‘অন্ধকারে আমার চোখ রিমঝিম করে।’

আশ্বিন বলল।

চোখ রিমঝিম করে! রিমঝিম!

‘রিমঝিমটা আবার কিরকম?’

‘কিরকম আবার!’

বলে আশ্বিন চুপ করে গেল।

পার্থও আর কিছু বলল না।

সন্ধ্যা হচ্ছে।

যদিও সন্ধ্যা নেমেছে মন্দ মন্থরে, আলোকমালা জ্বলে উঠেছে নগরীর। জ্বলতে নিভতে শুরু করে দিয়েছে হরেক রঙের নিয়ন সাইন। ঘর থেকে দেখা যায়। তারা দেখছে না। আশ্বিন পার্থ। আবছা অন্ধকারে বসে তারা সন্ধ্যা হতে দেখছে। পার্থর ফর্মুলা এটা। সকালের প্রথম আলো দেখা যতটা পুণ্যের, সন্ধ্যার প্রথম অন্ধকার দেখাও ততটা পুণ্যের।

আশ্বিনকে মুগ্ধ করেছে ফর্মুলা। এখন সেও সন্ধ্যা হতে দেখে বাসায় বা এখানে যদি থাকে। সন্ধ্যার অন্ধকারে তার চোখ রিমঝিম করে না, ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে রিমঝিম করে।

বিন্দুবাসিনী নোটিস করেছে হতে দেখা কিছু সন্ধ্যার আশ্বিনকে। কথাও বলেছে।

‘তোর আবার কী হলোরে, শিনশিন?’

‘কী হবে, বিন্দুবাসিনী?’

‘ভাবগতিক তো ভালো দেখি না। সন্ধ্যায় ঘর অন্ধকার করে বসে থাকিস কেন? কোনো সমস্যা? দিনশেষে তুইও প্রেমে পড়লি নাকি?’

‘নরকে যাও তুমি, বিন্দুবাসিনী। তুমি আর তোমার জামাইকে পাক্কা উনিশ বছর ধরে দেখছি, আমার শিক্ষা হয়ে গেছে, বাবা! তিন বছর প্রেম করে বিয়ে করেছিলে তোমরা! অ্যাবসার্ড! সতেরো বছর বয়সে তোমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। উনিশ বছর বয়সে আমি। তুমি এখনও একটা সুইট সিক্সটিন, বিন্দুবাসিনী। আমি প্রেমে পড়লে তোমাকে বলব না, বলো? পড়িনি।’

‘আমার তো মনে হয় দিনশেষে তুই ভয়ঙ্কর একটা প্রেমে পড়বি।’

‘হ্যাঁ, পড়ব। দিনশেষে কাউন্ট ড্রাকুলার প্রেমে পড়ব এবং ভ্যাম্পায়ার হয়ে যাব। হি! হি! হি!’

‘তোকে ভ্যাম্পায়ার হতে হবে না, বাবা। তুই হাসলেই তোকে ভ্যাম্পায়ার মনে হয়।’

‘খুব! হ্যাঁ?’

‘মাইন্ড করলি নাকি?’

‘তুমি কারেন্ট সংখ্যা উন্মাদ, বিন্দুবাসিনী। ব্যাপক হাসির। হি! হি! হি!’

‘বুঝেছি। এখন এই নবঢঙের মানে কী বল? অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে থাকিস, দেখি। কেন?’

‘নবঢঙ! হি! হি! হি! এ শব্দটা কি তোমার বানানো, বিন্দুবাসিনী? নবঢঙ! ফেসবুকে দেব, এক মিনিটে এক হাজার একটা লাইক পড়ে যাবে।’

‘তা তো অবশ্যই। তোমাদের লাইক তো আবার পড়ে।’

‘আমরা লাইক দিইও, বলো। হি! হি! হি!’

‘এই ভ্যাম্পায়ারের বাচ্চা ভ্যাম্পায়ার! হাসবি না এত। কাহিনী বল।’

‘দেয়ার ইজ নো কাহিনি, মাই ডিয়ার বিন্দুবাসিনী। সন্ধ্যা হতে দেখি।’

‘সন্ধ্যা হতে দেখিস! কী সর্বনাশ!’

