১.

আমি আছি, আবার নাই।

আমার চারপাশের এই পরিপার্শ্ব— আকাশ, বাতাস, প্রকৃতি সবই আছে, শুধু আমিই নাই। সময়ের দুর্জ্ঞেয় কোনো হিসাবে আমার বহিরঙ্গের বিলয় হইছে, কিন্তু চিরমুক্তি আমার হয় নাই। কায়াহীন এক অবয়বে আমি শুধুই ঘুইরা মরতেছি; ইতিহাসের এক পরত থিকা আরেক পরতে, পর্যুদস্ত, ক্ষীয়মান আর প্রায় বিলুপ্ত এক আমি। আমার নিয়তিই হইল শুধু ছায়ার মতো মাটি শুঁইকা শুঁইকা ঘুইরা বেড়ানো, হয়তো এই মাটির গন্ধ শুঁকতে শুঁকতেই একদিন আমার কাছে চিরমুক্তির পয়গাম আইসা যাবে, আর ততদিন আমি না মৃত না জীবিত। এক বনেচর।

আমি অভিশপ্ত। জন্মজন্মান্তরের অভিশাপগ্রস্ত।

আমার পরিচয় (বামার মগরা দিছে) রখইঙ্গের কালার কুঁইর। কুঁইর হইল কুত্তা। আর কালার হইল অচ্ছুতের মতো ঘৃণ্য, দুর্গন্ধময়। অর্থাৎ আমরা রখইঙ্গ রাজের অচ্ছুত কুকুরের দল।

আমার মৃত্যু কবে হইছে মনে করতে পারি না; এখন আর সাল, মাস কিছুই মনে নাই। একটা গ্রাম, একটা পণ্ডিত-মৌলবির টোল আর কিছু আপনজনের মুখ থাইকা থাইকা শুধু মনে পড়ে। আর বাকি মাথা শুধু ভার হইয়া আছে কোন যুগযুগান্তরের সব ইতিহাসে। এ ইতিহাস আমার মাথায় কেমনে ঢুইকা বসল, আমি জানি না। কালদর্শীর কোনো স্মৃতি তো আমার নাই! তবু আমি বাঁইচা আছি, আমার মাথায় বাঁইচা আছে রখইঙ্গের মার-উক রাজের স্মৃতি, কত শত আরব বণিক, পর্তুগিজ-মগ জলদস্যু, রেঙ্গুনে এক দুঃখী ভাগ্যবিড়ম্বিত সম্রাট আর আরাকান রাজ্যের আলাওল নামের এক কবিয়াল...। আমি চোখ বুজলেই দেখতে পাই অপমানে দুঃখে বিপর্যস্ত, বয়সের ভারে ন্যুব্জ ওই পতিত সম্রাটকে; যে নির্বাসিত, মৃত্যুর জন্য অপেক্ষমাণ। আরো দেখি আরাকানের দরবারের আলাওল নামের ওই কবিকে, যে সিকান্দারনামা রচনার জৌলুস নিয়া ঝপ কইরা আমার সামনে আইসা দাঁড়ায়। আর আমি দেইখা শুধু বিস্ময় মানি।

তবে আমার মৃত্যু ও তত্সংলগ্ন কিছু স্মৃতি মনে আছে। রাখাইনের এক বামার মগের দায়ের আঘাতে যেদিন গর্দান গেল, মাটিতে পইড়া গিয়াও সেদিন আমি বিস্ময় নিয়া দেখলাম, বামারের চোখে-মুখে আমারে হত্যা করার সাফল্যে সে কি পৈশাচিক উল্লাস! এত যুগ পরও, তার নিকট প্রতিবেশী হইয়া পাশাপাশি থাইকাও, এক থালায় একসঙ্গে খাওয়ার পরও আমি তার আপন হইতে পারি নাই!

এখন তার হিংসার আগুন দিনে দিনে লেলিহান শিখা হইয়া পুরা রখইঙ্গই গ্রাস কইরা নিতে উদ্যত হইছে। রখইঙ্গ জনপদের গ্রামের পর গ্রাম পুইড়া ছারখার হইয়া যাইতেছে। একদার রাক্ষস রাজ্যে এখন শুধু আকাশছোঁয়া আগুনের শিখা। ধোঁয়ায় কুচবরণ আকাশ, ওই তো আরাকান ওমের গা ঘেঁইষা ধোঁয়ার কুণ্ডলী কেমন পাকায় পাকায় উইঠা যাইতেছে আকাশে।

