য’ নামটা অনেক ভালো শোনায়, তবু আমার মনে হয় ‘পেইল’ শব্দটার অন্য একটা গুরুত্ব আছে এখানে। নামের ভেতরে যদিও পাহাড়ের দৃশ্যের কথাই বলা আছে। তবু যার কোনো উল্লেখ নেই, তার কথাই বেশি মনে আসে নামটা দেখলে। যে দৃশ্যটা বিবর্ণ হয়ে যাওয়ার মতো এতটাই দূরে, তাকে তো কেউ নিশ্চয়ই দেখছে। সে কে? কোথায় দাঁড়িয়ে দেখছে এ দৃশ্য? কোন বাড়ির জানালায়? এক সময় থেকে আরেক সময়ের দূরত্বে অথবা এক দেশের থেকে আরেক দেশের? বইটা পড়লে জানা যায়, এই সব রকম দূরত্বের কথাই আছে এতে।
ইশিগুরোর গল্প বলার ভঙ্গি খুব সংযত। কোথাও কোনো আতিশয্য বা নাটকীয়তা চোখে পড়ে না। প্রাথমিকভাবে মনে হয়, যেন কেউ খুব সাধারণভাবে নিজের জীবনের গল্প বলে যাচ্ছে। অথচ বলতে বলতে যে অংশটুকু বলা হচ্ছে না, তার একটা চোরাস্রোত জড়িয়ে থাকে। ‘পেইল ভিউ অব হিলস’-এর প্রথম কয়েকটা লাইন এ রকম—
‘শেষ পর্যন্ত আমাদের ছোট মেয়ের নাম রেখেছিলাম নিকি। এ নাম অন্য কোনো নামের সংক্ষেপ নয়। এটা তার বাবার সঙ্গে আমার আপস। আপাতবিরোধী মনে হলেও তিনিই চেয়েছিলেন মেয়ের একটা জাপানি নাম দিতে। আর আমি, হয়তো বা অতীত ভুলে থাকার স্বার্থপর চেষ্টায়ই ইংরেজি নাম চেয়েছি। শেষ পর্যন্ত নিকি নামটা এই ভেবে মেনে নিলেন যে, এতে অস্পষ্ট হলেও পুবের কিছুটা প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়।’
এই প্রথম কয়েক লাইনেই টের পাওয়া যায় নিকির মা, যিনি এ উপন্যাসের কথক, তিনি জাপানি হয়েও সে দেশ ভুলে থাকতে চান। অর্থাৎ এখন অন্য কোনো দেশে আছেন এবং হয়তো তার একটা করুণ অতীত রয়েছে। বাবা পশ্চিমা কেউ, যিনি পুব ভালোবাসেন। প্রথম বর্ণনাটুকু ধরেই নিকি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে তার মায়ের কাছে এসেছে কয়েক দিনের জন্য, কিন্তু খুব অস্থির হয়ে আছে। সুতা খুলে যাওয়ার মতো করে গল্প যত এগোতে থাকে, আমরা জানতে পারি কথকের নাম এতসুকো। কয়েক দিন আগে তার বড় মেয়ে কেইকো আত্মহত্যা করেছে। এজন্যই ছোট মেয়ে মায়ের কাছে এসে থাকছে কয়েক দিন।
মা-মেয়ের কথোপকথনেই বোঝা যায়, বড় বোনের দাফনের সময়েও নিকি আসেনি। মাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘তুমি কি আশা করেছিলে, সেখানে আমি থাকব?’ জানা যায়, কখনই তাদের সম্পর্কটা সহজ ছিল না। নিকি বলে, ‘ও দেখতে কেমন ছিল, তা-ই তো আমার মনে নে।’ মা উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ, ওকে তো তুমি অনেক দিন দেখোনি।’ এই ছোট ছোট কয়েকটা বাক্যেই একটা অস্বস্তির বোধ জন্মায়। মনে হয়, কিছু একটা কখনই ঠিক ছিল না। যে শব্দগুলো উচ্চারণ হচ্ছে, তার মাঝের শূন্যস্থানগুলোয় আরো বড় সত্যি কিছু লুকিয়ে আছে। এই অস্বস্তির বোধটা সম্পূর্ণ উপন্যাসজুড়েই উপস্থিত। এর কারণেই মনোযোগ একদম টান টান থাকে। পাঠক হিসেবে মনে হতে থাকে, এর ভেতর আরো কিছু খুঁজে দেখার আছে।
কেইকোর আত্মহত্যার সূত্র ধরেই এতসুকো স্বগতোক্তি করে যে ইংরেজরা ভাবতে ভালোবাসে, জাপানিরা আত্মহত্যা করায় ওস্তাদ। কেইকো ছিল পুরোপুরি জাপানি। নিকির মতো অর্ধেক নয়, আর সংবাদমাধ্যমগুলো এ বিষয়টাতেই গুরুত্ব দিয়েছে।