আফসারা বিন্দু। আশ্বিনের মা। আশ্বিন ডাকে বিন্দুবাসিনী।

টিএসসি, কারাসে আড্ডা দেয় আশ্বিনরা। টিএসসির চা বিক্রেতা নূরু মামা আশ্বিনকে ডাকে শিনশিন মামা। বিন্দুবাসিনীকে সব বলে আশ্বিন। নূরু মামার কাহিনীও বলেছে। শোনার পর থেকে বিন্দুবাসিনী ফেয়ার মুডে থাকলে কখনো কখনো শিনশিন বলে ডাকে আশ্বিনকে। আশ্বিন বোঝে, কুল আছে মহিলা।

পার্থ সম্পর্কেও অবগত বিন্দুবাসিনী।

আশ্বিন বলেছে, ‘আজব একটা মানুষ সে, বিন্দুবাসিনী। যতবার আমার সঙ্গে দেখা হয়, আমাকে একটা করে বই গিফট দেয়। খুব বই পড়ে। বাসাভর্তি বই। তুমি এক রামনাথ বিশ্বাসের কথা বলো না, ট্রাভেলগ লিখতেন, ওনার দুটো বইও তার কাছে দেখেছি। অন্ধকারের আফ্রিকা ও ট্যুর অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড উইদাউট মানি।’

‘কী বলিস!’

‘তোমাকে আমি একদিন তার বাসায় নিয়ে যাব, বিন্দুবাসিনী। ...না, নিয়ে যাব না। আমার ইউএসপি কমে যাবে।’

‘ইউএসপি কমে যাবে মানে? ইউএসপি কী?’

‘তুই একটা ওল্ড মডেল, বিন্দুবাসিনী। ইউএসপি মানে ইউনিক সেলিং পয়েন্ট। পার্থ তোমাকে দেখলেই তোমার প্রেমে পড়ে যাবে নির্ঘাৎ। ওল্ড মডেলের জিনিস হলেও তুমি কুল আছ এখনো। হেই! তোমরা আরেকটা বাচ্চা নিচ্ছ না কেন? আমি কোলে কাঁখে করে বড় করে দেব, চিন্তা করো না। নিয়ে নাও আরেকটা।’

‘চুপ কর উন্মাদের বাচ্চা উন্মাদ!’

বিন্দুবাসিনী গেছে এশিয়ার বৃহত্তম গ্রামে। বাপের বাড়িতে। আশ্বিনের বাপ ও আশ্বিন যাবে বৃহস্পতিবারে। আরো চারদিন। আজ দুপুরে বৃষ্টি হয়েছে অল্প। আশ্বিন ভিজেছে। বৃষ্টির পর ফোন করেছিল বিন্দুবাসিনী, ‘আসসালামওয়ালাইকুম। ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে দেখলাম।’

‘ওয়ালাইকুমসালাম দিতে দাও! ওয়ালাইকুমসালাম। হ্যাঁ, ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে। তুমি কী করে দেখলে?’

‘ফেসবুকে ভিডিও শেয়ার দিয়েছে কতজন। তকি দেখাল।’

‘তকি! এই মেকুরের ডিমটাও ফেসবুকে আছে নাকি? হি! হি! হি! কী নামে আছে? আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়নি কেন? আসি দাঁড়াও, মেকুরের ডিমটার নাক না কাটি তো!’

‘তকি আছে। কথা বলবি?’

‘বলব না মানে? দাও!’

তকি ফোন নিয়ে বলল, ‘দিপভাই!’

‘দিপভাই! এসে নিই, মজা দেখাব! ফেসবুকিং করো তুমি! মেকুরের ডিমটা! আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাসনি কেন, বল?’

‘তুমি ফেসবুকে আছ, দিপভাই?’

‘কী-ই-ই-ই? ওরে আমার মার্ক জাকারবার্গরে। তুই এক্ষুনি আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠা। দিপভাই লিখিস না আবার, লিখবি আশ্বিন। বাংলায় আশ্বিন।’

‘হুঁ।’

‘হুঁ! ফুফুমাকে দে।’

‘ফুফুমা, দিপভাই।’

বিন্দুবাসিনী বলল, ‘হ্যাঁ, বল।’

‘কী আর বলব? তোমার জন্য স্যাড নিউজ আছে, বিন্দুবাসিনী। ভেরি স্যাড নিউজ আছে।’

‘স্যাড নিউজ! কী?’