একটা মাটির ডেলার ওপর পশ্চাদ্দেশ ঠেকাইয়া এতক্ষণ বইসা আছি। অসহায়। আমার সামনে-পেছনে একদল মানুষের কাফেলা, ঘষটে ঘষটে, ধুঁকতে ধুঁকতে তারা সাগরের দিকে আগায় যাইতেছে। দুদিন ধইরা আমি এদের অনুসরণ কইরা আসতেছি। পেছনে আরাকান ওমের ঢালে, ধানক্ষেতের আইলের ওপর খানিক আগেই উপুড় হইয়া পইড়া থাকা একটা লাশরে দেখলাম। সারা পথ জুইড়াই ক্ষণে ক্ষণে এ রকম লাশ চোখে পড়তেছে। এ লাশটা এক রখইঙ্গ কুঁইরের মার, পালানোর সময় পেছন থিকা গুলি খাইছে; কিন্তু পরথমে যেটা বুঝি নাই, উপুড় হইয়া পইড়া থাকা মার বুকের নিচে গুলি খাইছে তার বারো-তেরো মাসের শিশুটাও। একটা গুলি দুজনেরই বুক-পিঠ এফোঁড়-ওফোঁড় কইরা দিয়া গেছে। মাত্র একটা গুলি। তারপর দেখলাম, পাঁচ-ছয় হাত তফাতেই চিত হইয়া পইড়া আছে আরেকটা লাশ। এক রখইঙ্গ বউ। কি ফুটফুটে তার মুখ, আকাশের দিকে চাইয়া রইছে স্থির চোখে, মাথায় তার লাল রঙের ফিতায় যেন আগুন জ্বলতেছে। শরীর, রক্ত শুঁইকা বুঝলাম, এদের ওপর গুলি হইছে গতকাইল, সম্ভবত রাইতে, শরীরের ওম এখনো পুরো ছাইড়া যায় নাই। বউটার মাথার চুলে রাতের শিশির মুক্তোদানার গয়না হইয়া ফুইটা আছে। শরীর আমার অসাড় হইয়া আসে; পা সরতে চায় না। কিন্তু তক্ষুনি শুনি, বুড়াটা হাঁক দিয়া ডাকতেছে:

‘ইঁয়া কুঁইর থিয়াইয়ছদে কিয়রলা? চলচেনা।’

দাঁড়িয়ে আছি কেন, সমানে চলছি না! বুড়া তাড়া দিচ্ছে।

সে এই কাফেলার সবচেয়ে বয়স্ক লোক, মাথার চুল সব সাদা, বুড়ার পাথুরে কুঁদা কালা মুখে এখনো চোখের পানি শুকাইয়া নুনের দাগ রাইখা গেছে। পেছনে নিজের হাতে জওয়ান পোলা আর আরেক নাতিরে মাটিচাপা দিয়া আইছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হইল, এ বুড়াটাই কেবল দেখতে পাইতেছে যে, আমি তাদের অনুসরণ কইরা আসতেছি। মাঝে মাঝে সে বিড় বিড় কইরা আমার সঙ্গে কথা কয়। অন্যরা অবাক হইয়া বুড়ারে দেখে তখন, কিন্তু কেউ কিছু বলে না; ভাবে শোকে-কষ্টে বুড়ার মাথা নষ্ট।

এ কাফেলায় মোট মাথা ছাব্বিশটা, তার মধ্যে পুরুষ মাত্র চারজন। বাকিরা গুঁড়াগাড়া আর মেয়েলোক। বেশির ভাগই এক কাপড়ে ঘর ছাড়ছে। আমি এই কাফেলার আগে আরো দুইটা দলে আছিলাম, সাগরপাড় পর্যন্ত গেছিলাম, এরপর ফিরছি। রখইঙ্গ ভূমি ছাইড়া আমার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা নাই, আমারে ইরাবতীর পাড় ছাইড়া, শীতং আর এদিকে নাফ— এই মাইনষের গড়ন নেয়া ভুঁইয়েই ঘুইরা মরতে হইব। এই, এখান থিকাই নাকি আলাওলরে তুইলা রখইঙ্গে বেইচা দিছিল; ঘটনার সত্য-মিথ্যা আমার জানা নাই। তবে এইখান থিকা মাইলটাক পিছায় গেলেই বদ্যির বাজার। একসময় এই বাজারের মেলা পসার ছিল, ভিনদেশী বণিকের নৌবহর ভিড়ত। এইখানে হার্মাদ রাজা তিবাউ ডেরা বানাইছিল কিছুকালের জইন্যে।

 

২.