তার মনে পড়ে যায় নাগাসাকিতে থাকার দিনগুলো। যুদ্ধের পরপর তখন শেষ হয়ে যাওয়া শহরটা আবার ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। সেখানে নতুন একটা অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে তার স্বামী জিরোর সঙ্গে থাকত এতসুকো। আশপাশের ফ্ল্যাটগুলোতেও তাদের মতোই অল্প বয়সী দম্পতি অথবা ছোট পরিবার। সে বছর প্রচণ্ড গরম এবং এতসুকো ছিল অন্তঃসত্ত্বা। তার স্বামী চাকরি নিয়ে খুব ব্যস্ত।
গল্পের কোথাও এ রকম উল্লেখ না থাকলেও টের পাওয়া যায় স্বামীর সঙ্গে সে সহজ হতে পারে না, তাদের দাম্পত্যে দায়িত্ববোধ যত আছে, ভালোবাসা সে রকম নেই। নতুন বাড়িগুলোর সামনেই অনেকটা পতিত জমি। তার পাশ দিয়ে নদী আর অন্য প্রান্তে বহু দূরে পাহাড় দেখতে পাওয়া যায়।
আর দেখা যায় বহু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা পোড়ো বাড়ি— যুদ্ধ এবং বোমার আঘাতের পরও বাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল।
সেই বাড়িতে একদিন এতসুকোর প্রতিবেশীদের প্রবল কৌতূহল উসকে দিয়ে থাকতে এল সাচিকো নামে এক মহিলা এবং তার নয়-দশ বছরের মেয়ে মারিকো। সাচিকো ছিল অদ্ভুত এক মহিলা। একসময় সম্ভ্রান্ত পরিবারের হলেও যুদ্ধে সব হারিয়ে প্রায় নিঃস্ব। মেয়েকে নিয়ে তার প্রয়াত স্বামীর এক চাচার বাসায় অনেক যত্নে ছিল, কিন্তু সেখান থেকে পালিয়ে চলে এসেছে এক আমেরিকানের প্রেমে পড়ে। সে প্রেমিক তাকে বারবার ছেড়ে যায়, বারবার ফিরে আসে। অথচ তার সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করার আশায় সাচিকো তার মেয়ে মারিকোর প্রতি দিনে দিনে আরো বেশি নির্মম হয়ে ওঠে। এতসব সত্ত্বেও এতসুকো তার প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়, বিপদে পাশে থাকে। এ বইয়ের চরিত্রদের কথোপকথনেই বোঝা যায়, যা তারা বলছে আর যা অনুভব করছে, তা প্রায় বিপরীতধর্মী। যেমন এতসুকো বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বলতে থাকে, ‘আমি খুব ভালো আছি, আমরা সুখে আছি, এর চেয়ে ভালো থাকার কথা ভাবা যায় না।’ সাচিকো বলে, ‘আমার মেয়েই আমার প্রথম চিন্তা, ওর জন্যই সবকিছু করব।’ যেন নিজেদেরই প্রবোধ দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে চাইছে সবাই।
এ বইয়ে আরেকটা চরিত্র আমার মনে খুব দাগ কেটেছে। এতসুকোর শ্বশুর ওগাতা। জিরোর সঙ্গে বিয়ের বহু আগে থেকেই ওগাতা এতসুকোর বাবার মতো। যদিও বইয়ে খুব স্পষ্ট করে বলা নেই। তবে আভাসে বোঝা যায়, তার পুরো পরিবার এবং প্রথম প্রেমিক নাগাসাকিতে বোমায় শেষ হয়ে গেছে। সে বড় হয়েছে ওগাতার বাড়িতে এবং সেই সূত্রেই জিরোর সঙ্গে পরিচয়। ওগাতার সঙ্গে এতসুকোর সম্পর্ক খুব সহজ সুন্দর। তিনি ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক, ততদিনে অবসর নিয়েছেন, স্ত্রী মারা গেছে। বহুদিন পর ছেলের বাড়ি বেড়াতে এসেছেন। চাকরিজীবনে তিনি ছিলেন আদর্শবাদী, দেশকে ভালোবাসতেন। তার ছাত্রদের ভালোবাসতেন, যেভাবে সম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। তিনি ও তাঁর সমসাময়িকরা মনে করতেন, জাপানকে অন্য দেশের প্রভাব থেকে যতটা