‘তোমার জামাই কাল রাত বারোটা দশে বাসায় ফিরেছে। টলছিল। আমি বললাম, তুমি আবার মদ খেয়েছ বাপি! আমি এক্ষুনি মাকে নিউজ করে দিচ্ছি। বলে কী, যা, নিউজ করে দে! মাকে জানা, মামাকে জানা, মামিকে জানা, ট্রাম্প, পুতিন, নরেন্দ্র মোদিকে জানা। হু কেয়ারস? দেখেশুনে তো আমি হতবাক। চিন্তা করে দেখো। দুদিন হয়েছে তুমি যাওনি, ফুল ফ্রিডম পেয়ে গেছে সে! ফোনে আবার সুলতান কাকাকে বলেছে, মহিলা গেছে বাপের বাড়িতে, দুই বোতল ভদকা নিয়ে চলে আয় ব্যাটা! চিন্তা করো! আমি তো এ ঘটনা তোমাকে বলব নাকি বলব না, এ চিন্তা করেই পাক্কা ষোল ঘণ্টা সতের মিনিট পার করে দিলাম। সুলতান কাকা আজ সন্ধ্যায় আসবে। দুই বোতল ভদকা না হোক দুই বোতল বাংলা মদ তো আনবে। আমি কী করব, তুমি বলে দাও।’

‘তুইও একটা গ্লাস নিয়ে বসে পড়িস।’

‘কী বলো তুমি! বিন্দুবাসিনী!’

‘কী বলি? কুটনীর কুটনী! সুলতান ভাই, মম ভাবি তো গত রবিবারে মাত্র গেছে কানাডায়। ক্রিসমাসের পর ফিরবে।’

এহ্হরে! এ রকম ধরা খাবে ভাবেনি আশ্বিন।

ঘরের অন্ধকার আরেকটু জমেছে। তাও চোখ রিমঝিম করার মতো না।

‘এমিলি’ মুভির সাউন্ড ট্র্যাক একবার বেজে উঠেই বন্ধ হয়ে গেল। এটা মনে হয় পাগলিটার কাণ্ড। উল্টোদিকের বিল্ডিংয়ে থাকে। ছাদে উঠে বেদম নর্তন-কুর্দন করে। পার্থর বইয়ের র্যাকে একটা বই আছে, ‘চিলেকোঠার উন্মাদিনী ও অন্যান্য।’ ধার করে পার্থ বলে, ‘চিলেকোঠার পাগলি।’ অবশ্যই ছোট হবে আশ্বিনের। সিগারেট টানে। নাকি গাঁজা, কে জানে? ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে ঘুড়ি ওড়ায় আবার। শীতকালে দেখেছে আশ্বিন। আবার উনি একজন গ্রাফিতি আর্টিস্টও। চিলেকোঠার হলুদ দেয়ালে কঠিন একটা গ্রাফিতি করেছেন। অনেকগুলো বিল্ডিং মিলিয়ে একটা কুমির হয়ে গেছে। ‘এমিলি’র সাউন্ড ট্র্যাক মনে হয় খুবই পছন্দ এর। প্রায়ই শোনে।

মাগরিবের আজান হলো মসজিদে।

নিচের রাস্তায় একটা শোরগোল উঠল হঠাৎ, ধর! ধর!

চোর-ছিনতাইকারী না নিরীহ কোনো মানুষকে ভুল করে ধাওয়া দিচ্ছে মানুষ? শিউরে উঠল আশ্বিন। আজো একটা নিউজ আছে পত্রিকায়, ছিনতাইকারী সন্দেহে তিনজনকে গণপিটুনি, দুজন নিহত। সে রকম কিছু না তো?

শোরগোল স্তিমিত হলো বা ঢুকে পড়ল আর কোনো গলিতে।

পার্থ বলল, ‘শীতকালের আর ক’দিন?’

আশ্বিন বলল, ‘কেন?’

‘এমনি। চা খাবি?’

‘শীতকালে চা খাওয়াবে নাকি?’

‘আরে না!’

‘তুমি বসে থাকো, আমি বানাই।’

‘সল্টেড টি?’

বলে পার্থ হাসল।

আশ্বিনও হাসল। এই কাণ্ড সে করেছে একদিন। ভুল করে লবণ দিয়ে ফেলেছিল চায়ে। পার্থর কিচেনের র্যাকে আলমন্ডের দুটো কৌটায় চিনি-লবণ থাকে। নোনতা দুর্ঘটনার পর মার্কার পেন দিয়ে আশ্বিন কৌটা দুটোয় লিখে দিয়েছে, চিনি, লবণ। এখন পার্থ ভুল করে চিনির কৌটায় লবণ রেখে থাকে যদি!

