(একবিংশ কিস্তি) তৃতীয় অধ্যায়
‘অনুবাদকবৃন্দ এবং জাতীয় সাহিত্যসমূহের উদ্ভব’ (২য় পর্ব))
ইয়ুস্ট ভ্যান দেন ভনেদল ও ওলন্দাজ স্বর্ণযুগ (প্রথমাংশ)
ইয়ুস্ট ভ্যান ডেন ভনেদলের (১৫৮৭-১৬৭৯) অনুবাদকর্ম আমাদের সামনে সতেরো শতকের ওলন্দাজ রিপাবলিকে অনূদিত সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি ও ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কে এক অনন্য উপলব্ধিতে পৌঁছে দেয়। তার অনুবাদগুলো এ কারণে স্বয়ংসম্পূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত যে, সেগুলো অনুবাদের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক মর্যাদাসম্পন্ন বিদেশী টেক্সট আমদানিতে উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও বস্তুগত সংস্থান (রিসোর্সেস) বিনিয়োগ করার ব্যাপারে একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর অন্তত কিছু অংশের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়। তাছাড়া ব্যাপারটি এমন একটি সময় ঘটেছিল, যখন ওলন্দাজ রিপাবলিকের শীর্ষস্থানীয় শ্রেণীগুলো— বিদ্রোহের মাধ্যমে জন্ম নেয়া নব্য গঠিত রাজনৈতকি সত্তা— একটি সচেতনভাবে জাতীয় সংস্কৃতি তৈরির মাধ্যমে তাদের অবস্থানের বৈধ রূপ দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। ভনেদলকে সাধারণত ওলন্দাজ স্বর্ণ যুগের সবচেয়ে বড় কবি ও নাট্যকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভনেদলের সমগ্র সাহিত্যিক রচনায় অনুবাদ একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, যেমনটি ছিল চসারের ক্ষেত্রেও। এর ফলে মার্কামারা রেনেসাঁ ধরনে translation (অনুবাদ), imitation (অনুকরণ) এবং aemulatio (প্রতিদ্বন্দ্বিতা)-এর একটি অখণ্ড জাল তৈরি হয়, যা লেখকের নিজের inventio (আবিষ্কার)কে উদ্বুদ্ধ করে এবং তাকে ধারাবাহিক কিছু টেক্সটগত নমুনা সরবরাহ করে।
ভনেদলের সাহিত্যিক রচনার পরিমাণ বিস্ময়কর এবং সেটা তার বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। অনুবাদক হিসেবেও তিনি কম বৈচিত্র্যের অধিকারী ও কম বহুপ্রজ ছিলেন না। তার অনুবাদের ব্যাপ্তিকাল অর্ধশতকেরও বেশি। ১৬১০ খ্রিস্টাব্দের অল্প ক’দিন পর তিনি Du Bartas-এর Les Sepmaines দিয়ে শুরু করেন, আর ১৬৭১ খ্রিস্টাব্দে ৮৪ বছর বয়েসে ওভিদের Metamorphoses দিয়ে ইতি টানেন।
{ফরাসি কবি গিয়ুম দে সালুস্তে দু বাখতাস (Guillaume de Salluste du Bartas, ১৫৪৪-৯০) একটি জাঁকালো ও প্রভাবশালী, বহুবিদ্যাসমন্বিত ও বাইবেলীয় মহাকাব্য Les Sepmaines-এর রচয়িতা, যেটার পুরো নাম La Sepmaine ou Création du monde (১৫৭৮) এবং পরবর্তী সময়ে তিনি La Seconde Sepmaine (১৫৮৪) নামে আরেকটি মহাকাব্য লেখেন, যা তিনি শেষ করেননি।}
তার কাজের মধ্যে রয়েছে, নিতান্তই খসড়া বা মকশো করার জন্য, ইতালীয় ও লাতিন থেকে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ রচনার গদ্য অনুবাদ। তিনি প্রথম সেনেকার লাতিন নাটকের সম্পূর্ণ অনুবাদ এবং সফোক্লিস ও ইউরিপিদেসের পাঁচটি গ্রিক নাটকের প্রথম ওলন্দাজ অনুবাদ করেন (তখন অবধি মাত্র সফোক্লিসের অন্য একটি মাত্র নাটকের অনুবাদ ছিল ওলন্দাজে)। তিনি ভার্জিলেরও দুটো সম্পূর্ণ অনুবাদ করেন, একটি গদ্যে, আরেকটি কব্যে।