এদিকে একটা নদী আছে জানা ছিল তার, ওইখানে পৌঁছতে পারলে বাঁচার একটা ব্যবস্থা হইতে পারে, ক্ষীণভাবে একবার মাথায়ও আসছিল চিন্তাটা, তারপর সবকিছু ছাড়া ছাড়া— একবার মনে হইল জঙ্গলটার শেষ, নদী পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারবে না। মাথা ঝিম ঝিম করতেছে। কাঁধের গুলিটার ধাক্কাটা মনে আছে, তারপর একটা বিকট বিস্ফোরণের শব্দও শুনছিল ঠিক তার কানের বাঁ পাশে, সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হইল, কানে তালা লাইগা গেছে! তার পর থেকে এখনো কানে ভোঁতা একটা তব্দা-মারা ভাব রইয়া গেছে।

জঙ্গলে পথ চলতে সে অভ্যস্ত না, সারা জীবন মাঠে-ঘাটে কাজ কইরা অভ্যস্ত আছিল, মাঝখানে রেঙ্গুনে গিয়া বাবুয়ানা কইরা শরীরে তার রস আইসা গেছে। এখন বুঝতেছে। কিন্তু তাকে বাঁচতে হইলে যতটা পারা যায় পেছনের ভস্মীভূত রখইঙ্গ গ্রাম থিকা দূরে সইরা যাইতে হইবে। যদিও তার পুরো শরীর বাইয়া রক্তের নদী বইতেছে। শরীর ক্রমে দুর্বল হইয়া আসতেছে। আর এদিকে অনেকক্ষণ ধইরা সে একটা জিনিস খেয়াল করতেছে, মাঝে মধ্যেই কালো, কুকুরের মতো কী একটার ছায়া বারবার তার সামনে দিয়া লাফাইয়া লাফাইয়া চইলা যাইতেছে। জিনিসটা কী, সে বোঝার ফুরসত পাওয়ার আগেই নাই হইয়া যাইতেছে। কিন্তু তার ধন্ধ লাগতেছে চারপেয়ের ছায়াটা সত্যি না, তার মনের ঘোর। এ রকম দুর্বল শরীরে ঘোর অস্বাভাবিক কিছু না। তার পরও বারকয়েক চোখ ডইলা জিনিসটারে সে ঠাহর করার চেষ্টা করতেছে, তাতেও নিশ্চিত হইতে পারে নাই। কিন্তুক তার ইন্দ্রিয় বলতেছে, জন্তুটা তারে ছাইড়া যায় নাই, সামনে-পেছনে প্রায়ই লাফাইয়া আগাইয়া যাইতেছে। আর ওর পেছনেই আসতেছে খুনে বামাররা।

এখন ঘোর বর্ষাকাল। সন্ধ্যা হইয়া আসছে প্রায়। দিনের আলো মইরা গেছে আরো আগেই। তার ওপর সকাল থাইকাই বৃষ্টি পড়তাছে। এখন চারপাশ মনে হইতেছে রাতের মতো।

এর মধ্যে ঘষটে ঘষটে পেছনের জঙ্গলটা কখন যে পার হইয়া আসছে, সে বুঝে নাই। এখন দিগন্তে একটা কালো পোঁচের মতো দেখাচ্ছে জঙ্গলটাকে। শীতং এখন একটু সামনেই পড়বে। নদীটারই একটা সরু খাঁড়ির মতো অংশে সে আছে। আরো কিছুদূর যাইতে হবে। শীতংয়ে এখন খুব বেশি পানি নাই। বৃষ্টি খাঁড়ির সাপের মতো বিস্তীর্ণ শরীরে কালো ছোপ ছোপ কিছু ডোবার মতো পানির জলা তৈরি করছে, বানের পানি না।&dquote;&dquote;