বাঁচিয়ে রাখা যায়, ততই তার ঐতিহ্য রক্ষা হবে, নিজস্বতা টিকে থাকবে। অথচ যুদ্ধ-পরবর্তী জাপানে তার পরের প্রজন্ম তাদের সে সময়কার আদর্শ ও নীতিবোধ সম্পর্কে তাচ্ছিল্য দেখাতে শুরু করেছিল। তাঁর প্রাক্তন ছাত্রের একটা লেখা পড়ে দুঃখ পেয়ে ছেলেকে বলেছিলেন, জিরো যদিও বাবার সঙ্গে ভদ্রতা রক্ষা করেই কথা বলছিল, কিন্তু বাবার প্রজন্মের লোকদের ওপর তার বিরক্তি চাপা পড়ে থাকেনি। বইটায় শুধু কিছু কথোপকথনের মাধ্যমে যেভাবে ওগাতার একাকীত্ব আর অসহায়ত্ব উঠে এসেছে, তা অনবদ্য।
আমার ধারণা, ইশিগুরোর দ্বিতীয় বই ‘অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’-এর কথক মিস্টার ওনো প্রথম বইয়ের ওগাতারই পরিবর্তিত রূপ। এ বইটা তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন প্রথম বই প্রকাশ হওয়ার আগেই, ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বরে, লন্ডনের শেপার্ড বুশের একটা বেজমেন্টের ফ্ল্যাটে বসে। তার বয়স তখন ২৬ বছর, তখনো জানতেন না, লেখালেখি করেই তার পক্ষে জীবন চালানো সম্ভব হবে। মাত্রই নতুন চাকরি নিয়ে তিনি ও তার স্ত্রী লর্না লন্ডন ফিরেছেন। চাকরি যদিও হয়েছিল, বাসা তখনো পাওয়া যায়নি। তা নিয়ে খুব চিন্তিতও ছিলেন না। ধরেই নিয়েছিলেন, নিজেদের বাসা পাওয়া পর্যন্ত কিছুদিন শেয়ারে থাকতে হবে, হয়েছিলও তাই। কিছুদিন চেষ্টা করেছেন কাজে যাওয়ার আগে ভোরে উঠে ৯০ মিনিটের মতো লেখালেখি করবেন। লেখার জায়গা ছিল ডাইনিং টেবিল, যেখান থেকে ব্যাকইয়ার্ডের ছোট বাগানটা দেখা যেত। অবশ্য পরে কাজের চাপ বাড়ায় লেখালেখি মুলতবি রাখতে হয়েছিল কিছুদিন। এরপর ১৯৮২ সালের শীতকাল আসার আগে আর উপন্যাসটা নিয়ে বসা হয়নি। ততদিনে প্রথম বই বেরিয়েছে, বেশ প্রশংসাও পেয়েছে। টিভির জন্য কিছু চিত্রনাট্য লিখেছেন তিনি। সে সময় খুব আচ্ছন্নের মতো চিত্রনাট্যের পাতাগুলোর সঙ্গে তার প্রকাশিত বইয়ের লেখার তুলনা করতেন। আর নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করতেন, ‘আমার উপন্যাস কি আমার লেখা চিত্রনাট্যের চেয়ে যথেষ্ট আলাদা?’ তার মনে হচ্ছিল, প্রথম বইয়ের বেশকিছু অংশ একদম চিত্রনাট্যের মতো। এতে বেশ মন খারাপ হয়েছিল ইশিগুরোর। যদি উপন্যাস পড়ে, টিভি দেখার মতো একই অনুভূতি হয়, তাহলে আর উপন্যাস লিখে লাভ কি? উপন্যাস কেমন করে সিনেমা বা টিভির মতো শক্তিশালী মাধ্যমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলবে, যদি আলাদা কিছু সে না দিতে পারে? যা অন্য মাধ্যমগুলো ঠিকঠাক পারে না, এমন কিছু।
তিনি জানতেন, কী লিখতে চান, কিন্তু এবার বিভিন্ন পদ্ধতিতে লেখার চেষ্টা করতে থাকলেন। একটা লেখায় ইশিগুরো বলেছেন, ‘সে সময় একবার আমি জ্বরে পড়ে বিছানা নিলাম। জ্বরের প্রকোপ একটু কমলে দেখলাম, যে বইটা আমার সঙ্গে বিছানায় নিয়ে এসেছি, যা এখন আমার লেপের মধ্যে গড়াগড়ি খাচ্ছে, তা হলো কিলমার্টিন-মনক্রিফের অনুবাদে মার্সেল প্রুস্তের ‘রিমেমব্রেন্স অব থিংস পাস্ট’। হয়তো জ্বরের ঘোরে বইটাকে আরো বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছিল। তখনো এবং এখনো আমি প্রুস্তের খুব বড় ভক্ত নই। তার