একাধিক দিক থেকেই ভনেদলকে রেনেসাঁর শেষ দিকের একজন প্রতিনিধিস্থানীয়, দেশীয় ভাষার লেখক হিসেবে গণ্য করা যায়। মানবতাবাদী বিদ্যার মধ্যস্থতার ভেতর দিয়ে ধ্রুপদী উৎসগুলোর ওপর দেশীয় সাহিত্যের নির্ভরতাই কেবল তিনি দেখিয়ে দেননি, সেই সঙ্গে এ উৎসগুলো কী করে একটি নব্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রের আত্মসচেতন সংস্কৃতির ভেতর ক্রমবর্ধমানভাবে বিলীন ও একীভূত হয়ে গিয়েছিল, সেটাও তিনি দেখিয়ে গেছেন। একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে ভনেদল বিদেশী— মুখ্যত ধ্রুপদী— উদাহরণ ও নমুনা বা আদর্শের প্রতি এবং সেসবের ওপর ভিত্তি করে নিজের রচনা তৈরি করার নিরন্তর ইচ্ছার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। অল্পস্বল্প ইস্কুলের পড়াশোনা করা ভনেদল একটু পরিণত বয়সেই লাতিন ও তারপর গ্রিক শিখেছিলেন। আর তাই লাতিন ও বিশেষ করে গ্রিক থেকে অনুবাদের সময় তিনি ধ্রুপদী ভাষাতত্ত্বে তার নিজের চেয়ে ভালো ধারণা রাখেন, এমন বন্ধুদের ওপর নির্ভর করতেন। এক অর্থে তার নিজের বিকাশের পাশাপাশিই রেনেসাঁ পর্বের লেখালেখির বাড়-বৃদ্ধি ঘটে— সাধারণভাবে পশ্চিম ইউরোপে এবং বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলীয় দেশগুলোয়। ইউরোপ গোড়ার দিকে ইতালীয় মানবতাবাদীদের লেখালেখির মাধ্যমেই ধ্রুপদী রচনাগুলোকে আবিষ্কার করে এবং মহাদেশটি বরাবরই গ্রিক প্রাচীন যুগের চেয়ে লাতিন প্রাচীন যুগের সঙ্গে অধিকতর পরিচিত ছিল। তারই ফলে বেশির ভাগ নতুন রেনেসাঁ ফর্ম ও ধ্যানধারণা ফ্রান্স হয়ে প্রথমে নিম্নাঞ্চলীয় দেশগুলোয় পৌঁছেছিল। এরই সমান্তরালে অনুবাদক হিসেবে ভনেদলের বিকাশ অসাধারণ: ফরাসি ও ইতালীয় থেকে অনুবাদ দিয়ে শুরু করে তিনি সেনেকা, হোরেস, ওভিদ ও ভার্জিলের দিকে অগ্রসর হন, যদিও তার আগে যখন তার বয়স সত্তরের কোটায়, তিনি গ্রিক থেকে তার পাঁচটি অনুবাদের চারটিই প্রকাশ করেন।
ভনেদলের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিশেষত্বের মধ্যে এমন অনেক কিছু রয়েছে, যা তাকে ওলন্দাজ স্বর্ণ যুগের সংস্কৃতিটি তৈরি করা সমাজের একজন প্রতিভূ হিসেবে চিহ্নিত করে। যদিও ধর্মীয় দিক থেকে তিনি প্রন্তিক অবস্থানে ছিলেন। দক্ষিণ নেদারল্যান্ডসের একটি অভিবাসী পরিবারের সন্তান ভনেদল আমস্টারডামের একটি অ্যানাব্যাপ্টিস্ট সম্প্রদায়ে বড় হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি একটি ক্যালভেনিস্ট নিয়ন্ত্রিত দেশে অত্যুত্সাহী ক্যাথলিকে পরিণত হন। তার আর্থিক অবস্থা ছিল একই সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নড়বড়ে। পেশায় ছিলেন রেশমের কারবারি এবং এক হাতেই তিনি তার ব্যবসা চালাতেন। ফলে তার সাহিত্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য তেমন সময় জুটত না তার। কিন্তু সেই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি প্রবল গতিতে তার বিপুল æuvre (সম্পূর্ণ সাহিত্যকর্ম) রচনা করে গেছেন।
একটি অথনৈতিক সংকটের কারণে ১৬৫০-এর দশকে বিলাসদ্রব্যের বাজার একেবারে মার খেয়ে যায়। এ সংকটে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া তার সন্তানের ঋণ মেটাতে ৭০ বছর বয়সী ভনেদল একজন হিসাবরক্ষক হিসেবে একটি বেতনভুক্ত কাজে যোগ দিতে বাধ্য হন। নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে ক্ষমতার অলিন্দে গতায়াত তার জন্য নিষিদ্ধ হলেও ভনেদল যাদের কাছ থেকে তার সাহিত্যিক রচনার পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন, তারা হলেন সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে তার ঠিক ঊর্ধ্বস্থিত কিছু মানুষ। সেই সঙ্গে হল্যান্ডের ধনী বণিক শ্রেণী এবং বিশেষ করে ক্ষমতাধর আমস্টারডাম ‘রিজেন্টরা’, যারা দেশটির বাণিজ্যিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং পাবলিক ডিসকোর্সে যাদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় ভনেদল সক্রিয় ছিলেন।
বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকেও ভনেদল তাদের ওপরই নির্ভরশীল ছিলেন, যারা তাকে উচ্চসাংস্কৃতিক মর্যাদার নমুনা, অর্থাৎ ধ্রুপদী নমুনা সরবরাহ করতে পারতেন। তার সামাজিক পরিমণ্ডল ও শিক্ষা এ ক্ষেত্রটির জন্য তাকে পুরোপুরি উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে পারেনি। ব্যবসা-বাণিজ্যভিত্তিক পেশার জন্য প্রশিক্ষিত ভনেদল ফরাসি শিখলেও কোনো ধ্রুপদী ভাষা শেখেননি। তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কবিতায়— নৌচালনবিদ্যার ওপর লেখা একটি স্তোত্র (১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে রচিত)— যে লাতিন ও নব্য লাতিন উেসর উল্লেখ পাওয়া যায়, তার জন্য তিনি বিদ্যমান ওলন্দাজ অনুবাদের কাছে অধমর্ণ। তার প্রথম নাটক Passover (১৬১২)-এ Les Sepmaines-এর আভাস পাওয়া যায়, যার দুটো খণ্ড ভনেদল সে সময়ের দিকে অথবা তার খানিক পরে অনুবাদ করেছিলেন (১৬১৬তে কুলপতিরা, The Patriarchs ও ১৬২০-এ সলোমনের রাজসিকতা, The Magnificence of Solomon)। সলোমনের রাজসিকতার ভূমিকায় ভনেদল অনুবাদ সম্পর্কে তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন, অনুবাদ ও invention (উদ্ভাবন)-এর মধ্যে তফাতের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং সেই সঙ্গে অনুবাদের একটি আক্ষরিক (literalist) পদ্ধতির বা কর্মকৌশলের প্রতি তার সমর্থন ব্যক্ত করেন।
আমস্টারডামের শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক বলয়ের সঙ্গে তার যোগাযোগ বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ভনেদল ব্যক্তিগতভাবে লাতিন ভাষাশিক্ষার পাঠ নেন (১৬১৩-২০); তিনি ইতালীয় ভাষাও আয়ত্ত করেন এবং তরকুয়াতো তাসেসার মুক্ত জেরুজালেমের (Gerusalemme liberata) একটি গদ্য অনুবাদ তৈরি করেন। যদিও সেটি কখনই সমাপ্ত করা হয়নি এবং যা এখন পর্যন্ত পাণ্ডুলিপি আকারেই রয়ে গেছে। ফ্লভিয়াস জোসেফাসের কাহিনী থেকে নেয়া, কিন্তু ভাষা ও কাঠামোয় সেনেকার Troades-এর সুস্পষ্ট ছাপবিশিষ্ট তার দ্বিতীয় নাটক ধ্বংসপ্রাপ্ত জেরুজালেম (Jerusalem Destroyed, ১৬২০), যে নাটকটিকে আন্তর্জাতি খ্যাতিসম্পন্ন নব্য লাতিন লেখক হিউগো গ্রোটিয়াস ‘ট্র্যাজেডির রাণী’ বলে অভিহিত করেছেন; ভনেদল তাকে খুব পছন্দ করতেন এবং তার সঙ্গে বন্ধুত্বও গড়ে তুলেছিলেন।
{Huig de Groot (১৫৮৩-১৬৪৫) ছিলেন একাধারে একজন ওলন্দাজ আইনবিশারদ, দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক, কবি, ও নাট্যকার। তার লাতিন নামেই (হিউগো গ্রোতিয়াস) তিনি সমধিক পরিচিত।}
কিন্তু ভনেদল যখন সেনেকার দুটো নাটক ওলন্দাজ ভাষায় অনুবাদ করতে চাইলেন (Troades হলো The Amsterdam Hecuba, ১৬২৬ আর Phaedra, Hippolytus, ১৬২৮), তখন তিনি অন্যদের সাহায্য নিয়ে একটা গদ্য অনুবাদ দাঁড় করালেন এবং কিছুদিন পর আবার সেটার পদ্য রূপ দিলেন। ১৬৩০-এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি তার নিজের সুবিধার্থে অনুশীলন হিসেবে হোরেসের সমগ্র রচনা গদ্যে অনুবাদ করেন। পরে ১৬৫৪ খ্রিস্টাব্দে তা প্রকাশ হয়, মূলত যাতে একটি অবৈধ সংস্করণ ছাপা না হতে পারে, সেজন্য।
ক্রমশ...