এইবার নিয়ে দ্বিতীয়বার সে দেশান্তরি হইতেছে, তবে এইবারের ঘটনার জন্য সে তৈরি আছিল না। এখন শেষ পর্যন্ত, যদি সাগর পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারে, তাহলে সে বাঁইচা যাবে, নয়তো কাল সকালে বামাররা তাকে ঠিকই খুঁইজা বাইর কইরা ফেলবে। কিন্তু এই রক্তক্ষরণ নিয়া সে কদ্দূর পর্যন্ত যাইতে পারবে! সে রখইঙ্গ হলেও মংডুতে তার বাড়ি না। এইখানে তার জন্ম, কিন্তু ১৯১২ সালের পর বর্মায় ফিরা সে থিতু হইছিল রেঙ্গুনে, এক আত্মীয়ের দোকানে কাজ করত। ক’দিন আগে আসছিল তার হবু স্ত্রীকে নেয়ার জন্যে। বেশ কিছুদিন ধইরাই নানা খবর পাইতেছিল— বামাররা সংগঠিত হইতেছে, সেনারাও তলে তলে বড় কিছুর জন্য প্রস্তুতি নিতাছে, তাই আশারবানুকে নিয়া তাড়াতাড়ি ফিরতে চাইছিল সে, কিন্তু দেরি কইরা ফেলছে। থুনি পাড়ায় আইসা দেখল, ঘরবাড়িতে আগুন জ্বলতেছে দাউ দাউ কইরা। বেশি দূর যাইতে হয় নাই, সব মিলাইয়া ওইখানে আট ঘর রোহিঙ্গা আছিল, দেখল সবগুলো ভিটায় আগুন জ্বলতেছে। আশারবানুরে দুয়ারের মাঝখানেই পাইল, একটু তফাতে অর মা, বোধহয় দৌড়াইয়া পালাতে চাইছিল, ওই অবস্থায়ই গুলি খাইছে। গোয়ালঘরের খড়ের পালার কাছে পাইল আশারবানুর বাবারে, তারে চেনা যায় না, খড়ের আগুনে শরীর পুইড়া কাঠ কয়লা হইয়া গেছে।

আর সে নিজে গুলি খাইল ঠিক ফিরার সময়, দৌড়াইয়া সে মংডুর শহরতলির দিকে যাইতে চাইছিল। তখনই কোত্থেকে যে কতগুলা গুলির বৃষ্টি আসল বলতে পারবে না, মাটিতে পইড়া গেছিল সঙ্গে সঙ্গে। অনেক পর, আগুন নিভা আসার পর হামাগুড়ি দিয়ে সে সইরা আসছে জঙ্গলের দিকে। আরাকান ওমে পৌঁছার পর সে সাগরের দিকে যাওয়ার সংকল্প করল।

সে বুঝতেছে, রাতের মইধ্যেই অনেকখানি পথ তারে সইরা যাইতে হবে। এই রাইতেই। নয়তো ওরা আইসা যাবে। সে ঘাতকদের দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু ওরা তাকে ঠিক খুঁইজা নেবে। কিন্তু তার এখন খুব দরকার ক্ষতস্থানের শুশ্রূষা, রক্ত পড়া থামাতে হইব, বিশ্রামও দরকার। আর কিছু খাবার পাইলে ভালা হইত। এই দুবলা অবস্থায় বেশি পথ সে চলতে পারবে না, গা-ঢাকা দেয়ার জন্য একটা জায়গাও দরকার।

কিন্তু ভোরের দিকে সে জ্বর আর ঘোর বিকারের মধ্যে চোখ খুলে দেখল, তার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে একটা অপার্থিব মুখ। লম্বা, ছুঁচালো। সেই কুঁইরটা! কিন্তু মুখটা মানুষের মতোই: তেরো-চৌদ্দ বছরের এক কিশোরের মুখ... তার পরই জ্ঞান হারাল সে।

 

৩.

লোকটা একবার চোখ মেলছিল, তার পরই আর সাড়া দেয় নাই।

দুপুরের দিকে মারা গেল সে। লোকটার বুক পকেটে একটা চিরুনি আর প্লাস্টিকের ভাঁজে একটা ছবি পাইলাম, মাথায় ঘোমটার মতো করে কাপড় বাঁধা একটা নারীমুখ। আরেকটা পরিচয়পত্র, এছাড়া বার্মিজ কটা নোটও আছে।

লোকটার শিয়রে বইসা নদীর উত্তরের দিকের মুখটার শুকনা জায়গাটারে আমার উপযুক্ত মনে হইল; পানি জইমা নাই এখন, কিন্তু মাটি এখনো ভিজা, কাদা কাদা। লাশটার একটা হাতের আস্তিন খামচে ধইরা আমি ওইদিকে টানতে শুরু করলাম।