পার্থর এ বাসাটার আর্কিটেকচার অদ্ভুত। আধা অফিস টাইপের ইন্টেরিয়র। বারান্দা আছে, টিনশেড দেয়া। বৃষ্টির শব্দ শোনা যায়। বারান্দার সঙ্গে কিচেন। দরজা নেই কিচেনের।

বারান্দালাগোয়া ঘরের দরজায় দাঁড়াতেই বারান্দায় পড়ে থাকা জ্যোত্স্না দেখল আশ্বিন। এ বাসার কোনাকানচি সব তার চেনা। কিচেনের লাইট না জ্বালিয়ে বার্নারে চায়ের পানি গরম হতে দিল সে।

চাঁদ ঝুলে আছে কিচেনের কপাটবিহীন জানালায়।

‘এমিলি’র সাউন্ড ট্র্যাক আবার বাজল।

অদ্ভুত লাগল।

‘এমিলি’ মুভিটা দেখেছে আশ্বিন। আঁদ্রে তাতু দারুণ।

পার্থও দেখেছে।

পার্থ আজ কোন বইটা দেবে আশ্বিনকে?

‘বৃষ্টি আর নক্ষত্র।’

ছোটদের গল্পের বই। রুশ। প্রগতি প্রকাশন, মস্কোর প্রকাশনা। এটা খুব প্রিয় একটা বই পার্থর। ফুটপাতের বইয়ের দোকানে ১৩ কপি পেয়ে ১৩ কপিই কিনে এনেছে।

জ্যোত্স্না আর বার্নারের লালচে কিছু আভা আশ্বিনের চিবুকে, নাকের ডগায় ও চোখের মণিতে পড়েছে।

ফোন বাজল।

আশ্বিন ধরল, ‘বিন্দুবাসিনী।’

‘তুই বাসায়?’

‘এ সময় আর কোথায় থাকব, বলো। ছাদে বসে আছি। জ্যোত্স্না দেখছি।’

‘তোর বাপ?’

‘ফেরেনি এখনো। ফিরবে, চিন্তা করো না। তোমার জামাই তো একটা ডমেস্টিক ক্রিয়েচার, বিন্দুবাসিনী। আচ্ছা, তার সঙ্গে তোমার কথা হয়নি, বলো? তুমি তাকে জিজ্ঞেস করোনি, সে বাসায় ফিরেছে কিনা। সে নিশ্চয় বলেনি ফিরেছে! তাহলে? প্যাকনা করো কেন মেয়ে? হয়েছে, রাখি। জ্যোত্স্না দেখি...!’

‘এই! শোন!’

‘ওহ্! বলো! কুইক!’

‘দিনশেষে তুই একটা মিথ্যুক।’

‘দিনশেষে না, বিন্দুবাসিনী। আমি হলাম একটা অলটাইম মিথ্যুক। তুমি জানো। কিন্তু এখন কী মিথ্যা কথাটা বললাম, শুনি।’

‘তুই বাসায় নেই, তোর বাপ বাসায়।’

‘তো?’

‘তুই কেন বললি তুই বাসায়?’

‘মিথ্যা কথা বললাম! আমি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিথ্যুক হতে চাই, বিন্দুবাসিনী। মিথ্যুকের প্রতিশব্দ হতে চাই। হি! হি! হি!’

‘দিনশেষে তোর মতো একটা উন্মাদের বাচ্চাকে আমি পেটে ধরেছি!’

‘কী করবে বলো! ডেলিভারি দিয়ে ফেলেছ!’

‘তুই এসব কথা কোত্থেকে শিখলি!’

‘বই পড়ে, বিন্দুবাসিনী। হি! হি! হি!’

‘অ।’

‘অ মানে?’

‘পার্থ কেমন আছে?’

‘অ মানে পার্থ কেমন আছে? পার্থ! সে তোমার ভাই হয় নাকি?’

‘সে কী কথা! ভাই হবে কেন?’

‘যেভাবে পার্থ বললে, মনে হলো মায়ের পেটের ভাই! তোমার ভাই ভালো আছে, বিন্দুবাসিনী। হি! হি! হি! হয়েছে। কাটি!’

বলে লাইন কেটে দিয়ে ফোন অফ করে দিল আশ্বিন। বাসায় ফিরে আবার কথা তো বলবেই। আজকের সন্ধ্যাটা এ টু জেড বিন্দুবাসিনীকে শেয়ার না করলে হবে? ঘুমই ধরবে না রাতে। কী কী বলবে? ‘বৃষ্টি আর নক্ষত্র’ বইয়ের কথা তো অবশ্যই। ‘এমিলি’র সাউন্ড ট্র্যাকের কথাও বলবে। বারান্দার জ্যোত্স্না ও কিচেনের কপাটবিহীন জানালার কথাও বলবে। আর? এমন একটা কথা কি বলবে, যে কথাটা বিন্দুবাসিনী কখনই বিশ্বাস করবে না।

বলবে।

আজ না হোক, আরেকদিন।

প্রথম আলো প্রথম অন্ধকারের মতো আশ্বিন প্রথমবারের মতো বলবে, ‘পার্থ বলে আসলে কেউ নেই।’