জলচক্র এখানে শেষ

 

কালো কুয়াশার নিঃশ্বাসের ভাপে ঠাসা

মহাগোধূলির স্বীয় হাতে পাতা রাত

ঢেকে দিচ্ছে গুঞ্জরিত ভবতীর।

আরশের ছায়াপাতে চমকে ওঠে জল।

শববাহিকা ঢেউয়ের ঝিম ধারাপাত

গুনে যায় লাশের পর লাশ

কানকোর মতো খুলে যায় ক্ষতস্থান,

মিহি বালিকা স্রোতেরা দোলাচ্ছে তাদের চুল।

ঝুর ঝুর কয়লাগুঁড়া থতমত এ সন্ধ্যায়,

শোকবস্তু কোলে নিশি জাগো গো রসুল।

 

২.

যেই জল ছায়া রাখে সেই জল স্মৃতিধর;

বাতাসের গমনছাপও ধরে রাখে নদী।

মাকড়জালের মতো হাওয়ার তন্তুরাশি

ক্ষণিক মুদ্রিত থাকে পানির পাতায়;

কৃষির আহ্বানে উঠে আসে গভীরের জল

কলঙ্ক লাঘব করাও সনাতন জলধর্ম।

চিতশোয়া নদীর পেটে গাল পেতে

এসব কথাও তো আমি বলেছি:

‘দুঃখভোগের শয়নভঙ্গিমা আর না সহে

বুকের কলস মোর ভরে দাও গো সাঁই

রক্ত নিরবধি বয়, নিদয়া তুমিই সহায়’!

 

৩.

সবই ভেবেছি দরিয়ায় নেমে যেতে যেতে,

আর অপেক্ষায় থেকেছি কখন জলশয়ান ছেড়ে

চরের কিনার থেকে ব্রহ্মাণ্ডের ঢাল বেয়ে

আকাশের রণক্ষেত্রে ঢুকে পড়বে কালপুরুষ।

ঘড়ির কাঁটার মতো তার নভো প্রদক্ষিণ

সুবহে সাদিকের দিকে স্থির হবে পুবে,

ঘুরতে ঘুরতে তার তীরের নিশানা

এত এত বায়ুমহলের তলে স্থানু করে দিয়ে

নিমেষে নির্দেশ করে বসে তিলার্ধ আমাকেই!

 

৪.

আশ্বিনে ঝড়ের মতো ঘোলা ঢেউ

জাগে যে নদীতে, সে নদী মেঘনা

আকাশের থিয়েটারে বিজলির ছায়াছবি,

বজ্রধ্বনিতে আসমানি কবিতার নাদ।

স্মৃতিপ্রেরিত বাতাসে নাই আর কেউ

একক নদীতে বহুবাচনিক কত ঢেউ;

ঐশী রজ্জু ধরে নক্ষত্রেরা আছে গাঁথা,

কাটা হবে বলে দাগ দিয়ে রাখা গাছ

পলে পলে চালায় প্রশাখা বাড়ানোর কাজ।

আমিও কি ফিরব না জলে— আদি সরোবরে?

 

৫.

মোহনায় দেখি তটস্থ তারাদের চোখ

ভীতিকরভাবে স্থির; তেতে উঠছে নিশি,

আকাশের অন্ধকার ঝাঁঝরি দিয়ে ছুটে

রাশি রাশি সুতাশঙ্খ সাপ

রশ্মিফলা হয়ে বিঁধছে মেঘনায়,

ভোরের জোয়ারে ফাঁপছে বঙ্গোপসাগর

পারে পারে ঘাটপুঞ্জির আলো

দূরের গ্রামগুলো মাছেদের মতো ঘুমে

দূরান্তের আলো, কচুরিবহর, চিমনির ফুলকি আর

মাঝিদের দাউ দাউ চুলা, লৌহ জলযান

ছলচ্ছল দুঃখে সব করছে টলমল।

আলোর বহর ভেদ করে যায় পরস্পর।

 

৬.

ভাগ্যরেখা পেরিয়েও যায় কারো কারো বিধি

বিপত্সংকেত নিয়ে বয়ে চলা লোহার জাহাজ

সদরঘাটের কফ ওঠা বুড়ো স্টিমার

পুরাকালের ইঞ্জিন বুকে আমার

ধোঁয়ামেঘে চলছি পাড়ঘেঁষে,

সুন্দরবনের খাঁড়িতে লুকিয়ে ছিলাম কিছুকাল

চাঁদপুরের ঘূর্ণিপাক বেয়ে উঠেছি এইমাত্র!

 

৭.

এসবের কিছুই বলতে পারব না আমি রাতে

পৃথিবীকেও জানাব না অত্যাসন্ন প্লাবনের কথা,

ভোরের আগেই কিছু ঘটে যাবে জানি

আকাশ উপচে যাবে এ নদীর পানি

ভরে দেবে বিশ্বময় সব ব্ল্যাকহোল।

আবার আসবে আমার সময় ফিরে,

কোনো এক নভোকূপে বসে

আবার বানাব নতুন মানুষ আমি

পৃথিবীর শেষ পলিটুকু দিয়ে