লেখার অনেক অংশই আমার চরম একঘেয়ে লাগে। অথচ তার ‘প্রস্তাবনা’ আর ‘কমব্রে’ অংশে আমি একদম আটকে গেলাম। এ অংশগুলো বারবার পড়েছি। এ পরিচ্ছেদগুলোর স্বর্গীয় সৌন্দর্য তো আছেই, কিন্তু আমি উত্তেজিত হয়ে উঠছিলাম প্রুস্তের লেখার ধরনে। পরে আমার নোটে যার নাম দিয়েছি ‘মেথডস অব মুভমেন্ট’। মানে যেভাবে এক অধ্যায় আরেকটায় গিয়ে মিশেছে। ঘটনা ও দৃশ্যগুলো কোনো ক্রম মেনে সাজানো হয়নি। আবার একরৈখিক প্লটও মানা হয়নি। বরং চিন্তার সূত্র আর স্মৃতির খেয়ালে উপন্যাসটা এক অংশ থেকে আরেক অংশে গেছে। এবং কখনো এ কারণেই মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, কেন? কী কারণে এ প্রায় সম্পর্কহীন দুটো ঘটনা কথকের মনে পাশাপাশি জায়গা নিয়েছে? এ থেকেই আমার গল্পটাকে নতুন উপায়ে বলার ধারণা খুঁজে পেয়েছিলাম, যাতে লেখা সমৃদ্ধও হবে আবার এর ভেতরকার নড়াচড়া পর্দায় ধরা প্রায় অসম্ভব হবে। যদি আমি কথকের চিন্তা ও স্মৃতি অনুসরণ করে এক পরিচ্ছেদ থেকে আরেকটায় যাই, বিষয়টা তাহলে প্রায় ক্যানভাসে যেভাবে একজন শিল্পী এক রঙের পাশে আরেক রঙ বোলান, সেভাবেই দুদিনের আগের ঘটনার পাশে ২০ বছর আগের ঘটনা রেখে দিয়ে পাঠককে এ দুইয়ের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে বলতে পারি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ দুই ঘটনার পাশাপাশি অবস্থানের গূঢ় রহস্য এমনকি কথকেরও জানার দরকার নেই। মানুষ কীভাবে নিজেকে ও তার অতীতকে নিজের থেকেই আড়াল রাখে, নিজেকেই অস্বীকার করে অথবা ফাঁকি দেয়, তা বিভিন্ন স্তরে দেখাতে পারার একটা উপায় খুঁজে পেয়েছিলাম আমি। একজন লেখকের সাফল্যের সময় এগুলোই, এই অগোছালো, একান্ত মুহূর্তগুলো। এখন যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি, আমার শোয়ার ঘরে মাত্র জ্বর থেকে ওঠা ওই তিনটা দিন, প্রুস্তের লেখা বিশ পাতা বারবার পড়তে থাকা সময়টিতে আমার লেখকজীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল। যেকোনো বড় পুরস্কার জেতার চেয়ে তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এরপর যা কিছুই আমি লিখেছি, তা ওই তিনদিনে যতটুকু প্রতিভাত হয়েছে, তার থেকেই পাওয়া।’
প্রথম দুই উপন্যাসের পর ১৯৮৬ সালে ধারণ করা একটা সাক্ষাত্কারে তার লেখা নিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি না, আমি জাপান নিয়ে লিখি। এ দেশে আমার বইগুলোকে যেভাবে নেয়া হচ্ছে, তা দেখে আমি কিছুটা আতঙ্কিত। মূলত ধরে নেয়া হচ্ছে, বইগুলো এক ধরনের ডকুমেন্টারি, যা জাপানের সমাজ সম্পর্কে একটা ধারণা দেবে। বিশেষ করে আমার দ্বিতীয় উপন্যাসটার এ রকমই রিভিউ করা হয়েছে। যারা এ বইটা অন্যদের পড়তে বলছেন, তারা এজন্য বলছেন যে, বইটা জাপান সম্পর্কে একজন ঘরের লোকের বয়ান, যে আবার কিছুটা বাইরের লোকও। অথচ আমি একজন রিয়ালিস্ট হিসেবে লিখিনি। একজন লেখক হিসেবে আমি ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতে চাইনি, বরং এ পটভূমিটা বেছে নিয়েছি যেহেতু আমার থিম এর সঙ্গে মানায়। আর যে বিষয়বস্তুতে আমি আগ্রহী, তা পরিবর্তনশীল। তবে গত কয়েক বছরে যে বিষয়টা আমার মাথায় ঘুরছে তা হলো, কীভাবে মানুষ নিজের কাছে তাদের জীবনযাপন জাস্টিফাই করে।’