মাটি খুঁড়তে তেমন কষ্ট হইতেছে না, নরম মাটি। কিন্তু খোঁড়াখুঁড়ির মাঝপথেই অদ্ভুত এক অনুভূতি হইল আমার, মনে হইল মাটি খুঁড়তে গিয়া আপনাআপনি আমার নাসারন্ধ্র ফুইলা ফুইলা উঠতাছে, যত মাটি খুঁড়তেছি, নিচ থেকে ততই জানি অদ্ভুত এক গন্ধ বাইর হইয়া আসতে শুরু করছে, মাটির ভেজা সোঁদা গন্ধ ছাপাইয়া একটা খুব পরিচিত গন্ধ। যেন আমার কোন জন্মজন্মান্তরের চেনা গন্ধ এইটা। তার পরই মনে হইল, আমার চারপাশটায় কিছু একটা উলটপালট ঘইটা যাইতেছে, কোত্থেকে যেন জেগে উঠতেছে অজস্র মানুষের কোলাহল, চিত্কার। দৌড়াদৌড়ির পদশব্দ। আমার মনে হইল, আমার পায়ের নিচেরকার মাটি আমারে নিচের দিকে টাইনা লইয়া যাইতেছে... আমি মাটির নিচে যেন সেঁধিয়ে যাইতেছি... এক অতলগহ্বরে।

একটা কোনো প্রলয়কাণ্ড যেন ঘটতেছে চারপাশে... তারপর, অনেক পর আবিষ্কার করলাম, আমার চারপাশের শীতং নদী ঠিক আছে, নদীটারে চেনাও যাইতেছে, কোনো অসুবিধা হইতেছে না, কিন্তু আমি পইড়া আছি একটা হাড়গোড়ের গহ্বরে: মুখের কাছেই একটা নরমুণ্ড, চোখের কোটর দুটো ফাঁকা, মুখটা হাঁ করে যেন হাসছে, একটা বিচ্ছিন্ন কঙ্কাল, আর তারপর শুধুই হাড়গোড়, আরো নরমুণ্ড, অগুনতি হাড়গোড়ের শরীর যেন পরস্পরের সঙ্গে জড়াজড়ি কইরা পইড়া আছে... একটা না, দুইটা না, শয়ে শয়ে, হাজারে হাজার...

তার সামনের মাথার খুলি, কঙ্কাল-হাড়গোড় এক কিশোরের, সে বুঝতে পারছে। করোটির নিচের দিকে, ঘাড়ের যে অংশের সঙ্গে মাথা জুড়ে থাকে, সেখানেও কোনো কিছুর কোপে চোয়ালের পেছন দিকের হাড় কেটে আলাদা হয়ে গেছে, কঙ্কালের কাঁধের বাঁ দিকের হাড়টাও দুই টুকরা হয়ে আছে দায়ের কোপের চিহ্ন নিয়ে।

আর তক্ষুনি, শুধু তক্ষুনি সে নিশ্চিতভাবে বুঝল, এটা তার নিজের মাথার খুলি, তার নিজের কঙ্কাল... এই তার নিজের হাত... তার সব অস্থি...

এই তার জীবন... তার মৃত্যু... তার অতীত, তার অতৃপ্ত আত্মা, যা শুধু এতদিন দিশাহীন এক রখইঙ্গ যাযাবরের গান হয়ে এই চরাচরে ঘুরে বেড়িয়েছে।

এবার সে তার চারপাশে তাকাল, সে একা নয়। আরো অসংখ্য আত্মা দলে দলে এসে জড়ো হয়েছে এখানে, তাদের পতিত কঙ্কাল, হাড়গোড় খুঁজছে তারা। তার টোলের এক সহপাঠীকে চিনল সে, তার পাড়ার অন্যরাও আছে, তাদের গ্রামের অনেকেই... তাদের পণ্ডিতমশাই... মৌলবি সাহেব... তার বাবাও আছে! তার আরেকজন খেলার সাথিকেও দেখল, পড়শিদের একজন... আরো একজন... আরো... অনেক... অনেক... সবাই এসে জড়ো হচ্ছে...।

অতলগহ্বরের এই গণকবরের মাঝখানেই আচমকা সে দেখল: মাটি ফুঁড়ে কোত্থেকে যেন এসে উদয় হলো তাদের বড়বাজারের গেরুয়া বসনধারী ভিরাথু ভিক্ষু, কোনো সুদূর অতীতের ঘটনা হঠাৎ যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে কিশোরের চোখের সামনে। কি ভীষণদর্শন ভিরাথুর চেহারা! তার হাতে ধরা বিশাল এক দা, কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘাড়ে কোপ খেয়ে লুটিয়ে পড়ল কিশোর। টোল থেকে ফিরছিল সে, হাতের বই-খাতা কোথায় গিয়ে ছিটকে পড়ল, রক্তে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল তার, শুধু কানে এল ভীষণদর্শন ভিরাথু ভিক্ষুর পৈশাচিক উল্লাস:

আনাতারাউঙ হকুয়ে...

(বেজন্মা কালার কুঁইর...)