পরবর্তীতে আরেকটা লেখায় তিনি লিখেছিলেন, ‘অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’-এর পটভূমি যদিও বোমায় বিধ্বস্ত যুদ্ধ-পরবর্তী জাপান। বইটা লেখা হয়েছে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৫ সালে। তখন মার্গারেট থ্যাচারের সরকার ক্ষমতায়। ব্রিটেন একটা বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। মূলত জনকল্যাণমূলক উৎপাদনশীলতা থেকে সরে গিয়ে সেবামূলক অর্থনীতিতে পরিবর্তিত হচ্ছিল। ফলে প্রচুর মানুষের চাকরি গেছে। একটা অসন্তোষ আর অসহনশীলতার সময় ছিল সেটা। এ বইটা যদিও যুদ্ধের আগের আর পরের জাপানের পটভূমিতে লেখা। যেকোনো পেশার মানুষ যে রকমভাবে যেকোনো একটা রাজনৈতিক মতাদর্শ সমর্থন করতে বাধ্য হয়েছে, মানুষের অনমনীয়তা, উগ্রতা হয়তো একই রকম ছিল।
১৯৮৬ সালের এ সাক্ষাত্কারের শেষে প্রায় রসিকতার ভঙ্গিতে বলেছিলেন, এবার একজন ইংরেজ বাটলারকে নিয়ে লিখব, যাতে কেউ বলতে না পারে, শুধু জাপান নিয়ে লিখি। তার সেই বইয়ের নাম ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’, যা বুকার প্রাইজ পেয়েছিল এবং পরবর্তীতে সিনেমা হয়েছে।
সেখানে বাটলার স্টিভেনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অ্যান্থনি হপকিন্স, আর মিস কেন্টের ভূমিকায় ছিলেন এমা থম্পসন। প্রাথমিক চিত্রনাট্য লিখেছিলেন আরেক নোবেল বিজয়ী স্যার হ্যারল্ড পিন্টার। পরে অবশ্য রুথ প্রাওয়ার ঝাবওয়ালার সংস্করণই সিনেমার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে স্টিভেন ছিল একজন অত্যন্ত কর্তব্যপরায়ণ বাটলার, যে নিজের কাজটা যতটা সম্ভব নিষ্ঠার সঙ্গে করতে চেষ্টা করে এবং তার ব্যক্তিগত যেকোনো প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে তার মনিবের প্রতি দায়িত্বকেই প্রাধান্য দেয়। এ বইয়ের কেন্দ্রেও আছে আত্মপ্রবঞ্চনা এবং প্রথম দুই বইয়ের প্রশ্ন এখানে আরো তীক্ষভাবে আছে। একটা জীবন পার করে মনে হয়, এতদিন যা করলাম ঠিক করলাম কিনা।
তার নোবেল বিজয়ে যদিও খুব সম্মানিত বোধ করছেন বলে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এও বলেছেন যে, এখন তার নতুন বই লেখার খুব গভীরে আছেন। কিছুটা ভয়ে আছেন, এ পুরস্কার জেতার ফলে লেখালেখিতে ভাটা পড়বে কিনা। ‘আশা করি, লেখালেখি শেষ হয়ে যাবে না। আশা করি, এর ফলে অলস অথবা নিজেকে নিয়ে এতটাই খুশি হয়ে যাব না যে, কাজ করাই ছেড়ে দেব। আশা করি, আমি বদলাব না আর কম বয়সীরা আমার লেখা পড়া ছেড়ে দেবে না।’
তার বিজয়ে সমসাময়িক লেখকরাও খুশি। সালমান রুশদী জানিয়েছেন, ইশিগুরোর প্রথম বই থেকেই তিনি তার ভক্ত। সুইডিশ একাডেমির পার্মানেন্ট সেক্রেটারি সারা দানিয়াস বলেছেন, ‘ইশিগুরো অতীতকে জানতে চান। তিনি প্রুস্তিয়ান লেখক নন, অতীতকে তিনি উদ্ধার করতে চান না, বরং খুঁজে দেখতে চান, ব্যক্তি ও সমাজ হিসেবে টিকে থাকার জন্য অতীত কতটুকু ভুলে থাকা জরুরি।’ দানিয়াস আরো বলেছেন, তারা আশা করেন, এবার ইশিগুরোর বিজয় পৃথিবীকে আনন্দিত করবে।






